, ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

কাঠের তালা চাবি

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

কাঠের তালা চাবি

নিরাপত্তা মানুষের মৌলিক চাহিদা। এই চাহিদা থেকেই তালা চাবি তৈরি হয়েছে। বর্তমানে অনেক রকম ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হয়েছে। ডিজিটাল যন্ত্রের তালা খুলতে লাগে পাসওয়ার্ড বা চাবি। ডিজিটাল বাংলাদেশের মানুষ পাসওয়ার্ড শব্দটির সঙ্গে হরহামেশাই পরিচিত।

আদিম কালেও এই তালাচাবি ছিল। আদিম গুহাবাসী মানুষের যেমন নিরাপত্তার প্রয়োজন ছিলো, বর্তমান শহর জীবনেও তেমনই প্রয়োজন নিরাপত্তা। মানুষ আদিকাল থেকে এ পর্যন্ত যেখানেই অবস্থান করে সেখানেই তার নিরাপত্তার প্রশ্নটি প্রথম ভেবে থাকে।

jagonews24

এভাবে এক হাত থেকে আরেক হাত, এক দেশ থেকে আরেক দেশ চিন্তা, গবেষণা ও প্রযুক্তি বিবর্তন হয়ে আধুনিক তালাচাবি তৈরি হয়েছে। ইতিহাসের পাতায় দেখা যায়, এক কাঠুরে থাকতেন গুহায়। যখন সে বাইরে যেতো, গুহার মুখে একটা পাথর চাপা দিয়ে ঢেকে রাখতেন।

ধীরে ধীরে মানুষ পরিচিত হলো, গাছ, খড়-কুটো ইত্যাদির সঙ্গে। সেসব দিয়ে ঘর বানানোও শিখলো। তখন থেকেই ব্যক্তিগত জীবনের নিরাপত্তার জন্য দরজা তৈরির। প্রথম প্রথম দরজায় রশির গিট দেওয়া হতো।

মানুষে মানুষে বৈরিতার জন্য নিরাপত্তার কথাটি সবাই ভাবলো। শুরু হলো তালা চাবি বানানোর গবেষণা। পুরোনো শহরগুলোতেও ভেতরে থেকে লোহার রড দিয়ে দরজা আটকানো হতো। এই লোহার দণ্ডটিই ক্রমান্বয়ে তালাচাবির আকার পেলো।

jagonews24

বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা যে ঘরে থাকতেন সেই ঘরের দরজায় ছিলো এক ধরনের কাঠের তালা। এই তালাকে বলা হয় ডাব্বা। এটি মিসরীয় ভাষা। তখনকার তালার সঙ্গে প্রযুক্তিগত মিল ছিলো কাঠের তালায়। মিশরে কাঠের ছুঁতোর-মিস্ত্রিরা নির্মাণ কাজে ছিলো খুব দক্ষ।

তারা হরেক রকমের তালা চাবি বানাতো। বাইরে থেকে দরজা খোলা বা বন্ধ করার পদ্ধতিও তারা জানতেন। সেজন্য গোপন সুতা ব্যবহার করতেন। এক টুকরো কাঠ এক দরজার পাল্লায় লাগিয়ে অন্য দরজায় একটা গর্ত করা হতো। কাঠের টুকরোটি আর গর্তটি তখন তালার কাজ করতো। এমন কাঠের দরজার তালা আজও মিশরের গ্রামগুলোতে জনপ্রিয়।

মিসর থেকে এই তালা চলে আসে মধ্যপ্রাচ্য, মেক্সিকো ইত্যাদি এলাকায়। তবে দরজার খিল বানানো হলো অন্যভাবে। ইবনে ইখওয়া তার ভ্রমণ কাহিনিতে উল্লেখ করেছেন, ‘দরজার তালা ছিলো দরজার ভেতরেই কনসিল বা গোপন অবস্থায়।’

jagonews24

‘এই কনসিল তালাটি বাইরে থেকে এমনিতে খোলা যেতো না। এই তালার নিরাপত্তা গুণ বেশি ছিলো।’ মিশরের জাদুঘরে এমনই কতগুলো কাঠের তালা আছে। এই তালাগুলো খুলতে আবার কাঠের চাবি লাগে।

প্রশাসনিক আইন বিষয়ক আরবি বইয়ের নাম হিসবা। সেখানে বর্ণিত রয়েছে, কোনো ব্যক্তিই একটি তালার দু’টো চাবি বানাতে পারতো না। কোনো ছুঁতোর-মিস্ত্রি যদি কাঠের তালার দু’টো চাবি বানাতো, তাহলেই হয়েছে। তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হতো। শুধু বাজার পরিদর্শককে প্রতিটি ঘরের একটি করে চাবি দেওয়া হতো।

তিনি তার এলাকার যে কোনো ঘর যখন তখন খুলে পরিদর্শন করতে পারতেন। সে কারণে কেউ চাবি হারিয়ে ফেললে তার পক্ষে আরেকটি চাবি বানানো সম্ভব হতো না। একই সঙ্গে বাজার পরিদর্শক বা মুহতাসিব তালা চাবি বানানোর কতিপয় নির্দেশ জারি করেন।

একেকটি তালার জন্য একেক রকম কাস্টমাইজ চাবি বানাতে হবে। নিরাপত্তা জোরদার করতে তালা চাবির নমুনা প্যাটার্ন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তৈরির নির্দেশ দিলেন।

jagonews24

এই তালা চাবি বানানোর কাজে দারোয়ান, রক্ষীদেরও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা আছে। কায়রোর আল-আজহার এলাকায় ওক গাছের কাঠ দিয়ে দরজার বোল্ট বানানো হতো। এসবের চাবি এলাকার প্রধান ব্যক্তির নিরাপদ হেফাজতে থাকতো।

যানবাহন ছাড়া শুধু মানুষ ঢুকতে পারে এমন স্থানে ছোট ছোট গেট বানানো হতো। এই গেটও আবার ভেতর থেকেই শুধু খোলা যেতো। এ ধরনের পুরোনো গেট মিশরের আল আজহার এলাকায় এখনো দেখতে পাওয়া যায়।

মিসরের জাদুঘরে যেসব কাঠের তালা চাবি রয়েছে সেগুলোর মতোই এখনো মিসরের প্রাচীন শহরের তালাগুলো দেখা যায়। এসব ডাব্বা বা কাঠের তালায় বিচিত্র নকশা করা হতো। আফ্রিকার তালাগুলোতে কোনরূপ নকশা থাকতো না। কোনো কোনো তালা বানানো হতো জীব জন্তুর শিং দিয়ে। অনেক সময় দরজার তালায় খোদাই করে বিভিন্ন কথা লেখা হতো।

কোনোটিতে লেখা থাকতো- ‘শান্তিতে প্রবেশ করো’ ইত্যাদি। এ শতাব্দীর পরিব্রাজক ই. ডব্লিউ লেন মিসরের গ্রামে গ্রামে বছরের পর বছর ঘুরে বেড়ান। তিনি লিখেন, ‘মিসরে গ্রামের মানুষ এখনো শক্ত কাঠ দিয়ে দরজা তৈরি করে। সেসব দরজার তালাচাবিও থাকে কাঠের। সেখানকার রাস্তার বড় গেট ৩৫ সেন্টিমিটার লম্বা।’

মিসরের ওয়াদীহাফা নামক এলাকায় যেসব কাঠের তালা ব্যবহৃত হয় সেগুলোর সৌন্দর্য্য মেয়েদের গয়নার মতো। দেয়ালের প্লাস্টারের রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তালায় ম্যাচিং করা রং দেওয়া হতো। এই ডেকোরেশনকে মিসরের ঐতিহ্যগত নিউবিয়ান ডেকোরেশন বলে।

jagonews24

মিসরের নিউবিয়ান যুগে শিল্পকলা ছিলো ভিন্নধর্মী। তখন আঁকাবাঁকা ফর্মে অংকন করা হতো। আড়া-আড়িভাবে দাগ টেনে মাঝের বৃত্তটি ভরাট করা হতো। এই ধরনের শিল্পকলা মধ্যযুগে ছিলো বেশ জনপ্রিয়।

ধীরে ধীরে কাঠের তালার উন্নতি হয়ে এলো লোহার তালা। এই তালা দেখতে যেমন সুন্দর। টেকেও বেশিদিন। আবার নিরাপত্তাও বেশি। এই তালায় প্রথম প্রথম বড় আংটা লাগানো থাকতো। মিসরের এক কামার প্রথম লোহার তালা তৈরি করেন।

তিনিই প্রথম ব্যাঙের ছাতার মতো আকৃতিতে ধাতু কেটে লোহার তালা তৈরি করেন। তিনি ছেনি দিয়ে লোহা কেটে কেটে তালার আকার দিতেন। এগুলো মূলত তালা নয়। আংটা। সেদিনের কাঠের তালার কোনো পরিবর্তন নেই আজও। এখনো এই খিল বা ডাব্বার আধুনিক সংস্করণ তালাচাবি সবাই ব্যবহার করেন।

আগেই বলা হয়েছে, তালাচাবি যা দিয়েই তৈরি হোক না কেন, সবই নিরাপত্তার জন্য তৈরি। বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে এখনো মানুষ এই কাঠের তালাচাবি ব্যবহার করেন। লোহার তালা, চাকু ইত্যাদি বিভিন্ন জিনিস দিয়ে রোগ উপশমের প্রাচীন বিশ্বাস বদ্ধমূল হয়ে রয়েছে।

মিসরের সাধারণ মানুষ আজও শারীরিক নিরাপত্তার জন্য ব্যবহার করে এই তালা। যেমন- মাথা ব্যথার উপশমে লোহার তালা ব্যবহার করেন মিসরের কৃষকরা। প্রথম তালা চাবিকে এক টুকরো কাপড়ে বেঁধে সেটা কপালে বেঁধে দেওয়া হয়। তাদের বিশ্বাস, এই তালা মাথাব্যথা চুষে খায়।

  • সর্বশেষ - ফিচার