, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

১৪ এপ্রিলে দেশে দেশে বর্ষবরণ

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

১৪ এপ্রিলে দেশে দেশে বর্ষবরণ

'মুছে যাক গ্লানি/ঘুচে যাক জরা/অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা'/ তাপস নিশ্বাস বায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে,/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক যাক। কবিগুরুর গানের মতোই বাঙালির সব গ্লানি,জরা সব মুছে যাক নতুন বছরে। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ আজ। শুধু বাংলাদেশের বাঙ্গালিরাই নন, বিশ্বের সব বাংলা ভাষাভাষীর মানুষের প্রাণের দিন আজ।

বাংলা বর্ষপঞ্জির প্রথম দিন পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। রমনার বটমূলে শতকণ্ঠে এসো হে বৈশাখ, এসো এসো গানের মাধ্যমে বাংলাইর এই উৎসবের শুরু। সূর্য ওঠার সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলাভবন থেকে বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। যা পহেলা বৈশাখের উৎসবের অংশ হয়ে গিয়েছে এতদিনে। এরপর পান্তা ইলিশ খাওয়া আর মেলায় ঘোরা।

রংবেরঙের পোশাকে সজ্জিত নারী-পুরুষ শিশুরা। নারীদের পরনে সাদা পাড়ের লাল শাড়ি, খোপায় ফুল, হাতভর্তি লাল চুড়ি এক ঐতিহ্যবাহী সাজ। পুরুষের পরনে থাকে সাদা পাঞ্জাবি। ছোটদের গালে আঁকা লাল সাদা রঙে শুভ নববর্ষ।

তবে জানেন কি? শুধু বাংলা ভাষাভাষীর মানুষেরাই নন, ১৪ এপ্রিল দিনটি আরও অনেক দেশ তাদের বর্ষবরণ উৎসব পালন করেন। এর মধ্যে ভারতের কয়েকটি রাজ্য, মিয়ানমার, নেপাল, থাইল্যান্ড, শ্রীলংকা, কম্বোডিয়া এবং ভিয়েতনাম অন্যতম।

jagonews24

বাংলাদেশ
ইতিহাসবিদদের হিসাব অনুযায়ী ১৫৫৬ সাল থেকে বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়। মুঘল সম্রাট জালালউদ্দিন মোহাম্মদ আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য তার সভার জ্যোতির্বিদ আমির ফতুল্লা শিরাজীর সহযোগিতায় ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দে 'তারিখ-এ-এলাহি' নামে নতুন একটি বছর গণনা পদ্ধতি চালু করেন।

এটি কৃষকদের কাছে 'ফসলি সন' নামে পরিচিত হয়, যা পরে 'বাংলা সন' বা 'বঙ্গাব্দ' নামে প্রচলিত হয়ে ওঠে। ঐ সময়ে প্রচলিত রাজকীয় সন ছিল 'হিজরি সন', যা চন্দ্রসন হওয়ার প্রতি বছর একই মাসে খাজনা আদায় সম্ভব হতো না।

বাংলা সন শূন্য থেকে শুরু হয়নি, যে বছর বাংলা সন প্রবর্তন করা হয়, সে বছর হিজরি সন ছিল ৯২৩ হিজরি। সে অনুযায়ী সম্রাটের নির্দেশে প্রবর্তনের বছরই ৯২৩ বছর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু হয় বাংলা সনের। বাংলা বর্ষের মাসগুলোর নামকরণ হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্রের নামে।

তবে এখন যে রূপে বাংলা নববর্ষ পালন করা হয়, রাজধানী ঢাকায় ১৯৬৭ সনের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন জনপ্রিয় হয় নি। সেসময় ঢাকায় রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ ও মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করার রীতি চালু হয়, যা এখন সার্বজনীন চরিত্র লাভ করেছে।

jagonews24

ভারত
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন শুরু হয়। কিন্তু তারও বহু বছর আগে থেকে পঞ্জিকা দেখে যেসব দিন আর ক্ষণ উদযাপন হত, সেগুলো এখনো দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে পালন করা দেশটির সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।

ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বৈশাখ মাসের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করা হয়। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন হয় বৈশাখের প্রথম দিন। যেমন: পাঞ্জাবে-বৈশাখী, কেরালায়-ভিষু, আসামে-বিহু, তামিল নাড়ুতে-পুথান্দু, উড়িষ্যায়-পান সংক্রান্তি, পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়-পহেলা বৈশাখ।

মিয়ানমার
মিয়ানমারের নববর্ষকে স্থানীয়ভাবে থিংইয়ান নামে ডাকা হয়। বার্মিজ ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে 'পরিবর্তন' বা 'এক জায়গা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর'। নতুন বছরের প্রথম দিনটি সাধারণত মধ্য-এপ্রিলে হয়ে থাকে, তবে ঠিক কোন নির্দিষ্ট দিনে তা পালন হবে তা হিসাব করা হয় মিয়ানমারের সৌর এবং চন্দ্র পঞ্জিকার গণনা মিলিয়ে।

১৪ এপ্রিল মিয়ানমারে পালিত হয় থিংইয়ান উৎসব। এই দিনে বার্মা বা মিয়ানমার জুড়ে পানি উৎসব হয়, এটি পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো পানি উৎসবের একটি। দেশটির মানুষ ৫০০ বছরের বেশি সময় ধরে পালন করে আসছে এ উৎসব। নববর্ষের চারদিন আগে থেকে পানি উৎসব শুরু হয়, চলে নববর্ষের দিন পর্যন্ত।

jagonews24

দেশটির মানুষের বিশ্বাস, পানি উৎসবের পানির ছোঁয়া লাগতে হবে সব মানুষের গায়ে, তাতে করে সব পাপ দূর হয়ে যাবে। এপ্রিলে মিয়ানমারের তাপমাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে, যে কারণে পানি উৎসবের কারণে লোকের কষ্টের চেয়ে বরং এক ধরণের শান্তি হয়।

থাইল্যান্ড
থাইল্যান্ডের নতুন বছরের শুরুর দিনটি সংক্রান উৎসব নামে পরিচিত। সংক্রান শব্দটি সংস্কৃত ভাষার শব্দ সংক্রান্তি থেকে এসেছে। থাইল্যান্ডে মূলত এটি এপ্রিলের ১৩ তারিখে শুরু হয়, কিন্তু এ উৎসব চলে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত। নববর্ষে সেখানে সবচেয়ে বড় আয়োজন থাকে পানি উৎসব। দিনভর সব বয়সের সব শ্রেণীর মানুষ অংশ নেন তাতে।

২০১৮ সালে থাই সরকার উৎসবের দৈর্ঘ্য ১২ এপ্রিল থেকে ১৬ই এপ্রিল পর্যন্ত ঘোষণা করেছে। এ সময়ে দেশটির সাধারণ ছুটি থাকে। থাই ও মালয়েশিয়ান সিয়ামিজ গোত্রের মানুষেরাই মূলত ধর্মীয় রীতি মেনে এ উৎসব পালন করেন, কিন্তু উদযাপন হয় দেশজুড়ে।

শ্রীলঙ্কা
১৪ এপ্রিল দিনটিতে শ্রীলঙ্কায় সরকারি ছুটি থাকে। এই দিনে তারা নববর্ষ পালন করে। তবে উৎসব চলে এক সপ্তাহ ধরে। এ উৎসবটিও সৌর পঞ্জিকা অনুসারে পালন করা হয়, কিন্তু ঠিক কোন দিনে পালন করা হবে দিনটি সেটি নির্ধারণ করা হয় নতুন চাঁদের হিসাবে।

এই উৎসবকে তারা বলে সিনহালা উৎসব। নববর্ষকে স্থানীয়ভাবে আলুথ আবুরুদ্ধাও বলা হয়। মূলত সিনহালিজদের উৎসব হলেও দেশটির সকল মানুষ উদযাপনে সামিল হন।

jagonews24

উৎসবে নানা রকম পিঠা, মিষ্টি আর পায়েস বানানো হয়। সিনহালা বর্ষবরণে গরুর দৌড়েরর মতো বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী প্রতিযোগিতা হয়। এই উৎসবের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী খেলা হাওয়ায় ছুড়ে মারা ডিম ধরেন প্রতিযোগীরা।

এই উৎসবের আরেকটি খেলা হচ্ছে ফসলি মাঠে কাদা খেলা। সিনহালা উৎসবে মূলত নাগরিক আয়োজনের চাইতে লোকজ বিভিন্ন খেলাধুলা আর প্রতিযোগিতার আয়োজন বেশি দেখা যায়।
কম্বোডিয়া এশিয়ার আরও একটি দেশ কম্বোডিয়াও ১৪ এপ্রিল নববর্ষ পালন করে। দেশটিতে দিনটিকে বলা হয় 'চউল সানাম থামাই', এর মানে নতুন বছরে প্রবেশ করা।

উৎসবের শুরু হয় বৌদ্ধ মন্দিরে সকাল বেলায় ধর্মীয় আচার পালনের মধ্য দিয়ে। এরপর প্যাগোডা বা বৌদ্ধমন্দির চত্বরে ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মাধ্যমে নতুন বছরের স্বাগত জানাতে শুরু করেন অধিবাসীরা।

খেমার নববর্ষে কম্বোডিয়াতে নানা ধরনের লোকজ খেলা এবং প্রতিযোগিতা হয়। এর মধ্যে একটি হচ্ছে রশি বা দড়ি টানাটানি খেলা হয়, অধিকাংশ এলাকায় নারী বনাম পুরুষের মধ্যে হয় এই খেলা। তাতে অংশ নেন বাচ্চা-বুড়ো সবাই।

jagonews24

নেপাল
১৪ এপ্রিল নেপালের আনুষ্ঠানিক বর্ষ পঞ্জিকা বিক্রম সাম্বাতের প্রথম দিন। সৌর পঞ্জিকা, যা মূলত প্রাচীন হিন্দু রীতি অনুযায়ী তৈরি করা হয়, তার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয় কোন দিনে পালন হবে উৎসব, তবে সাধারণত ১৪ এপ্রিলেই হয় উৎসবটি।

এ দিনে নেপালে নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকে। বিভিন্ন পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানাদি হয় দিনটিতে, উৎসবের আমেজে ভালো খাওয়া-দাওয়া, শুভেচ্ছা বিনিময় আর নানা খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। তবে নেপালে চন্দ্রবর্ষের প্রথম দিন, যার নাম সোনাম লহসারও উদযাপন করা হয়, সেদিনও সরকারি ছুটি থাকে দেশটিতে।

লাওস
লাওসেও সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী বৈশাখের প্রথম দিনটি পালন করা হয়। স্থানীয়ভাবে এর নাম সংক্রান বা পি-মেই, যার মানে নতুন সংক্রান্তি বা নতুন বছর। দেশটিতে তিন দিন ধরে চলে উৎসব আনুষ্ঠানিকতা।

  • সর্বশেষ - ফিচার