, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

পাসপোর্ট ইস্যুর অনলাইন কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহবাসী

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

পাসপোর্ট ইস্যুর অনলাইন কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহবাসী

পাসপোর্ট ইস্যুর অনলাইন কার্যক্রম স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় সুফল পাচ্ছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহবাসী। সেবার মান বেড়ে স্বচ্ছতা ফিরে এসেছে ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। গত ৬ মাসে প্রায় ২ হাজার অমিমাংসিত আবেদন নিষ্পত্তি করে ভুক্তভোগীদের হৃদয়ে ঠাঁই করে নিয়েছেন কর্মকর্তারা। সেবা প্রত্যাশীরা যেকোনো সমস্যা নিয়ে সহসাই দেখা করতে পারেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সাথে। সমাধান নিয়ে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেন ভুক্তভোগীরা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও সচিব এবং ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব চৌধুরী এসজিপি, পিবিজিএমএস, এনডিসি, পিএসসি-এর কঠোর নির্দেশের পুরোটাই বাস্তবায়িত হচ্ছে ময়মনসিংহে। দালাল পাসপোর্ট করে দেয় এ কথা এখন পুরোপুরি সত্য নয়। বাংলাদেশে পাসপোর্ট ইস্যু সিস্টেম এখন শতভাগ ডিজিটালাইজড। দেশের প্রতিটি অফিসে আবেদন থেকে শুরু করে পাসপোর্ট বিতরণ পুরোটাই স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। বিষয়টি না জেনে ৩০ ভাগ সেবা প্রত্যাশী দালালের শরণাপন্ন হন। এদের অধিকাংশই অশিক্ষিত এবং গ্রামের সহজ-সরল মানুষ। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে তারা দালালদের খপ্পরে পড়েন। অন্যদিকে অবৈধ সুবিধা নিতে ব্যর্থ হওয়া একটি চক্র এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে প্রায়ই নানান অপপ্রচার চালায়। সূত্র মতে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অপপ্রচার আমলে না নিলেও অনেকেই ঠিকই বিশ্বাস করেন। গ্রামাঞ্চল থেকে পাসপোর্ট করতে আসা সহজ-সরল মানুষ অপপ্রচারের কারণে হরহামেশাই প্রতারিত হন। এদিকে পাসপোর্ট দালাল এবং অপপ্রচারে জড়িতদের বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছে একটি গোয়েন্দা সংস্থা। অনেক তথ্য এখন তাদের হাতে। সোমবার (১৮ এপ্রিল) সরেজমিন ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে কথা হয় অর্ধশত সেবা প্রত্যাশী এবং গ্রহীতার সাথে। ভুক্তভোগী এবং প্রতারণার শিকার ৭-৮ জন বর্ণনা করেন তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতা। এদের একজন নারী সাংবাদিক মারফুয়া আক্তার মোনালিসা। গত ৬ মাস আগে দীর্ঘ ১ বছর কয়েকবার পাসপোর্ট অফিসে ধর্ণা দিয়েও কাঙ্খিত সেবা পান নি। উপ-পরিচালক মোঃ হাফিজুর রহমান তার কাছ থেকে বিস্তারিত শুনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে ৪ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট দেওয়ার অঙ্গিকার করেছেন। সূত্র মতে, এভাবেই গত ৬ মাসে জটিলতা নিরসন করে প্রায় ২ হাজার অমিমাংসিত আবেদন নিষ্পত্তি করা হয়।


মারফুয়া আক্তার মোনালিসা দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে জানান, আগের পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় ১০-০৩-২০২০ তারিখে এমআরপি’র জন্য ময়মনসিংহ অফিসে হাতে লিখা আবেদন জমা দেন। আবেদনের সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের গড়মিল থাকায় তার আবেদন অমিমাংসিত রাখা হয়। নিয়ম অনুযায়ী তিনি জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেন। পরবর্তীতে কয়েকদিন অফিসে গেলেও কোনো সুরাহা পান নি। বিড়ম্বনার কারণে পরে আর তিনি পাসপোর্ট অফিসে যান নি। পাসপোর্টের বিশেষ প্রয়োজন পড়ায় মোনালিসা গত ১২ এপ্রিল এবং ১৮ এপ্রিল সরাসরি উপ-পরিচালকের সাথে দেখা করে কাগজপত্র উপস্থাপন করেন। অন্যদিকে অভিন্ন এবং কিছুটা ভিন্ন সমস্যার কথা জানান কয়েকজন ভুক্তভোগী ও প্রতারণার শিকার সেবা প্রত্যাশী। সংশোধন করা জাতীয় পরিচয়পত্র, প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে করা এফিডেভিটের মূল কপি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার শর্তে দ্রুত সময়ের মধ্যে তাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছেন উপ-পরিচালক মোঃ হাফিজুর রহমান। সূত্র মতে, ব্যক্তিগত তথ্য গোপন করে আবেদন জমা দেওয়া, অনভিজ্ঞ লোক দিয়ে হাতে লিখা ও অনলাইনে ত্রুটিপূর্ণ ফরম পূরণ এবং আবেদন জমা নেওয়ার সময় ভালোভাবে চেক না করার কারণে গত ৬ মাস আগে পর্যন্ত ৪ হাজার আবেদন অমিমাংসিত থেকে যায়। বর্তমান উপ-পরিচালক ১৪-১০-২০২১ তারিখে ময়মনসিংহে যোগদান করে কয়েকদিনের মধ্যে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে এনে ভুক্তভোগীদের দুর্ভোগ কমাতে থাকেন। অক্লান্ত শ্রম দিয়ে গত ৬ মাসে পর্যায়ক্রমে নিষ্পত্তি করেন প্রায় ২ হাজার অমিমাংসিত আবেদন। সোমবার (১৮ এপ্রিল) পর্যন্ত ময়মনসিংহে অমিমাংসিত আবেদন ছিলো আড়াই হাজারের বেশি। জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে ব্যাপক গড়মিল রয়েছে ৫ শতাধিক আবেদনের। গুরুত্বপূর্ণ মামলা এবং ভুল ঠিকানার কারণে নেগেটিভ পুলিশ রিপোর্ট হওয়ায় ঝুলে আছে শতাধিক আবেদন। অমিমাংসিত আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে পাসপোর্ট অফিস আন্তরিক হলেও চিহ্নিত কয়েকজন দালাল আবেদনকারীদের ভুলভাল বুঝিয়ে মোটা অংক হাতিয়ে নেয়। সূত্র মতে, আবেদনের সাথে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকা, পুরাতন এমআরপি’র সাথে জাতীয় পরিচয়পত্রের ব্যাপক গড়মিল থাকায় রি-ইস্যুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জটিলতা সৃষ্টি হয়। বিষয়টিকে পুঁজি করে মোটা অংক হাতিয়ে নেন পাসপোর্ট দালালরা। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে একটি চক্র প্রায়ই নানান অপপ্রচার চালায়।


জানা যায়, ময়মনসিংহে অফিস খোলার দিন গড়ে বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১৮০ টি আবেদন জমা পড়ে। স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার নিয়ন্ত্রিত ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সার্ভারে আবেদন ফরম পূরণ করে সেবা প্রত্যাশীকে ব্যাংক অথবা বুথে টাকা জমা দিয়ে সরাসরি আবেদন স্ক্যান করে ছবি তুলে ফিঙ্গার ও আইরিশ দিতে হয়। এখানে পাসপোর্ট দালালদের কোনো ভূমিকা নেই। পাসপোর্ট করতে আসা অনেকেই বিষয়টি না বুঝে দালালের খপ্পরে পড়েন। তড়িঘড়ি করার কারণে দালালদের হাতে পূরণ করা ২০ ভাগ আবেদন কমবেশি ভুল হয়। অনিচ্ছা থাকার পরও অনেকেই দালালের কথায় ভুলে গিয়ে ফাঁদে পড়েন। মাসকান্দায় পাসপোর্ট অফিসের কাছে, নগরীর দুর্গাবাড়ি এবং রেলীর মোড় ইন্ডিয়া ভিসা সেন্টারের সামনে এই দালালদের অবস্থান। অনলাইনে বিভিন্ন সেবা দেওয়ার নামে দোকান খুলে এরা পাসপোর্টের দালালী করেন। তারা পাসপোর্ট করিয়ে দেওয়ার কথা বলে ফরম পূরণ করে সেবা প্রত্যাশীদের পাসপোর্ট অফিসে পাঠিয়ে আবেদন জমা দেওয়ায়। বলা হয়, ‘আপনি জমা দিয়ে আমাকে রসিদ দিয়ে যান। বাকি কাজ আমরাই করে দিব।’ এর পরই শুরু হয় নানান জটিলতা ও ভোগান্তি। স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে সেবা প্রত্যাশীদের নামে পাসপোর্ট ইস্যু হলেও বাহবা নেন দালালরা। অনেক সময় তারা নিজেরাই জটিলতা তৈরী করে অফিসের কথা বলে গ্রামের সহজ-সরল মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেন। সূত্র মতে, ময়মনসিংহের পুরোপুরি এবং চাকরি, ব্যবসা ও সন্তানের লেখাপড়া করাতে ময়মনসিংহে অবস্থান করা নেত্রকোনা, শেরপুর ও জামালপুরের আংশিক মানুষ ময়মনসিংহ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিস থেকে সেবা নেন। এছাড়া চাকরি সূত্রে দীর্ঘদিন ময়মনসিংহে অবস্থান করা বিভিন্ন জেলার লোকজনও ময়মনসিংহ অফিস থেকে সেবা নিয়ে থাকেন। ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ সরকারি ছুটি থাকায় রবিবার এবং সোমবার (১৮ এপ্রিল) পাসপোর্ট অফিসে বেশি ভিড় ছিলো। সোমবার ২৭২ টি আবেদন জমা হয়। বিতরণ করা হয় প্রায় ৩০০ পাসপোর্ট। কথা হয় আবেদন জমা এবং পাসপোর্ট নিতে আসা অনেকের সাথে। কোনো প্রকার জটিলতা ছাড়াই ভালুকার তরিকুল ইসলাম, গফরগাঁওয়ের নবী হোসেন, ধোবাউড়ার মোছাঃ নূরুন নাহার ও ফুলবাড়িয়ার মোঃ ইউসুফ আলী আবেদন জমা দেওয়ার কথা নিশ্চিত করেন। অভিন্ন মন্তব্যে তারা জানান, এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম না জানি কতো ঝামেলা। কাঙ্খিত পাসপোর্ট হাতে পাওয়া ধোবাউড়ার মোঃ রুবেল মিয়া, গফরগাঁওয়ের শিউলী আক্তার, ভালুকার মোঃ মাজেদুল ইসলাম ও ফুলবাড়িয়ার মোঃ মামুন মিয়া অভিন্ন বক্তব্যে জানান, তারা বিড়ম্বনা ছাড়াই পাসপোর্ট নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। পাসপোর্ট অফিস সম্পর্কে তাদের ধারণা পাল্টে গেছে।



  • সর্বশেষ - জাতীয়