, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

আনিস ফারদীনের গল্প: একলা একা

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

আনিস ফারদীনের গল্প: একলা একা

এক.
জানালা দিয়ে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে ফারিহা। কিছু ভালো লাগছে না তার। নদীর তীরে উঁচু ঢিবিটাতে যে কাঠগোলাপ গাছটা রয়েছে, চোখ পড়ে তার দিকে। সাদাভ লাল লাল ফুলে ছেয়ে আছে পুরো গাছ। গা ঘেঁষাঘেঁষি করে বসে আছে দুটো মধ্যবয়সী শালিক। যেন দুজন দুজনের মনের সব ভালোবাসার কথা উগড়ে দিচ্ছে একান্তে। দুটো নৌকা উত্তর দিকে প্রতিযোগিতা করে এগিয়ে চলছে যেন। অদম্য এ ছুটে চলা। নৌকাগুলোয় যাত্রী আছে কয়েকজন। গন্তব্য সামনের চর। পাশের লঞ্চঘাট থেকে দু-ঘণ্টা পর পর লঞ্চ ছেড়ে যায় বিভিন্ন গন্তব্যে। এ লঞ্চগুলো দূরের গন্তব্যে ছেড়ে যায়। তাই স্থানীয়রা যাতায়াতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাঝারি আকৃতির এই সাম্পান নৌকাগুলো ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিম দিকের সূর্যটা কিছুক্ষণের মধ্যেই অস্ত যাবে। আকাশে কিছু লাল পাহাড়ের সারি দেখা যাচ্ছে মনে হয়। বিষণ্ন মনে বসে আছে ফারিহা। মন খারাপের সময়গুলোয় এভাবে বসে থাকে সে। আজও মন খারাপ তার। তবে সহজে হুটহাট মন খারাপ হয় না তার। আশে-পাশের সবাই জানে ফারিহা হাসি-খুশি একটা মেয়ে। সব কিছুকে দক্ষতার সাথে হ্যান্ডেল করে। আজ মন খারাপের অবশ্য কারণ আছে। আজ তার ২১তম বিবাহবার্ষিকী। অথচ যার সাথে ঘটা করে বিয়ে হয়, সে মানুষটি নেই তার সাথে। বছর পাঁচেক আগে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় আসিফের সাথে। যেটাকে সবাই ডিভোর্স বলে। দুজনের পথ দুই দিকে আজ।

দুই.
চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলো। কী সুন্দরই না ছিল তাদের জীবন। আসিফের সাথে প্রথম পরিচয়টা এখনো স্বপ্নের মতো মনে হয় ফারিহার কাছে। ক্যাম্পাসের থিয়েটারের মঞ্চে প্রথম দেখা হয় দুজনের। প্রথম যেদিন দেখা হয়, আসিফ পরেছিল হালকা নীলের মধ্যে চেক শার্ট। মাথায় লম্বা চুল। কলারে ঝুলানো ছিল সানগ্লাস। হাতে মাইক্রোফোন। অসাধারণ গানের গলা। নবীন বরণ অনুষ্ঠানে অসাধারণ গান করেছিল আসিফ। যেন গানের প্রকৃত স্রষ্টাকেই পেছনে ফেলে দিচ্ছে। কী সুর, কী মোহনীয় গলা, পারফেক্ট কম্বিনেশন। পরপর চার-পাঁচটি গান গায় আসিফ। মঞ্চের দর্শকদের হাততালিতে যেন খই ফুটছিল। অবশ্য আসিফকে পুরো ক্যাম্পাসে সবাই এক নামে চেনে। জুঁইও সেদিন গানের প্রসঙ্গ আসতেই আসিফ ভাইয়ের কথা বলেছিল। আসিফ ফারিহার ডিপার্টমেন্টের তিন ইয়ার সিনিয়র। ফারিহা থার্ড ইয়ারে এখন। গানের অনুষ্ঠান শেষে ফারিহার কথা হয় আসিফের সাথে। অবশ্য এটা ছিল নবীন বরণ অনুষ্ঠান। প্রায় প্রতিবছর আয়োজন হয় এ অনুষ্ঠানের। এরপর মাঝেমধ্যে দেখা হতো ফারিহা আসিফের, কথা হতো দুজনের। এভাবে দুজনকে দুজনের ভালো লেগে যায়। কিন্তু কেউ কাউকে বুঝতে দিচ্ছিল না। পরে একদিন ফারিহা একটি চিঠি লেখে আসিফকে। ফারিহার বান্ধবী জুঁই চিঠিটা পৌঁছে দেয় আসিফকে। আসিফের মনে ভালোবাসার ডিঙি নৌকা অনেকদিন ধরে ভাসছিল। জলের অভাব ছিল শুধু। এ চিঠি আসিফের জন্য হয়ে উঠল প্রত্যাশার জল। যেখানে ইচ্ছেমতো ভালোবাসার নৌকা নিয়ে ভাসা যায় আনমনে, খেয়ালে, খুশিতে আর ইচ্ছায়। এভাবেই সিনিয়র-জুনিয়রের সম্পর্ক রূপ নেয় কাছের মানুষে। এরপর একসাথে শুরু ক্যাম্পাসে স্বপ্নের মতো পথচলা। ক্যাম্পাসের স্বপ্নের দিনগুলো, শহরের অলিগলি একসাথে হুডখোলা রিকশায় বসে চষে বেড়ানো, গানের কনসার্ট, বৈশাখের অনুষ্ঠান এখনো লেপ্টে আছে মন-মগজে।

তিন.
পড়াশোনা শেষে ফারিহার বিয়ে হয় আসিফের সঙ্গে। অবশ্য এই বিয়ে নিয়ে অনেক প্রতিকূলতার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে ফারিহাকে। অনেক কিছু হয়েছে ফারিহা আসিফের বিয়েকে কেন্দ্র করে। কারণ আসিফের গ্রামের বাড়ি উত্তরবঙ্গে। তা ছাড়া আসিফের পড়াশোনা শেষ চার-পাঁচ বছর হয়েছে এখনো বেকার। শুধু মাঝেমধ্যে গানের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কিছু টাকা আয় করে। তা দিয়ে চলা নিতান্তপক্ষে কঠিনও বটে। ফারিহার পরিবার চালচুলোহীন এমন একটা ছেলের সাথে বিয়ে দিতে রাজি ছিল না। শুধু ফারিহার একগুয়েমি আর জেদের কারণে পরিবার বাধ্য হয়। তা ছাড়া আরও একটি কারণ ছিল, পারিবারিকভাবে আগেই ফারিহার বিয়ে তার মামাতো ভাইয়ের সাথে ঠিক করা ছিল। মামাতো ভাই বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে প্রশাসন ক্যাডারে জয়েন করেছিল তখন। দেখতে শুনতেও মাশাআল্লাহ। পোস্টিংও ঢাকায়। সব মিলে এ বিয়ে হতো ফারিহার জন্য সোনায় সোহাগা। কিন্তু ফারিহা আসিফকে ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করবে না এ সিদ্ধান্তে অনড় থাকার কারণে পরিবার তাদের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়।

বিয়ের দুই মাসের মাথায় একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে মোটা বেতনে চাকরি হয় আসিফের। এর আগে বিভিন্ন জায়গায় গানের অনুষ্ঠান করে ভালোই চলছিল সব। চাকরিতে জয়েনের সাথে সাথে বাড়তে থাকে আসিফের ব্যস্ততা। মাঝেমধ্যে বিদেশে ট্যুর দেয় আসিফ। কখনো কখনো দুই-তিন মাস একসাথে প্রতিষ্ঠানের কাজে বাহিরে থাকতে হয়। বিয়ের তিন বছরের মাথায় জন্ম নেয় মাহা। আলোকিত হয় আসিফ-ফারিহার সংসার। সাজানো গোছানো ছোট্ট সংসার। ছোট্ট মাহাকে নিয়ে পরিবারে সে কী আনন্দ। আনন্দ আর ধরে না। এভাবে মেয়ে বড় হতে থাকে। সময় তার গতিতে এগোতে থাকে।

বড় হতে থাকে ছোট্ট সেই মাহা। ক্লাস এইটে ওঠে মাহা। সব ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু একদিন গণ্ডগোল বাঁধে হঠাৎ করে। একটি কল আসে আসিফের ফোনে। কল বেজেই যাচ্ছিল। কিন্তু আসিফ ওয়াশরুমে শাওয়ার নিচ্ছিল, তাই ফোন রিসিভ করার সুযোগ ছিল না। অগত্যা ইমারজেন্সি মনে করে ফারিহা ফোন কল রিসিভ করে। রিসিভ করেই ফারিহা শুনতে পায় একটি মেয়ের কণ্ঠ। ‘এই আসিফ, তুমি গতকাল দেখা করোনি কেন? আমি গতকাল অনেকক্ষণ এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করেছি তোমার জন্য। বিকেল চারটায় আমি বাংলাদেশে ল্যান্ড করি। তোমায় অনেকবার কল করেছি কিন্তু তুমি রিসিভ করোনি। পরে আমি উত্তরার বাসায় চলে আসি। তুমি আজ অবশ্যই দেখা করবে আমার সাথে। মামনি বলেছে, তার সাথে তোমার পরিচয় করিয়ে দিতে। আজ সন্ধ্যায় আমাদের উত্তরার বাসায় আসতে হবে তোমায়। আমি শুধু তোমার জন্যই বাংলাদেশে এসেছি। বাই।’ বলে কল কেটে দেয় অপর পাশের মেয়েটি। ফারিহা ভাবতে থাকে, কে হতে পারে! আসিফ তো এমন কারো কথা বা এমন কিছু বলেনি কখনো। শাওয়ার শেষে নাস্তা করে আসিফ রেডি হয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যায়। অফিস থেকে ফিরে আসতে প্রায় রাত পৌঁনে বারোটা বাজে আসিফের। ফারিহা এতক্ষণ বসেছিল একসাথে খাবে বলে। অবশ্য মাহা আরও আগেই খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু আসিফ বলল, আমার খিদে নেই। তুমি খেয়ে ফেল। আমি ঘুমোতে যাচ্ছি। ফারিহা একাই খেয়ে নেয়। দুইদিন পর আসিফের শার্ট ধুয়ে দিতে গিয়ে হঠাৎ ফারিহার চোখ ছানাবড়া। কী দেখছে সে! আসিফের আকাশি রঙের শার্টটার পেছনের দিকের ঘাড় বরাবর কলারে আড়াআড়ি করে একজোড়া ঠোঁটের কয়েকটি আড়াআড়ি দাগ। গাঢ় গোলাপি কালারের শুকনো লিপিস্টিক লেগে আছে এখনো।

চার.
আজকাল আসিফ প্রায়ই দেরিতে ফেরে বাসায়। মনে হয় ধূমপানও করে। মাঝেমধ্যে ড্রিংকস করে। মাতলামিও করে কিছুটা। এসব ফারিহার ভালো লাগে না। অসহ্য মনে হয় সব কিছু। আসিফের এমন বদঅভ্যেস কখনো ছিল না। কিন্তু কী এমন হচ্ছে একবারে বদলে গেল আসিফ। ভাবতে থাকে ফারিহা। এমনই বা কেন করছে! ঘড়ির কাঁটা ধরে সময় এগোতে থাকে। পাল্টে যেতে থাকে আসিফ। দূরত্ব বেড়ে চলে ফারিহা-আসিফের। এ দূরত্ব যেমন শরীরের, সাথে মনেরও। এভাবে আসিফ বদলায়। আগের আসিফের সাথে নতুন আসিফের বিস্তর ফারাক। স্ত্রী-মেয়েকে খুব একটা সময় দেয় না। কিছু বললেই যেন খুব সহজে বিরক্ত হয়। অফিস থেকে বাড়িতে ফেরার সময় ক্রমশ পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। ফারিহা শুধু অপেক্ষা করে যায়। প্রতীক্ষা করে সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুই ঠিক হয়ে ওঠে না। বরং সব কিছু নিয়ন্ত্রণের বাহিরে চলে যায়। ফারিহা আসিফকে একদিন বাসায় দেরিতে ফেরার কারণ জিজ্ঞেস করে। আসিফ এড়িয়ে যেতে চায়। আবার জিজ্ঞেস করায় ফারিহার গায়ে হাত তোলে। ফারিহা প্রতিবাদ করায় বেদম মারধর করে। মাহা এগিয়ে আসায় তার গায়েও হাত তোলে। আসিফের এমন আচরণ মা-মেয়ের মন খারাপ করে দেয়। আসিফ ঘুমোতে চলে যায়। আজও কিছু খায়নি। মা-মেয়েও মন খারাপ করে ঘুমোতে যায়।

তার কিছুদিন পর সকালে মাহাকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে ফারিহা নিজেদের মাইক্রোতে পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ বছরের একজন সুদর্শনা মহিলাকে দেখতে পায় আসিফের সাথে। মহিলাটির দেহের অবয়ব অনেকটা বিদেশির মতো। গাড়ি চলে যায় পাশ দিয়ে। কিন্তু এ সময় তো আসিফ অফিসে থাকার কথা। ফারিহা ভাবতে থাকে। চোখে আবার ভুল দেখলো না তো! আসিফ নাকি অন্য কেউ ছিল। না নিজের চোখে দেখা তো আর মিথ্যে হতে পারে না। নিজের হাতে নিজে চিমটি কাটে। না ঠিকই তো আছে। সাথে সাথে ওইদিনের লিপিস্টিক মাখা শার্টের কথা মনে পড়ে। মাহাকে স্কুলে দিয়ে বাসায় ফেরে ফারিহা। অনেকক্ষণ কেঁদেছে আজ। কেন কেঁদেছে নিজেও জানে না। চোখ-মুখ ফুলে আছে। না আজ আসিফকে জিজ্ঞেস করতে হবে, মহিলাটি কে ছিল। তা-ও আবার অফিসের না, নিজেদের গাড়িতে।

পাঁচ.
আসিফের অফিসে খোঁজ নেয় ফারিহা। অফিসে গিয়ে যা শোনে, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারে না। আজকাল আসিফের সাথে ওই মহিলাকে প্রায়ই নাকি দেখা যায়। একজন এসে বলে গেল, আসিফ স্যার নাকি নতুন করে বিয়ে করেছে ওই মহিলাকে। তাও দুই তিন মাস হলো। সব কিছু অবিশ্বাস্য ঠেকে ফারিহার কাছে।

ফারিহা আর নিতে পারে না। বাসায় চলে যায়। মন ভীষণ খারাপ তার। কী করবে বুঝতে পারছে না। সব যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। অফিসে যা শুনে এসেছে, তা কি সত্যি! গা গুলোচ্ছে তার। সোফায় বসে পড়ে। সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজে আছে। সময় যেন আর কাটতে চায় না। অস্থির লাগে। রাত প্রায় ১১টায় কলিং বেল বেজে ওঠে। দরজা খুলে দেয়। বাসায় প্রবেশ করে আসিফ। ড্রেস চেঞ্জ করে ঘুমোতে যায়।

সাথে ফারিহাও। আজ অবশ্য ফারিহা নিজেও খাবে না। আসিফের অফিসে গিয়ে যা শুনে এসেছে, আজ গলা দিয়ে খাবার নামবে না। নামার কথাও নয়। দুপুরের খাবারও খায়নি। খাটের উপর আসিফের পাশে গিয়ে বসে। ‘আচ্ছা আসিফ! একটা কথা বলব। উত্তর দেবে?’ জিজ্ঞাসা করে ফারিহা। ‘বলো, কী বলবে?’ আসিফ উত্তর দেয়। ‘আমি তোমার অফিসে গিয়েছি আজ। লোকে কী সব বলাবলি করছিল।’ আসিফ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যেতে চেষ্টা করে। কিন্তু ফারিহাকে যে শুনতেই হবে। ফারিহা শোনার জন্য গোঁ ধরে বসে আছে। কিন্তু আসিফ কিছুই বলবে না এ প্রসঙ্গে। দুজনের কথা কাটাকাটি হয়। এক পর্যায়ে ফারিহার গায়ে হাত তোলে। বলে, ‘আমি তোমার সাথে আর থাকতে চাই না। আমি তোমাকে ডিভোর্স দেব। আগামী মাসে আমি ফ্রান্স চলে যাচ্ছি। আমার কোম্পানির এমডি আমাকে সেখানে সেটেল্ড হওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছে।’ কিছুদিন পর আসিফের কারণে ডিভোর্স হয় দুজনের। বলা চলে ডিভার্সে ফারিহাকে বাধ্য করে আসিফ।

ফারিহা মেয়েকে নিয়ে আছে। আর আসিফ চলে যায় ফ্রান্স। যাওয়ার সময় আসিফ তার সাথে মাহাকে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু ফারিহা নিতে দেয়নি। ফ্রান্সে যাওয়ার আগে পারিবারিক আদালতে মামলা দায়ের করে যায় আসিফ। তার এসাইন করা আইনজীবী মামলার যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে। অবশ্য পরে ফারিহা জানতে পারে, আসিফ তার কোম্পানির এমডির মেয়ে নাতাশাকে বিয়ে করেছিল। এর বদৌলতে আসিফকে কোম্পানির ফ্রান্সের ফ্যাক্টরির দায়িত্ব দিয়েছে এমডি। আসিফ তার মতো সেখানেই আছে। ফারিহা বাংলাদেশে।

ছয়.
দু’বছর পর হঠাৎ একদিন রাতে অপরিচিত একটি নাম্বার থেকে মেসেজ আসে ফারিহার ফোনে। মেসেজ পড়ে ফারিহার বুকে মোচড় দিয়ে ওঠে। বুক ব্যথা করছে। মেসেজে লেখা, আমার বাচ্চাকে দিয়ে দাও। আমি আগামীকাল ওকে নিতে আসব। অবশ্য এর মধ্যেই আদালত আসিফের পক্ষে রায় দেয় যে, মাহা তার বাবা আসিফের সাথে থাকবে। পরদিন সকাল দশটার দিকে আসিফ একটি লাল চোখা রঙের মাইক্রো নিয়ে আসে। বারবার হর্ন দিয়ে যাচ্ছিল। ফারিহা মেয়ে মাহাকে নিয়ে নিচে নেমে আসে।

এর আগে মেয়েকে ফ্রান্স নিয়ে যাওয়ার জন্য সব কাগজপত্র রেডি করে ফেলেছে আসিফ। মেয়ে মাহাকে নিয়ে ফ্রান্সের উদ্দেশে আগামীকাল বিকেল পাঁচটায় বাংলাদেশ ছাড়বে। ফ্লাইটের সময় হয়ে এসেছে। আসিফ মাহাকে নিয়ে চলে যাবে। মাহা যেতে চাচ্ছে না। মেয়েটি এক দৌড়ে চলে আসে ফারিহার কাছে। মা-মেয়ে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। মাহাকে জোর করে আবার নিয়ে যায় আসিফ। জোর করে গাড়িতে তোলে। গাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করেছে। ফারিহার দু’চোখে জল, স্বপ্নভঙ্গের জল, সব কিছু হারানোর জল। গাড়ির দিকে তাকিয়ে থাকে ফারিহা। গাড়ি চলছে তো চলছেই!

হঠাৎ কাঠগোলাপ গাছে বসা একটি পাখি উড়ে চলে যায়, একটি পাখি এখনো গাছে বসে আছে। ফারিহা পাখিটির দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। সোফা ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে।

লেখক: প্রভাষক, চাঁদপুর সরকারি কলেজ, চাঁদপুর।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য