, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

ডায়রিয়ায় উদ্বেগ নয় সচেতনতা দরকার

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

ডায়রিয়ায় উদ্বেগ নয় সচেতনতা দরকার

ডা. মুহাম্মদ ইব্রাহিম মাসুম বিল্লাহ
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দৈনিক তিনবার বা তার চেয়ে বেশি স্বাভাবিকের চেয়ে পাতলা পায়খানা হওয়াকে ডায়রিয়া বলে। ডায়রিয়া হলে শরীর থেকে পানি ও লবণজাতীয় পদার্থ বের হয়ে যায়। ফলে শরীরে দেখা দেয় পানিস্বল্পতা ও লবণের ঘাটতি। সময়মতো পানিস্বল্পতা ও লবণের ঘাটতি পূরণ না করলে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে।

সাধারণত অন্ত্রে বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের ফলে ডায়রিয়া হয়। ডায়রিয়ার জীবাণু দূষিত খাদ্য ও পানির মাধ্যমে মানুষের পেটে যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকে ডায়রিয়ার জীবাণুগুলো হাতের মাধ্যমে, মাছি বা তেলাপোকার মাধ্যমে, এমনকি অনেক সময় সরাসরি খাদ্য ও পানিতে সংক্রমিত হয়। এই দূষিত খাদ্য বা পানি গ্রহণ করলে অন্যরাও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

বিশেষ করে গরমের মৌসুম এপ্রিল ও মে মাসে ডায়রিয়ার প্রকোপ থাকে বেশি। কিন্তু এ বছর চিত্রটি একটু ভিন্ন। মৌসুমের শুরু থেকেই উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে ডায়রিয়া রোগী। হাসপাতালগুলোতেও জায়গা দেওয়া যাচ্ছিল না। করোনাকালীন মানুষ ঘনঘন হাত ধোঁয়ার মতো ভালো অভ্যাসে যেমন যুক্ত ছিল; তেমনই আউটিং না হওয়ায় বাইরের খাবার থেকেও ছিল দূরে।

হঠাৎ মানুষ এ অভ্যাস ছেড়ে দেওয়া ও বিভিন্ন বিভাগীয় শহরগুলোর পানির কারণেও ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। তবে ডায়রিয়া হলে উদ্বিগ্ন ও আতঙ্কিত না হয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ডায়রিয়া বড় কোনো সমস্যা হতে পারে না।

ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে যা করবেন
> এক প্যাকেট খাবার স্যালাইন আধা লিটার পানিতে গুলিয়ে খাবেন।
> বড়দের (দশ বছরের বেশি) ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পায়খানার পর এক গ্লাস (২৫০ গ্রাম) পানিতে গুলিয়ে খাবেন।
> শিশুদের ডায়রিয়া হলে প্রতিবার পায়খানার পর শিশুর যত কেজি ওজন; তত চা চামচ বা যতটুকু পায়খানা হয়েছে; আনুমানিক ততটুকু স্যালাইন খাওয়াবেন।
> শিশুর বমি হলে ধীরে ধীরে খাওয়ান, যেমন প্রতি তিন-চার মিনিট পর পর এক চা চামচ করে স্যালাইন খাইয়ে দিন।
> খাবার স্যালাইন খাওয়ানোর পাশাপাশি দুই বছরের নিচের শিশুকে অবশ্যই মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে, কোনোভাবেই বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ করা যাবে না।
> ছয় মাসের বেশি বয়সী রোগী খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি সব ধরনের খাবার খেতে পারবেন।
> রোগীকে খাবার স্যালাইনের পাশাপাশি বেশি বেশি তরল খাবার, যেমন- ডাবের পানি, চিড়ার পানি, স্যুপ ইত্যাদি খাওয়াবেন।
> রোগীকে কোমলপানীয়, ফলের রস, আঙুর, বেদানা খাওয়ানো যাবে না।
> ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের শিশুকে প্রতিদিন একটি করে জিংক ট্যাবলেট পানিতে গুলিয়ে দশ দিন খাওয়াবেন।> অবস্থার কোনো পরিবর্তন না হলে বা অবনতি হলে নিকটস্থ হাসপাতালে রোগীকে ভর্তি করাতে হবে।

ডায়রিয়া প্রতিরোধে করণীয়
প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। কিছু পদক্ষেপ যথাযথ মেনে চললে ডায়রিয়াও প্রতিরোধ করা সম্ভব-
> মলত্যাগে স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার করুন।
> পায়খানা করার পর ও খাওয়ার আগে অবশ্যই সাবান দিয়ে ভালো করে হাত ধুয়ে নিন।
> খাবার তৈরি করা ও পরিবেশন করার আগেও হাত ধুয়ে নিন।
> ব্যবহার্য থালা-বাসন, চামচ-বাটি ইত্যাদিও ভালো করে ধুয়ে নিন। এসব কাজে নিরাপদ পানি ব্যবহার করুন।
> ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুকে শুধু বুকের দুধ খাওয়ান।
> বাসি-পচা খাবার, মাছি বসা খাবার এবং বাইরের খোলা খাবার, শরবত বা ফলের রস খাওয়া থেকে বিরত থাকুন।> রান্না করা খাবার বেশিক্ষণ বাইরে রেখে দিলে তাতে রোগ-জীবাণু দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
> খাবার খেয়ে নিন গরম গরম। বাড়তি খাবার ঠান্ডা করে রেখে দিন ফ্রিজে।
> পরে খাওয়ার সময় আবার ভালোভাবে গরম করে নেবেন।
> পরিষ্কার পাত্রে রাখা টিউবওয়েলের নিরাপদ পানি কিংবা ফোটানো পানি ঠান্ডা করে পান করুন।
> পানি ফুটিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হলে চুলায় পানি ফুটতে শুরু করার পর ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত সময় ফোটাতে হবে।
> পানি ঠান্ডা হলে মাটির কলস বা কাঁচের জার বা বোতলে রাখুন। প্লাস্টিকের বোতল ব্যবহার না করাই ভালো।

মনে রাখতে হবে, ডায়রিয়া হলে যে পানিস্বল্পতা ও লবণের ঘাটতি দেখা দেয়, তা পূরণ করাই মূল চিকিৎসা। খাওয়ার স্যালাইনে পানিস্বল্পতা দূর করা যায়। মারাত্মক পানিস্বল্পতার লক্ষণ দেখা গেলে রোগীকে শিরায় উপযুক্ত স্যালাইন দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। এ জন্য রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করাই ভালো।

সঠিক ও নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস তৈরি করি, সুস্থ থাকি।

  • সর্বশেষ - ফিচার