, ১৩ আষাঢ় ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

আমাদের শৈশব-কৈশোরে গ্রামের ঈদ

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

আমাদের শৈশব-কৈশোরে গ্রামের ঈদ

মিথিলা ফারজানা লোপা

আমি গ্রামে বড় হয়েছি। তাই ঈদের আনন্দটা তখন ছিল অন্যরকম। রোজার অর্ধেক চলে যাওয়ার পরই শুরু হতো ঈদের কেনাকাটা। আমি সাধারণত নিজে ডিজাইন করেই জামা বানাতাম। বিভিন্ন রকমের গজ কাপড় কিনে আপু আমাকে টেইলার্সের কাছে নিয়ে যেত, কী ডিজাইনের জামা বানাবো বলার জন্য। তখন মনে হতো, বড় হয়ে ফ্যাশন ডিজাইনার হবো। আমার ডিজাইন করা জামা হতো একদম আনকমন।

জামা বানাতে দিয়ে আসার পর থেকেই রাতে ঘুম হতো না। জামার চিন্তায়, কেমন হবে জামাটা! পরলে কেমন লাগবে! সবাই দেখে কী বলবে—এসব চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেতো। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সব কেনাকাটা শেষ হয়ে যেত। জুতা, নেইলপলিস, লিপস্টিক, চুড়ি, চুলের ব্যান্ড, মেহেদি। সবকিছুই জামার সাথে ম্যাচিং করে কেনা হতো। কেনাকাটার পর বাসায় এসে জুতা পরে বিছানার উপরে ট্রায়াল দিতাম। ক্ষণে ক্ষণে কসমেটিক্স বের করে দেখতাম। জামা বানানো হলে আপু নিয়ে আসতেন। তখন শুরু হতো আবার জামা ট্রায়াল দেওয়া আর ক্ষণে ক্ষণে বের করে দেখা।

এসব অনেক যত্ন করে লুকিয়ে রাখতাম। আমার অনেক চাচতো বোন ছিল আমার বয়সী। ওরা সবাই ঈদের মার্কেট দেখানোর জন্য অনেক অনুরোধ করতো। লুকিয়ে লুকিয়ে ঘরের আশপাশ দিয়ে, জানালা দিয়ে উঁকি মারতো। আমিও অবশ্য তাদের ঈদের জামা দেখার জন্য চেষ্টা করতাম। কেউ কারোটা দেখাতাম না।

ঈদের দু’তিন দিন আগে থেকেই আমরা ইফতার শেষে উঠানে দাঁড়িয়ে আনন্দে নাচতাম আর হইচই করতাম ‘ঈদের চাঁদ উঠবে’, ‘ঈদের চাঁদ উঠবে’ বলে। আর রাতে তো খুশিতে ঘুমই হতো না। এরপর চাঁদরাতে সন্ধ্যায় ইফতার শেষে সবাই দৌড়ে ঘরের পেছনের ছোট নদীর পাড়ে গিয়ে দাঁড়াতাম পশ্চিম আকাশে ঈদের চাঁদ দেখার জন্য। বড়রা আমাদের ধরে উঁচু করে দেখেতেন ঈদের চাঁদ। ‘ওই যে ঈদের চাঁদ’ বলে চিৎকার তো আছেই। এরপর সন্ধ্যায় শুরু হতো টিভিতে ঈদের গান, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ’। এ গান না শুনলে মনেই হতো না যে, ঈদ এসেছে। সাথে মসজিদের মাইকে ছোট-বড় পুরুষরা ‘ঈদ মোবারক’, ‘ঈদ মোবারক’ বলে জানান দিতো যে, আগামীকাল ঈদ।

এরপর পিকনিকের আয়োজন করতো বড়রা। আমরা ছোটরা ব্যস্ত হয়ে যেতাম হাতে মেহেদি দিতে। চাঁদের দিন সকালেই নারিকেল গাছের ও খেজুর গাছের ছোবড়া কুড়িয়ে রাখতাম, রাতে বাজি ওড়াবো বলে। বড় একটি কচু পাতা কেটে রাখতাম। চাঁদরাতে কচু পাতাকে নারিকেল পাতার শলাকার মাধ্যমে ফুটো করতাম তিন-চার জন মিলে। এরপর নারিকেল ও খেজুর গাছের ছোবড়ায় আগুন লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতাম। আগুনটা কোনো রকম নিভিয়ে ওগুলোকে কচু পাতায় নিয়ে পোটলার মতো করে বেঁধে রশি দিয়ে ঘোরাতাম। এতে চারিদিক জোনাকির মতো জ্বল জ্বল করে উঠতো। এটাই ছিল আমাদের বাজি ওড়ানো।

বামহাতে মেহেদি দেওয়া শেষ হলে পিকনিকের স্থানে চলে যেতাম। বড়রা রান্না করছে, আমরা আনন্দ করছি। রান্না শেষে একসাথে বড়-ছোট সবাই মাটিতে মাদুর পেতে বসে খিচুড়ি খেতাম। বাসায় এসে আবার ডানহাতে মেহেদি লাগাতাম। আমি যেহেতু মেহেদি একটু ভালো দিতে পারতাম, আমার চাচতো বোনরা তাই আমার কাছেই আসতো মেহেদি দিতে। সারারাত মেহেদি হাতে দিয়েই ঘুমাতাম।

ফজরের আজানের পরই আবার মাইকে বেজে উঠতো, ‘ঈদ মোবারক’, ‘ঈদ মোবারক’। তখনই ঘুম ভেঙে যেত আর অন্ধকারেই দেখার চেষ্টা করতাম মেহেদি কেমন লাল হয়েছে। ভোর হওয়ার আগেই আপু নতুন বিছানার চাদর বিছানোর জন্য ঝাড়ু নিয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে ঘুম থেকে তুলে দিতেন। আপু সারা ঘর খুব সুন্দর করে গোছানো শুরু করতেন। আম্মু ফজরের নামাজ শেষ করেই রান্না ঘরে চলে যেতেন। পায়েস, ডিমের জর্দা, পোলাওয়ের জর্দা, সেমাই, খিচুরির সাথে বেগুন ভাজা, ইলিশ মাছ ভাজা—এসব বানানোর জন্য। ভাইয়ারা এবং আব্বু গোসল করে এসে ঈদের নামাজের জন্য তৈরি হতেন। জায়নামাজ, টুপি আপুর কাছে চাইতেন। নতুন পোশাক পরে তারা মিষ্টি কিছু খেয়ে নামাজে যেতেন।

এদিকে আমার কাজ ছিল উঠান ঝাড়ু দেওয়া। সকাল সকালই আমি আর চাচতো বোনদের মধ্যে শুরু হয়ে যেত উঠান ঝাড়ুর প্রতিযোগিতা। এরপর চলে যেতাম সবার হাতের মেহেদির রং দেখার জন্য। ঈদ মোবারক বলার জন্য।

আমরা ছোট নদীতে গোসল করতে যেতাম সকালে। সাবান-শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করে বাসায় এসে নতুন জামা পরতাম। আপু সুন্দর করে সাজিয়ে দিতেন। এরপর আম্মুকে সালাম করে গালে চুমু দিতাম রান্নাঘরে গিয়ে। আম্মু জিরার কৌটার মধ্য থেকে কচকচে ৫০ টাকার নতুন নোট বের করে সালামি দিতেন আর কপালে চুমু খেতেন। বলতেন, ‘খুব সুন্দর লাগছে’। এরপর বড় কাকি আম্মার ঘরে গিয়ে তাকে সালাম করতাম। তিনিও সালামি দিতেন আর মলিদা খেতে দিতেন। মলিদা আমি শুধু আমার কাকিমাকেই বানাতে দেখেছি। বাড়ির আর কেউ বানাতে পারতেন না। তাই ওটাই ছিল ঈদের স্পেশাল খাবার। মলিদা না খেলে মনেই হতো না যে ঈদ এসেছে।

তারপর সবাই সবার জামা-কাপড় দেখার জন্য বের হতাম। কেমন লাগে? কেমন লাগে? বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলতাম। নামাজ শেষে সবাই বাড়ির দিকে রওনা হলে সালাম দিতাম। সবাই আমাকে সালামি দিতেন। সবার ঘরে ঘরে গিয়ে পায়েস, সেমাই, জর্দা, খিচুড়ি খেতাম।

সকালের পর দুপুরে আরেকটি জামা পরতাম। দুপুরে আবার রান্না হতো পোলাও ও গরুর গোশত। তখন আবার ঘরে ঘরে গিয়ে খেয়ে আসতাম বোনেরা একসাথে। এরপর বড়রা বিকেলে নতুন জামা পরে সবার ঘরে গিয়ে দেখা করতেন। দেখতে দেখতে দিনটি আনন্দেই কেটে যেত। তখন মনে হতো ঈদ মানে খুশি, ঈদ মানে অনাবিল আনন্দ।

এমন আনন্দ বড় হওয়ার পর আর পাইনি। বড় হতে হতে আনন্দে কেমন পরিবর্তন এসেছে। এখন ছোটরা আনন্দ করে, আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। সে সময় খুব মিস করি আমার শৈশব-কৈশোরের ঈদকে।

  • সর্বশেষ - ফিচার