, ১৬ আষাঢ় ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

জেলেপাড়ায় নেই ঈদের আনন্দ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

জেলেপাড়ায় নেই ঈদের আনন্দ

রাত পোহালেই ঈদ আনন্দে মাতবে সবাই। এ দিনটিকে ঘিরে মানুষের ব্যস্ততার যেন শেষ নেই। ঈদ উপলক্ষে দেশের সব বাজারগুলো জমজমাট, সর্বস্তরের মানুষ যখন প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি নিয়ে ব্যস্ত, সেই সময় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ভোলার জেলেপল্লিতে। ঈদ এলেও যেন ঈদের আনন্দ নেই জেলে পরিবারের মাঝে। 

মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়ার ১৯০ কিলোমিটার নিষেধাজ্ঞার পর নদীতে ইলিশ না থাকায় তাদের ঈদের আনন্দ মাটি হয়ে গেছে। ধারদেনা করে আবারও সংকটে পড়ার শঙ্কায় দিশেহারা জেলেরা। ঈদের দিন ঘরে মিষ্টান্ন তো দূরের কথা শিশুদের গায়ে নতুন জামা উঠবে কিনা তা নিয়েই যত দুশ্চিন্তা। দিন রাত নদীতে জাল ফেলে যে দু-চারটি ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে তাতে খরচের টাকাও উঠছে না।

একদিকে এনজিও, অন্যদিকে মহাজনের দাদনের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে জেলেদের। তার ওপর রয়েছে সংসারের খরচ। কোনো কোনো জেলে পরিবারে দুবেলা দুমুঠো ভাতও জুটছে না। সব মিলিয়ে জেলে পরিবারগুলো এখন চরম বিপাকে রয়েছে। এ সময় জেলেপল্লিতে মাছ বিক্রি করে ঈদের উৎসবের আমেজ থাকবে সেখানে জেলেপল্লিতে চরম সংকটের মুখে অভাব অনটনের মধ্যে জীবন-যাপন করছেন জেলেরা, চলছে নীরব হাহাকার।

আর ভোলার মেঘনা পাড়ের ইলিশা, তুলাতুলি, নাছির মাঝি, ভোলার খালসহ প্রায় অর্ধশতাধিক ছোট বড় ঘাটে এখন নেই আগের মতো কর্মচাঞ্চল্য। আড়তদারদের মাছের বাক্সগুলো খাঁ খাঁ করছে। আড়তে অলস সময় পার করছেন আড়তদাররা। দু-এক ঝুড়ি মাছ ঘাটে আনা হলেও আগের মতো নেই হাঁকডাক। জেলেদের পাশাপাশি আড়তদাররাও রয়েছেন বিপাকে।

কথা হয় ভোলা সদর উপজেলার কোরারহাট জেলেপল্লির শিশু ফারিয়ার সঙ্গে। ফারিয়া জানায়, এলাকার অন্য সহপাঠীরা ঈদের নতুন জামা কিনেছে। তাই সেও তার বাবার কাছে আবদার করে নতুন জামার জন্য। কিন্তু বাবা ফরিদ মাঝি আশ্বাস দিয়েছেন নদীতে মাছ পেলে তবেই নতুন জামা কিনে দেবেন।

ইলিশা মাছ ঘাটের জেলে মো. রফিজল মাঝি বলেন, রাত ১২টার দিকে আমরা সাতজন জেলে নদীতে ইলিশ শিকারে গিয়েছিলাম। সকাল ৬টা পর্যন্ত নদীতে মাছ ধরি। তবে বড় সাইজের ইলিশের দেখা না মিললেও ১০/১২টা জাটকা পেয়েছি। ঘাটে বিক্রি করে ১৮০০ টাকা পাই। কিন্তু ট্রলারের তেল ও আমাদের খাবার খরচ বাবদই ব্যয় হয়েছে দুই হাজার ৭০০ টাকা। নিষেধাজ্ঞার পর আশা করেছিলাম নদীতে অনেক মাছ ধরতে পারব। কিন্তু গতরাত থেকে সকাল পর্যন্ত জাল ফেলে আশানুরূপ ইলিশ পাইনি।

তুলাতুলী মাছ ঘাটের রহিম মাঝি বলেন, ‘অভিযানের সময় আমরা নদীতে যাই নাই, মাছও ধরতে পারি নাই। আশায় আছিলাম অভিযান শেষে নদীতে যাইয়া মাছ ধইরা বিক্রি করে আগের দেনা পরিশোধ করতে পারমু। কিন্তু নদীত এখন মাছের যেই অবস্থা, তাতে দেনার দায়ে দেশ ছাইড়া পলাইতে হইবো।’

আবু মাঝি বলেন, ‘দুই দিন পরে ঈদ। অভিযান শেষে অনেক আশা লইয়া গাঙ্গে গেছিলাম কয়ডা মাছ ধরমু। তা বিক্রি কইরা বাড়িত পোলাপাইনের লইগা নতুন জামা আর সেমাই কিনমু, কিন্তু নদীতে যাইতে ট্রলারের তেলসহ খরচ হইছে ৭০০-৮০০ টাকা। মাছ বিক্রি করেছি ১১০০ টাকার। এই অবস্থায় কোনো কুলকিনারা পাইতাছি না।

ধনিয়া তুলাতুলী মাছ ঘাটের আড়তদার মো. নাছিম বলেন, নদীতে আশানুরূপ ইলিশ না থাকায় আমাদের ব্যস্ততা কম। অভিযান শেষে জেলেরা নদীতে গিয়ে শুধু ইলিশ নয়, অন্য প্রজাতির মাছের দেখাও পাইনি। দুই মাসের নিষেধাজ্ঞার পর তেমন কোনো মাছ ঘাটে আসেনি। এ কারণে ঘাটে বেচাকেনা নাই বললেই চলে। এখন দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি মোকামে কী মাছ পাঠাবো। ঈদ উপলক্ষে মোকাম থেকে মাছের জন্য অনেক চাপ দিচ্ছে।

ভোলা জেলা মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি মো. এরশাদ ফরাজি বলেন, এই অভিযানের সময় আমাদের জেলেদের সরকারের পক্ষ থেকে চার মাসে ১৬০ কেজি চাল প্রণোদনা হিসেবে দেওয়ার কথা থাকলেও দুই মাসের চাল ৫০ থেকে ৬০ কেজি করে দিছে, কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পরও বাকি দুই মাসের চাল জেলেরা পায়নি। গতকাল রাত থেকে জেলেরা নদীতে নামছে, কিন্তু নদীতে মাছ কম থাকায় জেলেরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। জেলেদের এই দুঃসময়ে তাদের পুনর্বাসন না করা হলে জীবনযাপন খুব কঠিন হয়ে যাবে। জেলেদের বাকি দুই মাসের চাল যাতে অতিদ্রুত দেওয়া হয় এটাই আমাদের দাবি।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এসএম আজহারুল ইসলাম জানান, মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ভোলার মেঘনা-তেঁতুলিয়ার ১৯০ কিলোমিটারসহ দেশের ছয়টি অভয়াশ্রমের মিঠা পানিতে ইলিশ বিচরণ করে। এ সময়টা ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা নিষিদ্ধ করা হয়। বর্তমান সময়টায় তারা বিচরণ শেষে সাগর মোহনায় চলে যায়। এ কারণে সাগর ও সাগর মোহনায় ইলিশের পরিমাণ বেশি আর মেঘনা-তেঁতুলিয়ায় ইলিশ কম পাওয়া যাচ্ছে।  

তিনি আরও জানান, নিষেধাজ্ঞার সময়টায় নিবন্ধিত জেলেদের জন্য ৪ মাসে ১৬০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছে। যার মধ্যে দুই কিস্তির চাল ইতোমধ্যে ঈদের আগে বিতরণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদে চেয়ারম্যানরা ভিজিডি, প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার প্রদানসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকায় বাকি দুই কিস্তির চাল বিতরণে বিলম্ব হচ্ছে। ঈদের পরপরই বাকি চাল জেলেদের মাঝে বিতরণ করা হবে।

উল্লেখ্য, দ্বীপ জেলা ভোলায় প্রায় দুই লাখ জেলে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এর মধ্যে নিবন্ধিত জেলে আছেন ১ লাখ ৩৯ হাজার। মৎস্য বিভাগের মতে- দেশের ইলিশের চাহিদার প্রায় ২৫ ভাগ ভোলা থেকেই পূরণ করা হয়।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ