ময়মনসিংহ, , ২৪ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

আহা, নিজের বইয়ের ঘ্রাণ!

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

আহা, নিজের বইয়ের ঘ্রাণ!

নিজের প্রকাশিত তিনটি বই হাতে শ্রাবণী শেলী


একবার কবি শামসুর রাহমানের বাসায় নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের অ্যাসাইনমেন্ট ছিল আমার। কবি বেশ অসুস্থ ছিলেন, তাই অনুষ্ঠান বাইরে কোথাও না করে তাঁর শ্যামলীর বাসায় করা হয়।

অনুষ্ঠান বলতে একেবারেই ঘরোয়া আয়োজন। গণমাধ্যমকে ফলাও করে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। কবি তিন-চারজন কবি-লেখকের নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন তেমনটাই কথা। কিন্তু এরপর দল বেঁধে আরও অনেকে তাঁদের নতুন বই নিয়ে হাজির হলেন। তখন ফেসবুকের যুগ ছিল না বলে কেউ মুঠোফোনে ছবি তুলে পোস্ট করতে পারলেন না। তবে নির্ধারিত একজন আলোকচিত্রী তাঁদের ছবি তুলে দিচ্ছিলেন। আরও কিছু পরে আরও কয়েকজন এলেন কবিকে দিয়ে মোড়ক উন্মোচন করানোর জন্য। আমি দেখলাম শুরুতে আসা কবিদের অনেকেরই মুখ থমথমে। বিষয়টি যেমন ‘বিশেষ’ ছিল, তেমন ‘বিশেষ’ রইল না, ‘গণ’ হয়ে গেল। তাঁদের আলোচনা থেকেই শুনতে পেলাম, পরে আসা কবিরা ‘কীভাবে কীভাবে’ যেন খবর পেয়ে চলে এসেছেন।

তাঁদের এমন ভগ্নহৃদয় দেখে আমার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছিল অসুস্থ শরীরের উজ্জ্বল মুখের কবির কাছে। তাঁর কোনো বিরক্তি নেই, ক্লান্তি নেই। তিনি হাসিমুখে প্রত্যেকের বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করে ছবি তুলছেন। তাঁর পাশে শান্ত মুখে কখনো এসে বসছেন কবি-পত্নী, কখনো তাঁর পুত্রবধূ। কবিকে দেখে মনে হলো, মন মহিরুহ হলে এতে হয়তো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্ররাও স্থান পায়।

আজ ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসে সেই ঘটনার কথা মনে পড়ল সামনে বসে থাকা চল্লিশোর্ধ নারীকে দেখে। তাঁর বইগুলো নাড়াচাড়া করে দেখছিলাম। তিনি কবি ও লেখক হিসেবে নিজের নতুন পরিচয় প্রতিষ্ঠা করতে চান। কবি হিসেবে নিজের আলাদা একটি নাম দিয়েছেন ‘শ্রাবণী শেলী’।

কথা হচ্ছিল শ্রাবণী শেলীর সঙ্গে। হাতের তিনটি বইয়ের একটি দেখিয়ে বললেন ‘এটিকে বুকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলাম। আমার কান্না দেখে প্রকাশক বললেন, “আপা, কান্না থামান প্লিজ। লোকজন তো ভাববে আমি আপনাকে বকাঝকা করেছি”।’ যে বইটি দেখিয়ে কথা বলছিলেন সেটির নাম ‘হৃৎপিণ্ডে শিরোচ্ছেদ’। কাব্যগ্রন্থ। এবারের বইমেলা উপলক্ষে এটি প্রকাশিত হয়েছে। আর এটি তাঁর প্রথম বই।

নিজের প্রথম বইটি হাতে পাওয়ার অনুভূতি বলতে গিয়ে সেদিনের মতো আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন শ্রাবণী শৈলী। বলেন, ‘নিজের নতুন বইয়ের ঘ্রাণই আলাদা। বইটা যখন বুকে জড়িয়ে ধরেছিলাম, তখন মনে হচ্ছিল, যেন নিজের সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছি। জীবনের যত গ্লানি-কষ্ট সব ধুয়ে মুছে গেল। বাসায় বইগুলো এনে নিচে রাখিনি, উঁচু জায়গায় রেখেছি। মনে হচ্ছিল, যদি তেলাপোকা কাটে! নষ্ট হয়ে যায়!’

জানালেন কাব্যগ্রন্থটি ১৭ জানুয়ারি হাতে পান। আর বাকি দুটি বইয়ের একটি ‘শিশির স্নিগ্ধে তোমায় খুঁজি’ কাব্যগ্রন্থ, অপরটি ‘জীবনের গল্প কথা’ গল্পগ্রন্থ। প্রথম বইটি চয়ন প্রকাশন আর বাকি দুটি বই নব সাহিত্য প্রকাশনী থেকে প্রকাশ হয়েছে।

কবিতা আর গল্পগুলো কত দিনে লিখেছেন, জানতে চাইলে শ্রাবণী শৈলী বললেন, ‘দেড় বছর ধরে লিখেছি। প্রথম প্রথম শুধু নিজের জন্যই লিখতাম। মনের ক্ষুধা মেটাতাম। কোনো কষ্টের সময়ে একটি কবিতা লিখলে মনটা হালকা হয়ে যেত। কিন্তু কাউকে পড়ানোর মতো সাহস করে উঠতে পারিনি। বছর দেড়েক আগে আবৃত্তি কুঞ্জ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়ে একটু একটু করে কবিতা পোস্ট করা শুরু করি। অনেকে পছন্দ করলেন। আত্মবিশ্বাস পেলাম। পরে অন্যদের উৎসাহে এবার বই তিনটি বের করলাম।’

শ্রাবণী শেলী বললেন, ভাই ফিরোজ আহমেদের হাত ধরে লেখালেখি শুরু করেন। রাজধানীর ওয়ারী উচ্চবিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন ক্লাসে নিজের লেখা একটি ছড়া শোনান। বাংলার শিক্ষক আউয়াল স্যার শুনে বললেন ‘দেখিস, একদিন তুই বড় কবি হবি।’

শ্রাবণী শেলী তাঁর গল্প, কবিতা নিয়ে কতটুকু এগোবেন, সেটা সময় বলে দেবে। তবে কথা শেষে যাওয়ার আগে লাজুক হেসে বারবার তাঁর বইয়ের জন্য শুভকামনা চাইলেন। ‘অখ্যাত’ হওয়ার মরমে যেন মরে যাচ্ছিলেন!

আমরা যত সহজে ‘দেশে কাকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি’ বলে নতুন কবিদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করি, ‘এখন তো আমি ছাড়া সবাই বই বের করে’ মন্তব্য করে যত সহজে নতুন লেখকদের বিদ্রূপ করি, প্রতিষ্ঠিত কবি-লেখকেরা হয়তো এত সরল হিসাব কষে গড়পড়তা ভাবনা ভাবেন না।

কবি হেলাল হাফিজের কাছে এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বলেন, ‘আমি সব সময় তরুণদের পক্ষে। নতুনদের আগ্রহ ও ভালোবেসে উৎসাহ দিই। আমার ফেসবুকে যুক্ত তরুণ কবি–লেখকদের উপযাচক হয়ে উৎসাহ দিয়ে কথা বলি। প্রবীণদের অনেকেই তো খারাপ লেখেন। তাহলে শুধু নতুনদের নিয়ে কেন আশঙ্কা?’ তবে তরুণ কবি–লেখকদের মানসম্মত লেখার প্রতি মনোযোগ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। কবি জানালেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবার বইমেলায় কী কী বই বেরিয়েছে, সে বিষয়ে খোঁজ নিতে পারেননি।

নতুন কবি–লেখকদের বই ছাপাতে প্রকাশকেরা আগ্রহী হন না—এমন অভিযোগের ব্যাপারে প্রতিষ্ঠিত প্রকাশনা সংস্থা সময় প্রকাশনের প্রধান নির্বাহী ফরিদ আহমেদ বলেন, এ অভিযোগ সত্য নয়। তাঁর সংস্থা নতুন কবি–লেখকদের জন্য ২০ শতাংশ কোটা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে নতুন নারী লেখকদের প্রাধান্য দেওয়া হয় বেশি। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠিত লেখকদের ক্ষেত্রে যা হয়, তাঁদের লেখনী পাঠকেরা গ্রহণ করেছেন, তাই পাঠকের জন্য তাঁদের লেখার দায়বদ্ধতা তাঁদের নিজেরই থাকে। আর নতুন লেখকদের ক্ষেত্রে এ দায়বদ্ধতা সম্পূর্ণ থাকে প্রকাশকের। তাই যাচাই–বাছাই করে লেখার মান দেখে বই ছাপাতে হয়।
একই মন্তব্য করলেন নতুন প্রকাশনা সংস্থা বর্ষাদুপুরের প্রকাশক মাশফিকউল্লাহ তন্ময়। তিনি বলেছেন, নতুন কবি–লেখকদের লেখার মান বিবেচনা করে ছাপাতে হয়। এবার বইমেলা উপলক্ষে তাঁরা যাচাই–বাছাই করে সাত-আটজন নতুন লেখকের বই প্রকাশ করেছেন।

যাঁরা প্রকাশকদের মান যাচাই পরীক্ষায় পাস করতে পারেন না অথবা প্রকাশক যাঁদের মান যাচাইয়ের জন্যও লেখা হাতে নিতে আগ্রহ দেখান না, সেই কবি-লেখকদের অনেকে নিজ খরচায় চলে যান ছাপাখানায়। এটা এখন ওপেন সিক্রেট যে কবি-লেখকেরা খরচ টানতে পারলে অনেক প্রকাশনা সংস্থা বই প্রকাশ করে দেন। শ্রাবণী শেলীর মতো অনেক কবি-লেখকদের নতুন বই বুকে জড়িয়ে ঘ্রাণ নেওয়ার সুযোগ করে দেন।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ