, ১০ আশ্বিন ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

কবি আমিনুল ইসলাম: তাঁর অন্তর্লোক

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

কবি আমিনুল ইসলাম: তাঁর অন্তর্লোক

মানবর্দ্ধন পাল

কবিতার উর্বর ভূমি বাংলাদেশ, কবিতার রসময় ভাষা বাংলা এবং ছন্দময়ও। তাই প্রাচীনকাল থেকে কবিতা এদেশের মানুষের ভাবপ্রকাশের প্রধানতম বাহন। অতীতের সপ্তম শতক থেকে এ পর্যন্ত যতদূর জানা যায়, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির বর্তমান একুশ শতকেও কবিতারই জয়জয়কার। সেই চর্যাপদের কবিতা-বৃক্ষ পত্র-পুষ্প-পল্লবে এবং ফলে বীজে বিকশিত হয়ে এখন সুবিশাল নন্দনকানন। কালে কালান্তরে অযুত-নিযুত কবি, অসংখ্য-অগনন কবিতা বাংলা কাব্যধারাকে করেছে বেগবান- ফুল্ল করেছে কবিতার বাগানকে। নিরন্তর এই প্রবহমানতা, অনির্বাণ এই আলোকশিখা, অদম্য এর ধাবমানতা। হাজার বছরের এই গতিধারায় কত কবির অপমৃত্যু হয়েছে- কালের অপ্রতিরোধ্য ঝড়ে ঝরে গেছে কত কবিকুসুম। নামহীন গোত্রহীন সেই কবিকুলের হিসেব নেই। উল্কা ও ধূমকেতুর মত হঠাৎ আলোর ঝলকানি দিয়ে উদয় হয়েছে কতজন আবার হারিয়েও গেছে কালের অতলে। কতজনের নামই আছে কেবল ইতিহাসের পাতায় তাদের সৃষ্টিশীলতার শেষ চিহ্নটুকুও নেই। কারও বা দু-চারটি পঙক্তি সাক্ষ্য হয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় কিংবা এক আধটি কাব্যগ্রন্থের নামকেবল। কারও বা দু’এক পঙক্তি এখনো জ্বলজ্বল করে পাঠকের স্মরণের সরোবরে। কেউ কেউ আবার চিরন্তন সৃষ্টিশীলতায় এখনো জীবন্ত হয়ে আছেন। কালের কালিমা এবং যুগের জঞ্জাল তাদের নাম ও কবিকৃতির ওপর নিশ্চিহ্নতার প্রলেপ দিতে পারেনি। প্রবহমান সময়ের ধুলো মুছে দিতে পারেনি তাদের কবিকর্ম। তবে একথা অনস্বীকার্য যে, ছোটবড় সকলেরই তিল-তাল অবদানে গড়ে উঠেছে বাংলা কবিতার শতসহস্র বিশিষ্ট মৌচাক। এই নিরন্তর অবদানের সম্মিলিত ধারাবাহিকতায় যুক্ত হয়েছেন কবি আমিনুল ইসলাম।

বিশ শতকের শেষ দশক থেকে আমিনুল ইসলামের কবিতার স্বপ্ন ও সুন্দরের পথে পরিক্রমা শুরু। বিগত শতকের নব্বই দশক থেকে অদ্যাবধি তিনি নিরন্তর হেঁটে চলেছেন কবিতার মায়াঞ্জন ও স্বপ্নজালের আচ্ছন্নতায়। তাঁর এই কালপরিক্রমা কম করে হলেও আড়াই দশকের। কবিতা লক্ষ্ণীর আরাধনায় প্রায় এই সিকি শতাব্দী সময় মহাকালের বিচারে নগন্য পল-অনুপলের মত হলেও ব্যক্তি মানুষের জীবনে তা উপেক্ষণীয় নয়। এই পঁচিশ বছরে কবি আমিনুল ইসলামের গোটা দশেক কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। পরিসংখ্যান বস্তুনিষ্ঠ না-ও হতে পারে। কারণ ২০১৬ সালে প্রকাশিত তার ‘কবিতা সমগ্র’ ১০টি কাব্যগ্রন্থ এক মলাটে গেঁথে দেওয়া হয়েছে। হয়তো আরও আরও কিছু কবিতার বই ইতোমধ্যে প্রকাশিত হতে পারে। তাছাড়া জুন ২০১৭ তে কবির ফেসবুক আইডিতে লক্ষ্য করা গেছে ‘ভালোবাসার ভূগোলে’ শিরোনামে তাঁর নতুন কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী কবি আমিনুল ইসলামের গ্রন্থের কালানুক্রমিক শিরোনাম ও প্রকাশ সাল নিম্নরূপ:

কবিতা: তন্ত্র থেকে দূরে (২০০২); মহানন্দা এক সোনালি নদীর নাম (২০০২); শেষ হেমন্তের জোছনা (২০০৮); কুয়াশার বর্ণমালা (২০০৯); পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি (২০১০); স্বাপ্নের হালখাতা (২০১১); জলচিঠি নীল স্বপ্নের দুয়ার (২০১২); শরতের ট্রেন শ্রাবণের লাগেজ (২০১৩); জোছনার রাত বেদনার বেহালা (২০১৪); আমার ভালোবাসা তোমার সেভিংস একাউন্ট (২০১৫) ও ভালোবাসার ভূগোলে (২০১৭)। ছড়া: দাদুর বাড়ি (২০০৮); ফাগুন এলো শহরে (২০১২) ও রেলের গাড়ি লিচুর দেশ (২০১৫)। প্রবন্ধ: বিশ্বায়ন বাংলা কবিতা ও অন্যান্য প্রবন্ধ (২০১০) এছাড়া ইতোমধ্যে কবি আমিনুল ইসলামের তিনটি কাব্য সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে: প্রেমসমগ্র (২০১১); কবিতাসমগ্র (২০১৩); কবিতা সমগ্র (২০১৬, পরিবর্ধিত সংস্করণ)।

সিকি শতাব্দীর লেখালেখির জীবনে তাঁর শিল্পসাফল্যের প্রাপ্তিও একেবারে কম নয়। জাতীয়ভাবে পরিচিত বেশ কয়েকটি স্বনামধন্য সাহিত্য সংগঠন থেকে তিনি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। এগুলো হলো: রাজশাহী সাহিত্য পরিষদ সাংগঠনিক সম্মাননা (২০০৪); বগুড়া লেখকচক্র স্বীকৃতি পুরস্কার (২০১০); শিশুকবি রকি সাহিত্য পুরস্কার (২০১১); নজরুল সঙ্গীত শিল্পী পরিষদ সম্মাননা (২০১৩) এবং গাঙচিল সাহিত্য পুরস্কার (২০১৫)।

দুই.
একুশ শতকের শুরু থেকে আমাদের দেশে তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপক বিকাশ শুরু হয়েছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার এর আগেও যে ছিল না এমন নয়। কিন্তু যখন থেকে গুগলসহ বিভিন্ন সার্চ ইঞ্জিনের পরিষেবা, কম্পিউটার, ল্যাপটপের বিস্তীর্ণ ব্যবহার এবং এনড্রয়েড মোবাইল ফোনের প্রযুক্তি হাতে হাতে চলে এসেছে; তখন থেকে শিল্প সাহিত্যের বিকাশের নানান বহুবর্ণিল দরজাও খুলে গেছে। সাহিত্য সম্পর্কিত বিভিন্ন ব্লগ, সাংগঠনিক সর্বজনীন দলগত ও ব্যক্তিগত ফেসবুক পেজের এখন বিপুল সমাহার। প্রিন্ট মিডিয়ার স্থান এখন অনেকটাই দখল করে নিয়েছে ইলেকট্রনিক মিডিয়া। এ লাইনের পাঠকের সংখ্যাও নিতান্ত কম নয় এবং ক্রমেই দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে এই ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাঠক। এর সুবিধাও অনেক বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা কিনবার তেমন প্রয়োজন পড়ে না, ব্যস্ত জীবনে পাঠমনস্কতার জন্য আলাদা করে সময় বের করার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। সেলফোনটি হাতের মুঠোয় থাকলে চলতে ফিরতে, যাত্রাপথে, কাজের ফাঁকে, চা পানের সংক্ষিপ্ত অবসরে প্রয়োজনীয় পাঠ দেখে নেওয়া যায়। আর প্রিন্ট মিডিয়াও এখন অনলাইন হয়ে যাওয়ার সুবধিা বেড়েছে অনেক- দু মিডিয়ার কাজ এক মিডিয়াতেই সেরে নেওয়া যায়।

কবি-লেখকদের জন্যও এসেছে অপার সুবিধা ও সম্ভাবনা। লেখা কপি করে সম্পাদকের টেবিলে পাঠাতে হয় না, লেখা ছাপার আশায় দো-মনা হয়ে থাকতে হয় না দীর্ঘকাল। সম্পাদকের সুবিচার অবিচারের জন্য সংশয়াপন্ন হয়ে অপেক্ষা করতে হয় না। এখন নিজের লেখা নিজেই কম্পোজ করে এক টিপেই পৌঁছে দেওয়া যায় অগণিত পাঠকের কাছে। স্পর্শসুখের এই আনন্দ অপরিসীম। কবি আমিনুল ইসলাম আধুনিক প্রযুক্তির এই সুবিধার সদ্ব্যবহার করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। তাঁর ফেসবুক পেজ এককথায় কবিতাময় এবং পাঠকদের সদর্থক মন্তব্যে ভরপুর। প্রায় প্রতিদিনই তিনি আপলোড করছেন কবিতা। আর শতশত পাঠক ভক্ত বন্ধুবান্ধব তা পাঠ করে মুগ্ধ হচ্ছেন- অল্পকথায় প্রকাশ করছেন সে মুগ্ধতাও। বলতে দ্বিধা নেই, আমিও কবিতার নগণ্য পাঠক। দু-একবার পাঠে হয়তো কোনো কবিতার অন্তর্গত ভাবসত্তা উপলব্ধি করা যায় না অধরাই থেকে যায় কবিতার অন্তুর। কিন্তু কবিতার শরীরে থাকে যে কারুময় অলংকার শৈলী-উপমা প্রতীক চিত্রকল্প বাক্প্রতিমা, এককথায় বাণীর চমৎকারিত্ব তা কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাকে পাঠকমনস্ক করে তোলে। তাই তাঁর কবিতা পাঠক কেবল বাইরের চোখ দিয়ে পড়েন না- অন্তরের চোখেও। তাঁর কবিতার ভেতর এই মণিমুক্তা, হিরে জহরৎ, পান্নাচুনি কেবল চোখ ধাঁধায় না, মনকেও পুলকিত করে। তাই মনেধরা সে সব পঙক্তি কখনো কখনো উঠে আসে পাঠকের মত-মন্তব্যে। তাতে বোঝা যায়, তিনি জীবনানন্দ দাশের মতই চিত্রকল্পের কবি।

তিন.
তাই বলে কবি আমিনুল ইসলাম দেশ সমাজ সভ্যতা রাজনীতি নিরপেক্ষ কবি নন। সভ্যতার টানাপোড়েন, রাজনৈতিক সংকট, সমকালে জঞ্জাল, আসুরিক আস্ফালন, মানবতার বিপর্যয় ও নষ্ট সমাজের পুতিগন্ধময়তায় তিনি নীরব থাকেন না। দুঃশীলের বর্বরতায় তার কবিচিত্ত বিহ্বল হয় কিন্তু তিনি অহল্যা পাথরের মত নিশ্চুপ থাকেন না। এসবের দর্শনে শ্রবণে তাঁর অন্তর্গত কান্না কবিতায় কারুণ্য বর্ষণ করে, মুগ্ধতা প্রতিবাদের ভাষায় কব্যরূপ পায় অন্তর্জালা দহনে রূপান্তরিত হয়। বিশ্বময় বর্বরতার দলন পীড়ন দহন, দৈশিক বিপর্যয়ের ব্লু হোয়েল তাঁর কবি আত্মাকে আর যুধিষ্ঠির রাখে না দুর্বাশা করে তোলে। তাই জনৈক সরকারি কর্মকর্তার শুভবোধ যখন আক্রান্ত হয় অপরাজনীতির নীল বিষক্রিয়ায় কিংবা ক্ষাত্রশক্তির চরম বর্বরতায় যখন সমূলে বিপর্যস্ত হয় ধনে মানে জীবনে, সম্বলে সহায়ে স্বস্তিতে তখন কবি জ্বলে ওঠেন বারুদের মতো। তাঁর অন্তরের অগ্ন্যুৎপাত থেকে নির্গত শব্দাবলি লাভাময় হয়ে ওঠে কবিতায়।

পৃথিবীর সর্বসাধনার সাফল্যের ভিত্তি ভালোবাসা। প্রেমযোগেই যেমন ঈশ্বরলাভ, তেমনই কবিতাসুন্দরীর সঙ্গে অভিসারও। শব্দ শিল্পের মাধ্যমে কবিতায় যে সুন্দরের সাধনা, তা সর্বময় ভালোবাসাতেই লভ্য। এই ভালোবাসা প্রকৃতির প্রতি, পৃথিবীর প্রতি, মানুষের প্রতি এককথায় সৃষ্টিময় বিশ্বজগতের প্রতি। সিগমন্ড ফ্রয়েডের দর্শনতত্ত্বে বিশ্বস্ত হলে বলতে হয়, এই ভালোবাসার ভিত্তিমূল পরস্পর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি। একারণে নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রেম ও প্রীতিময়তা সৃষ্টির বীজাঙ্কুর এবং তা সভ্যতার ঊষালগ্নে থেকে নিরন্তর প্রবহমান।

কবি আমিনুল ইসলামের কাব্যসাধনার নিউক্লিয়াসেও আছে প্রেমের প্রোটোপ্লাজম। প্রেমসত্তাই তাঁর সাধনার প্রাণপঙ্ক। আর স্পষ্ট করে বলা যায়, সেই প্রেম বিপরীত লিঙ্গের প্রতি,—নারীর প্রতি নিরন্তর প্রেমময় মুগ্ধতায়। তবে নারীর প্রতি তাঁর প্রেমাকাঙ্ক্ষা যত না শরীরছোঁয়া, তার চেয়ে অনেক বেশি হৃদয়স্পর্শী। কিন্তু তা আবার রজকিনীর প্রেমও নয় যে, ‘কাম ও গন্ধ তা নাহি তায়।’ সবচেয়ে বড়কথা, কবি আমিনুল ইসলামের কবিতায় প্রেমসত্তা সর্বমানবিক ও বৈশ্বিক। সীমিত অর্থে রবীন্দ্রনাথের মত তাঁর কবিসত্তা ‘বিশ্বযোগ বিহার’ করছে এবং একইসঙ্গে ‘তুমি আমি’ এর সম্মিলন ঘটাচ্ছে। বিশ্বকবি নানাভাবে, নানা দৃষ্টিতে বহুকৌণিক আলোকসম্পাতে বিশ্বজগতকে অবলোকন করেছেন। এমন কি সংগীতের ভেতর দিয়েও তিনি দেখতে চেয়েছেন দুনিয়াকে—‘গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি জগতখনি/তখন তারে তিনি আমি, তখন তারে চিনি।’ সুর ও সংগীতের ভেতর দিয়ে এই রাবীন্দ্রিক অবলোকন মানুষের অন্তর্দৃষ্টিতে এক নতুন মাত্রা সংযোজন করেছে। আমিনুল ইসলামও তেমনই কবিচেতনায় জাগরুক প্রেমসত্তা দিয়ে দেখেছেন দলিত দেশ, নষ্ট রাজনীতি, কুষ্ঠ-আক্রান্ত সমাজ, সিফিলিসের বিষে ভরা সভ্যতা ও নপুংসক নেতৃত্ব। উপমা প্রতীকের কাব্যময়তায় তিনি দেশ-সমাজ সভ্যতা ও রাজনীতির দুরারোগ্য দুশ্চিকিৎস্য ব্যাধির কথা বলেছেন। সামাজিক অন্যায়-অবিচার, অনিয়ম-অসঙ্গতির কথাগুলোও তিনি বলেছেন ভালোবাসার ভায়োলিন বাজিয়ে এবং প্রেমের পরাগ মাখিয়ে। দ্রোহের কথাও তিনি বলেছেন তবে তা অগ্নিবীণা বা রুদ্র ডম্বরুর কর্ণবিদারী ঝংকারে নয়। পেলব কোমল কাব্যভাষায়। শিল্পিত তাঁর উচ্চারণ—নিনাদের আতিশয্য বা চিৎকারের চরমতা সেখানে নেই। কবি আমিনুল ইসলামের কাব্যবৈশিষ্ট্যের অনন্যতা এখানেও।

স্বদেশের সৌন্দর্য ও প্রকৃতির প্রতি বিনত হননি, দেশ দয়িতার প্রতি আনত নন এমন কবি পৃথিবীতে নেই। কিন্তু কবি আমিনুল ইসলামের রস্যানি বীক্ষণ পাঠককে অন্যরকম চেতনালোকে নিয়ে যায়। বাংলার নিসর্গের রূপ রস গন্ধ বর্ণ স্পর্শ তিনি অন্তর্লোকের নিবিড়তম ঘনিষ্ঠতায় অনুভব করেছেন। এই অনুভব শুধু পর্যবেক্ষণ নয়, কেবল দর্শন নয় সমূল বীক্ষণ।

যাকে বলে ‘তৃতীয় নয়ন’ সেই অন্তর্চক্ষু কবি আমিনুল ইসলামের করায়ত্ত। সেজন্য তিনি সুযোগ পেলেই বেরিয়ে পড়েন বস্তি থেকে বিশ্বলোক প্ররিভ্রমণে এবং বাংলা অদর্শিত রূপ পরিদর্শনে। এসব ভ্রমণ অভিজ্ঞতা থেকে তিনি সংগ্রহ করেন কাব্যবীজ; অঙ্কুরিত হয় তাঁর কবিতার ডালপালা। রুদ্ধ ঘরে সঙ্গীহীনতা যদিও কবিতার প্রসবস্থান কিন্তু এর কাব্যবীজটি জন্মে দেশ সমাজের সঙ্গে কবির মনোলোকের মিথষ্ক্রিয়ায়। তাই নদী নারী নিসর্গ কবি আমিনুল ইসলামের কবিমনকে সততই হাতছানি দিয়ে ডাকে। পর্যবেক্ষণের চোখ এবং প্রকাশের ভঙ্গিমা স্বতন্ত্র হলেও কবি হিসেবে আর একটি স্থানে তিনি জীবনানন্দের স্বগোত্র, ইতিহাস চেতনা ঐতিহ্যনিষ্ঠা এবং প্রাচীন মানবসভ্যতা সংস্কৃতির ওপর প্রবল আকর্ষণ। রবীন্দ্রনাথের যেমন উজ্জয়িনীপুর, জীবনানন্দের যেমন বিদিশা ও শ্রাবস্তী, আমিনুল ইসলামের তেমনই বৌদ্ধবিহার, সোনামসজিদ, বেহুলার ভিটা ও উয়ারী বটেশ্বর। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ঐতিহ্য ও বিশ্বামানব জাতির ইতিবৃত্তও তাঁর কবিতার উপাদান। অবশেষে গঙ্গাজলে গঙ্গাপূজার মত কবির আত্মঅবলোকনের কথামালা দিয়েই যবনিকা টানি: ‘আরেকটি বিষয় আমার জীবন ও কবিতার ক্ষেত্রে সত্য হয়ে আছে তা হলো আমার বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ পরিভ্রমণ, দেশ বিদেশের ইতিহাস ভূগোল-নৃতত্ত্বপাঠ এবং আমার ভাবনায় ও কবিতায় সে সবের ছাপ। আমি প্রায় সমগ্র বাংলাদেশ দেখেছি। আমি সোনা মসজিদ, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার, মহাস্থানগড়, বেহুলার ভিটা, রামসাগর, নীলসাগর, মহীপালের দিঘি, দিবর দিঘি, কুসুম্বা মসজিদ, ভিমের পান্টি, কান্তজীর মন্দির, উয়ারী বটেশ্বর, ময়নামতি, শালবন বিহার, শহাজালালের মাজার, জীবনানন্দ দাশের জন্মভিটা, পতিসর শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিস্থান, সোনারগাঁও, বিভিন্ন জমিদারবাড়ি/ রাজবাড়ি, পার্বত্য চট্রগ্রাম অঞ্চল এবং খালবিল নদী সমুদ্র দেখেছি। তাঁর সাথে দেখেছি মায়ানমার, ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্কের বহু ঐতিহাসিক শহর ও স্থান। এবং জানার চেষ্টা করেছি এসব স্থানের মানুষের অতীত বর্তমান। আমার কাব্যভাবনার এসব দর্শন ও পঠনের প্রভাব পড়েছে গভীরভাবে এবং তাৎপর্যপূর্ণ ইতিবাচকতায়।’ (কবিতাসমগ্র-এর ভূমিকা)

কবি আমিনুল ইসলামের কবিতাসমগ্রের স্বরচিত ও সুলিখিত আত্মপর্যবেক্ষণ এবং আত্মমূল্যায়নটির ব্যাখ্য বিশ্লেষণ ভাবসম্প্রসারণই হতে পারে তাঁর কবিতার পূর্ণাঙ্গ টীকা ভাষ্য। এই সত্যের ওপরে আর কিছু হতে পারে বলে মনে হয় না।

লেখক: গবেষক-প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন অধ্যাপক, ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য