, ১১ আশ্বিন ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

আকাশপথে কমছে যাত্রী, জেট ফুয়েলে ভর্তুকি চাইছেন ব্যবসায়ীরা

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

আকাশপথে কমছে যাত্রী, জেট ফুয়েলে ভর্তুকি চাইছেন ব্যবসায়ীরা

# সর্বশেষ ৯ জুলাই প্রতি লিটারে বেড়েছে ১৯ টাকা
# এখন এক লিটার জেট ফুয়েলের দাম ১৩০ টাকা
# পাল্লা দিয়ে বাড়ছে উড়োজাহাজ ভাড়া

উড়োজাহাজে ব্যবহৃত জ্বালানি জেট ফুয়েলের প্রতি লিটারের দাম দুই বছর আগে ছিল ৪৬ টাকা। এখন একই ফুয়েলের প্রতি লিটারের সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০ টাকা। এভাবে গত ২০ মাসে জেট ফুয়েলের দাম বেড়েছে প্রায় ১৮৩ শতাংশ। এতে যাত্রী পরিবহনের খরচ মেটাতে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো বলছে, দুই বছর আগে অভ্যন্তরীণ যে রুটের সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল আড়াই হাজার বা এর কিছু বেশি, এখন সেই ভাড়া গিয়ে ঠেকেছে পাঁচ হাজারে। কারণ উড়োজাহাজের ভাড়ার ৪০ শতাংশ নির্ধারণ হয় জেট ফুয়েলের খরচের ভিত্তিতে। বাড়তি ভাড়ার এই বোঝা যাত্রীদের ওপর পড়ছে। এতে অভ্যন্তরীণ রুটের আকাশপথে ফ্লাইট ও যাত্রী সংখ্যা কমছে। এ কারণে এখন ভর্তুকি দিয়ে কম দামে জেট ফুয়েল চাইছেন এ খাতের ব্যবসায়ীরা।

দেশে জেট ফুয়েলের দাম নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। আর বিপণনের কাজটি করে বিপিসির সহযোগী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) চেয়ারম্যান এ বি এম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রমেই জ্বালানি তেলের দাম বাড়ছে। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এমনটা বেশি হচ্ছে। তাই বিপিসি বা পদ্মা অয়েল দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। যখন আবার আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমবে, বিপিসি কমিয়ে দেবে। এর আগেও এভাবে দাম বাড়ানো-কমানো হয়েছে।

এখন সরকার অকটেন এবং ডিজেলে দিনে ১০৭ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়। জেট ফুয়েলে এই সুযোগ দেওয়া যায় কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে এ বি এম আজাদ বলেন, অকটেন এবং ডিজেল দেশের সব শ্রেণির যানবাহনে ব্যবহার হয়। বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ মেট্রিক টন চাহিদা রয়েছে। আর জেট ফুয়েলের চাহিদা মাত্র দুই থেকে তিন লাখ মেট্রিক টন। তাই জেট ফুয়েলে ভর্তুকি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা যে দামে এই তেল কিনি, একই দামে বিক্রি করি। অনেক ক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কলকাতার তুলনায় এক থেকে দেড় টাকা কমেও বিক্রি করি।

তিনি বলেন, এখন অনেকেই বলছেন জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় উড়োজাহাজের ভাড়া বেড়ে গেছে। কিন্তু উড়োজাহাজে যারা যাতায়াত করেন তাদের প্রায় সবাই সমাজের সামর্থ্যবান। তাদের জন্য সরকার কেন জেট ফুয়েলে ভর্তুকি দেবে এমন প্রশ্ন করেন বিপিসি চেয়ারম্যান।

গত ৯ জুলাই বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ওয়েবসাইটে জেট ফুয়েলের নতুন দামের তালিকা হালনাগাদ করে বিপিসি। এই তালিকায় দেখা যায়, সব শেষ ২০১৬ সালের ২৪ জুলাই ৮৯ টাকা লিটারে অকটেন এবং ৮৬ টাকা লিটারে পেট্রোলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চলতি মাসের ৮ তারিখ থেকে জেট ফুয়েল অভ্যন্তরীণ রুটের ফ্লাইটের জন্য ১৩০ টাকা আর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য ১ দশমিক ২২ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করেছে বিপিসি। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরে এই তেল বিক্রি করা হয়।

jagonews24

বিপিসি ও পদ্মা অয়েল কোম্পানির সংশ্লিষ্টরা জানান, গত জানুয়ারিতে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম ছিল ৭৩ টাকা। ৯ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার কারণে ৭ টাকা বাড়ানো হয়। ৮ মার্চ প্রতি লিটার ৮০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৭ টাকা নির্ধারণ করে বিপিসি। পরে ৭ এপ্রিল লিটারে আবারও ১৩ টাকা বাড়ানো হয়। এর এক মাসের মাথায় আবার জেট ফুয়েলের দাম লিটারে ৬ টাকা বাড়ায় বিপিসি। এর এক মাস পর অর্থাৎ গত ১০ জুন আরও পাঁচ টাকা বাড়িয়ে জেট ফুয়েলের দাম ১১১ টাকা করা হয়। সব শেষ গত ৮ জুলাই আরও ১৯ টাকা বাড়ায় কর্তৃপক্ষ। ওই দিন থেকেই ১৩০ টাকা করে তেল কিনছে উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো।

বাড়ছে উড়োজাহাজ ভাড়া

এক-দুই মাস পরপর জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট পরিচালনার খরচ তুলতে হিমশিম খেতে হচ্ছে বলে দাবি করেছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্স ও নভোএয়ার।

সংস্থাগুলো জানায়, এখন কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল, সৈয়দপুর, রাজশাহীতে নিয়মিত ফ্লাইট পরিচালনা করে তারা। কিন্তু জেট ফুয়েলের দাম বাড়ায় এসব রুটে ভাড়া দ্বিগুণের বেশি বেড়ে গেছে। এই চাপ যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়ছে। এতে আকাশপথে যাত্রী সংখ্যা কমছে। পর্যটন এলাকাগুলোতেও পর্যাপ্ত যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের পর্যটনখাতও পিছিয়ে যাবে।

ফ্লাই ঢাকা ও এয়ার অ্যাস্ট্রা নামে আরও নতুন দুটি উড়োজাহাজ সংস্থা অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী পরিবহনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু যে হারে জেট ফুয়েলের দাম বাড়ছে, এমন পরিস্থিতিতে এয়ারলাইন্সগুলোর টিকে থাকাই কঠিন হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, করোনা মহামারির আগে প্রতি লিটার জেট ফুয়েলের দাম যখন ৪৬ টাকা ছিল তখন ঢাকা-যশোর রুটের সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল দুই হাজার ৭০০ টাকা। সেটি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৮০০ টাকায়। একইভাবে ঢাকা-কক্সবাজার রুটে সর্বনিম্ন ভাড়া ছিল তিন হাজার ৭০০ যা এখন পাঁচ হাজার ৮০০ টাকা। দুই হাজার ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে ঢাকা-সৈয়দপুরের ভাড়া এখন চার হাজার ৮০০ টাকা। চট্টগ্রাম, সিলেট, রাজশাহীর ভাড়া হয়েছে সর্বনিম্ন পাঁচ হাজার টাকা। করোনার আগে যা ছিল দুই হাজার ৭০০ টাকা। এখন এই ভাড়া আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি চলছে।

গত ১২ জুলাই ‘দেশের এয়ারলাইন্স ব্যবসা, কে নিয়ন্ত্রণ করছে?’ শীর্ষক একটি বিবৃতি দিয়েছেন ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) মো. কামরুল ইসলাম। ওই বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রতি মাসে রুটিন করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জেট ফুয়েলের মূল্য বৃদ্ধি করে বাংলাদেশের এভিয়েশন ব্যবসাকে অস্থির করে তুলছে। এভিয়েশন ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই আতঙ্কিত। ব্যবসার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যে সময় পার করছে বিনিয়োগকারীরা। তাই সরকারের উচিত জেট ফুয়েলের দাম কমানো এবং এই খাতে ভ্যাট কমিয়ে আরও ভর্তুকি দেওয়া।

জেট ফুয়েলের দামের ওপরই ফ্লাইট ভাড়াসহ উড়োজাহাজ পরিচালনার সবকিছু নির্ভর করে বলে জানান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের মহাপরিচালক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকার। তবে এ বিষয়ে তার বিস্তারিত জানা নেই বলেও জানান তিনি।

  • সর্বশেষ - অর্থ-বাণিজ্য