, ১০ আশ্বিন ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা হারিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ী

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ: স্ত্রীর চিকিৎসার টাকা হারিয়ে বিপাকে ব্যবসায়ী

কুষ্টিয়ার ফল ব্যবসায়ী হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরার ছোটবেলা থেকেই দুই কানে সমস্যা। বিয়ের পর হেকমত আলী তার চিকিৎসার জন্য একাধিকবার উদ্যোগ নেন। কিন্তু টাকার অভাবে পারেননি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নেন।

গত মঙ্গলবার (২ আগস্ট) ঋণের ২৮ হাজার টাকা নিয়ে ঈগল পরিবহনের একটি বাসে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু পথিমধ্যে বাসটি ডাকাতির কবলে পড়ে। ডাকাতদল তার সব টাকা নিয়ে যায়। এতে বিপাকে পড়েছেন এই ব্যবসায়ী। রাইজিংবিডির প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে এসব তথ্য জানান হেকমত আলী।

চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনার পরের দিন বুধবার হেকমত আলী বাদী হয়ে মধুপুর থানায় একটি মামলা করেছেন। বর্তমানে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।

শনিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত চাঞ্চল্যকর এ মামলায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলার প্রধান আসামি রাজা মিয়া পাঁচ দিনের রিমান্ডে রয়েছেন। গ্রেপ্তার অপর দুই আসামি আউয়াল ও নুরুকে দুপুরে আদালতে তোলা হয়েছে।

ভয়াবহ সেই রাতের বর্ণনায় হেকমত আলী বলেন, মঙ্গলবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বাসটি সিরাজগঞ্জ পৌঁছালে রাতের খাবারের জন্য বিরতি দেওয়া হয়। বিরতি শেষে কিছু দূর যাওয়ার পর চারজন বাসে ওঠেন। এদের সবার মুখে মাস্ক ও একজনের পিঠে ব্যাগ ছিল। পরবর্তীতে একইভাবে আরও কয়েকজন বাসে ওঠেন।

বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর রাস্তা থেকে ওঠা যাত্রীদের মধ্যে একজন বাস থামাতে বলেন। কিন্তু চালক না থামালে তাকে মারধর করা হয়। একপর্যায়ে চালককে সরিয়ে পুরো বাসের নিয়ন্ত্রণ নেন তারা।

এর পরের তিন ঘণ্টা বাসের ভেতর তাণ্ডব চালানো হয়। পুরুষ যাত্রীদের গলায় ছুরি ও কাঁচি ধরে রাখে ডাকতরা। কোনও যাত্রী যেন চিৎকার করতে না পারে, সে জন্য বাসের পর্দা কেটে মুখ, হাত ও পা বেঁধে ফেলা হয়।

বাসে থাকা ১০ থেকে ১২ জন নারীর মধ্যে একজনের চোখ, মুখ ও হাত বাঁধা হয়। বাকিদের খোলা ছিল। বাসের সব আলো নিভিয়ে প্রত্যেকের শরীর তল্লাশি করে টাকা, মোবাইল নিয়ে নেওয়া নেয়। নারী যাত্রীদের সঙ্গে যে স্বর্ণালঙ্কার ছিল তাও লুট করে নেয় ডাকাতদল।

তিনি আরও বলেন, এক নারীকে তল্লাশি করার সময় উনি প্রতিবাদ করে বলেন, তোরা যে কাজ করছিস, সেটা ঠিক নয়। আমার এলাকা পাবনায় হলে তোদের দেখে নিতাম। এ কথা শোনার পর ডাকতরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওই নারীকে মারধর করে। পরে বাসের পেছনে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করা হয়।

হেকমত আলীর স্ত্রী জেসমিন আরা বলেন, আমি সন্তানকে বুকে জড়িয়ে মাথা নিচু করে সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছিলাম। সামনের সিটে আমার মা বসেছিলেন আরেক সন্তান নিয়ে

তিনি আরও বলেন, ডাকাতি ও ধর্ষণ শেষ হওয়ার পর ডাকাতরা টাকা, মোবাইল ও স্বর্ণালঙ্কার নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি শুরু করে। এসময় তাদের নিজেদের মধ্যে ঝগড়া হয়। সব কাজ শেষ হবার পর সড়কের পাশে একটি খাদে বাসটি রেখে চলে যায় তারা।

হেকমত আলীর শাশুড়ি শিল্পী খাতুন বলেন, ভোরের দিকে যখন পুলিশ আসে তখন কয়েকজন যাত্রীকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কয়েকজনকে থানায়। আমরা বুধবার মধুপুর থানায় ছিলাম। রাত ৯টার দিকে বিআরটিসির একটি গাড়িতে টিকিট কেটে দিয়ে আমাদের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় পুলিশ।

হেকমত আলী বলেন, বুধবার (৩ আগস্ট) জেসমিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করলে এক সপ্তাহ পরেই তার কানের অপারেশন হবার কথা ছিলো।

চিকিৎসা ও থাকা খাওয়া নিয়ে ৩০ হাজার টাকার মতো খরচ হতো। প্রথমে এক কান অপারেশন করতাম, এর ছয় মাস বা একবছর পর অপর কানটি অপারেশন করতাম। কিন্তু ডাকাতির কবলে পড়ে কিছুই হলো না।

তিনি আরও বলেন, এখন একদিকে ঋণ পরিশোধের চিন্তা অপরদিকে অপারেশন করার জন্য পুনরায় টাকা জোগাড় করতে হবে। সব মিলিয়ে দারুণ বিপাকে পড়েছি।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ