, ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

ভর্তা-ডিম দিয়ে একবেলা ভাত খাওয়ার খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

ভর্তা-ডিম দিয়ে একবেলা ভাত খাওয়ার খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

মোখলেস মিয়া ৪৫ বছর বয়সী একজন রিকশা চালক। বাড়ি রংপুর হলেও ঢাকায় প্রায় ১৩ বছর ধরে রিকশা চালান। থাকেন মালিবাগের একটি রিকশার গ্যারেজে। সেখানেই মেস সদস্য হিসেবে অন্য রিকশা চালকদের সঙ্গে রাতের খাবার খান। কিন্তু সকালে আর দুপুরে খেতে হয় কম বাজেটের ছোট হোটেলে। আগে দুপুরে ডিম-ভাত খেলে যে বিল আসতো, সেই একই খাবার খেয়ে এখন বিল দিতে হচ্ছে প্রায় দ্বিগুণ।

মোখলেস মিয়া বলেন, আগে হোটেলে প্রতি প্লেট ভাত ছিল ১০ টাকা, এখনও তাই আছে, তবে পরিমাণ কমেছে। আবার কোথাও কোথাও ১৫ টাকাও হয়েছে। ভাতের সঙ্গে খাওয়ার জন্য ডিমের তরকারি ছিল ১৫ টাকা, এখন বেড়ে তা হয়েছে ২৫ টাকা, কোথাও আবার ৩০ টাকা। সেই সঙ্গে ৫ টাকার ডাল ১০ টাকা, আর যে কোনো ভাজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা। সব মিলিয়ে আগে ভাত, ডিম, ডাল খেলে ৩৫ টাকায় হয়ে যেত। আর এখন শুধু ডিম-ভাত খেতেই লাগে ৫০ থেকে ৫৫ টাকা। সঙ্গে যদি ভাজি, ডাল নেওয়া হয় তাহলে তা পড়ে যায় ৭০/৭৫ টাকা। মাছ-মাংসের কথা তো বাদই দিলাম।

dhakapost

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে প্রতিটি জিনিসেই আকাশ ছোঁয়া দাম। যে কারণে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শ্রমজীবী, নিম্ন আয়ের মানুষজন। রাজধানীতে রিকশাচালক সহ নিম্ন আয়ের বিভিন্ন মানুষজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কর্মসূত্রে যাদের প্রতিদিনই বাইরে খেতে হয় তাদের খরচ বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। ফলে মাস শেষে খরচের হিসাবই মেলাতে পারেন না অনেকে।

রাজধানীর পল্টন মোড়ে ভাড়ার জন্য অপেক্ষারত শাজাহান আলী নামে এক রিকশাচালকের সঙ্গে কথা হয় হোটেলে খাওয়ার বিষয়ে। তিনি বলেন, রিকশা চালানোর কারণে প্রতিদিন সকাল-দুপুরে বাইরে খেতে হয়। তবে বর্তমানে হোটেলে খাওয়ার খরচ খুবই বেড়ে গেছে। আগে ৩০/৩৫ টাকা হলে দুপুরে খাওয়া হয়ে যেত, কিন্তু এখন তার দ্বিগুণ লেগে যায়। মাছ বা মাংস খাওয়ার কথা ভাবাই যায় না। তাও তো নিয়মিত গরিবের হোটেলে খাই, তবুও সকালে একটা পরটার দামই লাগে ১০ টাকা। আর দুপুরে আগে ৩ প্লেট ভাত খাইতাম, এখন খরচ বেশি লেগে যাওয়ায় দুই প্লেট খাই।

dhakapost

রাজধানীর ভাটারা এলাকায় একটি হোটেলে মালিক আব্দুস সোবহানের সঙ্গে আলাপ হয় হোটেলে সব ধরনের খাবারের দাম বৃদ্ধির বিষয়ে। তিনি বলেন, বাজারে এমন কিছু নেই যার দাম বাড়েনি। প্রতিটি জিনিসের দাম বাড়তি, তাই আমরা কোনো মতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার জন্য খাবারের দাম কিছুটা বাড়িয়েছি। বাজারে ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা কেজি, ডিম ১৫০ টাকা ডজন, এছাড়া তেল, ডাল, চাল, তরি-তরকারি গ্যাস সব কিছুর দাম অতিরিক্ত বেড়েছে। কিছুদিন আগেও ডিমের তরকারি বিক্রি করেছি ১৫ টাকা। কিছুদিন আগে সব কিছুর দাম বেড়ে যাওয়ায় সেটা করা হয়েছে ২০ টাকা। এখন আবার সবকিছুর দাম অতিরিক্ত বাড়তি, তাই ২৫ টাকা করে বিক্রি করছি।

তিনি আরও বলেন, আমার হোটেলে ভাত এখনও ১০ টাকা প্লেট আছে, যদিও পরিমাণ কিছুটা কমিয়েছি, তবে অন্যান্য হোটেলে এখন ভাত ১৫ টাকা প্লেট। আগে পাঙ্গাস মাছ প্রতি পিস বিক্রি করতাম ২৫/৩০ টাকায়, এখন ৪০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, কই মাছ, তেলাপিয়া মাছেরও একই অবস্থা। অন্যদিকে রুই, কাতলা মাছের দাম আরও বেশি। মুরগির তরকারি আগে প্রতি প্লেট ৪০ টাকা বিক্রি করেছি এখন ৫৫/৬০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে প্রতিটি খাওয়ার আইটেমেরই দাম বেড়েছে।

dhakapost

রাজধানীর বাড্ডায় গরিবের হোটেল নামে পরিচিত হোটেলের মালিক রফিকুল ইসলাম বলেন, গরিবের হোটেল আর গরিবের নেই। আগে একজন রিকশাচালক, কর্মজীবী নিম্ন আয়ের মানুষ হোটেলে এসে ৩০/৩৫ টাকার মধ্যে দুপুরের খাবার খেতে পারতো, কিন্তু এখন সব কিছুর দাম বাড়তি হওয়ার কারণে একই খাবার খেতে প্রায় দ্বিগুণ টাকা লেগে যাচ্ছে। কোনভাবেই আমরা আর কম দামে বিক্রি করতে পারছি না। যে কারণে আগের চেয়ে ক্রেতার সংখ্যাও অনেকে কমেছে, এছাড়া আগে যারা হোটেলে এসে ৩ প্লেট ভাত খেতো, তারা এখন খায় দুই প্লেট, দেড় প্লেট ভাত। আবার অনেকে এখন এসে ভাত না খেয়ে সিঙ্গারা খায়, খরচ কমানোর জন্য, পরে একবারে বাড়িতে গিয়ে ভাত খায় রাতে।

রফিকুল ইসলামের হোটেলে বর্তমানে খাওয়ার আইটেমগুলোর দামের ধারণা দিয়ে তিনি বলেন, আগে ব্রয়লার মুরগির তরকারি কিছুদিন ৩৫ টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন সেটা ৪৫/৫০ টাকা। পাঙ্গাস, কই, তেলাপিয়া আগে বিক্রি হয়েছে ৩০ টাকা পিস, এখন সেটা ৫০ টাকা। ডিমের তরকারি আগে ছিল ১৫/২০ টাকা, এখন সেটা ৩০ টাকা। ডাল আগে ৫ টাকা বাটি ছিল, এখন সেটা ১০ টাকা। করোলা ভাজি এখন ৩০ টাকা বাটি। অন্য ভাজি, সবজি আগে ছিল ১৫ টাকা এখন সেটা ২৫ টাকা। গরুর মাংস সচারাচর না থাকলেও আগে যেটা বিক্রি হয়েছে ৮০ টাকায় এখন সেটা ১২০/১৫০ টাকা। এছাড়া সব ধরনের ভর্তা ১০ টাকা, তবে আগের চেয়ে পরিমাণ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া সকালে পরোটা-রুটি প্রতি পিস ১০ টাকা আর ডাল ভাজি ১০ টাকা বাটি বিক্রি করি।

অন্যদিকে রাজধানীর মহাখালীতে তুলনামূলক একটি ভালো মানের হোটেলের ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ হিরার সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, এখানে ভাত ১৫ টাকা প্লেট। আর সব ধরনের তরকারির দাম বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বড় ধরনের সব মাছের পিছ ১২০ টাকা থেকে ১৫০ টাকা, গরুর মাংস ১৫০ টাকা, মুরগি ৮০ টাকা, সব ধরনের ভাজি ৩০ টাকা, সব ধরনের শাক, ভর্তা ২০ টাকা করে বিক্রি করছি। ইদানিং হোটেলে খাওয়ার খরচ আগের চেয়ে বেড়ে গেছে কারণ আমাদের সব কিছুই বাড়তি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই যদি হোটলের খাবারের দাম না বাড়াই তাহলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে যাবে। হোটেলে হোটেলে খাবার দাম বাড়ার কারণে সত্যি কথা বলতে আমাদের ক্রেতাও আগের চেয়ে কমে গেছে। হোটেলে এসে মানুষ আগের চেয়ে কম খাচ্ছে।

হোটেলে হোটেলে সব ধরনের খাওয়ারের দাম বেড়ে যাওয়া বিষয়ে হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন বলেন, হোটেল পরিচালনার জন্য সব ধরনের কাঁচা মালের দাম আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, যে কারণে বাধ্য হয়ে সবাই হোটেলের খাবারের দাম বাড়িয়েছে। তবে দাম বাড়িয়ে কিন্তু হোটেল মালিকরা লাভ করতে পারছে না, তাদের বরং লস হয়েছে। কারণ হোটেলে খাবারের দাম বাড়ার কারণে ক্রেতা অনেকাংশেই কমে গেছে। আগের চেয়ে মানুষ হোটেলে খাওয়া কমিয়ে দিয়েছে। 

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সার্বিক বিষয় নিয়ে নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, একজন রিকশাচালক, সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক, বাসের হেলপার, নির্মাণ শ্রমিকসহ নিম্ন আয়ের কিছু মানুষ আগে হোটেলে ৩৫/৪০ টাকার মধ্যে দুপুরে খেতে পারত। কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি আর নেই। এসব নিম্ন আয়ের মানুষজন খুব কষ্টে আছে। তারা হয় হোটেলে গিয়ে কম খাচ্ছে, নয়তো যাচ্ছেই না। আগে পাঙ্গাস মাছ, তেলাপিয়া মাছ, কই মাছ দিয়ে গরিব মানুষরা ভাত খেত ৪০/৫০ টাকার মধ্যে, আর এখন সেই একই খাবার হোটেলে খেতে দ্বিগুণ টাকা লেগে যাচ্ছে তাদের। এছাড়া সবচেয়ে কম দামে আগে এসব মানুষ ডিম দিয়ে হোটেলে ভাত খেত ৩৫ টাকায় এখন সেটা খেতে ৫০/৬০ টাকারও বেশি লেগে যাচ্ছে তাদের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ নিম্ন আয়ের মানুষ খুব কষ্টে আছে। সব কিছুর দামই বাড়তি।

  • সর্বশেষ - জাতীয়