, ২৬ মাঘ ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

কঙ্ক ও লীলা : জাতি ও বর্ণ বৈষম্য

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

কঙ্ক ও লীলা : জাতি ও বর্ণ বৈষম্য

ড. মো. সানোয়ার হোসেন

প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা বা মৈমনসিংহ গীতকিার পালাসমূহ বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ শিল্প সম্পদ। মহুয়া, মলুয়া, দেওয়ানা মদিনা, চন্দ্রাবতী, দস্যু কেনারামের পালা, কঙ্ক ও লীলা-এ ধরনের অর্ধ শতাধিক পালা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক থিয়েটারসহ উভয় বাংলার বিভিন্ন নাট্য সংগঠন কর্তৃক উপস্থাপন হয়েছে, গবেষণাও হয়েছে বিস্তর। তবু গীতিকার পালাসমূহের আবেদন লুপ্ত হয়নি, বরং কালক্রমে এর পঠন পাঠন ও উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। কারণ গীতিকা বাঙালির নিজস্ব শিল্পসম্পদ।

বর্তমান বিশ্বে সুখময় ও শান্তিময় জীবন যাপনের লক্ষে ‘কঙ্ক ও লীলা’ বার বার পাঠ ও মঞ্চায়ন হওয়া প্রয়োজন এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ কঙ্ক ও লীলার জীবন চরিত্র রূপায়ণের মধ্যদিয়ে পালাকার তাঁর এই পালা কাহিনিতে যা প্রকাশ করেছেন তা থেকে একালের মানব জাতি নবরূপে সম্পীতির বন্ধন বিনির্মাণের প্রয়াসী হতে পারে। 

এই শিল্পসম্পদ সৃষ্টি হয়েছে এদেশের কৃষিজীবী মানুষের আপন ভাবনায় প্রণয়ন এবং তা আসরে আসরে পরিবেশনের মাধ্যমে। মহুয়া পালা থেকে শুরু করে গীতিকার বহু পালা কাহিনির মধ্যদিয়ে বাঙ্গালির নারীর প্রেম, ভালোবাসা, দুঃখ বেদনা, আত্মবিসর্জন, দৃঢ় প্রত্যয়বাণি উচ্চারণের শক্তিমত্তার পরিচয় প্রকাশ পেয়েছে। একই গীতিকার কোনো কোনো পালা কাহিনিতে জাতি ও বর্ণ বৈষম্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির স্বরূপ উত্থাপিত হয়েছে। এরূপ একটি পালার নাম ‘কঙ্ক ও লীলা’।

প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা বা মৈমনসিংহ গীতিকার পালাসমূহের মধ্যে ‘কঙ্ক ও লীলা’ বাংলা ভাষাভাষি অঞ্চলে বহুল পরিচিত ও সমাধৃত একটি পালা। শ্রী দীনেশচন্দ্র সেন, রায় বাহাদুর, বিএ ডিলিট কর্তৃক সঙ্কলিত ‘মৈমনসিংহ গীতিকা’ প্রথম খন্ড এবং শ্রীক্ষিতীশ চন্দ্র মৌলিক সম্পাদিত ‘প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা’র তৃতীয় খণ্ডে উল্লিখিত পালাটি প্রকাশিত হয়েছে। তবে শ্রীক্ষিতীশ চন্দ্র মৌলিক সম্পাদিত ‘প্রাচীন পূর্ববঙ্গ গীতিকা’য় এই পালাটির নামকরণ ‘লীলা কন্যা- কবি কঙ্ক পালা’ হিসেবে ধৃত হয়েছে। দু’টি গ্রন্থেই পালাটির রচয়িতা হিসেবে চারজনের নাম উল্লেখ আছে, এঁরা হলেন - দামোদর দাস, রঘুসুত, শ্রীনাথ বেনিয়া এবং নয়ানচাঁদ ঘোষ। এই পালাটিতে কঙ্ক ও লীলার বেদনাহত জীবনচিত্র রূপায়নের নানান বাঁকে সমাজের ব্যক্তি চরিত্রের আত্ম মর্যাদার রূপ ও ধর্ম প্রসঙ্গ বর্ণিত হয়েছে যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ কারণে উক্ত পালা কাহিনিতে জাতি ও ধর্ম কিরূপে বিদ্যমান তা অতি সংক্ষেপে উপস্থাপন করার প্রয়াস আছে।

‘কঙ্ক ও লীলা’ পালাটির কাহিনিতে দেখা যায় কঙ্ক এক দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। ছয় মাস বয়সকালে তার পিতা-মাতার মৃত্যু হয়। অতঃপর সে আশ্রয় পায় মুরারী চন্ডালের ঘরে। কিন্তু ভাগ্য তার জীবনে সহায় হয়না। কঙ্ক যখন পাঁচ বৎসর বয়সে পদার্পন করে তখন মুরারী চন্ডাল ও চন্ডালিনীও মৃত্যুবরণ করে। এরপর এক পন্ডিত ব্রাহ্মণ শ্মশানে ক্রন্দনরত শিশু কঙ্ককে দেখে নিয়ে যায় আপন ঘরে। ব্রাহ্মণের স্ত্রী গায়ত্রী দেবী কঙ্ককে পেয়ে খুবই খুশি হয়। পুত্রহীনার দুঃখ ভুলে যায় সে। আপন পুত্র সন্তানের মতই সে তাকে লালন পালন করে। তাঁদের একমাত্র শিশু কন্যা লীলার সঙ্গে খেলাধুলা করে কঙ্কের সময় কাটে।

‘আদর যতনে কঙ্কের সুখে দিন যায়।
লেখাপড়া করে আর ধেনু যে চড়ায়’
গায়ত্রী দেবী গৃহে আদর স্নেহ-মায়-মমতা ও লেখাপড়ার মধ্যদিয়ে জীবন অতীবাহিত হলেও মাতৃস্নেহ- তার কপালে স্থায়ীরূপ পায় না। কারণ যার মাতৃস্নেহে বড় হতে থাকে কিছুদিন পর সেই গায়ত্রী দেবী ইন্তেকাল করে। আবার সে মাতৃহীন হয়। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে যে, দরিদ্র ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করে, চন্ডালের ঘর হয়ে কঙ্কের আবার আশ্রয় হয় পন্ডিত ব্রাহ্মণের সংসারে। অতঃপর নানা ঘটনা পরম্পরায় এক মুসলিম পীরের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে সে। যে কঙ্ক পন্ডিত ব্রাহ্মণের কাছে থেকে গান, শ্লোক আর মন্ত্র শিখে। সেই কঙ্ক পঞ্চপীরের দরগায় গান গায়, প্রাসাদ খায়, দোয়া কালাম শিখে, ধর্ম নিয়ে আলাপ করে।
‘পীরের অদ্ভুতকাণ্ড দেখিয়া।
কঙ্কের পরাণ গেল মোহিত হইয়া /
সর্ব্বদা নিকটে কঙ্ক লুটায় ভক্তিপূর্ণ মনে।
চরণে লুটায় তার দেবতার জ্ঞানে /
তারপর জাতি-ধর্ম্ম সকলি ভুলিয়া।
পীরের প্রাসাদ খায় অমৃত বলিয়ে /
দীক্ষিত হৈলা কঙ্ক যবন পীরের স্থানে।
সর্বনাশের কথা গর্গ কিছুই না জানে/
জাতি - ধর্ম্ম নাশ হৈল রটিল বদনাম।
পীরের নিকটে কঙ্ক শিখিয়ে কালামা/’

পঞ্চপীরের দরগায় তার এসব কর্মকাণ্ডকে সমাজের সাধারণ মানুষ সুদৃষ্টিতে গ্রহণ করে না। জাতি, ধর্ম ভুলে পীরের প্রাসাদ খাওয়া, পীরের চরণতলে ভক্তি প্রদর্শন করা দেখে তার প্রতি সমাজপতিরা ক্ষুব্ধ হয়, তারা এসব কর্মযজ্ঞকে জাতি ধর্ম নষ্ট হওয়ার সামিল মনে করে। কিন্তু কঙ্ক তা উপলব্ধি করতে পারে না। অপরদিকে তার ভক্তি-শ্রদ্ধা আর কাব্য প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে পীর তাকে সত্যপীরের পাঁচালি রচনা করার কথা বলে।

‘সত্যপীরের পাঁচালি’ রচনা করে সে কবি কঙ্ক নামে দেশ বিদেশে পরিচিত হয়ে ওঠে। পন্ডিত ব্রাহ্মণ গর্গ কঙ্কের অসামান্য প্রতিভার প্রতি আকৃষ্ট হয়। অসামান্য প্রতিভার কারণেই গর্গ তাকে সমাজে মর্যাদা দিতে চায়, জাতে তোলার উদ্যোগী হয়। কিন্তু এতে সমাজের উঁচু জাতের মানুষ বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়। কঙ্ককে জাতে না তোলার জন্য গর্গকে নিষেধ করে।

জন্মিয়া চন্ডালের অন্য খায় যেই জন।
যে তারে সমাজে তুলে নহে সে ব্রাহ্মণ/
অনাচরে জাতি নষ্ট, নষ্ট হয় কুল।
মাটিতে পড়িলে কেহ নাহি তুলে/

এতো কিছুর পরও কঙ্ক ব্রাহ্মণ সমাজে প্রতিষ্ঠা পায় বিধায় তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হয়। সমাজপতিরা কঙ্ককে শুধুমাত্র চন্ডালের পুত বলেই খান্ত হয় না। মুসলমান বলেও তাকে তিরস্কার করে, তার রচিত সত্যপীরের পাঁচালি পুড়ে ফেলে। এমনকি লীলা ও কঙ্ককে নিয়ে মিথ্যা কলঙ্ক রটাতেও তারা দ্বিধাবোধ করে না। লীলার বিরুদ্ধে মিথ্যা কলঙ্ককথা গর্গের মনে ভ্রান্ত বিশ্বাস তৈরি হয় এবং কঙ্ক ও লীলাকে হত্যা করার সংকল্প করে। ‘কি কলঙ্ক কৈল মোর কহন না যায়।
কঙ্কেরে মারিয়া পরে মারিব লীলায়/
তারপর প্রবেশিয়া জলন্ত আগুণে।
প্রায়শ্চিত্ত করব নিজে শরীর দহনে/’

গর্গের বেদনাহত হত মন ক্রমে চঞ্চল হয়ে ওঠে। প্রায়শ্চিত্যস্বরূপ প্রাণ বিসর্জনের জন্য আগুণে ঝাঁপ দেয়ার প্রাক্কালে ভুলক্রমে কঙ্ক ও লীলা পরিবর্তে সুরভীর মৃত্যু হয়।
‘গয়বি আদেশ গর্গ শুনিলা শ্রবণে।
কঙ্কেরে মারিতে বিষ দিল অকারণে/
তেহি না কারণে তার এতেক সর্ব্বনাশ।
সেই বিষে সুরভীর হইল প্রাণনাশ/’

কঙ্ক ও লীলাকে নিয়ে সামাজিকভাবে যে প্রবঞ্চনার সূত্রপাত হয় তা গর্গ সহ্য করতে সক্ষম হয়। সমাজপতিদের কূট সমালোচনার কারণে তার মন ক্রমাগত অস্থির হয়ে ওঠে।
‘আশ্রমে গোহত্য হইল আমার কারণ।
অগ্নিতে পশিয়া আমি ত্যজিব জীবন /

সুরভীকে (গরু) হত্যা মানে দেবতাকে হত্যা কারছে সে, এই কথা সমাজের লোকজন বলাবলি করে। এই পাপবোধ তার মনোলোকে অন্ধকারের ছায়া ফেলে। পাপ উত্তরণের আশায় দেবতার পূজা ছাড়া সবকিছু বিসর্জন দেয় সে। এক পর্যায়ে সে উপলব্ধি করতে পারে যে, সমাজের তথাকথিত উঁচু জাতের মানুষ চক্রান্ত করেছে, মিথ্যা কলঙ্ক লেপন করেছে কঙ্ক ও লীলার কপালে, চন্ডাল ও মুসলমান বলে দেশান্তরী করেছে কঙ্ককে।

এই বোধশক্তি যখন গর্গের মনে জাগ্রত হয় তখন সে কঙ্ককে খুঁজে আনার জন্য শিষ্যদের আহ্বান জানায়। কঙ্কের জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠে। অবশেষে কঙ্ক পন্ডিত ব্রাহ্মণ গর্গের ভিটায় ফিরে এসে সবকিছু অন্ধকার দেখে। লীলার মৃত্যুতে গর্গের চোখে বেদনার ছবি ভাসে। তার কান্নায় বৃক্ষলতার পাতা ঝরে, আকাশ পাতাল কেঁপে উঠে।

‘কঙ্ক ও লীলা’র এই কাহিনির সামগ্রিক বিষয়ের দিকে ফিরে তাকালে কী দেখা যাবে? এ থেকে পাঠক কী শিক্ষা নিবে? কাহিনির শেষ প্রান্তে এসে পালাকার দামোদর দাসও পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখে বলেছেন- ‘যে নিধি হারাইলা ফিরি না পাইবা আর’। কঙ্ক তার পিতামাতাকে হারিয়েছে, গর্গ তার স্নেহের কন্যা লীলাকে হারিয়েছে। কেন? সমাজপতিদের কূটকৌশলের কারণে। ধর্মান্ধ মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্রকে কীভাবে ধ্বংসলীলায় পরিণত করতে পারে তারই প্রকৃষ্ঠ উদাহরণ এ কাহিনির অন্তরে বর্ণিত হয়েছে। কেননা চন্ডালের ঘরে অন্য খাওয়া, মুসলমান পীরের দরগায় সিন্নি খাওয়া, সত্যপীরের পাঁচালি রচনা করা- এসব দোষের কিছু নয়। অথচ এসব কর্মকান্ডের জন্যই সমাজপতিরা কঙ্ককে জাতে তোলেনি, সমাজে মর্যাদার আসন দেয়নি।

মানুষের মধ্যে জাত ও ধর্ম নিয়ে এই যে দ্বন্দ্ব সংঘাত তা শুধু মানুষের জীবনকে ধ্বংসই করে, সুষ্ঠু সুন্দর জীবন গড়ে ওঠে না। এই সত্য উপলব্ধি করেই হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ- ‘বঙ্গে মুসলমান শাসনের শেষের দিকে সত্যপীর ও সত্য নারায়ণ কাহিনির মধ্যদিয়ে সম্প্রীতি তৈরি করার চেষ্টা হয়েছিল’। (সূত্র: সুকুমার সেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস (২য় খণ্ড), পৃ-৩৯৮)।

কাজেই গীতিকা সাহিত্যের এই পালা কাহিনি থেকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সম্প্রীতির বিষয়টি মানব মনে নতুনরূপে আশার আলো সঞ্চার করতে পারে। বর্তমান বিশ্বে মানব সভ্যতার যে সংকট দেখা যাচ্ছে, তার মূলে আছে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ বৈষম্য। আলোচ্য পালাটির কাহিনিতে লীলার মৃত্যু, কঙ্ক ও গর্গের দুঃখময় জীবন রূপায়ণের পেছনে ছিল জাতি, সমাজ ও ধর্ম।

সুতরাং বর্তমান বিশ্বে সুখময় ও শান্তিময় জীবন যাপনের লক্ষে ‘কঙ্ক ও লীলা’ বার বার পাঠ ও মঞ্চায়ন হওয়া প্রয়োজন এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ কঙ্ক ও লীলার জীবন চরিত্র রূপায়ণের মধ্যদিয়ে পালাকার তাঁর এই পালা কাহিনিতে যা প্রকাশ করেছেন তা থেকে একালের মানব জাতি নবরূপে সম্পীতির বন্ধন বিনির্মাণের প্রয়াসী হতে পারে।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য