, ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ অনলাইন সংস্করণ

ঋণ না নিয়েও এসেছে ব্যাংক নোটিশ, আতংকে অর্ধশত দিনমজুর পরিবার

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

ঋণ না নিয়েও এসেছে ব্যাংক নোটিশ, আতংকে অর্ধশত দিনমজুর পরিবার

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় সোনালী ব্যাংকের এক নোটিশে আতংকে রয়েছে অর্ধশতাধিক দিনমজুর পরিবার। এসব পরিবারের কাছ থেকে ২০১৬ সালে রাস্তার মাটি কাটার কাজ দেওয়ার কথা বলে ভোটার আইডি ও ছবি নিয়ে প্রত্যকের নামে ৩০-৫০ হাজার টাকা ঋণ নেয় একটি প্রচারক চক্র। ভুক্তভোগীদের অজ্ঞাতসারেই এসব ঋণ নেওয়া হয়। এসব ঋণ পরিশোধের জন্য ভুক্তভোগীদের ব্যাংক থেকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। এ নোটিশ পেয়ে হতাশা আর আতংকে দিন কাটছে এসব পরিবারের।

উপজেলার নীলগঞ্জের আবাসনে বাস করা ষাটোর্ধ্ব সাপিয়া বেগমের নামে ৩৫ হাজার টাকা ঋণি নিয়েছে প্রতারক চক্র। সুদ-আসলে সে ঋণ বেড়ে হয়েছে ৫৪ হাজার ৫২৪ টাকা। ঋণ না নিয়েও উকিল নোটিশ এসেছে সাপিয়ার কাছে। সোনালী ব্যাংক কলাপাড়া বন্দর শাখার এমন নোটিশ পেয়ে আতংকে রয়েছেন এ বৃদ্ধা। কেননা বিধবা সাপিয়ার সংসারই চলে অন্যের কাছ হাত পেতে।

সাপিয়ার মতো এরকম প্রায় অর্ধশতাধিক পরিবারের রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছে সোনালী ব্যাংকের এই নোটিশ। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের দিকে এই পরিবারগুলো রাস্তার মাটি কাটার কাজ করতো। তাদের দলনেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিতেন তাদেরই প্রতিবেশী পিয়ারা বেগম। আর এ কাজের সমন্বয় করতো ‘স্বনির্ভর প্রকল্প’ নামের একটি এনজিও। তাদের দলনেতা ও এই এনজিওর একটি চক্র মিলে তাদের নামে ব্যাংক ঋণ নিয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর।

রুবি নামের এক ভুক্তভোগী বলেন, ‘পিয়ারা আমাদের দলনেতা ছিলেন। তিনি বিমা করে দেওয়ার কথা বলে জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নিয়ে আমাদের এক হাজার করে টাকা দেন তখন। বলেন, তোমাদের নামে বিমা করেছি। তাতে আমিও টাকা পাবো, তোমরাও প্রতি বছর টাকা পাবে। এছাড়া আমরা কিছুই জানি না। কিন্তু পাঁচ বছর পর দেখি আমার নামে ৭৫ হাজার টাকা পরিশোধের নোটিশ এসেছে।’

মঞ্জু রানী নামের আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘দলনেতা পিয়ার আর স্বনির্ভর প্রকল্পের মনির স্যার সবসময়ই আমাদের কাজের ব্যবস্থা করে দিতেন। তাই ছবি ও আইডি কার্ড তাদের দিয়েছি। কিন্তু তারা আমাদের নামে হাজার হাজার টাকা তুলে নিয়ে পালিয়েছেন। আমরা তাদের বিচার চাই এবং এই হয়রানি থেকে মুক্তি চাই।’

স্থানীয়দের অভিযোগ, অভিযুক্ত এই পিয়ারা বেগম ও মনিরের মধ্যে বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। তারা মিলেই এই সাধারণ মানুষের সর্বনাশ করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন। এই হয়রানি থেকে বাঁচতে পরিবারগুলো গত ১ সেপ্টেম্বর মানববন্ধনও করেছে।

অভিযুক্ত পিয়ারা বেগমের বাড়িতে গেলে প্রতিবেশীরা জানান, আবাসনে পাওয়া ঘর বিক্রি করে দিয়ে এলাকা ছেড়েছেন অনেক আগে। পরে টেলিফোনে যোগাযোগ করলে পিয়ারা এই ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনিবলেন, ‘মনির স্যার বলেন, আমাকে কিছু লোক দেন। স্বনির্ভর প্রকল্পের মাধ্যমে তাদের লোন দেবো। তারপরে আমি তাদের আইডি কার্ড ও ছবি নিয়ে গুছিয়ে দিয়েছি কিন্তু আমি টাকা নেইনি।’

তিনি আরও বলেন, ‘এখন যাদের নামে নোটিশ এসেছে তারা সই না দিলে টাকা দিয়েছে ক্যামনে? এখন টাকা মনির স্যারে নিয়েছে নাকি তারা নিয়েছে তা আমি জানি না।’

এ বিষয়ে কথা হয় এনজিও স্বনির্ভর প্রকল্পের কলাপাড়া উপজেলার তৎকালীন ব্যবস্থাপক মনির হোসেনের সঙ্গে। তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে।

মনির হোসেন বলেন, ‘আমরা ভূমিহীন মানুষকে ঋণ দিতাম তাই অনেককে ঋণ দিয়েছি কিন্তু কোনো টাকা নেইনি। সোনালী ব্যাংক যার টাকা তার হাতে দিয়েছে। অন্য কেউ টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমাদের স্বনির্ভরের কার্যক্রম আগামী ১ অক্টোবর থেকে চালু হচ্ছে। তারপরে এই টাকা কে নিয়েছে বা কোথায় কী তা খুঁজে দেখা হবে।’

এ বিষয়ে সোনালী ব্যাংক কলাপাড়া বন্দর শাখার সহ-ব্যবস্থাপক মাসুম বিল্লা বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমাদের ব্যবস্থাপক ও প্রিন্সিপালের সমন্বয়ে বৈঠক করার কথা রয়েছে। তবে এখনো বৈঠক হয়নি। তাই আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না।’

কলাপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জসিমবলেন, ‘কিছু পরিবার মানববন্ধন করেছে শুনেছি। কিন্তু আমাদের কাছে লিখিত কোনো অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউএনও (ভারপ্রাপ্ত) মো. আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত আমরা কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনানুসারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

  • সর্বশেষ - সারাদেশ