ময়মনসিংহ, , ১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহে অসহায় ও এতিমদের খাদ্যপণ্য দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন পুলিশ সুপার আহমার

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

ময়মনসিংহে অসহায় ও এতিমদের খাদ্যপণ্য দিয়ে বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন পুলিশ সুপার আহমার

ময়মনসিংহের পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান একজন মানবিক মানুষ। অসহায় ও এতিমদের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করে অনুকরণীয় এবং বিরল দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করছেন। ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার’ এবং ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই ২টি জাতীয় স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন মানবিক এই এসপি। করোনার ভয়ালথাবার আশঙ্কায় দেশ যখন টালমাটাল ঠিক তখনই মানুষের জন্য এগিয়ে এসেছেন ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের এই কর্ণধার। তিনি অসহায় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাদ্যপণ্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। পুলিশের পক্ষ থেকে বৃহস্পতিবার (০৯-০৪-২০২০) রাত পর্যন্ত ময়মনসিংহ নগরী ও বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত: ৪ সহস্রাধিক অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হয়েছে। একই সময় রান্না করা সুস্বাদু খাবার বিতরণ করা হয় নগরীর ৭ শতাধিক ভাসমান, অসহায় ও রিকশা চালকদের মধ্যে। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ময়মনসিংহ নগরীতে ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ কামাল আকন্দ এবং বিভিন্ন উপজেলায় সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) খাদ্যপণ্য বিতরণ করছেন। সূত্র মতে, এসপি থেকে শুরু করে মানসিকতা সম্পন্ন কনস্টেবলদের নিজস্ব টাকায় অসহায় এবং এতিমদের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান পিপিএম (সেবা) বৃহস্পতিবার দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে জানান, ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের মানবিক এ কার্যক্রম আপদকালীন সময় পর্যন্ত চালু থাকবে।

জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে সরকার প্রথম দফায় সাধারণ ছুটি ঘোষণা করার পরই ময়মনসিংহ নগরীতে খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েন। সঞ্চিত অর্থ শেষ হওয়ার পর অসহায় হয়ে পড়েন নগরীতে বসবাস করা বিপুল সংখ্যক পরিবার। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আগেই মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন। তালিকা তৈরী করা হয় খেটে খাওয়া ও নিম্ন আয়ের মানুষের। পরে ৩১ মার্চ থেকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে খাদ্য সঙ্কটে থাকা অসহায়দের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ শুরু করেন মানবিক এসপি। গত ১০ দিন যারা খাদ্যপণ্য পেয়েছেন তাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়, হতদরিদ্র, কর্মহীন, অক্ষম, ভাসমান এবং অসহায় মানুষ। নগরীর একটি প্রতিষ্ঠানের অর্ধশত এতিমদের আশ্রয়স্থল খুঁজে বের করে তাদেরকে খাদ্যপণ্য দিয়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছেন পুলিশ সুপার। তিনি নিজ হাতে কুলি শ্রমিক এবং বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের খাদ্যপণ্য বিতরণ করেন। জেলা পুলিশের ফেসবুক পেজ, এসপি এবং ওসি ডিবির ফেসবুক মেসেঞ্জারে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে না খেয়ে থাকার কথা জানাচ্ছেন অনেকেই। এসব অসহায় পরিবারের ঠিকানা নিয়ে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে খাদ্যপণ্য। যা দিয়ে পরিবারগুলো অন্তত: ১০ দিন তাদের চাহিদা মিটাতে পারে।


সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে কাজ করে যাচ্ছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। শুরুতে জনসচেতনতা বাড়ানোর জন্য ময়মনসিংহ নগরীসহ বিভিন্ন থানা এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণের প্রচারপত্র বিতরণ এবং মাইকিং করা হয়। সীমিত করা হয়েছিলো মানুষের চলাফেরা। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী জনসমাগম কমানো এবং শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে পুলিশ সুপারের নির্দেশে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), বিভিন্ন থানা এবং ফাঁড়ি পুলিশ। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ময়মনসিংহ নগরীতে ডিবির মোটরসাইকেল টহল থাকছে চোখে পড়ার মতো। জনগণ ঘোষিত লকডাউনে সম্মতি দিয়ে সহযোগিতা করছে জেলা পুলিশ। বিনা প্রয়োজনে ব্যক্তিগত যানবাহন ও কাউকে চলাচল এবং অযথা ঘোরাফেরা করতে দিচ্ছে না ডিবি, থানা ও ফাঁড়ি পুলিশ। ময়মনসিংহ নগরীর বিপনী বিতান, বাণিজ্যিক, অফিস-আদালত এবং আবাসিক এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। বিভিন্ন পয়েন্টে বসানো হয়েছে চেকপোস্ট। বাড়ানো হয়েছে পুলিশী টহল। করোনাকে পুঁজি করে কেউ যেন আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াতে না পারে এদিকেও নজর দিয়েছে পুলিশ। বাড়ানো হয়েছে সিসি টিভি মনিটরিং।

জানা যায়, পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামান পিপিএম (সেবা) গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে যোগদান করেন। এর আগে তিনি খাগড়াছড়ি জেলায় কর্মরত ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় এমএসসি শেষ করে ২১ তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি পুলিশ বাহিনীতে যোগ দেন। ময়মনসিংহে যোগদানের পর তিনি মাদক এবং অপরাধ নির্মূলে বিশেষ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া প্রতিরোধে সরকারি নির্দেশনার পর জনসচেতনতা বাড়ানো এবং অসহায় ও এতিমদের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করে তিনি মানবিক মানুষ হিসেবে বিশেষ পরিচিতি পান। ময়মনসিংহ নগরী এবং বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে মানবিক এই মানুষটির আপদকালীন সময়ের যতসব সহযোগিতার কথা। সূত্র মতে, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি, পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) মোঃ হুমায়ুন কবির, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মোঃ শাহজাহান মিয়া, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) জয়িতা শিল্পী, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর দপ্তর) মোঃ হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) মোঃ আল আমীন, কোতোয়ালি মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মাহমুদুল ইসলাম, জেলা গোয়েন্দা শাখার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ কামাল আকন্দ প্রমুখ জেলা পুলিশের খাদ্যপণ্য বিতরণ কার্যক্রম সমন্বয় করছেন।


সূত্র জানায়, প্রতিটি উপজেলায় পুলিশের পক্ষ থেকে অসহায়দের মধ্যে খাদ্যপণ্য এবং মাস্ক বিতরণ করা হচ্ছে। পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামানের নির্দেশনায় ১৪টি থানার অফিসার ইনচার্জরা (ওসি) নিজ এলাকায় সামাজিক দায়িত্ব পালন করছেন। এতে পুলিশের প্রতি ময়মনসিংহবাসীর ধারণা পাল্টে যাচ্ছে। সূত্র মতে, ১৪টি থানার মধ্যে খাদ্যপণ্য এবং মাস্ক বিতরণে এগিয়ে রয়েছে ফুলবাড়িয়া ও ঈশ্বরগঞ্জ থানা। ফুলবাড়িয়ার কৃঞ্চপুরে গারো, বর্মণ ও কোচ সম্প্রদায়ের অর্ধশত, দোলমা গ্রামে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের অর্ধশত পরিবারসহ বিভিন্ন এলাকার অন্তত: ৭ শতাধিক অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করা হয়। অফিসার ইনচার্জ (ওসি) ফিরোজ তালুকদার পিপিএম অন্যান্য পুলিশ সদস্যদের সাথে নিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম ঘুরে খাদ্যপণ্য বিতরণ করেন। ফুলবাড়িয়া থানা পুলিশের মানবিক উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জ থানার চৌকস অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ মোখলেছুর রহমান করোনা সঙ্কটের শুরু থেকেই ঈশ্বরগঞ্জবাসীকে বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করে বেশ আলোচিত হয়েছেন। পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় জনসচেতনতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের মধ্যে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন বিতরণের মধ্য দিয়ে মানবিক সেবা শুরু করেন। বৃহস্পতিবার রাত পর্যন্ত তিনি ৫ শতাধিক অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করেন।

জানা যায়, অসহায় ও এতিমদের মধ্যে জেলা পুলিশের খাদ্যপণ্য বিতরণ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। এ খবর ছড়িয়ে পড়েছে ময়মনসিংহ বিভাগসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায়। মানবিক পুলিশ সুপার মোহাঃ আহমার উজ্জামানের নির্দেশনা এবং অন্যান্য পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে নগরীতে রাতের বেলা ভাসমান, অসহায় ও রিকশা চালকদের মধ্যে রান্না করা সুস্বাদু খাবার বিতরণ করছেন ডিবির অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শাহ কামাল আকন্দ। গত ৭ দিন রেলওয়ে স্টেশনসহ বিভিন্ন পয়েন্টে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়। জেলা পুলিশের খাবারের জন্য প্রতিক্ষায় থাকেন ক্ষুধার্তরা। অসচ্ছল সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও বৃহস্পতিবার খাদ্যপণ্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় ডিবির ওসি অসহায় মানুষের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ করে প্রশংসিত হয়েছেন। অর্ধশত এতিমদের খুঁজে বের করে উল্লেখযোগ্য পরিমাণের খাদ্যপণ্য বিতরণ করে আলোচিত হয়েছে জেলা পুলিশ। ফেসবুক মেসেঞ্জারে অনাহারে থাকার কথা জানানোর পর মানবিক পুলিশ সুপারের নির্দেশে ডিবির ওসি দীঘারকান্দার আলমানার এতিমখানার এতিমদের তালিকা ও সম্ভাব্য ঠিকানা যোগাড় করেন। পরে খাদ্যপণ্য নিয়ে শম্ভুগঞ্জ, বয়ড়া, চুরখাই, পারাইল, দাপুনিয়া ও ঢোলাদিয়ায় গিয়ে এতিমদের খুঁজে বের করে তাদের হাতে জেলা পুলিশের খাদ্যপণ্য তুলে দেন। অপরদিকে ডিবির ওসির নেতৃত্বে নগরীতে মোটরসাইকেল টহল মানুষের চলাচল এবং অযথা ঘোরাফেরা অনেকাংশে কমে গেছে।


সূত্র জানায়, ময়মনসিংহ নগরীতে পুলিশের ব্যাপক জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং অসহায় ও এতিমদের মধ্যে খাদ্যপণ্য বিতরণ রাজনৈতিক, সামাজিক ও পেশাজীবিদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। জনসচেতনতা এবং নিরাপত্তার পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব পালন করার বিষয়টিকে মহানুভবতা বলে মন্তব্য করেছেন নাগরিকরা। অনেকের মতে, ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার পুলিশ হবে জনতার এবং ‘পুলিশই জনতা, জনতাই পুলিশ’ এই ২টি জাতীয় স্লোগানকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন ময়মনসিংহের মানবিক পুলিশ সুপার। পুলিশের অব্যাহত খাদ্যপণ্য বিতরণের বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল বৃহস্পতিবার রাতে দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে বলেন, ময়মনসিংহ নগরীসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুলিশ খাদ্যপণ্য বিতরণ করে সাধারণ মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হচ্ছে। বিষয়টি অন্যান্য জেলা পুলিশের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে। তিনি বলেন, অসহায় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের হাতে খাদ্যপণ্য তুলে দেওয়ার পাশাপাশি জনসচেতনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও প্রশংসার দাবি রাখে। অভিন্ন বক্তব্যে ময়মনসিংহের নাগরিক নেতারা বলেছেন, মরণব্যাধি করোনার ভয়ালথাবার আশঙ্কায় সারাদেশ যখন অস্থির ঠিক তখনই অসহায়দের জন্য এগিয়ে এসেছে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ। ময়মনসিংহ জেলার ইতিহাসে বিষয়টি বিরল দৃষ্টান্ত।

সম্পাদনায়: নাসিমুল গনি ইশরাক

  • সর্বশেষ - জাতীয়