ময়মনসিংহ, , ২১ আষাঢ় ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

অসচেতনতাই ডেকে আনছে মহাবিপদ

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

অসচেতনতাই ডেকে আনছে মহাবিপদ
মানুষের অসচেতনতাই ডেকে আনছে মহাবিপদ

সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে বলে আবারও বিশ্ববাসীকে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক টেডরস আধানম গোব্রিয়াসেস। তিনি বলেন, ‘কোনো দেশে করোনা ভাইরাসের আক্রমণ স্তিমিত হয়ে যাওয়া মানেই তা শঙ্কামুক্ত নয়। তাই সব দেশকে অতিমাত্রায় সাবধান হতে হবে। তড়িঘড়ি করে লকডাউন প্রত্যাহার করা হলে করোনা পরিস্থিতির আরো ভয়াবহ পুনরুত্থান হবে।’

বাংলাদেশে একবার সুস্থ হয়ে উঠলেও তারা আবারও সংক্রমিত হয়েছে। একাধিক এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশেও এই মুহূর্তে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা খুবই জরুরি। কিন্তু এক্ষেত্রে সফলতা আসছে না। লঘু দণ্ড, গাড়ি ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া কিংবা সরকারি আদেশ আমান্যের মামলা দিয়েও আসছে না সুফল। বিকল্প উপায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ কিংবা বের হওয়া কিছুতেই বন্ধ করা যাচ্ছে না। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে রাস্তাঘাট, বাজার, পার্ক ও চায়ের দোকানে ভিড় করছে সাধারণ মানুষ। পাড়া-মহল্লায় ঘুরে বেড়াচ্ছে যুবকেরা। সাধারণ ছুটি বাড়লেও দিন যত গড়াচ্ছে, রাস্তায় সব ধরনের যানবাহনের সংখ্যা তত বাড়ছে। এছাড়া পণ্য পরিবহনে যাত্রী বহন করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকেরা বলেন, দেশের মানুষের অসচেতনতাই দেশের জন্য ডেকে আনছে মহাবিপদ। মানুষকে ঘরে রাখার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে এখনই দেশ জুড়ে কারফিউ জারি করতে হবে। এদিকে করোনা ভাইরাসে দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরো ৫৮ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন। এতে দেশে ভাইরাসটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৮২ জন। আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মারা গেছেন আরো তিন জন। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ জন।

প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য নমুনা পরীক্ষার পরিধি বাড়ছে। সারাদেশে হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোও নমুনা স্যাম্পল সংগ্রহ করবে। সারাদেশে হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে ১৪ হাজারের বেশি। ফলে দেশে প্রতিদিন ব্যাপকসংখ্যক মানুষের পরীক্ষা করা সম্ভব হবে। এছাড়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা করা হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘বিশ্ব অবস্থা এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ অনুযায়ী আমরা বুঝতে পেরেছি যে আমাদের পরীক্ষার সংখ্যা আরো বাড়াতে হবে। আমরা গ্রাম অঞ্চল পর্যন্ত করোনা সন্দেহ ব্যক্তিদের পরীক্ষা করার জন্য তাদের নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করছি। এ কারণে কমিউনিটি ক্লিনিকের টেকনিশিয়ানরা নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করবেন। তাদের সেই ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’ গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত করোনাবিষয়ক ব্রিফিংয়ে যুক্ত হয়ে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা জানতে চাই, বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নের পরিস্থিতি কী? আমরা জানতে চাই, বাংলাদেশের গ্রামগুলোর পরিস্থিতি কী? আমরা জানতে চাই, শহরগুলোর পরিস্থিতি কী? আমরা সেজন্য পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা যদি এরকম পাই যে উপজেলায় কিংবা ইউনিয়নে একটিও করোনা আক্রান্ত রোগী নেই, তাহলে আমরা চাইব যাতে নতুন করে সেখানে সংক্রমণ না হয়। যদি সংক্রমণ পাওয়া যায়, তাহলে সেখান থেকে যেন বাইরে না যায় সেদিকে আমরা নজর রাখব। আমাদের পরীক্ষার সংখ্যা প্রচুর বাড়ানো হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আমাদের ১৪ হাজার হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিকের স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেব। বাংলাদেশের হেলথ কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে শুরু করে অন্যান্য সব হাসপাতালের চিকিত্সক ও নার্সের সুরক্ষা আমরা নিশ্চিত করব। প্রয়োজনে সবাইকে আমরা পিপিই সরবরাহ করব।’

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আরো বেশ কটি হাসপাতালকে করোনার জন্য প্রস্তুত করা প্রয়োজন। আমাদের বেশ কয়েকটি হাসপাতালের চিন্তাভাবনা রয়েছে। যার মধ্যে হয়তো আগামীতে মুগদা জেনারেল হাসপাতালের কথা চিন্তা করব, আমরা নিটোরের (জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান) কথা চিন্তা করব এবং আরো বেশ কয়টি হাসপাতালকে আমরা করোনার জন্য নিয়ে আসব।’ জাহিদ মালেক জানান, বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টার ২ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হচ্ছে। মহাখালীর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মার্কেটকে ১ হাজার ৩০০ শয্যায়, উত্তরার দিয়াবাড়ির চারটি ভবনকে ১ হাজার ২০০ শয্যায় উন্নীত করছি। রাজধানীর উত্তরার কুয়েত-বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মহাখালীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট, ফুলবাড়িয়া এলাকার রেলওয়ে হাসপাতাল ও নয়াবাজারের মহানগর জেনারেল হাসপাতালও কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের চিকিত্সার জন্য ইতিমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রামের বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ট্রপিকাল অ্যান্ড ইনফেকসাস ডিজিজেস-বিআইটিএডিতেও করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিত্সার জন্য সারাদেশে ৭ হাজার ৬৯৩টি আইসোলেশন শয্যা এবং ১১২টি আইসিইউ শয্যা প্রস্তুত রাখা রয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানিয়েছেন। এদিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চালু হচ্ছে করোনা ইউনিট। গতকাল শনিবার ইউনিটটি চালু হওয়ার কথা ছিল। তবে চিকিত্সকসহ স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের আন্দোলনের কারণে তা চালু করা সম্ভব হয়নি। চিকিত্সকরা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আন্ডারগ্রাউন্ডে করোনা রোগীদের চিকিত্সাকেন্দ্র চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এটা সম্ভব নয় বলে অনেকে দ্বিমত পোষণ করেছেন। শুক্রবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বার্ন ইউনিটকে করোনা রোগীদের চিকিত্সায় ব্যবহার করা বিষয়ে একটি আদেশ জারি করেছিল। অতিরিক্ত সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত ঐ চিঠিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিত্সাধীন রোগীদের শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তরের অনুরোধ জানানো হয়।

করোনা ভাইরাসের প্রভাবে কর্মহীন সাধারণ মানুষের মাঝে সুলভমূল্যে খাদ্যসামগ্রী বিক্রি করছে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)। সকালে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় টিসিবির গাড়িতে পণ্য কিনতে মানুষের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। তবে তাতে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে দেখা যায়নি। গতকাল দুপুরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত নিয়মিত হেলথ বুলেটিনে উপস্থাপনকালে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ। নিজের বাসা থেকে এতে যুক্ত হন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এবং আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা। প্রথমে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ৯৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এছাড়া সুস্থ হয়ে উঠেছেন আরো তিন জন, ফলে মোট সুস্থ হয়েছেন ৩৬ জন। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে স্বাভাবিক জীবন থমকে দাঁড়িয়েছে। আগামী ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত লকডাউন কার্যকর করতে জনগণকে ঘরে থেকে সুস্থ থাকতে অনুরোধও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, নতুন যে ৫৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে পুরুষ ৪৮ জন, নারী ১০ জন। সর্বোচ্চ ১৪ জনই ঢাকার। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আট জন নারায়ণগঞ্জের। নারায়ণগঞ্জ সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ ইমতিয়াজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে রয়েছেন। গতকাল দুপুরে আইইডিসিআর থেকে পাঠানো তার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্টে করোনা পজিটিভ জানানো হয়। তিনি জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সদস্য সচিব। যদিও রিপোর্ট আসার আগে থেকেই তিনি হোম কোয়ারেন্টাইনে ছিলেন।

  • সর্বশেষ - করোনা আপডেট