ময়মনসিংহ, , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

হারিনি আমরা, হারবোও না

হারিনি আমরা, হারবোও না

ডা. সাবিহা সুলতানা

আমি একজন চিকিৎসক। আজকের আঠারো কোটি জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে প্রতিরাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আমিও প্রার্থনা করি। ইস্, রাত শেষে সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি দেখতাম, আজকের এই করোনা মহামারী শুধুই আমার একটা দুঃস্বপ্ন ছিল। সব কিছু আগের মতোই আছে। সকালের সূর্য ওঠা, সন্ধ্যায় অস্ত যাওয়া। ব্যস্ত শহরের কোলাহল, মানুষের অবিরাম ছোটাছুটি। সব যেন আগের মতোই রয়েছে। জানি, এ কেবলই আমার অবচেতন মনের চাওয়া। আগামী বিশ্বের কথা, আমার দেশের কথা চিন্তা করেও জেগে উঠছি বারবার। আর দু’চোখ জলে ভরে হয়েছে একাকার।

বাঙালি জাতির কর্ণধার, সাধারণ জনগণ এই যে আপনারা যারা বলছেন, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাঙালির হাতে মেশিনগান, কামান, ট্যাঙ্ক, গোলাবারুদ ছিল না। বাঙালি তার লাঠিসোটা, বাঁশ, খাত্তা, শাবল- যার যা ছিল, তা-ই নিয়ে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ডাক্তার, তুমিও ঝাঁপিয়ে পড়ো। পিপিই নাই তাতে কী হয়েছে? আপনাকে, হ্যাঁ আপনাকেই বলছি, একদিন বাঙালি ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এক দৃশ্যমান শত্রুর বিরুদ্ধে। তার হাতে ছিল লাঠিসোটা, বাঁশ, খাত্তা, শাবল। আর আজ আমরা ডাক্তাররা লড়ে চলছি এক অজানা, অদেখা, অচেনা শত্রুর বিরুদ্ধে। যাকে মোকাবেলা করতে দাবি করেছিলাম শুধু পিপিই। যা ওই একাত্তরের মতো বাঁশ, লাঠিসোটা আর খাত্তার মতোই। এর চেয়ে বেশি কিছু তো নয়।

আজ আমরা স্বল্প করে হলেও পিপিই পাচ্ছি। আমাদের সরকার পিপিই দিচ্ছে। কিন্তু জাতি আজ যত বড় ক্ষতির মুখে পড়ল, যতবড় রত্ন বাংলার বুক থেকে হারিয়ে গেল, কে নেবে এই অপূরণীয় ক্ষতির দায়ভার? জাতির পক্ষে এ রকম জ্ঞানগর্ভ, মেধাবী, আত্মমননশীল, সৃষ্টিশীল, দয়ালু, রোগীবান্ধব একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈনুদ্দীন স্যারকে হারানোর ক্ষতি অপূরণীয়। এই অপূরণীয় ক্ষতির খাতায় ক্রমশ যোগ হবে আরও কত ডাক্তারের নাম। যার প্রমাণ এ পর্যন্ত অর্ধশতাধিক ডাক্তারের আক্রান্ত হওয়া।

আজ লকডাউন ও সাধারণ ছুটির ছকে পড়ে আপনারা বাসায় যখন পরিবারকে সময় দিচ্ছেন; আমরা ডাক্তাররা তখন ডিউটিরত। আপনি যখন আপনার সন্তানদের নিজ হাতে খাওয়াচ্ছেন, গোসল করাচ্ছেন; আমাদের ডাক্তারদের সন্তানরা তখন বারান্দার গ্রিলে মাথা হেলিয়ে পথের পানে চেয়ে থাকে কখন আসবে মা, কখন আসবে বাবা।

আপনি যখন পরিবারের বায়োজ্যেষ্ঠদের স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে চিন্তিত। তাদের প্রতি সেবা-যত্নে ব্যস্ত, আমরা ডাক্তাররা তখন তাদের দেওয়া ফোনে জেনে নিচ্ছি, তারা কেমন আছে? কারণ আমরা তো কর্মস্থলে অথবা কোয়ারেন্টাইনে থাকি। আপনি যখন ২৪ ঘণ্টায় প্রায় সবটুকু সময় পার করছেন নিজের সন্তান আর বাবা-মা, ভাই-বোনের সাথে; তখন আমরা গত দেড় মাস যাবৎ অনেকেই ঘর থেকে দূরে সন্তানদের থেকে বহুদূরে!

আপনি ঘরে বসে যখন সন্তানকে অনলাইনে ক্লাস করাতে ব্যস্ত। আর আমরা ব্যস্ত অনলাইনে করোনার ন্যাশনাল গাইড লাইন খুঁজতে, পিপিইর ডফিং আর ডনিং শিখতে। ছুটির দিনে এখন আপনি, আপনারা ইউটিউবের নতুন রেসিপি দেখে রান্না নিয়ে ব্যস্ত, পহেলা বৈশাখ উদযাপনে ব্যস্ত। আমরা ডাক্তাররা অনেকেই বাজারের ব্যাগ হাতে বের হই বাজার করতে। আপনারা যখন গিন্নির গোছানো বেডরুমে গা এলিয়ে দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ শেষে বিশ্রামে যান, আমাদের করোনা মহামারীর অনেক যোদ্ধা ডাক্তাররাই ডরমেটরিতে এসে মাসের পর মাস না ধোয়া গন্ধযুক্ত চাদরে গন্ধযুক্ত বালিশে ঘুমিয়ে পড়ে। কারণ সে যে ক্লান্ত, বড় ক্লান্ত!

এতগুলো কথা বলার পেছনে উদ্দেশ্য একটাই। হ্যাঁ! আমি চলতে জানি, আমি জয়ী হতে জানি। জয়ী আমরা হবোই। হতে পারে সেটা বাঁচার জন্য চিৎকার আর আর্তনাদ করতে করতে। হতে পারে সব হারিয়ে নিঃস্ব হতে হতে। হতে পারে নিজে শেষ হয়ে ডা, মঈনুদ্দিন, ডা. ফেরদৌসের মতো। তবুও জয়ী আমরা হবোই। করোনা মোকাবেলায় জীবনের শেষদিন পর্যন্ত লড়াই করে যাব। আমরা হারতে শিখিনি, আমরা হারকে হারাতে জানি। জয়ী আমরা হবোই, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: মেডিকেল অফিসার (গাইনি ও অবস বিভাগ), লালকুঠি মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, মিরপুর-১, ঢাকা।

  • সর্বশেষ - ফিচার