ময়মনসিংহ, , ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

ফুলবাড়িয়ায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় থাকা উপজেলা চেয়ারম্যানের ত্রাণ বিতরণ

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

ফুলবাড়িয়ায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় থাকা উপজেলা চেয়ারম্যানের ত্রাণ বিতরণ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় সরকারি নির্দেশ অমান্য করে ত্রাণ বিতরণের নামে তামাশা করছেন বরখাস্ত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা সেই উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান। গণমাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়া কাভারেজ পাওয়ার জন্য সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ত্রাণ বিতরণের নামে তিনি শোডাউন করছেন। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি বিপক্ষে যাবে তা ভাবতে পারেন নি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক সরকার। সচেতন ফুলবাড়িয়াবাসী তার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস সংক্রমণের অভিযোগ করেছেন। সামাজিক (শারীরিক) দূরত্ব বজায় রেখে ত্রাণ বিতরণের সরকারি নির্দেশ থাকার পরও তিনি কিছুই মানছেন না। হতদরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে অল্প পরিমাণের ত্রাণ নিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় গিয়ে শোডাউন করেন। বিপুল সংখ্যক মানুষকে জড়ো করে মাত্র ২০০ মানুষের হাতে ত্রাণ ধরিয়ে দিয়ে এলাকা থেকে চম্পট দিচ্ছেন। ত্রাণ নিতে আসা মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ত্রাণের প্যাকেট হাতে দিয়ে ছবি তুলতে এবং ভিডিও করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন মালেক সরকারের সাঙ্গপাঙ্গরা। এ ঘটনায় বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। প্রশাসন বিষয়টি জানলেও নীতিগত কারণে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সরকারি নির্দেশ অমান্য করার বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফুল সিদ্দিক সোমবার দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে বলেন, আমি নিজেও বিষয়টি শুনেছি। সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চেয়ারম্যান সাহেবকে ত্রাণ বিতরণের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সূত্র মতে, আব্দুল মালেক সরকারের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়ার বিভিন্ন ইস্যুতে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করাসহ সরকারি কাজে হস্তক্ষেপ এবং সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের সাথে খারাপ আচরণ করারও বহু অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

জানা যায়, প্রশাসন যখন প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে ঠিক তখনই ত্রাণ বিতরণের নামে তামাশা করছেন বিতর্কিত আব্দুল মালেক সরকার। তিনি নিজেই যখন প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধে সচেতন নন তখন সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কতটুকু সচেতনতা আশা করা যায়। উপজেলা চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কারণে প্রশাসন বিষয়টি চেপে গেলেও সচেতন মহল ক্ষোভ প্রকাশের পাশাপাশি ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। অনেকেই প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট এবং অন্যের পোস্টে কমেন্ট করেছেন। গত ৫ দিন সাঙ্গপাঙ্গদের দিয়ে সামাজিক (শারীরিক) দূরত্ব মেনে ত্রাণ বিতরণের ছবি পোস্ট করালেও এখনও বাস্তবচিত্র ভিন্ন। ত্রাণ দেওয়ার আগে বৃদ্ধদের ধরে এনে ছবি তোলার কাজটি সেরে নেন মালেক সরকার। ত্রাণ দেওয়া বড় কথা নয়। টার্গেট অসহায় লোকজন জড়ো করে ছবি তোলা। সূত্র মতে, ফুলবাড়িয়ার প্রতিটি ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ডে সরকারি ত্রাণ, পুলিশ সুপারের নির্দেশনায় থানা পুলিশ এবং কমিউনিটি পুলিশের ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম চলাবস্থায় বিতর্কিত ঘটনার জন্ম দেন মালেক সরকার। উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের অনাস্থা প্রস্তাবের কারণে বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় থাকায় তিনি ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে পারছিলেন না। এ পরিস্থিতিতে কৌশল অবলম্বন করে সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে ত্রাণ বিতরণের নামে বিভিন্ন ইউনিয়নে শোডাউন করে বেড়াচ্ছেন।


সূত্র জানায়, আব্দুল মালেক সরকার দেড়যুগ আগে থেকেই ফুলবাড়িয়াবাসীর কাছে বিতর্কিত এবং রহস্যজনক মানুষ। শতশত কোটি টাকার রহস্য আজও অজানা। ২০০১ সালে এলাকায় ফিরে সম্পদ রক্ষার জন্য তিনি আওয়ামী লীগে যোগ দেন। পরে বিপুল টাকা খরচ করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি হন। জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের মোটা অংক ভোগ দিয়ে ২০০৩ সালের নীলনক্সার কাউন্সিলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। পরে দলীয় প্রভাব বিস্তার করে ২ বার ফুলবাড়িয়া সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। বিতর্কিত মালেক সরকার আওয়ামী লীগে যোগদান করার পরই স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যে গ্রুপিং এবং চরম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করান। ত্যাগী নেতাদের সাথে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্ব এবং নিজের দাম্ভিকতার মাত্রা বাড়িয়ে দেন। তার জ্বালায় অতিষ্ট হয়ে পড়েছেন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের অধিকাংশ নেতাকর্মী। জেলা আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতাদের মোটা অংক ভোগ দিয়ে দীর্ঘ ১৬ বছর যাবত বন্ধ রেখেছেন কাউন্সিল অধিবেশন। সূত্র মতে, স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত আব্দুল মালেক সরকার যুবক বয়সে ‘গ... চো...’ সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করতেন। পুলিশ সক্রিয় হলে গ্রেফতার এড়াতে গাজীপুরের কোনাবাড়িতে পাড়ি জমান। অবৈধ কারবার করে তিনি শতশত কোটি টাকার মালিক হয়েছেন বলে সূত্র জানিয়েছে। সূত্র মতে, আব্দুল মালেক সরকার ২০১৬ সালে ফুলবাড়িয়া ডিগ্রী কলেজ সরকারি করার দাবিতে চলা আন্দোলনে সরকারের বিপক্ষে কলকাঠি নাড়েন। ওই আন্দোলনের সময় পুলিশ-জনতার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় পদদলিত এবং অসুস্থ হয়ে ১ শিক্ষকসহ ২ জন প্রাণ হারান।

জানা যায়, ০১-০৩-২০২০ তারিখে ময়মনসিংহের বিভাগীয় কমিশনার বরাবর ফুলবাড়িয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদের ২ ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৩টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান একমত হয়ে অনাস্থা প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। প্রাথমিক তদন্তের পর মতামত দিয়ে আবেদন স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে আপাতত বিষয়টি স্থগিত রয়েছে। তবে তিনি বরখাস্তের প্রক্রিয়ায় রয়েছেন। মালেক সরকার এর আগে ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়ায় জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে বরখাস্তের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন পাঠায়। এরই মধ্যে তিনি পদত্যাগ করে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। দায়িত্ব নেওয়ার পর অসদাচরণসহ নানান কারণে ইউনিয়ন চেয়ারম্যানদের সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। চেয়ারম্যানরা তার বিরুদ্ধে সরকারি সিদ্ধান্ত অমান্য, সরকারি তহবিল তছরুপ, লাখ লাখ টাকা আত্মসাত, উন্নয়ন কাজে বাধা প্রদান, সরকারি ভবন ভেঙ্গে অফিস কক্ষ বর্ধিত, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও প্রকল্প কমিটির কাছ থেকে ঘুষ দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নানান অনিয়ম ও দুর্নীতি, অসাদাচরণ, কথায় কথায় অস্ত্র প্রদর্শণ, উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানসহ অন্যান্য নারীদের উত্যক্ত এবং যৌন হয়রানির অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে মালেক সরকারের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়ায় ইয়াবা ব্যবসার প্রসার ঘটানোর অভিযোগ রয়েছে। কলেজ নিয়ে আন্দোলনের সময় পুলিশ ইয়াবার চালানসহ তার মেয়ের জামাই সাবেক ছাত্রদল নেতা আলমগীর হোসেনকে আটক করে। পরে বড় রকমের রফাদফার মাধ্যমে তাকে ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। মালেক সরকারের মেয়ের জামাই আলমগীর ফুলবাড়িয়া আসনের বিএনপি দলীয় (১৯৯১) সাবেক এমপি আমিরুল ইসলাম হীরার ছেলে।

সম্পাদনায়: নাসিমুল গনি ইশরাক

  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর