ময়মনসিংহ, , ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

মুসলিম হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় শুরু হবে আজকের তারাবিহ

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

মুসলিম হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় শুরু হবে আজকের তারাবিহ

১১ রোজার প্রস্তুতিতে আজকের তারাবিহ। আজ সুরা হিজর ও সুরা নাহল পড়া হবে। ইমাম ও মুসল্লিরা আজ পড়বেন ও শুনবেন অবিশ্বাসীদের মুসলিম হওয়ার আকাঙ্খার কথা। আফসোস করে অবিশ্বাসীরা বলতে থাকবে-
رُّبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُواْ لَوْ كَانُواْ مُسْلِمِينَ
'কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত! যদি তারা মুসলমান হত।' (সুরা হিজর : আয়াত ২)

সুরা হিজর (১-৯৯)
সিরিয়া ও মদিনার মধ্যবর্তী অঞ্চলের নাম হিজর। এ স্থানে বসবাসকারীরা ছিল নাফরমান। আল্লাহর অবাধ্যতায় তারা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। তাদের ধ্বংসের বর্ণনা রয়েছে এ সুরায়। তাদের মতো যারা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরোধিতায় চলে তাদের জন্যও রয়েছে অশুভ পরিণতি। এটি মুমিন মুসলমানদের জন্য শিক্ষণীয় একটি সুরা।

ইসলাম বিদ্বেষীদের মনোভাব, ইসলাম বিদ্বেষীদের প্রতি আল্লাহর হুশিয়ারি, মানবজাতির উত্থান-পতনের ইতিবৃত্ত, শয়তানের ধোঁকার আলোচনা করা হবে আজ। কাওমে লুতের চারিত্রিক বিকৃতি ও ধ্বংসের ঘটনা গুরুত্ব পেয়েছে এ সুরায়।

সুরার শুরুতেই অবিশ্বাসীদের মুসলিম হওয়ার আকাঙ্খার কথা বর্ণিত হয়েছে। তারা আফসোস করে বলতে থাকবে-
رُّبَمَا يَوَدُّ الَّذِينَ كَفَرُواْ لَوْ كَانُواْ مُسْلِمِينَ
'কাফেররা আকাঙ্ক্ষা করবে যে, কি চমৎকার হত! যদি তারা মুসলমান হত।' (সুরা হিজর : আয়াত ২)

পবিত্র রমজান মাসে আল্লাহ তাআলা এ কুরআন নাজিল করেছেন। আবার কুরআনের হেফাজতের দায়িত্বও গ্রহণ করেছেন স্বয়ং তিনি। সে কারণে কুরআন থাকবে নিরাপদ, অবিকল ও অবিকৃত। আল্লাহ তাআলা বলেন-
'আমি স্বয়ং এ উপদেশ গ্রন্থ অবতারণ করেছি এবং আমি নিজেই এর সংরক্ষক।' (সুরা হিজর : আয়াত ৯)

রমজানে আল্লাহ তাআলা বিতাড়িত শয়তানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখেন। এ ছাড়াও শয়তানের প্রতি আল্লাহ অগ্নিস্ফুলিগ্ন ছুড়ে মারেন। যাতে মানুষ শয়তানের ধোকা থেকে বেঁচে থাকে। আল্লাহ বলেন-
- আমি আকাশকে প্রত্যেক বিতাড়িত শয়তান থেকে নিরাপদ করে দিয়েছি। কিন্তু যে চুরি করে শুনে পালায়, তার পশ্চাদ্ধাবন করে উজ্জ্বল উল্কাপিন্ড।' (সুরা হিজর : আয়াত ১৭-১৮)

আজকের তারাবিহতে পড়া হবে সেই চিরন্তন মহাসত্য বাণী। যে গবেষণায় বিজ্ঞানীরা হয়রান পেরেশান। আল্লাহ তাআলাই মানুষকে জীবন দান করেন আবার মৃত্যুদান করেন। কেউ আগে আসে আগে যায়, আবার কেউ পরে আসে পরে যায়। আল্লাহ বলেন-
- 'আমিই জীবনদান করি, মৃত্যুদান করি এবং আমিই চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী। আমি জেনে রেখেছি তোমাদের অগ্রগামীদেরকে এবং আমি জেনে রেখেছি পশ্চাদগামীদেরকে।' (সুরা হিজর : আয়াত ২৩-২৪)

মানুষ ও জ্বীনের সৃষ্টি সম্পর্কে রয়েছে সুস্পষ্ট বর্ণনা। আল্লাহ কিভাবে কোন উপাদান দিয়ে মানুষ এবং জ্বীনকে সৃষ্টি করেছেন তা বর্ণনা করেছেন। এ মানুষ সৃষ্টির পর আল্লাহর নির্দেশে ফেরেশতারা মানুষকে সেজদা করলে করেনি ইবলিস, এ কথাও আবার তিনি এ সুরায় উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ বলেন-
- 'আমি মানবকে পচা কর্দম থেকে তৈরি বিশুস্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছি। এবং জিনকে এর আগে লু এর আগুনের দ্বারা সৃজন করেছি। আর আপনার পালনকর্তা যখন ফেরেশতাদেরকে বললেনম, আমি পচা কর্দম থেকে তৈরি বিশুষ্ক ঠনঠনে মাটি দ্বারা সৃষ্ট একটি মানব জাতির পত্তন করব। অতপর যখন তাকে ঠিকঠাক করে নেব এবং তাতে আমার রূহ থেকে ফুঁক দেব, তখন তোমরা তার সামনে সেজদায় পড়ে যাবে। তখন ফেরেশতারা সবাই মিলে সেজদা করল। কিন্তু ইবলিস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হল না। আল্লাহ বললেন, হে ইবলিস, তোমার কি হলো! যে তুমি সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হতে স্বীকৃত হলে না? (সে) বলল, আমি এমন নই যে, একজন মানবকে সেজদা করব, যাকে আপনি পচা কর্দম থেকে তৈরি ঠনঠনে বিশুষ্ক মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বললেন, তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও। তুমি বিতাড়িত। আর তোমার প্রতি ন্যায় বিচারের দিন পর্যন্ত অভিশাপ।' (সুরা হিজর : আয়াত ২৬-৩৫)

শয়তান সে দিন থেকেই মুমিন মুসলমানরে প্রতি শত্রুতা পোষণ করে আসছে। আল্লাহর সঙ্গে মুমিন মুসলমানকে পথভ্রষ্ট করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে শয়তান। সে কথাও ওঠে এসেছে এ সুরায়। আল্লাহ বলেন-
- ' সে বলল, হে আমার পালনকর্তা! আপনি আমাকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেন, তোমাকে অবকাশ দেয়া হল। সেই অবধারিত সময় উপস্থিত হওয়ার দিন পর্যন্ত। সে বলল, হে আমার পলনকর্তা! আপনি যেমন আমাকে পথ ভ্রষ্ট করেছেন, আমিও তাদের সবাইকে পৃথিবীতে নানা সৌন্দর্যে আকৃষ্ট করব এবং তাদের সবাইকে পথ ভ্রষ্ঠ করে দেব।' (সুরা হিজর : আয়াত ৩৬-৩৯)

সে কারণেই আল্লাহ তাআলা মানুষকে শয়তানের পথ পরিহার করে মুত্তাকিদের পথ অনুসরণ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাকওয়া তথা আল্লাহকে ভয় করার কথা বলেছেন। আর তাতে মুত্তাকিদের ঠিকানা হলো জান্নাত। আল্লাহ বলেন-
- 'নিশ্চয় খোদাভীরুরা বাগান ও নির্ঝরিনীসহূহে থাকবে। বলা হবে, এগুলোতে নিরাপত্তা ও শান্তি সহকরে প্রবেশ কর। তাদের অন্তরে যে ক্রোধ ছিল, আমি তা দূর করে দেব। তারা ভাই ভাইয়ের মত সামনা-সামনি আসনে বসবে। সেখানে তাদের মোটেই কষ্ট হবে না এবং তারা সেখান থেকে বহিস্কৃত হবে না। আপনি আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, আমি অত্যন্ত ক্ষমাশীল দয়ালু।' (সুরা হিজর : আয়াত ৪৫-৪৯)

এ সুরায় আল্লাহ তাআলা মুমিন বান্দাকে গোনাহ থেকে ক্ষমা লাভের সান্ত্বনা দিয়েছেন। মুমিন বান্দার জন্য রহমতের দরজা সব সময় খোলা। তাওবার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহ মুমিন বান্দাকে ক্ষমা করে দেবেন।

এছাড়াও এ সুরায় বৃদ্ধ বয়স হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সন্তান লাভের সুসংবাদ দিয়েছেন। আবার গোনাহের কারণে নবী লুত ও সালেহ আলাইহিস সালামের সম্প্রদায়ের ধ্বংসের কথা বলেছেন। যা মানুষের ঈমানকে আল্লাহর একত্ববাদের দিকে নিয়ে আসবে।

সুরা নাহল (১-১২৮)
সুরা নাহলও মক্কায় অবতীর্ণ। এর প্রেক্ষাপট ব্যাপক এবং সুপ্রশস্ত। বিশেষ করে এ সুরায় এত বেশি নিয়ামাতের কথা এসেছে, যার কারণে এ সুরাটি সুরাতুন নিয়াম নামেও পরিচিত। এ সুরায় আল্লাহর গুণ-বৈশিষ্ট্য, বিশ্বনবির প্রতি ওহি ও পরকাল- এ তিনটি বিষয়ে গভীর আলোচনা করা হয়েছে।

এ সুরায় মহান রবের অগণিত নেয়ামতের সেই ঘোষণা দেয়া হয়েছে যে, বান্দা চাইলেও তার নেয়ামত গুণে শেষ করতে পারবে না। আল্লাহ বলেন-
- وَإِن تَعُدُّواْ نِعْمَةَ اللّهِ لاَ تُحْصُوهَا إِنَّ اللّهَ لَغَفُورٌ رَّحِيمٌ
'যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা কর, শেষ করতে পারবে না। নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।' (সুরা নাহল : আয়াত ১৮)

সব জগতের সব সৃষ্টিই মহান আল্লাহর ইবাদত করে। আল্লাহকে ভয় করে। কেননা সব নেয়ামত মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দা পেয়ে থাকে। যার বর্ণনা এভাবে ওঠে এসেছে। আল্লাহ বলেন-
- 'যা কিছু নভোমন্ডল ও ভুমন্ডলে আছে তা তাঁরই ইবাদত করা শাশ্বত কর্তব্য। তোমরা কি আল্লাহ ব্যতিত কাউকে ভয় করবে? তোমাদের কাছে যে সমস্ত নেয়ামত আছে, তা আল্লাহরই পক্ষ থেকে। অতপর তোমরা যখন দুঃখে-কষ্টে পতিত হও তখন তাঁরই কাছে কান্নাকাটি কর। এরপর যখন আল্লাহ তোমাদের কষ্ট দুরীভূত করে দেন, তখনই তোমাদের একদল স্বীয় পালনকর্তার সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করতে থাকে। যাতে ঐ নেয়ামত অস্বীকার করে, যা আমি তাদেরকে দিয়েছি। অতএব মজা ভোগ করে নাও-সত্বরই তোমরা জানতে পারবে। তারা আমার দেয়া জীবনোপকরণ থেকে তাদের জন্যে একটি অংশ নির্ধারিত করে, যাদের কোনো খবরই তারা রাখে না। আল্লাহর কসম, তোমরা যে অপবাদ আরোপ করছ, সে সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসিত হবে।' (সুরা নাহল : আয়াত ৫২-৫৬)

এছাড়াও হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাজিলকৃত বিধানের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনাকারী তাওহিদ, ঈমান, কুফরি, হিদায়াত ও গোমরাহী সংক্রান্ত মানবীয় ইচ্ছা ও আল্লাহর ফয়সালার বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।

হালালকে হারাম করা ও হারামকে হালাল করা- এ বিষয়ে পৌত্তলিকদের ধ্যান-ধারণার আলোচনা ও আল্লাহর পথে হিজরত, মুসলমানদেরকে নির্যাতনের মাধ্যমে ইসলাম ত্যাগে বাধ্য করা প্রসঙ্গও পাঠ করা হবে আজ।

ঈমান গ্রহণের পর পুনরায় কুফরি গ্রহণ করলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে শাস্তি নির্ধারিত করা হয়েছে এ সুরার মাধ্যমে। পারস্পারিক লেন-দেন, ন্যায়-বিচার, পরোপকার, আল্লাহর পথে দান ও ওয়াদা পালনের বিষয়াবলীও আলোচিত হয়েছে এ সুরায়।

সর্বোপরি গোটা মানবজীবন, তার ঘটনাবলীও পরিণাম, গোটা পরকালীন জীবন, তার মূল্যবোধ ও দৃশাবলী এবং সমগ্র অদৃশ্য জগত, তার বৈচিত্র্যময় বৈশিষ্ট্য, মানব সত্ত্বা ও প্রকৃতির ওপর তার সুগভীর প্রভাব- এ সব কিছু নিয়েই এ সুরার আলোচনা ও পটভূমি গঠিত।

আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে কুরআনের এ গুরুত্বপূর্ণ সুরাদ্বয় বুঝে পড়ার এবং তাঁর ওপর আমল করার পাশাপাশি নিজেদের আকিদা-বিশ্বাসকে শিরকমুক্ত রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর