ময়মনসিংহ, , ২২ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

মোবাইল ফোনে প্রতারণা, সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

মোবাইল ফোনে প্রতারণা, সর্বস্বান্ত হচ্ছে মানুষ

ছবি: এএফপি


রাজধানীর মগবাজার মধুবাগের অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকুরে শাহীনা আক্তারের আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা দেখছিলেন পরিবারের সদস্যরা। একটি অজ্ঞাত ফোন এলেই ব্যস্ত হয়ে উঠতেন তিনি। ফোনের হদিস করতে গিয়ে পরিবারের লোকেরা জানতে পারেন, অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তিটি একজন প্রতারক। তিনি মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে শাহীনার কাছ থেকে ২৫ লাখ টাকা আদায় করেছেন। শাহীনা বুঝতে পারেন, প্রতারকের খপ্পরে পড়ে জীবনের সব সঞ্চয় তিনি খুইয়ে ফেললেন।

শুধু শাহীনা নন, প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও মানুষ এভাবে প্রতারকের খপ্পরে পড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠাচ্ছেন। পুলিশের হিসাবে এমন শতাধিক চক্র আছে সারা দেশে।

সিআইডি পুলিশের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণার ঘটনায় হওয়া মামলার এমন অর্ধশতাধিক ঘটনার তদন্তভার পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গত তিন বছরে তারা এসব ঘটনায় জড়িত অন্তত ৫০ প্রতারককে গ্রেপ্তার করেছে। তাঁদের ২০ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ দলের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মুহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লোভ ও ভয় থেকে দূরে থাকলে এবং মোবাইল ব্যাংকিংয়ের হট লাইনে যাচাই করে নিলে মানুষ এসব প্রতারকের কবল থেকে রক্ষা পেতে পারে।

প্রতারকের খপ্পরে পড়া পরিবার ও পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সাবেক কর্মকর্তা শাহীনা আক্তার জানান, গত ২০১৭ সালে তিনি অবসরে যান। তিনি গত বছরের জুনে বেসরকারি একটি টিভির বিজ্ঞাপনে যেকোনো সমস্যার দ্রুত সমাধান ও মনের বাসনা পূর্ণ করার কথা বলে এতে একটি মুঠোফোন নম্বর দেওয়া হয়। তিনি ওই নম্বরে যোগাযোগ করলে ২ হাজার ১০০ টাকা মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে পাঠিয়ে নিবন্ধন করতে বলা হয়। টাকা পেয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে জানান, নিবন্ধন হয়ে গেছে। এরপর সেই ব্যক্তি নিজেকে ‘হুজুর’ পরিচয় দিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেন। বলেন, ‘আপনি ভাগ্যবতী’, তবে ছেলেমেয়েদের ফাঁড়া বা বিপদ আছে। তা কাটাতে হলে জিনের মাধ্যমে চালান দিতে হবে। এতে টাকা লাগবে। টাকা না দিলে পরিবারের সবাই মারা যাবেন।

গভীর রাতে জিনের বাদশাহ পরিচয়ে ফোন দিয়ে ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষকে মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ে সক্রিয় শতাধিক চক্র।

শাহীনা আক্তার জানান, সেই হুজুর তাঁকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন নম্বর দেন। এরপর তিনি ব্যাংকে জমানো পেনশনের টাকা এবং সোনা বন্ধক রেখে টাকা নেন। চার মাসে তিনি ২৫ লাখ টাকা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরে পাঠান। অনেক পরে তিনি বুঝতে পারেন প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন।

শাহীনার ছেলে ব্যাংক কর্মকর্তা আবদুল কাদের বলেন, বহু কষ্টে জমানো টাকা খুইয়ে মা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন।

সিআইডি সূত্র জানায়, শাহীনার ছেলে আবদুল কাদের বাদী হয়ে গত বছরের অক্টোবরে হাতিরঝিল থানায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন। তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, টিভিতে ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচারের ব্যবস্থা করে দেওয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন ফরিদউদ্দিন নামের এক সাংবাদিক।

প্রতারকের খপ্পরে পড়ে সব খুইয়েছেন পল্লবীর আরেক নারী (৫০)। তিনি পেশায় স্কুলশিক্ষিকা।

ওই শিক্ষিকা প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিন বছর আগে একদিন রাতে আমার মোবাইলে ফোন আসে। অপর প্রান্ত থেকে ওই ব্যক্তি নিজেকে জিনের বাদশাহ পরিচয় দিয়ে আমাকে গুপ্তধন পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখান। বলেন, টাকা না দেওয়া হলে আমাকে ও আমার একমাত্র ছেলের বড় ধরনের ক্ষতি করবেন। তার এমন আচরণে আমি ভয় পেয়ে যাই।’

শিক্ষিকা জানান, সারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থ ও বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে ধারদেনা করে কথিত জিনের বাদশাহর দেওয়া ১৫টি বিকাশ নম্বরে ১০ লাখ টাকা পাঠান। পরে সেই জিনের বাদশাহর কথামতো নতুন সিম কার্ড কেনেন। মাসখানেক পরে রহিম, বাদশা, হাবিবুর রহমান, মান্নাত, মিন্টু আসাদ, রশিদ ও জুয়েল নিজেদের জিনের বাদশাহর প্রধান বলে পরিচয় দিয়ে টাকা চেয়ে আগের মতো ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন।

শিক্ষিকা আরও জানান, ‘ঘটনার পর থেকে আমি অসুস্থ। স্বজনদের কাছ থেকে জমি কেনার কথা বলে টাকা ঋণ নিয়েছিলাম। এখন তারা প্রতারকের খপ্পরে পড়েছি জানলে টাকার জন্য আমাকে মেরেই ফেলবে।’

মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডি কর্মকর্তা জানান, এ ঘটনায় জিনের বাদশাহ পরিচয় দেওয়া জুয়েলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদের গ্রেপ্তারে চেষ্টা চলছে।

ভাটারা থানার সোলমাইদে খোদ বিকাশ এজেন্ট হাসান আলী প্রতারকের খপ্পরে পড়েন। তিনি বলেন, অজ্ঞাত এক ব্যক্তি তাঁর বিকাশ এজেন্ট নম্বরে ফোন করে বিকাশ কার্যালয় থেকে ফোন করার কথা জানান। এরপর কৌশলে তাঁর বিকাশ হিসাবের ১০টি পিন নম্বর নিয়ে আড়াই লাখ নিয়ে যায় প্রতারকেরা।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা কামাল হোসেন জানান, এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ওই চক্রে ৩০ জন সক্রিয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে অবস্থানরত এদের ধরতে অভিযান চলছে।

জানতে চাইলে সিআইডির উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি-অর্গানাইজড ক্রাইম) ইমতিয়াজ আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ছয়-সাত বছর ধরে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এ কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। এতে প্রতিদিন অনেক মানুষ বুঝে না বুঝে নিজেদের কষ্টের সঞ্চয় প্রতারকের হাতে তুলে দিচ্ছেন। ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, এ জন্য সবার আগে দরকার সচেতনতা। তবে তিনি বলেন, সমস্যার কথা হলো প্রতারকেরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর সহজেই জামিন পেয়ে বেরিয়ে আসছে, এরপর পুরোনো পেশায় ফিরে যাচ্ছে। এ জন্য সিআইডি এসব প্রতারকের একটি ডেটাবেইস তৈরির কাজ শুরু করেছে, যাতে ভবিষ্যতে এ গ্রুপগুলোকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা যায়।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ