ময়মনসিংহ, , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

বেকার যুবক বুদারাম এখন সফল নার্সারি ব্যবসায়ী

  ডেস্ক রিপোর্ট

  প্রকাশ : 

বেকার যুবক বুদারাম এখন সফল নার্সারি ব্যবসায়ী

অল্প কিছুদিন আগেও বুদারামের পিতা হতদরিদ্র দিনমজুর শুকারু চন্দ্র বমর্নের চার ছেলে-মেয়ে নিয়ে এক বেলা খেয়ে এক বেলা না খেয়ে দিন কাটাতো। পড়াশুনার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও পিতা-মাতার কষ্টের সংসারের হাল ধরতে পঞ্চম শ্রেণীতে থাকতেই বুদারাম লেখাপড়া ছেড়ে শ্রমের বাজারে নেমে পড়ে।


পরবর্তীতে প্রায় এক যুগ পিতার সঙ্গে নিজেও দিনমজুরি করে দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন, দারিদ্রের কষাঘাত থেকে পরিবারের সদস্যদের মুক্তির পথ খুঁজেছেন। আজ তিনি স্বাবলম্বী হয়েছেন। অদম্য ইচ্ছা শক্তি, সরকার ও সমাজের সহযোগিতায় দারিদ্র্যের কষাঘাতে বেড়ে উঠা হতদরিদ্র্য দিনমজুর পরিবারের বেকার যুবকরাও যে দারিদ্র্যকে জয় করে সমাজে যে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে কাউনিয়া উপজেলার টেপামধুপুর ইউনিয়নের নিলামখরিদা গ্রামের শ্রী বুদারাম চন্দ্র বর্মন তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প ২০১০ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর বুদারামের ভাগ্য পরিবর্তনে বার্তা নিয়ে আসে। ওই প্রকল্পের ঋণ বুদারামকে স্বচ্ছল ও সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পে ২৪০০ টাকা সঞ্চয় জমা করে ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি গরু ক্রয় করে বুদারাম। নিয়মিত কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি ৬ মাস পরই গরুটি ৩৫,০০০টাকায় বিক্রি হয়। দ্বিতীয় ধাপে সমিতি থেকে ১৭,০০০ টাকা ঋণ নিয়ে ২৫,০০০ টাকায় ১টি গাভি ক্রয় করেন। এভাবেই চলতে থাকে তার দারিদ্র বিমোচনের লড়াই। ২০১৩ সালে গাভি পালনের পাশাপাশি বাড়ির উঠানে বিভিন্ন ধরণের ফলদ বৃক্ষের বীজ রোপন করেন। রোপনকৃত বীজের চারাগাছ হাট-বাজারে বিক্রি করে বাড়তি টাকা আয় করতে থাকেন বুদারাম। পরবর্তীতে প্রকল্প থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ ও নিজের সঞ্চয় দিয়ে বাৎসরিক ভিত্তিতে জমি বন্দোবস্ত নিয়ে নার্সারী ব্যবসায় নেমে পড়েন বুদারাম। দেখতে দেখতে ৭ বছর কেটে গেছে তার নার্সারি ব্যবসার।


পরে বিঘাপ্রতি বছরে ১০/১২ হাজার টাকা হারে লিজ নিয়ে তিন একর জমিতে আম, জাম, লিচু, নটকো, নারিকেল, সুপারিসহ ১০/১২ ধরণের ফলদ গাছের চারা করছেন। তার নার্সারীতে ৮ জন শ্রমিক দৈনিক কাজ করেন। ইতোমধ্যে ছোট ভাই-বোনকে বিয়ে দিয়েছেন, অপর ভাই এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। নার্সারী থেকে প্রতিমাসে লাখ টাকার উপরে আয় হয় বুদারামের। সম্প্রতি বুদারামও বিয়ে করে এক কন্যা সন্তানের জনক হয়েছেন।


শ্রী বুদারাম চন্দ্র বাসসকে জানান, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের ঋণ গ্রহণ করে তাঁর ভাগ্যের পরিবর্তন এসেছে এবং তার এখন মহাজনী ঋণ ও অন্যান্য এনজিও হতে ঋণ গ্রহণের প্রয়োজন হয় না।


এক সময়ে আর্থিক অভাব অনাটনে পরিবারে দু’বেলা দু’মুটো মোটা ভাত কাপড় জোটাতে পারছিলাম না, শিক্ষা-চিকিৎসা তো দূরের কথা। আর্থিক স্বচ্ছলতার পিছনে আমার বাড়ি আমার খামার সমিতির অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করে বলেন, এখন আমি আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী। এক কন্যা সন্তানের জনক বুদারাম এখন তার মেয়েকে নিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের অনেক স্বপ্ন দেখেন।


শহীদবাগ ইউনিয়নের র্খোদ্দ ভুতছাড়া গ্রামের সমিতির আরেক সদস্য মাসুদ রানা সদস্য হন ১০ জানুয়রি ২০১৪ সালে। মাসুদ রানা প্রকল্পের সুপার ভাইজারের পরামর্শ ও সহযোগিতায় খোর্দ্দ ভুতছাড়া সমিতির সদস্য হন। তিনি নিয়মিত সঞ্চয় জমা দেন এবং সমিতির মাধ্যমে প্রথম দফায় ১০ হাজার টাকা ঋণ ও নিজস্ব ৬ হাজার টাকাসহ সর্বমোট ১৬ হাজার টাকা দিয়ে একটি গরু ক্রয় করেন। বর্তমানে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তিনটি গরু ও তিনটি ছাগল কিনেছেন তিনি।


আর্থিক স্বচ্ছলতার পিছনে আমার বাড়ি আমার খামার সমিতির অবদানের কথা অকপটে স্বীকার করেন মাসুদ রানা। তিনি বাসসকে জানান, এখন আমি আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী। তিনি এ প্রকল্পের মাধ্যমে পেয়েছেন সাফল্য ও আত্মনির্ভরতা। তার পরিবারের দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। বড় মেয়ে এইচ.এস.সি, মেজো মেয়ে নবম শ্রেণীতে ও ছোট ছেলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে লেখাপড়া করছে।


বুদারামের মতো সারাই ইউনিয়নের আমিনা বেগম গবাদি পশু পালনে, আলেমা বেগম সবজি চাষে, হারাগাছ ইউনিয়নের আনিছা বেগম গরু মোটাতাজাকরণে, নিলুফা বেগম মুদি দোকানে, সিরাজুল ইসলাম ধান ব্যবসায়, কুর্শা ইউনিয়নের মশিউর রহমান ও আব্দুল হান্নান মৎস্য চাষে, শহীদবাগ ইউনিয়নের কুলসুম বেগম ও মাসুদ রানা গাভী পালনে, বালাপাড়া ইউনিয়নের জসিম উদ্দিন টারকি মুরগী পালনে, শ্রীমতি দুলালী রানী মুরগীর খামার করে দারিদ্র্য দূর করেছেন। ভাগ্যের পরিবর্তনে পারিবারিক স্বচ্ছলতায় সমাজে সম্মান বেড়েছে তাদের।


জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের ভুখা-নাঙ্গা মানুষগুলোকে নিয়ে একটি শোষনমুক্ত সমাজ গড়ার তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্নকে তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের মাধ্যমে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন।


আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী ও পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক মঈন উদ্দিন বাসসকে জানান, ২০০৯-১০ অর্থবছরে দারিদ্র দূরীকরণের জন্য প্রকল্পটি চালু হবার পর মানুষের মাঝে ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায় এবং প্রত্যেকটি মানুষ যেন দারিদ্র দূরীকরণের সহজ পথ হিসাবে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করে এবং দারিদ্র ব্যক্তিগণ বিভিন্ন এনজিও ছেড়ে প্রকল্পের সদস্য হন। বর্তমানে কাউনিয়া উপজেলায় প্রকল্পের আওতাভুক্ত ৬টি ইউনিয়নে ১১৩টি সমিতিতে উপকারভোগীর সংখ্যা ৬০৬০ জন, এদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ সদস্য মহিলা। উপকারভোগীদের মধ্য হতে ৬৪০ জন উপজেলা পর্যায়ে গবাদি পশু পালন, হাঁস-মুরগী পালন, মৎস চাষ ও নার্সারি চাষ বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। এছাড়াও ৫৪০ জন সদস্যকে পর্যায়ক্রমে ৩ দিনব্যাপি ক্ষুদ্র উদ্দ্যোক্তা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করা হচ্ছে এবং প্রশিক্ষণ শেষে ৫ শতাংশ সার্ভিস চার্জে ৫০ হাজার টাকা করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ঋণ প্রদান করা হচ্ছে যা বর্তমানে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্ষুদ্র উদ্দোক্তা ঋণ বিতরন করা হচ্ছে।


উপকারভোগীরা শুরুতে ২০০ টাকা দিয়ে সঞ্চয় আরম্ভ করলেও বর্তমানে প্রত্যেকে প্রায় ৬-৭ হাজার করে নিজস্ব সঞ্চয় গঠন করেছে। উপজেলার মোট মুলধন দাঁড়িয়েছে ৮৬৪ দশমিক ৫৭ লাখ টাকা। ৬০৬০ জন উপকারভোগীদের বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ ও নিয়মিত সঞ্চয় ও ঋণের কিস্তি আদায়ের জন্য উপজেলায় বর্তমানে ১২ জন মাঠকর্মী রয়েছে। মাঠসহকারী মো. মিজানুর রহমান জানান, প্রকল্পের শুরুতে ঋণ পরিশোধে সদস্যদের মাঝে অনীহা থাকলেও বর্তমানে নিয়মিত ঋণ আদায় হচ্ছে।


কাউনিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার উলফৎ আরা বেগম বাসসকে জানান, আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্প সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করে দরিদ্র জনগোষ্টির ভাগ্য উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি, গরীব জনগোষ্ঠির অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে নিজদের সচেতনাবোধ তৈরি করছে। যেমন- ছেলে মেয়েদের বাল্য বিবাহ দেওয়া বন্ধ, নারীর ক্ষমতায়ন, স্যানিটেশন ও সমাজ গঠনমূলক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ। তিনি আরও বলেন, কাউনিয়া উপজেলার দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের উন্নয়নে আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের দর্শন একটি চিরন্তন প্রক্রিয়া।


উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা যায় এক সময় যারা দরিদ্র ছিল, বর্তমানে তাঁরা আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের সদস্য হয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে সহজ শর্তে ঋণ গ্রহণ এবং যথাসময়ে ঋণ পরিশোধ করে পর্যায়ক্রমে ঋণের পরিমান বাড়িয়ে নিজেদের পরিবারের স্বচ্ছলতা এনে ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এ কর্মসুচি চলমান থাকলে আগামী কয়েক বছরেই গোটা উপজেলার সিংহভাগ পরিবারে স্বচ্ছলতা আসবে বলে আশা করা যায়।

  • সর্বশেষ - সাক্ষাতকার