ময়মনসিংহ, , ২৪ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় লেখা বাড়ছে

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় লেখা বাড়ছে


নিম্ন আদালতে বেশির ভাগ রায় ও আদেশ বাংলায় হচ্ছে। উচ্চ আদালতেও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায়–আদেশ লেখা বাড়ছে। বছর দশেক আগে উচ্চ আদালতে বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়ার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। এখন উচ্চ আদালতের বেশ কয়েকজন বিচারপতি বাংলা ভাষায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন। অবশ্য, এ পর্যন্ত কতগুলো রায় ও আদেশ বাংলায় হয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান পাওয়া যায়নি।

বর্তমানে উচ্চ আদালতে ৯৭ জন বিচারপতি আছেন। একাধিক আইনজীবী ও বিচারালয়-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছর দশেক আগেও বাংলায় রায়-আদেশ দেওয়ার সংখ্যা ছিল হাতে গোনা। হাইকোর্টের দুজন বিচারপতি এখন নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এর
বাইরে বিভিন্ন সময় হাইকোর্টের বেশ কয়েকজন বিচারপতি বাংলায় রায়-আদেশ দিয়েছেন। তবে উচ্চ আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার আরও বাড়ানোর সুযোগ আছে বলে মনে করেন তাঁরা।

গত বছরের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বিচার বিভাগীয় সম্মেলনে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় রায় লেখার পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর রায় অনুবাদের জন্য একটি সেল গঠনে প্রধান বিচারপতি উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানান সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমান। গত সোমবার তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অধস্তন আদালতের বেশির ভাগ রায় ও আদেশ বাংলায় হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্টের দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রয়োজন অনুসারে বাংলা বা ইংরেজি ভাষার ব্যবহার হয়ে থাকে। উচ্চ আদালতে এখন বাংলা ভাষায় রায়-আদেশ দেওয়ার সংখ্যা বেড়েছে। এর সংখ্যা কত, সে তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেননি তিনি।

বাংলা ভাষায় রায়ের পূর্বাপর
আইনজীবী ও বিচারালয়-সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রয়াত বিচারপতি এ আর এম আমীরুল ইসলাম চৌধুরী নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সর্বপ্রথম হাইকোর্টে বাংলায় আদেশ দেওয়া শুরু করেন। এরপর সাবেক বিচারপতিদের মধ্যে বিচারপতি কাজী এবাদুল হক, বিচারপতি হামিদুল হক, বিচারপতি আবদুল কুদ্দুছ, সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক, আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী বাংলায় বেশ কয়েকটি রায় দেন। বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, স্বাধীনতার ঘোষণা, স্বাধীনতাযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণ ও চার নদী সংরক্ষণসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার রায় বাংলা দেন।

হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতের নিবন্ধন অবৈধ ঘোষণা করে ২০১৩ সালে দেওয়া রায় বাংলায় লিখেছেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম গত বছর বিভিন্ন মামলার ১৫ হাজার রায়–আদেশ ও অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ বাংলায় দিয়েছেন। গাজীপুরে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য আহসান উল্লাহ মাস্টার হত্যা মামলায় বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০১৬ সালের ১৫ জুন রায় দেন, রায়টি বাংলা ভাষায় দেওয়া হয়।

দেশের ইতিহাসে আসামির সংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় মামলা পিলখানায় তৎকালীন বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে হত্যাযজ্ঞের মামলাটি। এই মামলায় হাইকোর্টের তিন বিচারপতির দেওয়া পূর্ণাঙ্গ রায় ২৯ হাজার ৬৭ পৃষ্ঠা, যার ১৬ হাজার ৫৫২ পৃষ্ঠা বাংলায় লিখেছেন বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী। এর শব্দসংখ্যা ২৭ লাখ ৯০ হাজার ৪৬৮। বাংলা ভাষায় লেখা পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রায় এটি। পূর্ণাঙ্গ রায়টি প্রকাশিত হয় গত জানুয়ারিতে।

এই বিচারপতি ২০১০ সালে নিয়োগ পাওয়ার পরের বছর থেকেই ইংরেজির পাশাপাশি বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়া শুরু করেন। বর্তমানে তিনি বেশির ভাগ আদেশ ও রায় বাংলায় দিচ্ছেন। এ পর্যন্ত প্রায় এক হাজার মামলায় রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন তিনি।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১০ সালের এপ্রিলে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাওয়া বিচারপতি শেখ মো. জাকির হোসেন যোগদানের পর নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিয়ে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত ১০ হাজারের বেশি মামলার রায় ও আদেশ বাংলায় দিয়েছেন এই বিচারপতি।

রায় অনুবাদ সেল গঠনের উদ্যোগ প্রধান বিচারপতির। নিম্ন আদালতে বেশির ভাগ রায় ও আদেশ বাংলায় হচ্ছে।

বিচারপতি মো. রুহুল কুদ্দুস ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি ফৌজদারি রিভিশন মামলায় বাংলায় রায় দেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে মামলায় ২০১৬ সালের ৫ মে হাইকোর্টের তিন বিচারপতি রায় দেন। তিন বিচারপতির মধ্যে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি মো. আশরাফুল কামাল বাংলায় রায় লেখেন। এরপর থেকে তিনি নিয়মিত বাংলায় রায় ও আদেশ দিচ্ছেন। তুরাগসহ দেশের সব নদ-নদীকে জীবনসত্তা ঘোষণা করে দেওয়া রায়টি বাংলায় লিখেছেন এই বিচারপতি। এ ছাড়া হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ২০১৫, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে তিনটি রায় বাংলায় দেন বলে জানা গেছে।

জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রথম আলোকে বলেন, নানা পরিস্থিতির কারণে উচ্চ আদালতে ইংরেজির ব্যবহার বেশি হচ্ছে, এটি সত্যি। তবে এর পাশাপাশি আদালতে বাংলা ভাষার ব্যবহার হচ্ছে। ভবিষ্যতে বাংলা ভাষায় রায় ও আদেশ দেওয়ার প্রচলন বাড়বে।

ভাষার মাসে রায়
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এ বছর ভাষার মাসের শুরু থেকে বাংলায় রায়–আদেশ দেওয়া শুরু করেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিম ও বিচারপতি রিয়াজ উদ্দিন খানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ। ১ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি এই বেঞ্চ বিভিন্ন মামলায় এক হাজার ১৭৫টি রায় ও ৬৩৭টি আদেশ বাংলায় দিয়েছেন।

অপর একটি দ্বৈত বেঞ্চের বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ২০১৭ সালের একটি ফৌজদারি বিবিধ মামলায় ১৯ ফেব্রুয়ারি রায় দেন বাংলায়। এর আগে বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি মো. জাকির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ অর্থঋণ আদালতের দুটি মামলায় বাংলা ভাষায় রায় দেন। এর মধ্যে ১৩ ফেব্রুয়ারি এক মামলায় রায় দেন বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান। অর্থঋণের অপর মামলায় বিচারপতি মো. জাকির হোসেন ১৬ ফেব্রুয়ারি বাংলায় রায় দেন।

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, স্বাভাবিক রীতিতে উচ্চ আদালতে ইংরেজি ব্যবহার হয়ে আসছে। তবে এখন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ও জনস্বার্থ জড়িত বিষয়ে উচ্চ আদালত বাংলায় রায় দিচ্ছেন, যা ইতিবাচক পরিবর্তন। কেননা, ১০ বছর আগেও বাংলায় রায় ও আদেশ দেওয়ার বিষয়টি ছিল হাতে গোনার মতো। এখন অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে আইনজীবীরা বাংলায় যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন। বিচারপতিরা বাংলায় এর জবাব দিয়ে থাকেন। উচ্চ আদালতের কার্যক্রমে বাংলা ভাষার প্রচলন আরও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।

সংবিধানে যা আছে
সংবিধানের তৃতীয় অনুচ্ছেদ বলছে, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। ১৯৮৭ সালে বাংলা ভাষা প্রচলন আইন করা হয়। এই আইনের প্রবর্তন ও কার্যকরী সংক্রান্ত ৩(১) ধারার ভাষ্য, এই আইন প্রবর্তনের পর দেশের সর্বত্র তথা সরকারি অফিস, আদালত, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বিদেশের সঙ্গে যোগাযোগ ছাড়া অন্যান্য সব ক্ষেত্রে নথি ও চিঠিপত্র, আইন আদালতের সওয়াল জবাব এবং অন্যান্য আইনানুগত কার্যাবলি অবশ্যই বাংলায় লিখতে হবে।

তবে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষার প্রচলন না হওয়ার প্রেক্ষাপটে প্রতিকার চাইতে কেউ কেউ আদালতের দ্বারস্থও হন। ২০১২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলোর উপসম্পাদকীয়তে ‘ভাষাদূষণ নদীদূষণের মতোই বিধ্বংসী’ শিরোনামে নিবন্ধ ছাপা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব রকিব উদ্দিন আহমেদ এটি পরদিন আদালতের নজরে আনেন। সেদিন আদালত স্বতঃপ্রণোদিত রুলসহ আদেশ দেন। আদেশে বেতার ও দূরদর্শনে বিকৃত উচ্চারণ, ভাষা ব্যঙ্গ ও দূষণ করে অনুষ্ঠান প্রচার না করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলা ভাষার দূষণ, বিকৃত উচ্চারণ, সঠিক শব্দচয়ন, ভিন্ন ভাষার সুরে বাংলা উচ্চারণ ও বাংলা ভাষার অবক্ষয় রোধে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তা নির্ধারণ করতে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করতে বলা হয়।

এর পরপরই অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে কমিটি গঠিত হয়। কমিটি ওই বছরই প্রতিবেদন পাঠিয়ে দেয়। এর সুপারিশে বলা হয়, হিন্দি চ্যানেলের ছড়াছড়ি বাংলা ভাষার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এটি নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। তবে রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

জানতে চাইলে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা প্রতিবেদন আইন মন্ত্রণালয়ে দিয়ে দিয়েছি। নাটকের চরিত্রের মুখে আঞ্চলিক ভাষা চলতে পারে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রমিত বাংলা ব্যবহার করতে হবে। আইন করে ভাষার ব্যবহার পাল্টানো যায় না। ভাষা ব্যবহারকারীদের সচেতনতাই ভাষার দূষণ রোধের বড় উপায়।’

চলতি মাসেও সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে ২১ ফেব্রুয়ারিসহ অন্যান্য জাতীয় দিবস পালনে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানে ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা তারিখ ব্যবহারে নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেন চুয়াডাঙ্গার বাসিন্দা নস্কর আলী।

এর আগে ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে সব ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা প্রচলনের নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। ওই বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। রুল এখনো নিষ্পত্তি হয়নি জানিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, আদেশের পরও বিভিন্ন জায়গায় সাইনবোর্ড ও নম্বরপ্লেট, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামফলকে ইংরেজি দেখা যায়, যা অনভিপ্রেত।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ