ময়মনসিংহ, , ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনগুলো

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনগুলো

চুড়িহাট্টায় অগ্নিকাণ্ডে দুই ভাইকে হারান জরিনা আক্তার। গত বৃহস্পতিবার ঘটনাস্থলে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। ছবি: প্রথম আলো


স্বামী মো. শাহীন জমি বেচাকেনার ব্যবসা করতেন। এক ছেলে আর দুই মেয়ে নিয়ে ভালোই ছিলেন ময়না বেগম। গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টার সেই আগুন যেন ময়নার সব সুখ–স্বাচ্ছন্দ্যকে গিলে খেয়েছে। স্বামী মো. শাহীন ওই আগুনে পুড়ে মারা যান। অনেক খোঁজাখুঁজি করে ১৫ দিন পর শাহীনের লাশ পেয়েছিলেন ময়না বেগম। লাশের সঙ্গে ২০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন দাফনের খরচ হিসেবে। এরপর শুরু দুর্বিষহ এক জীবনের। পরিবারে শাহীনই কেবল উপার্জন করতেন। সম্পত্তিও কিছু নেই, জমানো টাকাও নেই। ময়না আর তাঁর তিন ছেলেমেয়ের দিন কাটছে চরম অভাব–অনাটনে।

ময়না বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কী যে অবস্থায় আছি ভাই। প্রতিদিন যুদ্ধ করতে হচ্ছে। বড় ছেলের বয়স সবে ১৩ বছর, মেয়ে দুইটা আরও ছোট। না পারি ওদের পড়াশোনা বন্ধ রাখতে, না পারি খরচ চালাতে। আত্মীয়রা কিছু কিছু দিচ্ছে, তাই দিয়ে কোনোরকমে টিকে আছি।’

অগ্নিকাণ্ডের পরে চুড়িহাট্টার ‘হায়দার মেডিকো’ নামে ওষুধের দোকান থেকে সাতজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছিল। এর মধ্যে ছিলেন দোকানটির মালিক আনোয়ার হোসেনও (৪২)। আনোয়ারের মৃত্যুর পর কেউ আর দোকানটা চালু করেননি।  তাঁর ছেলে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র আর মেয়ে এখনো স্কুলে যায় না। স্বামী হারিয়ে দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোরকমে ঢাকার পুরোনো ভাড়া বাসাতে ১১ মাস টিকতে পেরেছেন আনোয়ারের স্ত্রী নাহিদা রহমান। এরপর ফিরতে হয়েছে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর বাবার বাড়িতে। এখন বাবা–ভাইয়েরাই তাঁর খরচ চালাচ্ছেন।

আনোয়ারের বড় ভাই সাজ্জাদ হোসেন বলেন, দুই ছেলেমেয়ে নিয়ে নাহিদা কিছুদিন পুরোনো ভাড়া বাসাতেই ছিলেন। আত্মীয়রা কিছু কিছু করে সাহায্য করেছেন। আর না পেরে এই ফেব্রুয়ারিতে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে বাবার বাড়িতে ফিরে গেছেন। অষ্টম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আর কোলের মেয়েকেও নিয়ে গেছেন। দোকানটা এখনো ওই অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। তিনি জানান, সরকারের অনেকগুলো সংস্থাই ক্ষতিপূরণ বা সাহায্যের কথা বললেও কেউ এগিয়ে আসেননি। নোয়াখালীর এলাকাভিত্তিক ‘নাটেশ্বর ফাউন্ডেশন’ নামে একটি সংগঠন আনোয়ারের ছেলেমেয়ের জন্য এক লাখ টাকা দিয়েছে।

ব্যবসায়ী জহিরুল হকের গল্পটা একটু ভিন্ন। অগ্নিকাণ্ডের চার মাস পর স্ত্রী বিবি হালিমার লাশ পেয়েছেন তিনি। ওই এলাকাতেই তাঁদের বাসা, সেখানেই হালিমা মারা যান। জহিরুল বলেন, আরেকজন ভুল করে তাঁর স্ত্রীর লাশ নিয়ে চলে গিয়েছিল বলে দীর্ঘদিন ধরে লাশ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ডিএনএ টেস্টের প্রতিবেদন আসার পর জানা যায় যে তাঁর স্ত্রীর লাশ আরেকটি পরিবার নিজেদের স্বজন ভেবে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীতে নিয়ে দাফন করেছেন। ডিএনএর প্রতিবেদন ধরে তাঁরা পুলিশ নিয়ে গিয়ে নোয়াখালীর সোনাইমুড়ী থেকে লাশ তুলে সেনবাগ উপজেলায় হালিমার বাবার বাড়িতে দাফন করেন। লাশ তোলা থেকে শুরু করে প্রতি পদে পদে তাঁকে প্রচুর টাকা গুনতে হয়েছে বলে অভিযোগ এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর।

জহিরুল বলেন, এখন ছয় বছর আর দেড় বছর বয়সী দুই কন্যা নিয়ে বিপাকে আছেন তিনি। হালিমার এক বোনের কাছে আপাতত মেয়েদের রেখেছেন।

দুই ছেলে মোহাম্মদ আলী (৩২) আর অপু রায়হানের (৩০) বাবা এখন একেবারেই শয্যাশায়ী বাবা মান্নাফ ব্যাপারী। এই দুই ভাই চুড়িহাট্টা এলাকায় একটি হোসিয়ারির দোকানে কাজ করতেন। আলী তিন বছরের এক ছেলে ও অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী রেখে যান। তাঁর মৃত্যুর তিন মাস পরে স্ত্রী ইতি বেগম আরেকটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। আর অপু রায়হানের স্ত্রী সেলিনা বেগমের কোলে তখন পাঁচ মাসের সন্তান। স্বামী হারানোর কিছুদিন পরেই ইতি বেগম দুই ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়ি কুমিল্লায় চলে যান। সেলিনাও এখন বাবার বাড়ি মুন্সিগঞ্জে থাকছেন। আলী ও অপুর বোন জরিনা আক্তার বলেন, একসঙ্গে দুই ভাইয়ের মৃত্যুর পরে সংসারটা তছনছ হয়ে গেছে। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে দুই ভাইয়ের স্ত্রীরা পড়েছেন অকূলপাথারে, তাঁদের এমন আর্থিক সংগতিও নেই যে দুই ভাইয়ের পরিবারের ভরণপোষণ জোগাতে পারে। অগত্যা দুজনই বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দুই ছেলের মৃত্যুর পর তাঁর বাবা মান্নাফ ব্যাপারী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে এখন একেবারেই শয্যাশায়ী। মা তারামনিও গুরুতর অসুস্থ।

জরিনা বলেন, ‘ক্যামনে যে দিন কাটাইতাছি ভাই আমরাই জানি। তাও আল্লার ধারে কইছি আল্লা আপনি খুশি তো আমরাও ভি খুশি।’ কথা বলতে বলতে গলা ধরে আসে জরিনার। হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করেন।



  • সর্বশেষ - মহানগর