ময়মনসিংহ, , ২৬ আষাঢ় ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

সাহস রতনের গল্প ‘দারোয়ান’

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

সাহস রতনের গল্প ‘দারোয়ান’

১.

‘কী নাম?’

‘মতলব, স্যার।’

‘বাড়ি কই?’

‘স্যার মতলব।’

‘আরে নাম না, বাড়ির কথা জিগাইছি।’

‘স্যার, আমার বাড়িও মতলব।’

‘উপজেলাও কি মতলব না-কি?’

‘জ্বি স্যার। আপনে বুঝলেন ক্যামনে?’

‘ধারণা করে বললাম। তা মিয়া তোমার মতলবটা কী?’

‘মতলব ভালো স্যার। একটা কাজ দেন স্যার। যেকোনো কাজ, খুব কষ্টে আছি স্যার।’

‘পড়াশুনা কদ্দুর?’

‘এইচএসসির পর আর আগায় নাই।’

‘এই বিদ্যা দিয়া কী চাকরি করবা তুমি?’

‘যেকোনো কিছু। পিয়ন, দারোয়ান। যা হোক কিছু একটা স্যার।’

‘আচ্ছা এখন তো সুযোগ নাই। তুমি যোগাযোগ রাইখো।’

‘জ্বি স্যার।’

‘শোনো মতলব মিয়া। তোমার চেহারা-ছবি তো মাশাল্লা ভালোই। নাটক, সিনেমায় ট্রাই করো।’

‘সেই চেষ্টাও করছি স্যার। কাম হয় নাই। শুরুর দিকে অভিনয় করতেও টাকা লাগে।’

‘চাকরি পাইতেও তো টাকা লাগে।’

‘সেইটা আমি জোগাড় কইরা রাখছি স্যার।’

‘তাই!’

‘জ্বি স্যার। জমি বন্ধক দিয়া কিছু টাকা রাখছি। আরও প্রয়োজন হইলে মাল্টিপারপাস থাইকা সুদেও নিতে পারুম।’

‘আচ্ছা ঠিকাছে। তুমি এখন যাও। যোগাযোগ রাইখো।’

‘জ্বি স্যার। আস্সালামালাইকুম।’

‘ওয়ালাইকুম।’

২.

‘স্যার! আসসালামালাইকুম।’

‘ওয়ালাইকুম। কে?’

‘স্যার, আমি মতলব স্যার।’

‘ও, কী খবর?’

‘এই বাঁইচা আছি স্যার। স্যার, আমার কোনো খবর হইল স্যার?’

‘ধুর মিয়া। একমাসের মধ্যেই চাকরির খবর হয় না-কি?’

‘হ, তা ঠিক। কিন্তু খুব কষ্টে আছি স্যার। একটু যদি দয়া করেন।’

‘তোমারে তো বলছি মিয়া, সুযোগ আসলে তোমারে জানামু। তুমি অপেক্ষা করো।’

‘ঠিক আছে স্যার। স্যার, আমি মাঝেমধ্যে ফোন দিয়া খোঁজ নিমু স্যার। আপনে রাগ কইরেন না।’

‘হুম, ঠিকাছে, রাখো।’

৩.

‘হ্যালো, আসসালামালাইকুম। স্যার, আমি মতলব।’

‘মতলব মিয়া। কেমন আছো?’

‘গরিব মাইনষের থাকা স্যার। আছি কোনো রকম। স্যার, আপনে ক্যামন আছেন? শরীর ভালোনি স্যার?’

‘মতলব মিয়া, আমি ভালো আছি। শরীরও ভালো আছে।’

‘শরীরের দিকে নজর রাইখেন স্যার। শরীরটাই আসল। শরীর ঠিক না থাকলে মনে কোনো শান্তি নাই স্যার।’

‘মাঝেমধ্যে তুমি তো দেখি খুব জ্ঞানের কথা কও।’

‘স্যার, পড়াশুনা কম করলেও আউট বই পড়ছি। তাতে জ্ঞান বাড়ছে কি-না জানি না। তবে অনেক কিছু বুঝতে পারি। আপনার সাথে কথা বলেই বুঝছি, আপনি নিজেকে যতটা কঠোর হিসাবে অন্যের সামনে জাহির করতে চান, ভিতরে ভিতরে ঠিক ততটাই নরম আপনি। এই জন্যই আপনার সাথে লেগে আছি স্যার। আমার বিশ্বাস, সুযোগ আসলে আপনি আমার জন্য চেষ্টা করবেন। আজকাল তো কেউ কারো জন্য কোনো চেষ্টাই করতে চায় না।’

‘অ তাই! তুমি তো দেখি ভালোই তেল মারতে পারো।’

‘না, তেল মারা না স্যার। আমার যা মনে হইলো, তা-ই আপনাকে বলছি। আপনাদের কাছে এইটা হয়তো তেল মারার মতোই।’

‘আচ্ছা, বুঝছি। শোনো মতলব মিয়া, তোমার জন্য একটা কাজ আছে। কিন্তু তুমি সেইটা করতে পারবা কি-না বুঝতে পারছি না।’

‘পারুম স্যার। বলেন কী কাম?’

‘দারোয়ানের চাকরি, করবা?’

‘করুম স্যার।’

‘পুরো না শুইনাই রাজি হইয়া গেলা? কোথায় চাকরি, বেতন কত এইসব তো কিছুই জানতে চাইলে না।’

‘স্যার, এতো কষ্টে আছি যে, এখন আর এইসব জানার টাইম নাই। কবে থাইকা কাজে লাগুম, তা বলেন স্যার।’

‘তুমি জানতে না চাইলেও আমি বলি শোনো। কাজটা গ্রামে, আমার বাড়িতে দারোয়ানের চাকরি।’

‘তাহলে তো স্যার আমার জন্য আরও ভালো হইলো। বাড়িতে থাইকাই চাকরি করতে পারুম।’

‘তোমার কাজ হলো সন্ধ্যা ৬টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত বাড়ির চৌহদ্দি পাহারা দেওয়া। আর দিনের বেলা কনস্ট্রাকশনের কাম-কাজ দেখাশুনা করা। দুই বেলা খাবার পাবা। আর বেতন মাসে পাঁচ হাজার টাকা। করবা?’

‘করুম স্যার। কবে থেকে কাজ শুরু করবো?’

‘আমি আগামী সপ্তায় বাড়ি আসতেছি। তখন সব আলাপ করে শুরু করবো। এখন রাখি কেমন।’

‘জ্বি স্যার। থ্যাংকিউ স্যার। আস্সালামালাইকুম স্যার।’

‘হুম, ওয়ালাইকুম।’

৪.

‘তাহলে মতলব মিয়া, কী অবস্থা?’

‘অবস্থা স্যার খুবই ভালো।’

‘শোনো, বাড়িতে থাকার জন্য আমি একটা ডুপ্লেক্স বানাবো। পুকুরে মাছের চাষ করবো। সামনে সবজি বাগান, ফুলের বাগান হবে। বাউন্ডারি ওয়াল হবে। আরও কিছু পরিকল্পনা আছে। তো তোমার কাজ হলো দিনে সবকিছু দেখাশোনা করা। আর রাতে এখানে থাকবা। কী পারবা না?’

‘স্যার, অবশ্যই পারবো স্যার।’

‘তোমার কথা-বার্তা আমার ভাল্লাগছে। তাইলে তুমি কাল থেকেই কাজে লেগে পড়ো। কী বলো?’

‘ঠিকাছে স্যার। কোনো অসুবিধা নাই স্যার।’

‘তাইলে তুমি এখন যাও। কাল সকাল আটটার মধ্যে চলে আসবা।’

‘আচ্ছা স্যার।’

৫.

‘স্যার, আস্সালামালাইকুম।’

‘মতলব মিয়া, আসছ।’

‘জ্বি স্যার।’

‘আচ্ছা বসো। তোমারে নিয়া বাজারে যাবো। কনস্ট্রাকশনের মালপত্র কিনতে হবে। তোমার একটা পোশাক বানাতে হবে। ঠিকাদারের সাথে কথা বলবো। তুমি সকালে কিছু খেয়েছো?’

‘না স্যার।’

‘অ, এই নাও পঞ্চাশ টাকা। দোকান থেকে নাস্তা করে এসো।’

‘না স্যার, লাগবো না।’

‘আরে ধুর মিয়া। এতো শরম পাইলে চলবে না-কি? ধরো, জলদি নাস্তা করে এসো। এর মধ্যে আমি গোসল সেরে রেডি হচ্ছি।’

‘স্যার, আপনি নাস্তা করছেন?’

‘হুম।’

৬.

‘জলিল ভাই, এই যে সব মালামালের হিসাব। এই হলো ঠিকাদার, রশিদ মিয়া। আর এই হলো মতলব মিয়া, আমার বাড়ির কেয়ারটেকার। এখন থেকে মতলব মিয়া বাড়ির যাবতীয় কাজকর্মের দেখাশুনা করবে। যখন যা মালপত্র লাগবে মতলব এসে ভাউচারে সই করে নিয়ে যাবে। আমি ঢাকা থেকে হিসাব অনুযায়ী আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করে দেবো। কোনো প্রশ্ন থাকলে বলেন।’

‘না, কোনো প্রশ্ন নাই। তবে মতলব মিয়ার সাথে ভালোমত কথা বলছেন তো?’

‘হুম কথা-বার্তা শুনে ভালোই তো মনে হইলো। কেন, কোনো সমস্যা?’

‘ওর তো কাজ-কামের কোনো আগামাথা নাই। সারাজীবন তো আজাইরা বইয়াই কাটাইলো। এখন এই বয়সে কাজকাম করবে তো?’

‘কী মতলব মিয়া, জলিল ভাই কি বললো, শুনছো?’

‘হ, উনি সঠিক কথাই বলছেন। আমি ভাদাইম্যা। কিন্তু আপনি চাকরি দেওয়ার পর থাইকা আমি বদলাইয়া গেছি।’

‘দেখিস কইলাম মতলব, আমাগো গেরামের মান-ইজ্জত ডুবাইস না। মাইনুল ভাইয়ের কথামতো ঠিকঠাক কাম করিস। আল্লায় চাইলে তোর দিন ফিরতে দেরি হইব না।’

‘না মামা, কোনো চিন্তা কইরেন না। আগে বেলাইন ছিলাম, তয় এখন আমি লাইনে চইলা আসছি।’

‘ঠিক আছে জলিল ভাই। তাইলে ওই কথাই রইলো।’

‘আচ্ছা।’

‘চলো মতলব মিয়া, তোমার জন্য সিকিউরিটি গার্ডের একটা ড্রেস বানাতে দেই। নারায়ণের দোকানে চলো।’

‘আসেন স্যার।’

৭.

‘শোনেন কাশেম ভাই। আপনি হইলেন এই এলাকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, আমাগো মা-বাপ। আপনের কথার উপরে কোনো কথা নাই। আমি স্যারের বাড়ির সব কাজ দেখাশোনা করতেছি ঠিকই কিন্তু আপনের কথার বাইরে তো কোনোদিন যাই না। বাড়ির কাজ তো আগামী মাসের মধ্যেই শেষ হইয়া যাইবো। এরপর আমারে কামে রাখবো কি-না ঠিক নাই। তখন আমি কী করুম, একটা বুদ্ধি দেন।’

‘হুম। তোর কেইসটা অনেক জটিল তো মতলব। বুদ্ধি একখান দিতে পারি কিন্তু তুই সেইটা কামে লাগাইতে পারবি কি-না, সেইটা হইল কথা।’

‘কী বুদ্ধি, বলেন?’

‘এখন থাইকা তোর স্যার ফোন দিলে তুই আর সহজে ফোন ধরবি না। মাঝেমধ্যে ধরবি। আর তোর স্যার বাড়ি আসতে চাইলে বলবি, সমস্যা আছে পরে আসেন। কি, পারবি না?’

‘এইডা কী কন? এইডা কোনো কাম হইল? আর কী করতে হবে কন?’

‘প্রথম কামডা আগে ঠিকঠাক কর, পরেরটা পরে কমু, ঠিকাছে? এখন প্যাচাল বাদ দিয়া গ্লাসে মাল ঢাল। তোরে যে খাসির মাংস রান্না করতে কইছিলাম, করছস?’

‘আপনে বলছেন আর আমি রান্দুম না, এইডা কি হয়? এই যে লন। খাইয়া বলেন, রান্না কেমন হইছে?’

‘হুম, রান্না তো বেশ মজাই হইছে রে। তুই এতো ভালো রান্না শিখলি কার কাছে?’

‘স্যারের কাছে শিখছি। আমার চৌদ্দগোষ্ঠী কোনোদিন খাশির মাংস খাইছেনি যে আমি রান্দা শিখুম।’

‘তোর স্যার কিন্তু খুবই কাবিল মানুষ রে মতলব। এক একর জমির উপর গেরামে আলিশান বাড়ি বানাইলো। তয় থাকনের মানুষ তো নাই। কয়দিন পর ভূত-পেত্তিনি বাসা বানাইবো। তার আগেই এখানে মানুষের বসতি বানাইতে হবে। কী কস্?’

‘এইসব আমি কি জানি, আপনে যা ভালো বোঝেন। তয় আমার কথাডা খেয়াল রাইখেন।’

‘এলাকার কারো লগে কোনো কানেকশন নাই। তার উপর গেরামে এতো বড় বিরাট আলিশান বাড়ি। তোর স্যার কামডা কি ঠিক করলো, তুই ক? এইভাবে আতকা শহর থাইকা গেরামে আইসা ঘর-বাড়ি বানাইলো, আমারে একটু জিগাইলোও না। এইভাবে চললে আমি এলাকায় মোক দেহামু ক্যামনে রে মতলব। তোর স্যার কামডা ঠিক করে নাই।’

‘তাইলে এখন কী করবেন?’

‘হুম, ভাবতেছি। শোন, তোর স্যার এরপর কবে আসবে?’

‘আগামী সপ্তায়।’

‘পরের বার আসলে তুই বলবি, এলাকার গুণ্ডা-পাণ্ডারা চান্দা চায়, মাঝেমধ্যে তোরে মাইরা ফালানোর হুমকি দেয়। তোর নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র লাগবে। কি পারবি না?’

‘হ পারুম।’

‘তোর স্যার বাড়ি তো ভালোই বানাইছে। এতো বড় বাড়িতে থাকার মতো মানুষ নাই রে। সেই জন্যই তো আমরা মাঝেমধ্যে এইখানে আড্ডা মারতে আসি। এখন মনে কর, এই বাড়িডা যদি আমার আর তোর নামে হইয়া যায়, তাইলে তোর ক্যামন লাগবো?’

‘কতাডা শুইনাই তো আমার গায়ের লোম খাড়াইয়া গেছে কাশেম ভাই। সত্যই কি এমনডা হবে ভাই?’

‘ধৈর্য ধর, দয়াল চাইলে কী-না হয়! সবই দয়ালের ইচ্ছা।’

৮.

‘হ্যালো মতলব মিয়া, কই থাকো তুমি? ইদানিং তো তোমারে ফোনে পাওয়াই যায় না, ঘটনা কি?’

‘স্যার, ফোন ঘরে রাইখা বাইরে গেছিলাম।’

‘হুম, আচ্ছা। বাড়ির কাজের কদ্দুর?’

‘কাম তো প্রায় শেষ।’

‘তাই! আচ্ছা আমি আগামী সপ্তায় বাড়ি আসতেছি।’

‘স্যার, একটা কথা বলতে চাইছিলাম।’

‘বলো।’

‘আপনি এখন আইসেন না। কয়দিন পর আসেন।’

‘কেন?’

‘স্যার ফোনে সব কথা কইতে পারতেছি না। আপনি আসলে সামনা-সামনি বলবো। গত কিছুদিন যাবত আমারে জানে মাইরা ফালানোর হুমকি দিতাছে। এই জন্য ফোন লগে রাখি না। পরিবেশ একটু ঠান্ডা হইলে আমি আপনেরে ফোন দিমু। তখন আপনি বাড়ি আইলে সব কথা কমু।’

‘মানে কি? কে তোমারে হুমকি দেয়?’

‘ফোনে বলতে পারতেছি না স্যার। আমি অনেক অশান্তিতে আছি স্যার। আমারে বাঁচান।’

‘মতলব মিয়া, শান্ত হও। কী হয়েছে আমাকে খুলো বলো।’

‘স্যার, আপনি আসেন, তখন বলবো।’

‘বিষয়টা তো থানায় জানানো দরকার। তুমি এখনই থানায় গিয়ে জিডি করে আমাকে ফোন দাও।’

‘স্যার, আমারে মাফ করেন স্যার। এই কাম করলে আমি আর জান নিয়া বাড়ি ফিরতে পারুম না। আপনি বাড়ি আইসা থানায় জিডি কইরেন।’

‘ঠিকাছে, আমাকে জানাবা কখন আসবো।’

‘আচ্ছা স্যার।’

৯.

এ ঘটনার পর প্রায় ছয় মাস অতিবাহিত হয়েছে। মতলব মিয়ার স্যার মাইনুল, এখনো সদ্য নির্মিত নিজের বাড়িতে আসতে পারেননি। যতবারই ফোন করেন, ততবারই মতলব মিয়া অপেক্ষা করতে বলে। মাইনুল তার পড়শিকে ফোন করলেন। জানতে পারলেন, সন্ধ্যার পর তার বাড়িতে এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের নিয়মিত আড্ডা জমে। মাইনুল স্থানীয় থানায় ফোনে যোগাযোগ করলেন। থানা থেকে বিষয়টি স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলার পরামর্শ দিলো। সব শুনে মাইনুল খুব হতাশ হয়ে পড়লেন। নিজের সৎ পরিশ্রমের অর্থে নির্মিত নিজের বাড়িতে ঢুকতে এতো বেগ পেতে হবে স্বপ্নেও ভাবেননি!


মা মারা যাওয়ার পর গ্রামের সাথে সম্পর্ক দিন দিন কমেছে। দূরসম্পর্কের এক ফুফু ছাড়া গ্রামে কেউই এখন আর থাকেন না। কাছের মানুষ সবাই শহরবাসী। ফলে গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় কালেভদ্রে। ধীরে ধীরে অর্থনৈতিক সক্ষমতা তৈরির পর ভাবলেন গ্রামে একটা বাড়ি করবেন। মাঝেমধ্যে পরিবার নিয়ে ছুটি কাটাতে বাড়ি গিয়ে থাকবেন। কিন্তু কিসের মধ্যে কী হয়ে গেল। ভাবলেই তার মেজাজ বিগড়ে প্রেসার বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে তার পরিবারের সাথে আলোচনা করলেন। উল্টো, এতো টাকা খরচ করে গ্রামে বাড়ি বানানোর কোনো দরকারই ছিল না বলে পরিবারের সবাই তাকে ভর্ৎসনা করলো।


একধরনের ক্ষোভ তার ভেতরে দানা বাঁধছিল। একটা ভ্যাগাবন্ডকে দারোয়ানের চাকরি দিয়ে এখন তার হাতেই নিজের জীবন বন্দি, এটা কিছুতেই মানতে পারছিলেন না। একদিন সকালে কাউকে কিছু না জানিয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে যাওয়ার জন্য বেরুলেন। এলাকায় পৌঁছে প্রথমেই গেলেন থানায়। সব জানিয়ে সাধারণ ডায়েরি করতে চাইলেন। কর্মরত অফিসার প্রথমে জিডি করতে গড়িমসি করলো।

‘আপনি যার নামে জিডি করতে চাচ্ছেন, তিনি তো নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। এইজন্য ওসি স্যারের পারমিশন লাগবে। ওসি স্যার এখন অফিসের বাইরে।’ বলে বেশ কিছু সময় বসিয়ে রাখলো। বিকেলের দিকে জিডি করে গ্রামের বাড়ির পথে পা বাড়ালেন মাইনুল।


সন্ধ্যার কিছু পর এলাকার বাজারে পৌঁছে জলিল মিয়ার দোকানে ঢুঁ মারলেন। তাকে দেখেই জলিল মিয়া, ‘মাইনুল, ভাই আসছো, একটু বসো।’ বলে সেই যে বেরিয়ে গেলেন, আর ফেরার নাম নেই। অনেকক্ষণ জলিল মিয়ার দোকানে বসে থেকে তিনি বাড়ির পথ ধরলেন। বাজার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে তার বাড়ি। নানারকম দুশ্চিন্তায় মাথা ভারী হয়ে আছে। কী করবেন ভেবে কূল পাচ্ছেন না। সকালেই গ্রামের সবাইকে ডেকে এটার একটা বিহীত করবেন বলে মনে মনে স্থির করলেন।

বাড়ির কাছাকাছি আসতেই দুই মোটরসাইকেলে চার কৈশোরোত্তীর্ণ যুবক তার পথ আগলে দাঁড়ালো। কাউকেই চিনতে পারলেন না।

‘আস্সালামালাইকুম, স্যার, কেমন আছেন?’

‘ওয়ালাইকুম। তোমরা কারা?’

‘আমাদের চিনবেন না। আমরা এ এলাকারই ছেলে। ভাই আপনাকে সালাম দিছে।’

‘কোন ভাই?’

‘কাশেম ভাই।’

‘উনি কোথায়? ওনাকে আসতে বলেন।’

‘উনি তো একটা মিটিংয়ে। সেইজন্য আপনাকে নিয়া যাইতে বলছে, চলেন।’

মাইনুল কিছু বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ওরা জোর করে একটা মোটরসাইকেলের মাঝখানে তাকে বসালো। আর পেছনে একজন বসে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল, ‘চুপ কইরা বইসা থাকেন। কোনো আওয়াজ কইরেন না। তাইলে এক্কেরে ভুরি নামাইয়া ফালামু।’

১০.

পরদিন সকালে উপজেলা সাব রেজিস্ট্রি অফিসে জমিসহ সদ্যনির্মিত বাড়ি বিক্রি করে দিলেন মাইনুল। দলিলগ্রহীতা সমান অংশীদার হিসাবে দুইজনের নাম। মতলব মিয়া, পিতা মৃত পানচু মিয়া ও কাশেম মিয়া, পিতা মৃত আংশু মিয়া। সাব রেজিস্ট্রার সাহেব দলিলে সই করার আগে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সব টাকা বুঝে পাইছেন?’ উত্তরে মাথা নাড়লেন মাইনুল।

দুপুরের পর ঢাকা ফেরার বাস ধরলেন তিনি। উস্কুখুস্কু চেহারা। মাথার চুল অবিন্যস্ত। নিদ্রাহীন লাল চোখ। চোয়াল ঝুলে পড়েছে। দরদর করে ঘামছেন। সন্ধ্যা ছ’টা নাগাদ সায়দাবাদ নেমে বাসার উদ্দেশ্যে অটোরিকশা নিলেন। জ্যাম ঠেলে অটোরিকশা যখন নাখালপাড়া লুকাস পৌঁছালো; তখন রাত আটটা ছুঁইছুঁই।

‘স্যার, লুকাস চইলা আইছি।’

অটোরিকশা ড্রাইভার দুইবার ডাকার পরও কোনো সাড়া না পেয়ে ভাবলেন প্যাসেঞ্জার হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছেন। পথিমধ্যেও লুকিং গ্লাসে কয়েকবার ঝিমুতে দেখেছেন। বারকয়েক ডেকেও কোনো উত্তর নাই দেখে ড্রাইভার একটু ঘাবড়ে গেলেন।

‘অ স্যার। স্যার কি ঘুমাইয়া পড়লেন না-কি?’

ড্রাইভিং সিটে বসেই পেছন ঘুরে দরজার হুক খুললেন অটোড্রাইভার। এরপর নেমে এসে গায়ে হাত দিতেই চমকে উঠলেন তিনি। পেছনে হেলান দেওয়া হিমশীতল নিথর দেহ। একটু ধাক্কা দিতেই একদিকে কাত হয়ে পড়লো মাইনুলের প্রাণহীন শরীর।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য