ময়মনসিংহ, , ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

ইরতেজা হাসানের ‘জীবনযুদ্ধের গল্প’

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

ইরতেজা হাসানের ‘জীবনযুদ্ধের গল্প’

আষাঢ় মাস! আকাশে মেঘের গুড় গুড় শব্দ। এরই মাঝে ঝুম করে বৃষ্টি নেমে এলো। টিনের ঘরের ছাদে বৃষ্টির ঝুম ঝুম শব্দ নেশা ধরিয়ে দেয়। ইট-পাথরের লাল-নীল শহরে এই বৃষ্টির শব্দ পাওয়া যায় না। বাড়ির সাথেই লাগোয়া বারান্দা। চেয়ার নিয়ে বারান্দায় বসে আছি। বৃষ্টি পড়ছে সর্বশক্তি দিয়ে। মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছিঁটা গায়ে এসে লাগছে। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছি উঠানের দিকে। বাড়ির সামনে একফালি উঠান। দু’টো বাচ্চা কাঁদা পানিতে লুটোপুটি খাচ্ছে। আমাকেও হাত দিয়ে ইশারা করছে পানিতে নামার জন্য।


উঠানের পূর্ব কোণেই ছোট একটি পুকুর। বৃষ্টির নতুন পানি পেয়ে মাছেরা লাফালাফি করছে মনের আনন্দে। বাড়ির সামনে সুপারির বাগান। মনে হচ্ছে যুগ যুগ ধরে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে গাছগুলো। হাসেরা সাঁতার কাটছে পুকুরে। বৃষ্টি আস্তে আস্তে কমে আসছে। বৃষ্টির শেষে উজ্জ্বল ঝলমলে আকাশ। চারদিকে সুনসান নীরবতা। কবরের নিস্তব্ধতা। মুরগিগুলো চেষ্টা করছে তার গায়ের পানি ঝেরে উঠে দাঁড়ানোর জন্য। সব কিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছে আহা জীবন! হঠাৎ করেই মনের কোণে ভিড় করল, কোথাও কোনো করোনা নেই। কোথাও কোনো ভয় নেই। করোনা না থাকলে জীবনটা কতো অদ্ভুত সুন্দর লাগতো এখন।


আমার বাড়িটা শহর থেকে অনেকটা দূরে। আমার বউয়ের ইচ্ছাতেই এখানে বাড়ি করা। বাড়ি বলতে দোচালা টিনের ঘর। আমি পুলিশে ছোটোখাটো চাকরি করি। বেতন যা পাই, সব মাস শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। সীমিত বেতনে আমার হিসেবি বউ কিভাবে সংসার চালায়, আমি জানি না। এই তো কয়েকদিন আগে, রাস্তায় একজন রোগী পড়ে ছিল। ভয়ে কেউ কাছে ভিড়ছিল না। বড় স্যারের নির্দেশে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দিলাম। তারপর থেকেই আমার প্রচণ্ড জ্বর-কাশি দেখা দিলো। করোনা টেস্ট দিলাম। পজিটিভ এসেছে। বাড়িতে আসার পর থেকে বারান্দায় বেড়া দিয়ে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আপাতত এখানেই থাকি। এখন সুস্থ আমি। তবুও বাড়ির কাউকে কাছে ভিড়তে দেয় না আমার বউ।


আমার বউ আছিয়া। অদ্ভুত খারাপ সময়ে তার সাথে পরিচয় আমার। তখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ চলছিল। আমার পনেরো কি ষোলো বয়স। দেশকে বাঁচানোর তাগিদে যোগ দিয়েছিলাম মহান যুদ্ধে। একটি অপারেশনে গিয়ে কাঁধে গুলি লাগে। খুব খারাপভাবে আহত হয়েছিলাম। পরবর্তীতে একটি গণ্ডগ্রামে আশ্র‍য় নিয়েছিলাম আছিয়াদের বাড়িতে। আছিয়া আমার অনেক সেবা-যত্ন করেছিল। সেবারের যাত্রায় প্রাণ ফিরে পেয়েছিলাম তার সেবা-যত্নেই। একটু সুস্থ হয়ে উঠলেও মনের অবস্থা খুব নাজেহাল হয়ে পড়েছিল। ভাবছিলাম বাড়ি চলে যাবো। বেঘোরে প্রাণটা দেওয়া যাবে না। যুদ্ধ করার অনেক মানুষ আছে। আমি কেন বেঘোরে প্রাণটা দেব? যেদিন বাড়ি ফিরে যাবো ভাবছিলাম, আছিয়া জিজ্ঞেস করলো, ‘কী ভাবছেন? কই যাবেন এখন?’ আমি বললাম, ‘বাড়ি ফিরে যাবো।’ আমাকে অবাক করে দিয়ে সে বলল, ‘বাড়ি যাবেন আগে জানলে কষ্ট করে সেবা করতাম না। যান! যুদ্ধে যাবেন কেন? বাড়ি ফিরে যান।’ আমি কিছুটা মর্মাহত হয়েছিলাম আছিয়ার এই রুঢ় ব্যবহারে। অনেক ভেবে-চিন্তে আবার যুদ্ধে যাওয়ার মনস্থির করেছিলাম। যুদ্ধ শেষে আছিয়াকে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে এসেছিলাম।


আছিয়া রান্না চড়িয়েছে। রান্নার মসলার গন্ধ আমার নাকে এসে লাগছে। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত আর সাথে শিং মাছের ঝোল। সাথে দুটো কাঁচা মরিচ। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে। ভাতের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খাওয়া শুরু করলাম। আছিয়া বাতাস করছে। আমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কবে নাগাদ ফিরে যাবেন কাজে?’ আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম বউয়ের দিকে। মনে মনে ভাবছিলাম, করোনার যে অবস্থা; কাজে একটু ফাঁকি দিয়ে বাড়িতে বসে থাকবো। বললাম, ‘আমার উপর তোমার মায়া-দয়া নেই? কতো বিপদ কাজ করা, তুমি সেটা বোঝো?’ আছিয়া ছল ছল নয়নে বলল, ‘বিপদ আছে জানি। তাই বলে তো ঘরে বসে থাকা আপনার মানায় না। দেশের এই বিপদে আপনারা ঝাঁপিয়ে না পড়লে আর কারা পড়বে?’


আমিও চিন্তা করে দেখলাম, ঠিকই তো। দেশের এই বিপদে পুলিশকে কতোটা দরকার জনগণের জন্য। মুক্তিযুদ্ধের সময়েও দেশের দরকার ছিল নিবেদিত মানুষের। দেশকে অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল সবাই। নির্বিঘ্নে বেঁচে থাকার লড়াই ছিল সেটা। মানুষ তখন রাস্তায় নামতে ভয় পেতো রাজাকারদের ভয়ে। মৃত্যুর ভয়ে মানুষ ছিলো ভীত-সন্ত্রস্ত। তখন শত্রুদের চোখে দেখা যেত, এখন শত্রু করোনাকে চোখে দেখা যায় না। শোনা যায় না যে আক্রমণ করতে আসছে। কিন্তু দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ঠিকই ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। এ সময়ে মানুষকে সাপোর্ট দেওয়া দরকার। মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া দরকার। আমি যাবো। এই করোনার সাথে যুদ্ধে শামিল হবো। এই যুদ্ধে বেঁচে ফিরবো না-কি মৃত হয়ে ফিরবো জানি না! আছিয়ার মায়াময় মুখটা আর দেখতে পারবো কি-না জানি না! জানি না কোনোদিন আর বউয়ের হাতে গরম ভাত আর শিং মাছের ঝোল খেতে পারবো কি-না! তবুও আমি যাবো। মরে গেলেও পরিবার গর্বভরে বলতে পারবে, দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে। এ মৃত্যু যে বীরের শামিল।


আবার পাড়ার মোড়ে চায়ের দোকানে আড্ডা হবে। হঠাৎ কোনো বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেলে কোলাকুলি করতে দ্বিধা করবে না কেউ। বন্ধুর কাঁধে চাপড় মেরে বলবে, ‘কিরে ব্যাটা, কতদিন দেখা নাই তোর সাথে।’ রাস্তায় মানুষ গাদাগাদি করে চলবে। লোকাল বাসে চাকরিজীবীরা বাড়ি ফিরবে। রাস্তার পাশে ফুচকার দোকানে থাকবে কাস্টমারের ভিড়। স্কুল-কলেজ ছাত্রছাত্রীদের কোলাহলে মুখরিত হবে। কবে আসবে সে জীবন! সুখের জীবন। স্বস্তির জীবন। যে জীবনে থাকবে না প্রতিদিন দুপুরে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর। থাকবে না প্রতিদিন মৃত্যুর সংবাদ। মানুষ স্বস্তিতে দুপুরে খেয়ে-দেয়ে শান্তির ভাতঘুম দেবে!


রাতের আকাশ! ঘনকালো অন্ধকার। বুক ভরে নিশ্বাস নিলাম। তাজা বাতাস। বিশুদ্ধ বাতাস। কাল সকালেই ফিরবো কাজে। আছিয়াকে ডাক দিলাম, ‘কই গো, আমার যাওয়ার ব্যাগটা গোছাও।’

লেখক: উপ-পরিদর্শক (নিরস্ত্র), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন, বাংলাদেশ পুলিশ।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য