, ১০ আশ্বিন ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

গফরগাঁওয়ে জাতীয় ক্রিকেট টিমের লুট হওয়া ত্রাণ ২ মাসেও উদ্ধার হয়নি : চরম ক্ষোভ ও হতাশা

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

গফরগাঁওয়ে জাতীয় ক্রিকেট টিমের লুট হওয়া ত্রাণ ২ মাসেও উদ্ধার হয়নি : চরম ক্ষোভ ও হতাশা

ময়মনসিংহের সন্ত্রস্ত জনপদ গফরগাঁওয়ে জাতীয় ক্রিকেট টিমের লুট হওয়া ত্রাণ সামগ্রী দীর্ঘ ২ মাসেও উদ্ধার না হওয়ায় ক্রীড়াঙ্গণে চরম ক্ষোভ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে। অন্যথায় আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানিয়েছেন ক্রিকেটপ্রেমীরা। সূত্র মতে, গত ৪ মে রাতে বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিমের পক্ষ থেকে সৈয়দপাড়ায় অসহায় এবং দরিদ্রদের মধ্যে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের সময় সন্ত্রাসীরা ফিল্মি স্টাইলে হামলা চালিয়ে ত্রাণ লুট করে। বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালালে সন্ত্রাসীরা সহায়তা টিমের লোকজনকে মারধর করে। হামলায় জাতীয় ক্রিকেট টিমের টিম বয় মোঃ নাসির, তার বড় ভাই বাবুলসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। তাৎক্ষণিক পাগলা থানা পুলিশকে বিষয়টি জানালেও রহস্যজনক কারণে নিরব ভূমিকা পালন করা হয়। নাসির থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে এখন না পরে, আজ না কাল এভাবে দীর্ঘ ৩ দিন সময় ক্ষেপন করা হয়। ৮ মে ইচ্ছে মতো এজাহার লিখে সই নিয়ে সাদামাটা মামলা রেকর্ড করা হয়। পুলিশ ৬ দিন পর নাটকীয়ভাবে আসামিদের গ্রেফতার দেখিয়ে জামাই আদরে এসি মাইক্রোতে আদালতে প্রেরণ করে। কম গুরুত্বপূর্ণ এজাহার হওয়ায় আসামিরা ওই দিনই জামিনে মুক্ত হয়। এ ঘটনায় পাগলা থানা পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। আসামিরা এলাকায় ফিরেই মামলা তুলে নেওয়ার জন্য নাসির ও তার পরিবারের উপর চাপ দেয়। প্রাণনাশের আশঙ্কায় নাসির তার পরিবার নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নেয়। অন্যদিকে সামাজিকভাবে হেনস্তা করার জন্য নাসিরের বড় ভাই বাবুল মিয়ার নামে পাগলা থানায় ছাগল চুরির মিথ্যা অভিযোগ করা হয়।


জানা যায়, করোনা পরিস্থিতিতে দেশের অন্যান্য এলাকার মতো ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ের লংগাইর ইউনিয়নের অসহায় এবং দরিদ্রদের সহযোগিতা করার জন্য জাতীয় ক্রিকেট টিমের মাশরাফি বিন মর্তুজা, তামিম ইকবাল, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ও মুশফিকুর রহিমের সাথে কথা বলেন টিম বয় মোঃ নাসির। তার বাড়ি লংগাইর ইউনিয়নের বাঙ্গালকান্দিতে। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে তিনি বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিমে টিম বয় হিসেবে কাজ করছেন। তার অনুরোধে দেশের ৪ তারকা ক্রিকেটার অসহায় এবং দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণের জন্য ২০০ ব্যাগ ত্রাণ সামগ্রী প্রদান করেন। নাসির তার গ্রামের বাড়ির বাঙ্গালকান্দি ও সৈয়দপাড়ার প্রকৃত অসহায় এবং দরিদ্রদের তালিকা তৈরী করে পরিবারের সদস্য এবং এলাকার কয়েকজনকে সাথে নিয়ে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ শুরু করেন। ৩ মে পর্যন্ত বাঙ্গালকান্দি এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়। ওই দিনই বিভিন্ন মাধ্যমে নাসিরের কাছে হুমকি আসতে থাকে। আর কাউকে ত্রাণ সামগ্রী দিলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এক পর্যায়ে নাসির ও তার পরিবারের সদস্যদের এলাকা থেকে উচ্ছেদ করারও হুমকি দেয় চিহ্নিত এবং অজ্ঞাত সন্ত্রাসীরা। এরা সবাই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সাবেক ক্যাডার। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ্‌ আল আমিন বিপ্লবের নাম করে কয়েকজন নাসিরকে হুমকি দেয় বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে। নাসির হুমকিকে পাত্তা না দিয়ে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন।


সূত্র জানায়, নাসির ও তার ভাই বাবুল পরিবারের সদস্য এবং এলাকার কয়েকজনকে নিয়ে ৪ মে ইফতারের পর ত্রাণ সামগ্রী বিতরণের জন্য সৈয়দপাড়ায় যান। এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী মোঃ রফিক, আপন মিয়া, খাইরুল ইসলাম, মোঃ রুবেল ও মোঃ রাব্বি আরও ৭-৮ জনকে নিয়ে ফিল্মি স্টাইলে হামলা চালায়। মারধরের পর অন্যদের সহযোগিতায় ত্রাণের অর্ধশত ব্যাগ নিয়ে সন্ত্রাসীরা ঘটনাস্থল ছাড়ে। আশপাশের লোকজন আহতদের উদ্ধার করেন। আহত নাসিরের ভাই বাবুলকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। তিনি চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেন। এর আগে অন্যরা এলাকায় প্রাথমিক চিকিৎসা নেন। জাতীয় ক্রিকেট টিমের ত্রাণ লুটপাটের বিষয়ে ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট এবং অনলাইন মিডিয়ায় খবর প্রকাশিত হলে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ক্রীড়াঙ্গণে প্রতিবাদের ঝড় উঠে। ক্ষোভে ফেটে পড়েন ক্রিকেটপ্রেমীরা। শুরু হয় প্রতিবাদ। লকডাউন এবং সামাজিক দূরত্বের কারণে বিষয়টি নিয়ে আগাতে পারেন নি ক্ষুব্ধ ক্রিকেটার এবং ক্রিকেটপ্রেমীরা। এলাকাবাসী জানান, নাসির এলাকার গর্ব। আমরা সবাই তাকে সম্মান করি। দেশের তারকা ক্রিকেটারদের কাছ থেকে ত্রাণ এনে এলাকার অসহায় এবং দরিদ্র মানুষের মধ্যে বিতরণ করছিলো। বিনিময়ে আমরা তাকে অসম্মান করেছি। যারা হামলা ও ত্রাণ লুট করেছে তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। অভিযোগ করা হয়, পাগলা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ উল্টো নাসিরকে শাসিয়ে থানা থেকে তাড়িয়ে দেয়। চাপের প্রেক্ষিতে পুলিশ কায়দা করে ত্রুটিপূর্ণ এজাহার লিখে নাসিরের সই নিয়ে মামলা রেকর্ড করে। নাটকীয়ভাবে আসামিদের গ্রেফতার, এসি মাইক্রোতে আদালতে প্রেরণ এবং জামিনের ঘটনা ঘটে। সূত্র মতে, ১০-০৭-২০২০ শুক্রবার রাতে এ খবর লেখার সময় পর্যন্ত পুলিশ লুট হওয়া ত্রাণ উদ্ধার এবং অজ্ঞাত আসামিদের গ্রেফতার করতে পারেনি।


জানা যায়, টিম বয় নাসিরের উপর হামলা এবং ত্রাণ ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট টিমের ৪ তারকা ক্রিকেটার। তারা দ্রুত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান। হামলা ও ত্রাণ লুটের ঘটনায় এলাকার লোকজন প্রতিবাদ জানিয়ে সড়কে দাঁড়ান। এর পরই পুলিশ কায়দা করে সাদামাটা মামলা রেকর্ড এবং আসামিদের গ্রেফতার দেখিয়ে এসি মাইক্রোতে আদালতে পাঠায়। অন্যদিকে ত্রাণ লুটের ঘটনাকে আঁড়াল করার জন্য নাসিরের ভাইয়ের বিরুদ্ধে উল্টো ছাগল চুরির অভিযোগ নেওয়া হয়। সূত্র মতে, হামলা ও ত্রাণ লুটপাটের সাথে জড়িতরা সবাই বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের চিহ্নিত ক্যাডার ছিলো। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করার পর তারা আব্দুল্লাহ্‌ আল আমিন বিপ্লবের শেল্টারে এলাকায় অবস্থান করে। এরাই এখন লংগাইর, উস্থি ও দত্তেরবাজার ইউনিয়ন দাপিয়ে বেড়ায়। তারা চেয়ারম্যান বিপ্লবের হয়ে অপ্রতিরোধ্য গতীতে ৩ ইউনিয়নে অপরাধ কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। অথচ এরাই ২০০১ সালে লংগাইর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায়। ওই সময় বিএনপি-জামায়াত জোটের ক্যাডাররা পুরো গফরগাঁও উপজেলায় বিভিষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলো। এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনের অর্ধ লাখ নেতাকর্মী ও সমর্থক। তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। নিন্দা জানিয়েছিলো জাতিসংঘসহ বিভিন্ন দেশ। টিম বয় নাসির শুক্রবার রাতে দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে বলেন, হামলা এবং ত্রাণ লুটের পর পুলিশ আমার সাথে যে আচরণ করেছে তা কোনো দিনই ভুলবো না। আমাকে জামায়াত শিবির বলে ওসি তার কক্ষ থেকে বের করে দেন। আবার ২ দিন পর ডেকে নিয়ে ইচ্ছে মতো এজাহার লিখে সই নিয়েছেন। তবে পাগলা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ শাহীনুজ্জামান খান নাসিরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

  • সর্বশেষ - জাতীয়