ময়মনসিংহ, , ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

সাহেদের মামলা বহু, সাজা কম

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

সাহেদের মামলা বহু, সাজা কম

করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) নমুনা পরীক্ষা না করেই ভুয়া রিপোর্ট প্রদান এবং অর্থ আত্মসাতসহ প্রতারণার অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেফতার হওয়ার আগে অন্তত ১৬টি মামলায় জড়িয়েছিলেন রিজেন্ট গ্রুপ ও রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের চেয়ারম্যান সাহেদ করিম ওরফে মোহাম্মদ সাহেদ। এবার গ্রেফতার হওয়ার পর হয়েছে আরও ১৩টি মামলা। ২০০৮ সাল থেকে আজ মঙ্গলবার (২১ জুলাই) পর্যন্ত সাহেদের বিরুদ্ধে ২৯টি মামলার হদিস পেয়েছে । নতুন ১৩টি মামলার তদন্ত চললেও আগের ১৬টি মামলার মাত্র একটিতে সাজা হয় সাহেদের। এতোগুলো মামলায় আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে লোকজনকে বারবার প্রতারণার ফাঁদে ফেলেছেন সাহেদ, করেছেন রাষ্ট্রের সঙ্গেও জালিয়াতি। সেজন্য অন্তত তদন্তাধীন মামলাগুলোতে তার দৃষ্টান্তমূলক সাজা চান জালিয়াতি-প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগীরা।


নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, সাহেদের বিরুদ্ধে নতুন ১৩টি এবং আগের ১৬টি মিলিয়ে যে ২৯টি মামলা হয়েছে, তার বেশিরভাগই প্রতারণার অভিযোগের। পুরনো মামলাগুলোর মধ্যে সাহেদ চারটিতে খালাস পেয়েছেন। পাঁচটি মামলার বিচার স্থগিত হয়ে গেছে। দুইটির অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় তাকে। গ্রেফতারি পরোয়ানা হয় দুইটিতে। আর সাজা হয় একটি, যেখানে পরোয়ানা জারি হয়। বিচার চলছে আরেকটি মামলার। নতুন মামলাসহ বাকিগুলো তদন্তাধীন।


রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, বর্তমানে যেসব মামলা সাহেদের বিরুদ্ধে রয়েছে, সেগুলোতে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে কাজ করবে রাষ্ট্রপক্ষ। তদন্তাধীন একটি মামলায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে জানিয়ে আইনজীবীরা বলছেন, তিনি যেন তার কৃতকর্মের সাজা থেকে রেহাই না পান, আইন অনুসারে সে চেষ্টা থাকবে রাষ্ট্রপক্ষের।


সাহেদের বিষয় সম্প্রতি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, প্রতারণার অভিযোগে গ্রেফতার সাহেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া নতুন মামলার চার্জশিট শিগগির জমা দেয়া হবে। সেক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সবগুলো মামলাও খতিয়ে দেখা হবে। সাহেদের ঘটনায় পুলিশের যা করার তা বাহিনীটি করে যাচ্ছে। কিছু মামলায় তার জামিন নেয়া আছে। তবে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা সবগুলো মামলা আমরা দেখবো। একইসঙ্গে তিনি এতো মামলা নিয়ে কীভাবে ঘুরে বেড়িয়েছেন, তারও তদন্ত চলছে। সাহেদকে এসব মামলায় অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। কাউকে কোনোভাবে ছাড় দেয়া হবে না।


ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আবু  বলেন, সাহেদ যে মামলাগুলোতে খালাস পেয়েছেন তার রেকর্ড বের করে দেখতে হবে। খালাসের পর রাষ্ট্র কোনো আপিল করেছেন কি-না, তাও দেখতে হবে। প্রয়োজনে আমরা খালাসের বিরুদ্ধে আপিল করবো। আর যেসব মামলা স্থগিত রয়েছে তা চালু করার বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। আর বর্তমানে যেসব মামলা চলমান রয়েছে সেগুলোতে যেন সর্বোচ্চ শাস্তি হয় সে দিকে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ সচেতন থাকবো।


সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন ১০ বছর

করোনা মহামারির মতো সময়ে প্রতারণা-জালিয়াতির অভিযোগে গ্রেফতার সাহেদ করিম ওরফে মো. সাহেদকে ১০ বছর আগে প্রতারণার একটি মামলায় ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত। কারাদণ্ডের পাশাপাশি ৫৩ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয় তাকে।


রায়ের পর আদালত থেকে সাহেদের বিরুদ্ধে তখনই সাজার পরোয়ানা জারি করা হয়। এই ১০ বছরে সাজা পরোয়ানা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন সাহেদ। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারিও থাকলেও রহস্যজনক কারণে তাকে গ্রেফতার করেনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী।


যে চার মামলায় খালাস

সূত্র জানায়, রাজধানীর দুই থানায় পৃথক চার প্রতারণার মামলায় খালাস পান সাহেদ। এর মধ্যে তিনটি মামলায় আপসমূলে খালাস পান তিনি।


সাহেদের বিরুদ্ধে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে উত্তরা-পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগে একটি মামলা (মামলা নং ১৬(৭)০৯) করেন এক ব্যক্তি। ২০১০ সালের ২৫ আগস্ট আপসমূলে ঢাকার সিএমএম-১৩ খালাস দেন সাহেদকে।


২০০৯ সালের জুলাই মাসে উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগে আরেকটি মামলা (মামলা নং ২০(৭)০৯) হয় সাহেদের বিরুদ্ধে। পরের বছরের ২০ মে আপসমূলে ঢাকার সিএমএম-২১ খালাস দেন আসামিকে।


উত্তরা পূর্ব থানায় সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে আরেকটি মামলা (মামলা নাং ১০(৮)০৯) হয় ২০০৯ সালের আগস্ট মাসে। পরের বছরের ১৬ জুন আপসমূলে ঢাকার সিএমএম-১৩ খালাস দেন তাকে।


২০০৯ সালের জুলাই মাসে লালবাগ থানায় প্রতারণার অভিযোগে আরেকটি মামলার (মামলা নং ৪৭(৫)০৯) আসামি হন সাহেদ। ২০১০ সালের ২১ অক্টোবর আপসমূলে ঢাকার সিএমএম-৩৩ খালাস দেন এই আসামিকে।


স্থগিত যে পাঁচ মামলা

সাহেদের বিরুদ্ধে যেসব মামলার বিচারকাজ স্থগিত রয়েছে সেগুলোও দায়ের হয়েছে ২০০৯ সালে।


ওই বছরের মে মাসে উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগে সাহেদের বিরুদ্ধে মামলা (মামলা নং ৫৬(৫)০৯) দায়ের করেন এক ব্যক্তি। কিন্তু পরের বছরের ৫ মে থেকে ঢাকার সিএমএম-১৩ আদালতে মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।


২০০৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগেই সাহেদের বিরুদ্ধে হয় আরেক মামলা (মামলা নং ২৫(৯)০৯)। এ মামলার বিচারকাজ স্থগিত আছে ২০১৫ সালের ৫ অক্টোবর থেকে। স্থগিত করেন ঢাকার এসিএমএম-৪ আদালত।


২০০৯ সালের জুলাই মাসে উত্তরা পূর্ব থানায় প্রতারণার অভিযোগে সাহেদ আরেকটি মামলার (মামলা নং ৩০(৭)০৯) আসামি হন। পরের বছরের ১১ জুলাই ঢাকার সিএমএম-৬ আদালতে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত হয়।


২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাহেদ গুলশান থানায় দায়ের হওয়া একটি প্রতারণা মামলার (মামলা নং ১০৭(২)০৯) আসামি হন। ২০১২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকার সিএমএম-২৭ আদালতে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।


আর ২০০৯ সালের জুলাই মাসে সাহেদের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে আরেকটি মামলা হয় শাহবাগ থানায় (মামলা নং ৩৫(৭)০৯)। ২০১৪ সালের ৪ মার্চ থেকে ঢাকার সিএমএম-১৩ আদালতে মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে।


দুই মামলায় অব্যাহতি

২০০৯ সালের জুলাই মাসে প্রতারণার অভিযোগে উত্তরা পূর্ব থানা সাহেদের বিরুদ্ধে একটি মামলা (মামলা নং ১৫ (৭)০৯) হয়। পরের বছরের ৮ জুলাই চার্জ গঠনের সময় ঢাকার সিএমএম-১৩ আদালত তাকে অব্যাহতি দেন।


২০০৯ সালেরই জুলাই মাসে প্রতারণার অভিযোগে এক ভুক্তভোগী আদাবর থানায় সাহেদের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা (মামলা নং ১৪(৭)০৯) দায়ের করেন। সে বছরের ২৫ আগস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে তাকে অব্যাহতি দেন ঢাকার সিএমএম আদালত।


বিচারাধীন এক মামলা

তবে ২০০৯ সালের জুলাই মাসে বাড্ডা থানায় সাহেদের প্রতারণার অভিযোগে দায়ের হওয়া এক মামলা ঢাকা সিএমএম-১৩ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।


তদন্তধীন যত মামলা

সম্প্রতি সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার নামে প্রতারণা, জালিয়াতি ও ভুয়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগ ধরা পড়ার পর তার বিরুদ্ধে উত্তরা পশ্চিম থানা, পল্লবী থানা, উত্তরা পূর্ব থানা ও সাতক্ষীরা মিলিয়ে মোট ১৩টি মামলা হয়। এর মধ্যে সাতক্ষীরার মামলাটি হয়েছে অস্ত্র আইনে। আর উত্তরা পশ্চিম থানায় একটি অস্ত্র আইনে মামলা আছে। দুটি মামলা আছে বিশেষ ক্ষমতা আইনের, যার মধ্যে জালটাকা উদ্ধারের মামলার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডেরও বিধান রয়েছে।


এসব মামলাসহ আগের একাধিক মামলার কার্যক্রমও দ্রুত এগিয়ে চলেছে বলে জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


গত ৬ জুলাই রিজেন্ট হাসপাতালের উত্তরা ও মিরপুর শাখায় অভিযান চালায় র‌্যাব। অভিযানে করোনা পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট, করোনা চিকিৎসার নামে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম উঠে আসে। পরে রোগীদের সরিয়ে রিজেন্টের উত্তরা ও মিরপুর শাখা সিলগালা করে দেয়া হয়। এরপর থেকে পলাতক ছিলেন সাহেদ।


তবে ১৫ জুলাই সাতক্ষীরা সীমান্ত এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরদিন ১৬ জুলাই সাহেদ এবং রিজেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসুদ পারভেজকে ১০ দিনের রিমান্ডে পাঠান আদালত। আর সাহেদের প্রধান সহযোগী তরিকুল ইসলাম ওরফে তারেক শিবলীকে সাতদিনের রিমান্ডে পাঠানো হয়।

  • সর্বশেষ - জাতীয়