ময়মনসিংহ, , ৩ আশ্বিন ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

জামালপুরে ত্রাণের জন্য হাহাকার

জামালপুরে ত্রাণের জন্য হাহাকার

জামালপুরে যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকালে যমুনার পানি বাহাদুরাবাদ ঘাট পয়েন্টে বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ৭ উপজেলার ৮ পৌরসভা ও ৬৮ ইউনিয়নের মধ্যে এখন ৬০টি ইউনিয়নের প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি পড়েছে। আঞ্চলিক ও স্থানীয় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তীব্র খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে রয়েছেন বানভাসিরা। এখন পর্যন্ত বন্যার পানিতে ডুবে মারা গেছেন ২২ জন।

জানা গেছে, যমুনা নদীর পানি তৃতীয় বারের মত বৃহস্পতিবার সকালে ১৭ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপৎসীমার ৯৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া ব্রক্ষপুত্র, ঝিনাইসহ অন্যান্য শাখা নদীর পানিও বাড়ছে। সাত উপজেলায় বন্যার ভয়াবহ অবনতি দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বেড়েই চলছে।

এরই মধ্যে ১৩ হাজার হেক্টর বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ, গো চারণ ভূমি, বসতবাড়ি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ গ্রামীণ হাট-বাজার ,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ১৭০০ কিলোমিটার সড়ক পানিতে তলিয়ে গেছে। এছাড়াও দুর্গত এলাকায় গো খাদ্যের সঙ্কটের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে পানিবাহিত রোগ। বন্যার কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে জেলার অধিকাংশ মানুষ। ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যারা গরু পালন করছিলেন তারা এবার লোকসানের মুখে পড়েছেন।

jagonews24

ইসলামপুর উপজেলার পার্থশী ইউনিয়নের দর্জিপাড়া এলাকার বেলে বেগম। স্বামী মারা গেছেন তিন বছর হলো। এক মেয়ে আর একমাত্র সম্বল একটি ছাগল নিয়ে তার অভাবের সংসার কোনো মতে চলছিল। বন্যায় ঘরে পানি ওঠায় অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছেন। তবে মেয়ে আর ছাগলের খাবার নিয়ে চরম সঙ্কটে পড়েছেন। পানিতে ভিজে ঘুরেছেন তারপরও ত্রাণ সহায়তা পাননি ।

চিনাডুলি ও পার্থশী ইউনিয়নের সীমানা ঘেঁষা আমতলী বাজারের মুদি দোকানি শামিম আকন্দ। ১৭ দিন ধরে বাজারে পানি। এতে ক্রেতা শূন্য হয়ে পড়ে তার দোকান। পানিতে নষ্ট হয়ে যায় মালামাল। ছেলেমেয়ে ও বৃদ্ধা মায়ের মুখে খাবার তুলে দিতে ত্রাণের জন্য হাত বাড়িয়েছিলেন চেয়ারম্যান-মেম্বারের কাছে। কিন্তু ত্রাণের ১০ কেজি চাল তার ভাগ্যে জোটেনি। পরে সড়কে খোলা আকাশের নিচে দোকান নিয়ে বসলেও বেচাকেনা নেই।

বলিয়াদহ গ্রামের শহিদুল আলম ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন। চারদিকে পানি ওঠায় ব্যবসা বন্ধ। দুদিন ধরে বাড়িতে চুলা জ্বলে না, সেই পরিবেশও নেই। ত্রাণের আশা ছেড়ে ধারদেনা করে বাজারে এসে দেখেন দোকান বন্ধ।

গরু ব্যবসায়ী আলাউদ্দিন মিয়া জানান, খাদ্য আর উঁচু জায়গার অভাবে কোথাও গরু রাখতে পারছি না। মোটাজাতা গরুগুলো এখন হাড্ডিসার হয়ে গেছে। কোনো পাইকারও আসেন না। খাদ্যের অভাবে এখন পশুগুলো বাঁচানো দায় হয়ে গেছে।

jagonews24

ইসলামপুর উপজেলার ৭নং পার্থশী ইউনিয়নের ৮নং ওর্য়াডের পশ্চিম ঢেংঙ্গারগড়ের খলিশাগুড়ি, দর্জিপাড়া সুরের পাড়া ও নবকুড়ায় প্রায় ৫ হাজার লোকের বসবাস। সেখানে বৃহৎ একটি অংশকে বাদ দিয়ে সামান্য ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

৭নং পার্থশী ইউনিয়নের ৮নংওর্য়াডের মেম্বার রেজাউল করিম রাজা বলেন, আমার ওর্য়াডে অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র। এখানে তিনটি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়েছে। বর্তমানে ১২০ জন বানভাসি মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে। ২৭ দিনের বন্যায় ৩০০ জনের জন্য ১০ কেজি চাল ত্রাণ বরাদ্দ এসেছে। বড় একটি অংশকে ত্রাণের আওতায় না আনতে পারায় খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবু সাইদ জানান, তৃতীয় বারের মত আবারও পানি বাড়ছে। আগামী ৪-৫দিন বন্যার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। এতে নিম্নাঞ্চলসহ বেশ কিছু নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। ইতোমধ্যে ঝিনাই নদীর কাবারিয়াবাড়ী প্রকল্পের ডোয়াইল এলাকার ৬০ মিটার, সরিষাবাড়ী থেকে ভুয়াপুর সড়কের ১২ কিলোমিটার বাঁধসহ বেশ কিছু সড়ক বন্যার পানির তোড়ে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে তা মেরামত করে সচল রাখা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা নায়েব আলী জানান, বন্যায় জেলায় ৬০টি ইউনিয়নের ৬৭৭টি গ্রামের দুই লাখ ৭০ হাজার পরিবারের প্রায় ১০ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানির তোড়ে ১৪ হাজার ৫০০ বসতবাড়ি আংশিক ও পুরোপুরি ভেঙে গেছে। বন্যা দুর্গতদের জন্য এখন পর্যন্ত ত্রাণ বরাদ্দ হয়েছে ৮৮৪ মেট্রিক টন চাল, নগদ ২৯ লাখ টাকা, দুই লাখ টাকার শিশুখাদ্য ও গো খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা। এ ছাড়াও প্রতিটি আশ্রয়কেন্দ্রে উপস্থিত সকলের মাঝে শুকনো খাবার ও খিচুড়ি বিতরণ করা হচ্ছে।

jagonews24

জামালপুর স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতরের (এলজিইডি) সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. সায়েদুজ্জামান সাদেক জানান, জেলায় ভয়াবহ বন্যায় ১৭০০ কিলোমিটার সড়ক পানিতে তলিয়ে আছে। কয়েকটি ছোট বড় ব্রিজ আংশিক ও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানির প্রচণ্ড তোড়ে জেলার অধিকাংশ সড়কের ক্ষতি হয়েছে।

জামালপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল হক জানান, বন্যা মোকাবিলায় প্রশাসনের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে। পাশাপাশি ত্রাণের কোনো কমতি নেই। এখন ২০০ মেট্রিক টন চাল, নগদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা ও গো খাদ্যের জন্য দুই লাখ টাকা মজুত রয়েছে। চারদিকে পানি থাকায় ত্রাণ পৌঁছাতে একটু দেরি হচ্ছে বলে তিনি জানান।

  • সর্বশেষ - মহানগর