ময়মনসিংহ, , ১৫ আশ্বিন ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা‘ নেতাদের বিষয়ে ব্যবস্থার দাবি আ.লীগে

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

‘উড়ে এসে জুড়ে বসা‘ নেতাদের বিষয়ে ব্যবস্থার দাবি আ.লীগে

প্রায় এক যুগ ধরে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এতো দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকার কারণে দলটির ছায়ায় পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছে সুযোগসন্ধানীরা। এ সুবিধাভোগীরা নিজেদের স্বার্থ হাসিলের কর্মকাণ্ডে দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে ফেলছে। জি কে শামীম, শামীমা নূর পাপিয়া, ও সাহেদ করিমকাণ্ডের পর দলটির ভেতরে এমন সুবিধাভোগীদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি উঠেছে। রাজপথ থেকে রাজনীতি করে আসা নেতারা বলছেন, দলের অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনে ছিলেন না, তবে মূল দলের বিভিন্ন পর্যায়ে পদ বাগিয়ে নিয়ে প্রতাপ দেখিয়ে চলেছেন—এমন ব্যক্তিদের বিষয়ে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া দরকার।


আওয়ামী লীগের ভ্যানগার্ড হিসেবে পরিচিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা বলছেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের গণমুখী চরিত্র ধরে রাখতেই অনুপ্রবেশকারী ও আদর্শের প্রশ্নে আপসকামীদের বিরুদ্ধে দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করতে হবে।


সাবেক ছাত্রনেতারা বলছেন, টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় আওয়ামী লীগে অনেক সুযোগসন্ধানীর অনুপ্রবেশ করেছে। এরা বিভিন্ন উপায়ে দলের বিভিন্ন উপ-কমিটিতেও ঢুকে গেছে। তাদের কাছে আদর্শের চেয়েও মুখ্য বিষয় থাকে দলীয় পদ-পদবি ব্যবহার করে অপকর্ম করে আর্থিকভাবে লাভবান হওয়া। এতে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার। এসব অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে আগামীতে সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই ‘উড়ে এসে জুড়ে বসা’ পদবিধারী অপকর্মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।


তারা বলেন, সাহেদ করিম, জি কে শামীম ও শামীমা নূর পাপিয়াই শুধু নন, আওয়ামী লীগের পরিচয় ব্যবহার করে অপকর্ম করছেন, এমন সুবিধাভোগীর সংখ্যা গুনে শেষ হবে না। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকায় বিভিন্ন দল থেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কাঠামোয় অনুপ্রবেশ ঘটেছে। কিছু কেন্দ্রীয় নেতা নিজেদের প্রটোকল বাহিনী বড় করতে বিএনপি-জামায়াত-শিবিরের নেতাকে দলে ভেড়ান। কখনোই তাদের রাজনৈতিক খতিয়ান দেখেননি। কেউ কেউ বিশেষ সুবিধা নিয়েও পদ-পদবি দিয়েছেন। কিংবা সহযোগী সংগঠনের পদ দিতে বাধ্য করেছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের। এখন সময় এসেছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার।


সাবেক এক ছাত্রনেতা  বলেন, এই সরকার ক্ষমতায় আসার পরে বিভিন্ন সময় দলের পদবি ব্যবহার করে অপকর্মকারীদের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হতে দেখা যাচ্ছে। গ্রেফতার হওয়ার পরে জানা যাচ্ছে, এরা কখনোই ছাত্রজীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার রাজনীতি করেনি। তারা কোনো আদর্শকে ধারণ করে না। এদের আদর্শ হলো দুর্নীতি করে টাকা কামানো। এসব ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে এসেছেন এমন কেউ গ্রেফতার হয়েছেন, তা দেখা যাচ্ছে না তেমন।


কারণ হিসেবে ওই নেতা বলেন, যারা ছাত্র রাজনীতি করেছিলেন তারা দলের আদর্শ বাস্তবায়নে অনেক ত্যাগ ও শ্রম দিয়েছেন। দল যে অবস্থানে থাকুক না কেন, দলের ভালো চান তারা। তাই তারা এমন কোনো কাজ করেন না, যাতে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।


কয়েকজন ছাত্রনেতা বলেন, দলের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটিই সাহেদ মার্কা নেতাদের জন্ম দেয়। কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুরোধে নাম পরিচয়হীন অনেকেই কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য বনে যান এবং পরে দাপুটে নেতা হয়ে ওঠেন। হোমড়া-চোমড়াও এরাই হন। আর এরাই দলের নাম ভাঙিয়ে ভাবমূর্তি নষ্ট করেন। তারা মুখে মুখে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বললেও কর্মে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের ধারে-কাছেও নেই। তাদের আদর্শ হচ্ছে টাকা কামানো। আদর্শহীন সুযোগসন্ধানী এই গ্রুপের কারণে দল বিপর্যয়ে পড়বে। তাই দলকে বাঁচাতে ও গতিশীল করতে হলে আদর্শ এবং আন্দোলন-সংগ্রামে পরীক্ষিত সাবেক ছাত্রনেতাদের বাছাই করে তাদের নিয়ে আসতে হবে। তাদের সুযোগ করে দেয়া গেলে দল অনেক এগিয়ে যাবে।


জি কে শামীম, শামীমা নূর পাপিয়া ও সাহেদ করিম; বিভিন্ন অপকর্মে গ্রেফতার এ তিনজনই আওয়ামী লীগের পরিচয় দিয়ে আসছিলেন


এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান বলেন, অনুপ্রবেশকারীদের বিষয়ে ইতোমধ্যেই বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা দলের প্রধান হিসেবে উদ্যোগ নিয়েছেন। সেভাবে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে। সেই তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন তিনি।


ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক অজয় কর খোকন বলেন, আমারও অনেক জায়গায় নেতা-মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ হয় না। অথচ এরা তাদের সঙ্গে বসে লাঞ্চ-ডিনার করে। সাহেদও উপ-কমিটির নেতা, আমিও উপ-কমিটির নেতা। রাজনীতিটা এমনই হয়ে গেছে।


ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সীমান্ত তালুকদার বলেন, আমরা যারা আদর্শের রাজনীতি করেছি তারা নেতাদের সামনে, মন্ত্রীদের সামনে গেলে একরকম দূর দূর করে, যা বাইরে প্রকাশও করতে পারি না। অথচ সাহেদমার্কা নেতারা গেলে তাদের কাছে কদর পায়। ওই সময় ভীষণ হতাশ হয়ে পড়ি। যাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, সেখানে পচন ধরেছে বলেই পাপুল (কুয়েতে গ্রেফতার এমপি কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল), পাপিয়া ও সাহেদদের ঘটনা বের হয়, আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়।


ছাত্রলীগের সাবেক গণশিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আবু আব্বাস ভুঁইয়া বলেন, যে পরগাছা-আগাছাদের কোনো দুর্দিনে রাজপথে দেখা যায়নি, আজ তাদের দাপট সর্বক্ষেত্রেই। এসব পরগাছাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সরকার ও দলকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হচ্ছে। বঙ্গবন্ধু কন্যার উন্নয়নের অগ্রযাত্রার সফলতা এদের কর্মকাণ্ডে ম্লান হচ্ছে। পরগাছাকে দ্রুত দল থেকে বের করে দিয়ে শাস্তি নিশ্চিত করার সঙ্গে সঙ্গে এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের চিহ্নিত করতে হবে।

  • সর্বশেষ - রাজনীতি