ময়মনসিংহ, , ৩০ শ্রাবণ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

মফিজ এবং জল-পেয়ারার গল্প

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

মফিজ এবং জল-পেয়ারার গল্প

ফাত্তাহ তানভীর রানা

দৃষ্টিজুড়ে বিস্তীর্ণ জলরাশি। এই সময় এই গ্রামে মাঠের পর মাঠ ধানে-জলে ভরে থাকার কথা ছিল। সাধারণত প্রত্যেক বছর এই সময়ে এই এলাকার মাঠ ধানে-জলে মিলে-মিশে একাকার থাকে। কিন্তু এ বছর কী যে হলো! কোথা থেকে পানি এসে গোটা মাঠসহ সব ডুবিয়ে দিল। গোটা মাঠের একবিঘা জমিও আর নেই, সব পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এর সাথে তলিয়ে গেছে আহমপুরের মানুষের স্বপ্ন! কত মানুষের কতই না ইচ্ছা করেছিল; করোনা চলে গেলে সব কিছু স্বাভাবিক হবে। এলাকার মানুষ আবার ঘুরে দাঁড়াবে, সকল শ্রেণিপেশার মানুষ আবার কাজে উদ্যমী হবে।


নদী উপচে পানি এই গ্রামে ঢুকে পড়েছে; ডুবে গেছে শত শত ঘর-বাড়ি। গ্রামের কিছু উঁচু বাড়ি শুধু পানিতে ডোবেনি। সেখানে অনেকেই নিরুপায় হয়ে আশ্রয় নিয়েছে। গ্রামের প্রধান রাস্তাটিও এখন পানির নিচে। এই গ্রামেই আখিজাদের বাড়ি। আখিজা ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পোড়ালেখা করেছে। এখন মাঝে মাঝে বাবার সাথে কাজ করে। গত বছর থেকে তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়েছে। আখিজা বাবার জমিতে কাজ করে, বাবার সাথে নাও নিয়ে মাছ ধরতে যায়। একদিন মেম্বার চাচা বলল, ‘কেরে মফিজ, তুই জুয়ান মাইয়ারে লিয়ে মাছ ধরিস ক্যা? অর বিয়ার বয়স হৈছে, অক বিয়ে দেওয়া লাগবি নারে?’ আখিজার আব্বা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ওই যদি আমার পুলা হইতো আমার সাথে আইসত্ত না? এখন বিটা ছাওয়াল নাই, তাই কাজে-কামে অরে লিয়ে আসি। আমি তো দোষ দেইখলাম না; তুমি আবার কী বুঝলা মেম্বার? আর মাইয়াডার কতই বয়েস হইছে?’


তারপর থেকে মফিজ মিয়া আখিজাকে কাজের সময় সাথে খুব একটা নিতো না। আখিজার একটি নতুন বোন হয়েছে। বাবার নামের সাথে মিল রেখে নাম রেখেছে মফিজা খাতুন। আখিজার মায়ের নাম হাফিজা খাতুন। হাফিজার মেয়ের নাম আখিজা-মফিজা। আখিজাদের একটি পেয়ারার গাছ আছে। এই গাছটি আখিজা নার্সারি থেকে এনে লাগিয়েছিল। খুবই সুস্বাদু আর মিষ্টি পেয়ারা, আকারে-ফলনেও ভালো।


মফিজ মিয়ার চোখ মাঠে যতদূর যায়; সে শুধু পানি ছাড়া আর কিছুই দেখে না। মফিজ বাড়ির পাশেই জাল দিয়ে মাছ ধরছে; নৌকা নিয়ে আর বেশি দূরে যায় না। অল্প জমিতে সে আমন ধান বুনেছিল, তা-ও ডুবে গেছে। পানি যে কবে চলে যাবে, কে জানে? ঘরে যে চাল ছিল, তা-ও শেষ। মাঝে মাঝে ত্রাণ দেওয়ার লোক এলে মফিজ লাইনে দাঁড়ায়। কখনো কখনো ত্রাণ পায় আবার ত্রাণ শেষ হয়ে গেলে কিছুই পায় না। কিন্তু স্যারেরা রিলিফ ভুল করে কম নিয়ে এলেও ছবি তুলতে ভুল করে না! মাঝে মাঝে চেয়ারম্যান আসে, সাথে মেম্বার আর পাতি নেতারাও থাকে।


বিভিন্ন আশার বাণী মফিজের কানে আসে। যেমন- ধানের বীজ পাবে, ঋণ পাবে, ঘরের টিন পাবে, আরও কত কী পাবে! মফিজ কখনোই কিছু পায়নি। ‘আরে এইগুলান তো মেম্বার-চেয়ারম্যানদের কাছের মানুষই সবাই পায় না। বিলি হবার আগেই শ্যাষ!’ অনেকেই মফিজের সাথে পানিতে নেমে ছবিও তোলে! ফটো তোলার কথা বললে মফিজের খুব রাগ হয়। মনে মনে মফিজ ভাবে, ‘আরে শালার বেটা শালা; আমার নাই রাত্তিরের খাওয়ার, দুপুরে এখনো কিছুই পেটে পড়ে নাই; আর তুমি আইছো ফডো তুইলবার? মস্করা কর আমার সাথে?’ ভাবতে ভাবতে মফিজ বড় মিয়ার বাড়ি গিয়ে টিউবওয়েল থেকে পানি নেয়, তারপর নৌকায় ওঠে। মফিজের গামছায় কয়েকটি পেয়ারা মোড়ানো ছিল। মাছ ধরতে আসার সময় বউ তাকে পেয়ারাগুলো দিয়েছিল।


বেলা তখন দ্বিপ্রহর পেরিয়েছে, মফিজের পেটে খুব ক্ষুধা। মফিজ পানি খাচ্ছে আর পেয়ারাগুলো ধুচ্ছে। মফিজ লক্ষ্য করলো, মাস্টার মশাই নাও নিয়া এদিক আসছে।

‘কিরে মফিজ কী খাচ্ছিস?’

‘জল খাই মাস্টার মশাই।’

‘আর ওই গোল গোল?’

‘পেয়ারা খাই গো; গাছে ধরেছে অঢেল। খাবেন না কি?’

‘না রে; দুপুরে আর কোনো খাবার সাথে নেই রে?’

‘না গো! ধান যা পেয়েছি বিক্রি করে ধার শুধেছি। মানুষের বাড়িত কাজ করতেই চাই, কেউ এই বন্যায় এখন কামে লিবিনি? গেরামে এখন সগোলাই মাছ মারে। এই মাছও কেউ কিনবি নানি। আর ঘরের চাউল শ্যাষ কয়েক দিন আগেই। কী খাব, জল আর পেয়ারা ছাড়া? গাছে পেয়ারা না ধরলে না খায়ে মরে যাওয়া লাগতো। আর ধার-কর্জ মেলাই হৈছে, আর কত? এখন তো সগলেইরি হাতের অবস্থাই বুজেন। লোক-ডাউনে তো কামের লাইগ্যা শহরেই কেউ যাতে পারে নাই, টাকা হাতে থাকে কিভাবে?’

‘বুঝি রে, সব বুঝি মফিজ। তবে এটাও ঠিক যে, খালি পেটে জল আর ভরা পেটে ফল।’

‘কী যে কন না মাস্টার মশাই! সব তো এক প্যাটেই জাবনি।’


মাস্টারের নৌকা চলতে লাগল; মফিজ জল-পেয়ারা খাচ্ছে। আর কেউ কোনো কথা বলল না। মফিজ ভাবছে, এরপরে কবে ত্রাণ আসবে। নিজের জন্য না হোক, মেয়েদের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ত্রাণের চাল।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য