ময়মনসিংহ, , ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

মীরপুরের নামধারী সাংবাদিক খোকার বিরুদ্ধে সহজ-সরল নারীদের ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

  বিশেষ প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

মীরপুরের নামধারী সাংবাদিক খোকার বিরুদ্ধে সহজ-সরল নারীদের ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গিয়ে সহজ-সরল নারীদের ব্ল্যাকমেইল করছেন ঢাকার মীরপুরের এমদাদুল হক খোকা। চিহ্নিত এই ব্ল্যাকমেইলারকে মীরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লক ও বেনারশী পল্লীর অনেকেই চিনেন ‘খোকা মামু’ হিসেবে। চোখে চশমা হাল্কা-পাতলা গড়নের এই ব্যক্তি নারীদের ফেসবুক আইডি ও সেলফোন নম্বর যোগাড় করে তাদেরকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে প্রেমের ফাঁদ পাতেন। নিজেকে অনেক বড় সাংবাদিক ও গার্মেন্টস-এর স্টকলট ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে ফেসবুক মেসেঞ্জারে চ্যাট, অডিও এবং ভিডিও কল ও সেলফোনে নানান কথাবার্তা বলে রেকর্ড করে সেগুলো হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। সম্মান এবং সংসারে অশান্তির ভয়ে অনেক নারী তার সাথে মেলামেশা করতে বাধ্য হন। যারা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পেরে নিজেদের সামলে নেন তাদের স্বামীকে খোঁজে বের করে স্ত্রীদের সম্পর্কে আজেবাজে কথা বলে সৃষ্টি করেন পারিবারিক অশান্তি। বিভিন্ন এলাকা থেকে নারী এনে আড্ডা এবং বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে সি ব্লক ও বেনারশী পল্লীতে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছেন ‘খোকা মামু’। বিভিন্ন মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পাওয়ার পর পুলিশের সংশ্লিষ্ট বিভাগ ব্ল্যাকমেইলার খোকার ৪টি ফেসবুক আইডি এবং একাধিক সেলফোন নম্বরের কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখছে। খুব শীঘ্রই এমদাদুল হক খোকার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।

জানা যায়, ‘ধুরন্দর’ এমদাদুল হক খোকার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার কলুকাঠি গ্রামে। পৈত্রিক সূত্রে মীরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লকের ৪ নম্বর সড়কের ১ নম্বর বাসায় বসবাস করেন। বাবা মরহুম আব্দুল হামিদ একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার ট্রান্সপোর্ট সুপারভাইজার ছিলেন। যৌবনে পা দিয়েই খোকা নানান অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। ১০ বছর আগে সাংবাদিকতা পেশায় নাম লিখান। মালিককে ‘ম্যানেজ’ করে দৈনিক ‘সোনালী খবর’ এর নির্বাহী সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। এভাবেই চলতে থাকেন ‘খোকা মামু’। ৩ বছর আগে শুরু করেন ‘মানবাধিকার সংবাদ’ নামের অনলাইন নিউজ পোর্টাল। এটি অন্যের মালিকানায় প্রকাশিত প্রিন্ট পত্রিকা। বিষয়টি জানাজানি হলে খোকা প্রকাশনা বন্ধ রাখেন। পরবর্তীতে শুরু করেন ‘দৈনিক বাংলার কাগজ’ নামে আরেকটি অনলাইন পোর্টাল। দেড় বছর আগে পত্রিকার মালিক বিষয়টি টের পেয়ে আইনী ব্যবস্থা নিতে চাইলে খোকা প্রকাশনা ছেড়ে দিয়ে রক্ষা পান। সূত্র মতে, ‘দৈনিক বাংলার কাগজ’ বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরের তালিকাভূক্ত প্রিন্ট পত্রিকা। ১০ মাস আগে খোকা আবারও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে ‘দৈনিক জাগো প্রতিদিন’ এর অনলাইন প্রকাশনা শুরু করেন। ডিএফপির তালিকাভূক্ত এই প্রিন্ট পত্রিকার মালিকও বিষয়টি টের পেয়ে প্রশাসনের শরণাপন্ন হলে খোকা এটিরও অনলাইন প্রকাশনা বন্ধ করে দেন।


সূত্র জানায়, নামধারী সাংবাদিক এমদাদুল হক খোকা ৩ বছর ধরে নারীদের ব্ল্যাকমেইল করে আসছেন। মীরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লক ও বেনারশী পল্লীতে তিনি নারীলোভী হিসেবে পরিচিত। তার ফেসবুক আইডিগুলো দেখলেই বুঝা যায় কি পরিমাণ এবং ধরণের নারীরা যুক্ত। ঘনঘন নারী পাল্টানো তার স্বভাব। সকাল থেকে দুপুর এবং বিকাল থেকে রাত পর্যন্ত এলাকার বিভিন্ন স্পট ও বেনারশী পল্লীর রাব্বানী হোটেলে আড্ডা দেন। আর বেটে-বলে মিলে গেলে প্রতারণার শিকার নারীদের নিয়ে যান ১০ নম্বর সেকশনের তৃতীয় শ্রেণীর একটি আবাসিক হোটেল এবং ১৪ নম্বর সেকশনে সানজিদা মোস্তফা নামের এক নারীর বাসায়। পরের ঘটনা সবার জানা। মাঝে মধ্যে সুযোগ বুঝে নারীদের বাসায় গিয়েও ফায়দা লুটেন এই ব্ল্যাকমেইলার। তার কথায় রাজি না হলেই শুরু হয় ব্ল্যাকমেইল। যারা বিপদ বুঝতে পেরে ইউটার্ন নেন তাদের কপালে নেমে আসে চরম অশান্তি। স্বামীদের ফেসবুক আইডি ও সেলফোন নম্বর যোগাড় করে বিভিন্ন কায়দায় সৃষ্টি করেন পারিবারিক অশান্তি। সূত্র মতে, খোকা সি ব্লকের ১৮ নম্বর সড়কের ২ নম্বর বাড়ির অফিসেও নারী নিয়ে আড্ডা এবং অসামাজিক কার্যকলাপে লিপ্ত হতেন। মালিক পক্ষের কাছে নারীসহ হাতেনাতে ধরাও পড়েন।

জানা যায়, ব্ল্যাকমেইলার এমদাদুল হক খোকা কৌশল অবলম্বন করে ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে ফেসবুকে পরিচিত হন মীরপুর কাজীপাড়ার শিক্ষিত ও সুন্দরী এক নারীর সাথে। নিজেকে অনেক বড় সাংবাদিক ও গার্মেন্টস-এর স্টকলট ব্যবসায়ী পরিচয় দিয়ে তার সাথে সম্পর্ক গভীর করেন। ওই বছরেরই মে মাসে তিনি বাসা পাল্টে পূর্ব শেওড়াপাড়ার অরবিট গলীর সাউথইস্ট মেঘনা আবাসনে যান। তখন থেকেই ব্ল্যাকমেইলার খোকা যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেন। খোকা সরল এই নারীর সাথে দেখা করে নানানভাবে নিজেকে জাহির করেন। ব্ল্যাকমেইল বুঝতে না পেরে এই নারী বিভিন্ন সময় খোকার সাথে ফেসবুক মেসেঞ্জারে চ্যাট, অডিও ও ভিডিও কল এবং সেলফোনে কথা বলেন। এই সুযোগে ‘ধুরন্দর’ খোকা নারীর স্বামী, সন্তান ও পরিবার সম্পর্কে সব জেনে নেন। এক পর্যায়ে তিনি নারীর ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে উত্যক্ত ও নানান রকমের কথাবার্তা বলতে থাকেন। এরই মধ্যে তার স্বামীকে নানান রকমের তথ্য দিতে থাকেন ব্ল্যাকমেইলার খোকা। বিষয়টি বুঝতে পেরে এই নারী ইউটার্ন নেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে খোকা নারীর সাথে তার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন জনের কাছে আজেবাজে কথা বলে ব্যক্তিগত জীবন বিষিয়ে তুলেন।


সূত্র জানায়, এমদাদুল হক খোকার কাছে এ পর্যন্ত ডজন খানেক নারী ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়েছেন। প্রতারণার শিকার হয়েছেন অর্ধশত পুরুষ। গত কয়েকদিন অনুসন্ধান করার সময় এমনই তথ্য দেন ব্ল্যাকমেইল এবং প্রতারণার শিকার নারী ও পুরুষ। একাধিক নারীর সাথে ব্ল্যাকমেইল করার প্রমাণ এখন আমাদের হাতে। খোকার ফেসবুক মেসেঞ্জারের অগণিত স্ক্রিনশট ও সেলফোনের কললিস্ট রয়েছে আমাদের কাছে। পরিবারের সদস্যরাও জানেন খোকার ব্ল্যাকমেইল এবং প্রতারণার কথা। বিষয়টি এখন মীরপুর ১০ নম্বর সেকশনের সি ব্লক এবং বেনারশী পল্লীর অনেকেরই জানা। নারী কেলেঙ্কারীর বিষয় নিয়ে স্ত্রীর সাথেও কয়েকবার খোকার বিবাদ সৃষ্টি হয়। এসব ঘটনায় তিনি বাবার বাড়ি চলে যান। পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করে খোকা স্ত্রীকে ফিরিয়ে আনেন। প্রতিবেশীদের অনেকেই সব জানেন। খোকার স্বভাব চরিত্রের কারণে পরিবারের সদস্যরাও তাকে এড়িয়ে চলেন। ৪ ভাই এবং ১ বোনের মধ্যে এমদাদুল হক খোকা সবার ছোট।

জানা যায়, ০১-০১-১৯৭০ তারিখে জন্ম এমদাদুল হক খোকা শুক্রাবাদের নিউ মডেল ডিগ্রী কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করলেও পরিচয় দেন মীরপুর বাংলা হাই স্কুল এন্ড কলেজ এবং ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজের। ফেসবুক প্রোফাইলেও তাই উল্লেখ করেছেন। একাধিক ফেসবুক আইডির মধ্যে ৩টিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকার কথা উল্লেখ করেছেন। এলাকাবাসীর সাথে প্রতারণা এবং অফিস ভাড়া না দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ‘মানবাধিকার সংবাদ’ নামের অনলাইন নিউজ পোর্টাল শুরু করার সময় তিনি সি ব্লকের ১৮ নম্বর সড়কের ২ নম্বর বাড়ির দ্বিতীয় তলার একটি অংশ ভাড়া নেন। শুরুতে অনিয়মিত ও শেষ দিকে ভাড়া না দেওয়া এবং অসামাজিক কার্যকলাপের কারণে বাড়ির মালিক গত বছরের নভেম্বর মাসে মালামাল রেখে খোকাকে বের করে দেন। এর পরই তার ব্ল্যাকমেইলে ধস নামে। ৩ মাস পর পার্শ্ববর্তী ১৪ নম্বর সড়কের ১২ নম্বর বাড়ির নীচ তলায় অফিস ভাড়া নেন ব্ল্যাকমেইলার খোকা। এখানেও সময় মতো ভাড়া পরিশোধ না করায় বাড়ির মালিক অফিস ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন। অন্যদিকে তদবিরের কথা বলে মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে খোকার বিরুদ্ধে।


সূত্র জানায়, নামধারী সাংবাদিক এমদাদুল হক খোকা বর্তমানে কোনো অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালাচ্ছেন না। ২ মাস আগেও অনিয়মিতভাবে ‘দৈনিক জাগো প্রতিদিন’ চালাতেন। নাম কাওয়াস্তে পত্রিকাটি চালালেও পরিচয় দিতেন ‘মানবাধিকার সংবাদ’ নামের আরেকটি অনলাইন পোর্টালের। সর্বশেষ ২ পত্রিকার পরিচয় দিয়ে খোকা নারী এবং পুরুষদের সাথে ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। পরিবর্তন করেছেন ব্ল্যাকমেইল ও প্রতারণার কৌশল। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সবার কাছে পরিচয় দেন গার্মেন্টস-এর স্টকলট ব্যবসায়ী হিসেবে। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য নানানভাবে উদ্বুদ্ধ করেন ঢাকার বাইরের নামধারী সাংবাদিকদের। পরিচয়পত্র দিয়ে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নামধারীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা। যার কাছ থেকে যেমন নিতে পারেন। টাকা ও বায়োডাটা পাঠালেই পরিচয়পত্র বানিয়ে পাঠিয়ে দেন কুরিয়ারে। এসব নামধারী সাংবাদিকরাই পরবর্তীতে প্রকৃত সাংবাদিকদের জন্য বিষফোঁড়ায় পরিণত হন।

জানা যায়, ব্ল্যাকমেইলার এমদাদুল হক খোকা মীরপুর ১০ নম্বর সেকশনের বিভিন্ন স্পট থেকে সাংবাদিকতার নাম ভাঙ্গিয়ে চাঁদাবাজি করেন। চাঁদা না দিলে তার অনলাইন নিউজ পোর্টালে খবর প্রকাশের হুমকি দেন ভুক্তভোগীদের। ব্ল্যাকমেইল এবং পুলিশী ঝামেলা থেকে মুক্ত থাকতে অনেকেই চাঁদা দিতে বাধ্য হন। এই ব্ল্যাকমেইলারের জ্বালায় এলাকার অনেকেই অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। আবার অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলেন। মাদক স্পট, অবৈধ ব্যবসা এবং অবৈধ স্থাপনা থেকে নিয়মিত চাঁদা নেন খোকা। চাঁদাবাজির ক্ষেত্রে তাকে সহযোগিতা করেন তারই ২ সহযোগী। অভিযোগ সম্পর্কে সরাসরি বক্তব্য নেওয়ার জন্য এমদাদুল হক খোকার বাসায় গেলে তিনি দেখা করেন নি। সেলফোনে কথা বলার সময় তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।


  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর