, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

মেহেরুন্নেছার গল্প ‘নিশীথের কান্না’

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

মেহেরুন্নেছার গল্প ‘নিশীথের কান্না’

অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকায়। তা না হলে কি আর এমন কাহিল অবস্থায় পড়ি! বাড়িতে গেলাম, বৃষ্টি উধাও। তার উপর গ্রামের বাড়িতে নতুন দালান। দালানের তিনদিক গাছপালা শূন্য। ফলে দিনের বেলা বাঘের মত গর্জে ওঠা রোদে আমরা সেদ্ধ হতাম। রাতেও গরমে-ঘেমে সবার অবস্থা কাহিল। কেবল দালানের একদিকে বড় বড় কড়ই, আম ও বাঁশঝাড় নুয়ে আছে। এই বৃক্ষের ছায়ায় যারা ঘুমিয়ে আছে; তারা এখন পরপারের বাসিন্দা। পুরোনো বাড়ির পারিবারিক কবরস্থান এখানে। আমি যে কক্ষটিতে ঘুমাতাম, তার পাশে প্রাচীর টপকালেই সরু পথ। তারপরেই সারি সারি কবর।

গ্রামের ময়-মুরুব্বিরা কবর নিয়ে যতই ভয় কাটানোর চেষ্টা করে; ততই রাতের বেলা ভয় আমাকে আঁকড়ে ধরে। অবশ্য তারা জানে না ছোটকাল থেকেই আমি গোপনে ভূত-প্রেত-ড্রাকুলা-ভ্যাম্পায়ার নিয়ে কতটা মেতে থাকি। রাতে ঘুমানোর সময় এই মেতে থাকার ফলাফল টের পাই। চোখের উপরে পাতলা কাঁথা দিয়ে রাখি যাতে অশরীরী কিছু আমাকে না পায়।

সেদিনও এমন করে কাঁথা মুড়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। চট করে ঘুম ভেঙে গেলো। চারপাশ ভীষণ অন্ধকার। নিস্তব্ধ হয়ে আসছে পৃথিবী। কারণ ফ্যানের ঘূর্ণন কমে আসছে।

কটা বাজে? বালিশের তলা থেকে মোবাইল বের করলাম। দূরর! মোবাইল হ্যাং! অনেক চেষ্টা করলাম সচল করতে। কিছুতেই কিছু না। বিরক্তিতে ইচ্ছে করছে মোবাইলটা ছুঁড়ে মারি। মোবাইল চালু থাকলে ফেসবুকিংয়ের মাধ্যমে অন্তত দম বন্ধ হওয়া পরিস্থিতি থেকে রেহাই মিলতো। এখন তো গরমে সেদ্ধ হতে হবে। ঘরের অন্য কক্ষের সদস্যরা এই বিটকেলে পরিবেশেও নিঃসাড় ঘুম! আমি কেবল গরমে নাকাল।

একবার ভাবলাম, কক্ষ লাগোয়া বারান্দায় গিয়ে চেয়ারে বসি। ওরে বাপ! বারান্দার কাছেই কবরস্থান! কবরের কথা ভাবতেই গা ছমছম করে উঠলো। সময় আর এগোচ্ছে না যেন! মনে হচ্ছে, পুরো পৃথিবী তার ঘুরপথে অজানা কারণে থমকে আছে।

হঠাৎ কান্নার শব্দ! ভালো করে কান পাতলাম! স্পষ্ট মেয়েলি কান্নার গুনগুন! এতো রাতে কবরস্থানে কে কাঁদে?

সত্যি আমি দারুণ ভয় পেয়ে গেলাম! কণ্ঠনালী শুকিয়ে জিহ্বা অবশ প্রায়। উঠে গিয়ে গলা ভেজানোর প্রশ্নই আসে না। মনে হলো, কে যেন হাত-পায়ের সন্ধিগুলো ভেঙে দলা পাকিয়ে রেখেছে। টাঁইটাঁই গরমে অসহ্য হওয়া সত্ত্বেও আগাগোড়া নিজেকে আবার কাঁথায় ঢেকে ফেললাম। দরদর করে যত ইচ্ছে ঘাম ঝরুক। কিন্তু না! বেশিক্ষণ ঘাম ঝরলো না! চট করে কারেন্ট চলে এলো। সঙ্গে সঙ্গে পুরো পৃথিবী কী এক মধুর ঝংকারে সরব হয়ে উঠলো। ‘যন্ত্রসভ্যতা’ কথাটির মধ্যে যত বিরক্তি লুকিয়ে থাকুক না কেন, মানুষের কর্ণকুহরের অভিযোজনটা ঠিক এমনি যে, যান্ত্রিক শব্দবিহীন জগত এখন আর মানুষের কাছে স্বাভাবিক ঠেকে না। সিলিং ফ্যানের খরখর ধ্বনি এখন সভ্যতার আরাম-আয়েশের মর্মর ধ্বনি।

অজ্ঞাতেই বারকয়েক কবরস্থানের দিকে কান পাতলাম। নাহ! এখন আর কোনো শব্দ পাচ্ছি না। মনেমনে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে নিজের সাথে যুক্তিতর্ক করেই চলেছি। ভাবলাম, হয়তোবা আশেপাশের কোনো ঘরের দাম্পত্য কলহের জের হতে পারে। কিন্তু আশেপাশের বসতিগুলো তো আমার ঘর হতে বেশ দূরে! ওসব ঘরের কান্না এখানে আসার কথা না। তাহলে এ নিশীথের কান্না কার!

আরে! এতো ভাবছি কেন! এখন তো আর কান্না শোনা যাচ্ছে না। নিজেকেই নিজে তিরস্কারের ভঙ্গিতে প্রবোধ দিলাম। জ্বীন-ভূত, দেও-দানো কিংবা সুন্দরী ভ্যাম্পায়ার নিয়ে অতি ভাবনার ফসল আমার উপর ভালোই ভর করেছে।

এতোসব ভাবনার আগডুম-বাগডুমের মধ্যেই ইউনিভার্সিটি লাইফে দেখা একটি ভূতের বিদেশি মুভির কথা মনে পড়ে গেলো। তখন আমাদের বাসায় টিভি কিংবা ভিসিয়ার কোনোটাই ছিলো না। বড়লোক বান্ধবীর বাসায় বসতো ভিসিয়ারে বিভিন্ন মুভি দেখার আসর। একদিন মারাত্মক ভয়ের ও প্রেমের একটি মুভি দেখেছিলাম। নায়িকা একতরফা ভালোবাসে নায়ককে। বহুচেষ্টা করেও নায়কের মন পেতে ব্যর্থ নায়িকা। ফলে নায়কের অন্য কাউকে জীবনসঙ্গী করে নেওয়াটা মেনে নিতে পারেনি সে। মনের দুঃখে নায়িকা গলায় ফাঁস দেয়।

এদিকে নায়ক বিয়ের পর এক বুনো পাহাড়ি এলাকায় হানিমুনে যায়। যখনই নায়ক স্ত্রীর সাথে ভালোবাসায় মত্ত হয়; ঠিক তখনই বনভূমি থেকে করুণ কান্নার সুর ভেসে আসে। এ সুর যেন দূর কোনো অদেখা ভুবন থেকে তরঙ্গায়িত হতো। আশ্চর্যজনক হলো, এ বিলাপ কেবল নায়ক শুনতে পেতো, তার স্ত্রী শুনতে পেতো না। নায়কের কাছে মনে হতো এ কান্না সেই মেয়েটির, যার ভালোবাসাকে সে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেছে। নায়ক তখনই স্ত্রীর ভালোবাসার বেষ্টনি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতো। তাদের ভালোবাসার চূড়ান্ত আসর জমে উঠতে কেউ যেন অনবরত বাঁধা দিয়ে যাচ্ছে।

একরাতে বাথরুম থেকে উঠে আসা হাত তার স্ত্রীর গলায় ফাঁস পরিয়ে বাথরুমে লটকে রাখে। আর সাদা গাউন পরিহিতা অপরূপা নায়িকা সম্মোহনের বেড়াজালে নায়ককে ঘর থেকে বের করে গহীন বনের দিকে নিয়ে যায়। নায়িকা ভ্যাম্পায়ার রূপে সম্মোহিত নায়কের গলায় তীক্ষ্ণ দাঁত বসিয়ে দেয়। এভাবে নায়িকা ভালোবাসার মানুষটিকে ভ্যাম্পায়ার বানিয়ে চিরতরে নিজের করে নেয়।

ভাবতে ভাবতে চোখটা লেগে এলো। আচমকা পৃথিবীর সব গুঞ্জন আবার থেমে গেলো। গ্রাম এলাকায় সচরাচর কারেন্টের যে দশা হয় আর কি! মানে দ্বিতীয়বারের মত কারেন্ট চলে গেলো। ঘুম গাঢ় হওয়ার একদমই সুযোগ পেলো না। গরম লাগছে ভীষণ। মনে মনে কারেন্টওয়ালাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করতে লাগলাম।

এমন সময় সেই গুমরে ওঠা কান্না! আমি হতবিহ্বল! বিছানা ছেড়ে উঠলাম। আস্তে গিয়ে আমার ইউনিভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেকে জাগালাম। যতটা নিঃশব্দে পারা যায়, ঠিক ততটাই ভারসাম্যপূর্ণ শক্তি প্রয়োগে কবরস্থান লাগোয়া বারান্দার ছিটকিনি খুললাম। বর্ষা শেষ হয়ে শরৎ এসে পড়েছে। পূর্ণিমার চাঁদ খণ্ডখণ্ড পেঁজা তুলোর মতো মেঘের আড়ালে পড়ে গেছে। গাছের পাতার ফাঁক গলে আসা নিষ্প্রাণ আলো আজ বড্ড বেশি নিস্তেজ আর রহস্যময়! আমার ছেলে টর্চ মারলো কবরস্থানের দিকে। গলা খাঁকারি দিলো। নাহ! নিঃসীম অন্ধকার পুরো গ্রামকে গ্রাস করে আছে। একটি জনপ্রাণির সাড়া নেই। চারদিকে বড়বড় বৃক্ষ এবং গুল্মেরা পরিবেশটাকে খুব ভারি করে রেখেছে।

মা-ছেলে যার যার বিছানায় চলে এলাম। এবার আর ঘুম আসছে না। ঘুমানোর চেষ্টাও করছি না। শরীর-মন দুটোই ভার।

শেষরাতের ভেজা কোমলতা পেরিয়ে দূরের কোনো মসজিদের মাইক সচকিত হয়ে উঠলো। মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠের প্রতিধ্বনি চাপা পড়ে গেলো কুকুরের কুঁইকুঁই স্বরে। আশ্চর্য! আজ কুকুরগুলোও সমস্বরে কাঁদছে! রাত্রির নিস্তব্ধতা ভঙ্গ হলে হয়তো এরা প্রতিদিন এরকম করে। ঘুমের আচ্ছন্নতাবশত আমি শুনতে পাই না। জানালার দিকে তাকালাম। ততক্ষণে পর্দার ফাঁক দিয়ে বাইরের মৃদু আলোর পরশ বোঝা যাচ্ছে। তাহলে কাঙ্ক্ষিত ভোর এলো। নিজেকে বিছানায় আর একদণ্ড আটকে রাখতে পারলাম না। কে যেন সজোরে ধাক্কা মেরে উঠিয়ে দিলো। সোজা বারান্দার ছিটকিনি খুলে ফেললাম। দৃষ্টি আটকে গেলো কবরস্থান ঘেঁষে সটান দাঁড়িয়ে থাকা বয়সের ভারে ন্যুব্জ আমগাছের মোটা ডালের দিকে। আবছায়া পরিবেশে ঠিকঠাক মতো মনুষ্য অবয়ব ঠাওর করে উঠতে পারছি না। মনে পড়লো, আরে আমার চোখে তো চশমা নেই। তাড়াতাড়ি বিছানায় এসে বালিশের পাশ থেকে চশমাটা নিয়ে আবার বারান্দায় এলাম।

হায় হায়! এ কী দেখছি! নীলের উপর কালো প্রিন্টের সালোয়ার-কামিজ পরা এক তরুণী আমের মোটা ডালটাতে ঝুলে আছে! সত্যি দেখছি তো! হ্যাঁ সত্যি তো! জগৎ-সংসার আমার চারপাশ থেকে সরে যাচ্ছে! আমি যেন বিশাল এক গর্তে পড়ে যাচ্ছি। গভীর অন্ধকার তলিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আমাকে! আমি কিছু বলতে চাই কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না।

তারপর নিজেকে যখন আবিষ্কার করলাম, দেখি সম্মুখে পুলিশ। এবার চিৎকার করে উঠলাম। ‘মেয়েটি কই? মেয়েটি কই? ওকে গাছ থেকে নামিয়েছে? আপনারা কারা?’

আমার হাজবেন্ড কপালে হাত রাখলেন। বললেন, ‘আজ সকালের দিকে মানুষের হট্টগোল আর চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙে যায়। আমাদের ঘরের পাশে তফাদার বাড়ির এক মেয়ে গলায় ফাঁস দিয়েছে। এদিকে তুমি অজ্ঞান অবস্থায় বারান্দায় পড়েছিলে। তারপর তোমাকে আমরা তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে এলাম। এখন বলো আসলে গতরাতে কী ঘটেছে!’
পুলিশের দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘উনারাও এসেছেন এ ব্যাপারে তোমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে।’

আমার সব মনে পড়ে গেলো। তবে টের পাচ্ছি, মস্তিষ্কের প্রবাহ দ্রুত ওঠানামা করছে। নির্ঘাত মেয়েটিকে আমি বাঁচাতে পারতাম। কেন তখন ঘরের সবাইকে জাগালাম না! কেন লাইট নিয়ে বাইরে গিয়ে খোঁজ করলাম না। কথাগুলো মাথার মগজে কিলবিল করছে। সামনে যারা বসে আছে তাদের বললাম, ‘মেয়েটি কি মরে গেলো? মেয়েটি কি মরে গেলো?’ বারবার এই প্রশ্ন করতে করতে আবার একরাশ অন্ধকার আমাকে গ্রাস করে নিলো।

কতক্ষণ পরে চোখ খুললাম মনে নেই। পুলিশের লোকটি এগিয়ে এলো। বললো, ‘ম্যাডাম, ধীরে-সুস্থে আমাদের একটু বলুন, আপনি মেয়েটির মৃত্যু নিয়ে কি কিছু দেখেছেন কিংবা জানেন?’

আমি চোখ বন্ধ করলাম। চোখ খুলে রাখতে ক্লান্ত বোধ করছি। চোখ মুদে রেখেই গতরাতের ঘটে যাওয়া ঘটনা সবিস্তারে বলে চললাম। হাসপাতালের উৎসুক জোড়া জোড়া চোখ আমার উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।

পরে শুনেছিলাম, অপরূপা মেয়েটির হাজবেন্ড ইতালি থেকে করোনা নিয়ে দেশে এসেছিলো। এই ভাইরাস তার স্বামীকে ছিনিয়ে নেয়। এরপর মেয়েটিকে শ্বশুরবাড়ির লোকজন জোরপূর্বক বাবার বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। মেয়েটি বেঁচে গেলেও তার বাবা-মা করোনায় মারা যায়। ভাইদের পরিবার থেকে বিতাড়িত মেয়েটির স্থান হয় জীর্ণ পরিত্যক্ত রসুই ঘরে। একলা-উপোস দিন কাটালেও প্রায় রাতে তাকে ধর্ষিত হতে হতো। একসময় মেয়েটি বুঝতে পারলো, তার ভেতরে আরেকটি অস্তিত্ব বেড়ে উঠছে। তখনি সে নিজেকে নিঃশেষ করে দিলো।

হায় রে মানুষ! জীবনব্যাপী সে বেলা-অবেলায় কতদিকে হাত বাড়ায়। কত আয়োজন চলে। কখনো শরতের এলোমেলো বাতাসে, গ্রীষ্মের তীর্যক রোদ্দুরে, বর্ষার ঘোলাকাদায় টিপেটিপে অথবা শীতের শীর্ণকায় অনুভূতিতে আচ্ছন্ন পথিকের সব আয়োজন অবশেষে ব্যর্থ হয়ে যায়। বিশাল এক কান্নার স্রোত মানুষকে জীবনভর তাড়িয়ে বেড়ায়।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ, কুমিল্লা।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য