ময়মনসিংহ, , ৫ কার্তিক ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

যেসব মুজিজা লাভ করেছিলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

যেসব মুজিজা লাভ করেছিলেন হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম

পুরুষের স্পর্শ ছাড়াই আল্লাহ তাআলার ‘কুন ফাইয়াকুন’ নির্দেশে হজরত মারইয়াম গর্ভধারণ করেছিলেন। তার গর্ভে জন্ম নিয়েছিল নবি ও রাসুল হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম। তিনিই দোলনায় থাকা অবস্থায়ই বড়দের মতো কথা বলতেন।

নবুয়ত ও রেসালাতের দায়িত্ব লাভের পর আল্লাহ তাআলা তাঁকে বেশ কিছু অলৌকিক ক্ষমতা তথা মুজিজা দান করেছিলেন। মুজিজা লাভের সেসব বর্ণনা উঠে এসেছে পবিত্র কুরআনে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَيُعَلِّمُهُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالإِنجِيلَ - وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنِّي قَدْ جِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ أَنِّي أَخْلُقُ لَكُم مِّنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ فَأَنفُخُ فِيهِ فَيَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِ اللّهِ وَأُبْرِئُ الأكْمَهَ والأَبْرَصَ وَأُحْيِـي الْمَوْتَى بِإِذْنِ اللّهِ وَأُنَبِّئُكُم بِمَا تَأْكُلُونَ وَمَا تَدَّخِرُونَ فِي بُيُوتِكُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لآيَةً لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ - وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ فَاتَّقُواْ اللّهَ وَأَطِيعُونِ - إِنَّ اللّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَـذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ
‘আর তাকে তিনি শিখিয়ে দেবেন কিতাব, হেকমত, তওরাত এবং ইঞ্জিল।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ৪৮)

‘আর বনি ইসরাইলদের জন্য রাসুল হিসেবে তাকে মনোনীত করবেন। তিনি বললেন- নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে তোমাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে নিদর্শনসমূহ নিয়ে এসেছি। (তাহলো)-
- আমি তোমাদের জন্য মাটির দ্বারা পাখীর আকৃতি তৈরী করে দেই।
- তারপর তাতে যখন ফুৎকার প্রদান করি, তখন তা আল্লাহর হুকুমে উড়ন্ত পাখীতে পরিণত হয়ে যায়।
- আর আমি সুস্থ করে তুলি জন্মান্ধ এবং শ্বেত কুষ্ঠ রোগীকে।
- আর আমি আল্লাহর হুকুমে মৃতকে জীবিত করে দেই।
- আর আমি তোমাদেরকে বলে দেই যা তোমরা খেয়ে আস এবং যা তোমরা ঘরে রেখে আস।
এতে প্রকৃষ্ট নিদর্শন রয়েছে, যদি তোমরা বিশ্বাসী হও।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ৪৯)

‘আর এটি পূর্ববর্তী কিতাবসমুহকে সত্যায়ন করে, যেমন তওরাত। আর তা এজন্য যাতে তোমাদের জন্য হালাল করে দেই কোন কোন বস্তু যা তোমাদের জন্য হারাম ছিল। আর আমি তোমাদের কাছে এসেছি তোমাদের পালনকর্তার নিদর্শনসহ। কাজেই আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ৫০)

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। তাঁর ইবাদত কর, এটাই হলো সরল পথ।‘ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ৫১)

আয়াতের ব্যাখ্যামূলক অনুবাদ
হে মারইয়াম! এ ভাগ্যবান সন্তানের ফজিলত হবে এই যে, আল্লাহ তাআলা তাঁকে আসমানি গ্রন্থ, এর নিগুঢ় তত্ত্ব এবং বিশেষভাবে তাওরাত ও ইঞ্জিল শিক্ষা দেবেন।
তাঁকে রাসুল হিসেবে বনি ইসরাইলের প্রতি এ বিষয়বস্তু দিয়ে পাঠাবেন যে, তিনি ঘোষণা করবেন- আমি তোমাদের কাছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ থেকে প্রমাণসহ এসেছি। তা এই যে-
- প্রথম : আমি তোমাদের বিশ্বাসের জন্য কাদামাটি থেকে পাখির আকৃতির মতো আকৃতি গঠন করি। অতপর এ কৃত্রিম আকৃতির মধ্যে ফুৎকার দেই। এতে সে আল্লাহর নির্দেশে সত্যি সত্যি জীবিত পাখি হয়ে যায়। আরও মুজিজা এই যে-
- দ্বিতীয় : আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ রোগীকে নিরাময় করি।
- তৃতীয় : আর আল্লাহর নির্দেশে মৃতকে জীবিত করি।
- চতুর্থ : তোমরা যা খাও তথা খেয়ে আস আর নিজ ঘরে রেখে আস, আমি তা বলে দেই।
নিশ্চয়ই উল্লেখিত মুজিজাগুলোর মধ্যে তোমাদের জন্য আমার নবি হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। যদি তোমরা ঈমান আনতে চাও।

আর আমি ওই গ্রন্থের সত্যায়ন করি, যা আমার দুনিয়ায় আসার আগে নাজিল হয়েছিল যেমন- তাওরাত।

আমি এ জন্য এসেছি যাতে এমন কতিপয় বস্তু তোমাদের জন্য হালাল করি। যা মুসা আলাইহিস সালামের শরিয়তের তোমাদের জন্য হারাম ছিল। আমার শরিয়তে এসব হারাম নির্দেশনা রহিত হবে।

আর আমার এ দাবি বিনা প্রমাণে নয়, বরং আমি প্রমাণ করেছি যে, আমি তোমাদের কাছে নবুয়তের প্রমাণ নিয়ে এসেছি। রহিতকরণের দাবিতে নবির এ উক্তিই একটি প্রমাণ।

মোট কথা এই যে, আমার নবি হওয়া যখন প্রমাণিত হয়ে গেল, তখন আমার শিক্ষা অনুযায়ী তোমরা আল্লাহকে নির্দেশ লঙ্ঘনের ব্যাপারে ভয় কর আর ধর্মের ব্যাপারে আমার অনুগত হও।

আমার ধর্মীয় শিক্ষার সারমর্ম এই যে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা আমার পালনকর্তা এবং তোমাদেরও পালনকর্তা। অতএব কাজের নির্দেশ হলো- তোমরা তাঁরই ইবাদত কর। আর এটাই সরল পথ।

কুরআনুল কারিমের এ আয়াতে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও কাজের সমাবেশ রয়েছে। এর দ্বারাই মিলবে মুক্তি। আর এর দ্বারাই মহান আল্লাহ তাআলাকে পাওয়া যাবে।

প্রাসঙ্গিক আলোচনা
উল্লেখিত আয়াতগুলো হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের হিকমত লাভ এবং বিশেষ কিছু অলৌকিক নির্দশন তথা মুজিজা উঠে এসেছে। যা তাঁর নবুয়ত ও রিসালাতের সত্যতার অন্যতম প্রমাণ।
সাধারণত অঙ্কিত প্রাণী কিংবা মাটির দ্বারা তৈরি প্রাণীর মধ্যে ফুৎকার দিয়ে জীবন দান করা কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব নয়। হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম মহান আল্লাহর নির্দেশে কাগজে অঙ্কিত কিংবা মাটির দ্বারা বানানো প্রাণীর প্রতি ফুৎকার দিলেই তা জীবন ফিরে পেত।

এভাবে আল্লাহ তাআলা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামকে বেশ কিছু মুজিজা বা অলৌকিক শক্তি দান করেছিলেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো-
- কোনো জন্মান্ধ ব্যক্তির চোখে স্পর্শ করলেই অন্ধ ব্যক্তির দৃষ্টি ফিরে আসতো।
- আবার কুষ্ঠরোগী গায়ে হাত বুলিয়ে দিলে রোগ ভালো হয়ে যেতো।
- দীর্ঘ দিনের মৃত ব্যক্তিকে নাম ধরে ‘কুম বি ইজনিল্লাহ’ বললেই ওই ব্যক্তি জীবিত হয়ে যেতো।
- কোনো ব্যক্তি বাড়ি থেকে কিছু খেয়ে আসলে এবং বাড়িতে কিছু রেখে আসলে তিনি তা বলে দিতে পারতেন।

এসবই ছিল হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের বিশেষ ক্ষমতা। তিনি প্রয়োজনের আলোকে নবুয়ত ও রেসালাতের সত্যতায় এসব বিষয় প্রয়োগ করতেন।

উল্লেখ্য, পাখির আকৃতি গঠন করা তথা চিত্রাঙ্কন করা হজরত ঈসা আলাইহিস সালামের শরিয়তে বৈধ ছিল। যে বিধান উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য রহিত হয়ে গেছে।

সবশেষ হজরত ঈসা আলাইহিস সালাম মানুষের উদ্দেশ্যে এ মর্মে নসিহত পেশ করেন যে, আল্লাহ তাআলা আমার এবং তোমাদের প্রভু। সুতরাং তোমরা তার ইবাদত কর। আর এটাই সঠিক পথ।

  • সর্বশেষ - অতিথি কলাম