ঢাকা, , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬ আপডেট : কিছুক্ষণ আগে

কতটা প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে আমাদের

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

কতটা প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে আমাদের

মহান বিজয়ের মাস শুরু হল আজ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বীর বাঙালির কাছে তাদের অহঙ্কারী শির নত করতে বাধ্য হয়। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালিকে এ বিজয় অর্জন করতে হয়েছিল। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অস্তিত্বের বিষয়টি কোনো টেবিল আলোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করা হয়নি। প্রচুর রক্তদানের ভেতর দিয়ে তার জন্ম। একটি জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গঠনে এত আত্মত্যাগের ঘটনা পৃথিবীতে আর দুটি পাওয়া যাবে না। বাঙালি জাতি যেমন ধৈর্য দেখিয়েছে, তেমনি দেখিয়েছে শৌর্য। যাদের প্রাণ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের আস্বাদন গ্রহণ করছি, তাদের সবার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

আমরা প্রতি বছরই এ মাসটিকে বিজয়ের মাস হিসেবে রাষ্ট্রীয়ভাবে উদযাপন করি এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উদযাপনটি কেবল ভক্তি-শ্রদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে আমরা লক্ষচ্যুত হব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয়ে যাবে অবহেলিত। আজকের প্রজন্মকে জানাতে হবে কেন আমরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকতে পারিনি। কোন স্বপ্ন সামনে রেখে এ দেশের দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এবং সে স্বপ্নের প্রকৃত বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে। আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ফারাক কতখানি।

১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের মাধ্যমে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। এটি এক ধরনের আপসরফার মাধ্যমেই হয়েছিল- হিন্দুদের দেশ হবে ভারত আর মুসলমানদের হবে পাকিস্তান। পাকিস্তানের দুটি অংশ- পূর্ব পাকিস্তান (পূর্ব বাংলা) আর ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার দূরে পশ্চিম পাকিস্তান। দুই ‘মুসলমানের’ মাঝখানে বিশালকায় ‘হিন্দু’। অনেকেই বলে থাকেন, দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারণা ভ্রান্ত হওয়ার কারণেই বাংলাদেশের সৃষ্টি। আমি বিষয়টিকে অত সরলভাবে দেখতে চাই না। কেননা ভুল সংশোধন করে তো আমরা আবার ভারত হয়ে যাইনি?

আমরা মনে করি, দুই দশক ধরেই আমাদের মননে বাঙালি হিসেবে একটি নতুন জাতি সৃষ্টির তাড়না অনুভূত হয়েছিল; তাই তার নাম রেখেছি বাংলাদেশ, ভারত নয়। আসলে ভুলটা ছিল জাতির সংজ্ঞা নিরূপণে। ধর্মের ভিত্তিতে কখনও জাতি তৈরি হয় না। জাতি সৃষ্টিতে ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, কৃষ্টি, পোশাক-পরিচ্ছদ, এমনকি খাবারও একটা অংশজুড়ে থাকে। আরব বিশ্বের আয়তন ১৩.১৩ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটার। ৪২ কোটিরও বেশি মানুষ সেখানে ২২টি দেশে ভাগ হয়ে বাস করে। শুধু ভাগই হয়নি, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি জোট ইয়েমেনে বোমা মেরে ৩৯ শিশু মেরে ফেলেছে। ধর্ম এখানে কোনো কাজে আসেনি। যেমনটি কাজে আসেনি একাত্তরে।

মুসলমানদের রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তানের পূর্ব অংশের মানুষ কখনই সাম্প্রদায়িক ছিল না। এ অসাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির কারণেই পাকিস্তান তৈরির মাত্র দু’বছরের মাথায় ১৯৪৯ সালে মুসলিম লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতারা নতুন দল হিসেবে গঠন করেন ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’, পরে তা আওয়ামী লীগ নামে প্রতিষ্ঠা পায়। ‘আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নেই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে যার একটা ম্যানিফেস্টো থাকবে’ (শেখ মুজিবুর রহমান, অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা : ১২১)। এর অর্থই হল পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানিদের একটা বড় রকমের দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্য ছিল।

আমাদের ওপর প্রথমেই সাংস্কৃতিক আঘাত হানা হয় ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে পাকিস্তানের বড়লাট মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ ঢাকায় এসে সাফ জানিয়ে দিলেন- ‘উর্দু শ্যাল বি, উইল বি অ্যান্ড মাস্ট বি দ্য স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান।’ যে দেশের ৫৬ শতাংশ নাগরিকের ভাষা বাংলা, সেদেশে মাত্র ৬ শতাংশ নাগরিকের উর্দু ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়? এটা তো মেনে নেয়া যায় না। সেদিন বাঙালিরা তা মেনেও নেয়নি; ‘নো’ ‘নো’ বলে দৃপ্ত কণ্ঠে প্রতিবাদ করেছিল। তারপরও আমরা আলাদা হতে চাইনি, চেয়েছিলাম উর্দুর সঙ্গে সমান মর্যাদায় বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করা হোক। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিদের গোঁয়ার্তুমির মাত্রা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, ভাষার দাবিতে ’৫২ সালে আমাদের যুবকদের প্রাণ দিতে হল। সালাম, রফিক, জব্বার, বরকতদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হল।

দ্বিতীয় আঘাত রাজনৈতিক। উদাহরণ হিসেবে আসে ১৯৫৪-এর নির্বাচন। ‘পূর্ব বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাসে ১৯৫৪ সালের নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাঙালি জাতি, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি এবং বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ নেতৃত্বের কার্যকলাপ ও পাকিস্তানি শাসকদের ছয় বছরের শোষণের বিরুদ্ধে এ নির্বাচন ছিল ‘ব্যালট বিপ্লব’ (ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন, বাংলাদেশের ইতিহাস : ১৯০৫-১৯৭১, পৃষ্ঠা : ২৩৮)। মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে পরিষ্কার মতামত ব্যক্ত করে এ দেশের মানুষ যুক্তফ্রন্টের পক্ষে রায় দেয়। ২৩৭ আসনের মধ্যে ২২৩ আসনে জয়লাভ করে যুক্তফ্রন্ট; আর মুসলিম লীগের বরাতে জোটে ১০টি আসন। শেরে বাংলা একে ফজলুল হকের নেতৃত্বে গঠিত হয় ১৪ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন কৃষি, সমবায়, পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। কিন্তু গণরায়কে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী মানতে পারেনি। অগণতান্ত্রিকভাবে এবং মিথ্যা অভিযোগে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় ১৯৫৪ সালের ৩০ মে মন্ত্রিসভা ভেঙে দেয়া হয়। আমরা ক্ষুব্ধ হলেও তা মেনে নিতে হয়েছিল।

তৃতীয় আঘাতটি প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর ক্ষমতায় আসীন হন ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান। সামরিক শাসনের মধ্য দিয়ে তিনি দশ বছর গণতন্ত্রকে নির্বাসন দেন। অনেকে আইয়ুব খানের ১০ বছরকে ‘উন্নয়নের দশক’ বলতে ভালোবাসেন। এটি পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য সঠিক হতে পারে; কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের ভাগ্যে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বৈষম্য ছাড়া কিছুই জোটেনি। আমরা জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ অথচ আইয়ুব খানের ১৯৫৮-৬০ মন্ত্রিসভার ১২ জনের মধ্যে বাঙালি ছিল তিনজন (২৫ শতাংশ), ১৯৬০-৬২তে ছিল ২৬ শতাংশ। সিএসপি অফিসারের কথা যদি বলি তাহলে দেখা যাবে ১৯৬০ সালে ৩১ জন অফিসারের মধ্যে বাঙালি ছিল ১০ জন (৩২.৩ শতাংশ)।

১৯৬২ সালের পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সচিবালয়ের পরিসংখ্যান দেখলে থমকে যাবেন। ১৯ জন সচিবের মধ্যে একজনও বাঙালি ছিল না। যুগ্ম সচিব ১৫ শতাংশ, উপসচিব ১৯ শতাংশ, শাখা কর্মকর্তা ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। অর্থাৎ মোট ৯৫৪ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার মধ্যে বাঙালি ছিলেন মাত্র ১১৯ জন (১২ শতাংশ)। সামরিক বাহিনীর অবস্থা তো আরও নাজুক। ১৯৬৩ সালে স্থলবাহিনীতে বাঙালি কমিশন্ড অফিসার ছিল ৫ শতাংশ, বিমানবাহিনীতে ১৭ শতাংশ আর নৌবাহিনীতে ৫ শতাংশ। ভাবা যায়! অর্থনৈতিক বৈষম্য তো আকাশছোঁয়া। কেন্দ্রীয় ব্যাংক, বীমাসহ বিদেশি মিশনগুলোর হেড অফিসগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় অবাধে অর্থ পাচার করা সম্ভব হয়েছিল। ‘ইসলামাবাদ’ নামে গোটা একটা রাজধানীই বানিয়ে ফেলল আমাদের টাকায়।

১৯৬৫-৬৬ থেকে ১৯৬৮-৬৯ সালে আমরা সরকারি খাতে ৭২৮ কোটি টাকা জমা দিয়েছিলাম। বিপরীতে আমাদের রাজস্ব খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৪৮৪ কোটি টাকা। অথচ পশ্চিম পাকিস্তান জমা করেছিল ১৭৮১ কোটি টাকা আর খরচ বাগিয়ে নিয়েছিল ১৬৫৯ কোটি টাকা। পাকিস্তান আমলে ৭৬৪০ মিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক সাহায্যের মধ্যে আমাদের ভাগ্যে জুটেছিল মাত্র ২০২৪ মিলিয়ন ডলার আর ভাগ্যবান পশ্চিমারা পেয়েছিল ৫৬১৬ মিলিয়ন ডলার। ১৯৬৯ সালে পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল ৩৩১ টাকা আর পশ্চিম পাকিস্তানিদের বেলায় তা ছিল ৫৩৩ টাকা- আমাদের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি। স্বাস্থ্য খাতের অবস্থার কথা শুনবেন? পশ্চিম পাকিস্তানের জনসংখ্যার বিপরীতে ডাক্তার ছিল ১২ হাজার ৪০০ জন আর আমাদের জন্য ছিল ৭ হাজার ৬০০ জন। হাসপাতালে বেডের সংখ্যা পশ্চিমাদের জন্য ছিল ২৬ হাজার আর বাঙালিদের ললাটে ছিল মাত্র ৬ হাজার। এতটা বৈষম্য মেনে নিয়ে একই রাষ্ট্রে বাস করা যায়?

বাস করা যায় না জানি। তাই আইয়ুব শাসনকে বাঙালি বিনা বাক্যে মেনে নেয়নি। ঊনসত্তরে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাকে গদি থেকে নামানো হয়। ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া খান মসনদে বসে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচন হয়। নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় পরিষদের মোট ৩১৩ আসনের মধ্যে ১৬৭ আসনে জয়লাভ করে। প্রতিদ্বন্দ্বী জুলফিকার আলীর পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) পায় মাত্র ৮৮টি আসন। প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩১০ আসনের ২৯৮টিই জিতে নেয় আওয়ামী লীগ। সুতরাং বঙ্গবন্ধুর হাতে ক্ষমতা দিয়ে দেয়াই ছিল ইয়াহিয়ার জন্য ফরজ কাজ। কিন্তু ইয়াহিয়া গড়িমসি করতে লাগলেন। নানা ছুতোয় তিনি সময়ক্ষেপণ করতে লাগলেন।

এদিকে ১৯৫৪ সালের কথা স্মরণে রেখে বাংলার জনগণ দিনকে দিন ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছিলেন। তারা নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, পশ্চিমাদের সঙ্গে আর থাকা চলবে না। এর একটা চূড়ান্ত বিহিত হওয়া দরকার। মানুষের এ স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ জনগণকে উপহার দিলেন ঐতিহাসিক সেই ভাষণ- যাকে আমি বলি মুক্তিকামী মানুষের মহাকাব্য। ‘‘বস্তুত বাঙালি জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ কাব্য গীতাঞ্জলি নয়, বলাকা নয়, সোনার তরী নয়, ‘আর দাবায়া রাখবার পারবা না’। সহস্রাধিক বছরের পরাধীন জীবনের অস্তিত্বের প্রতি সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়ে এ উচ্চারণের মাধ্যমে গোটা জাতির চিত্তলোকে তিনি এমন একটা অনমনীয় আকাক্সক্ষার সৃষ্টি করেছিলেন যা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরাট এক প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। এ গৌরব শেখ মুজিবকে অবশ্যই দিতে হবে’’ (আহমদ ছফা, শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ২১)।

ওই ভাষণে ইয়াহিয়া দিশেহারা! কিন্তু বাঙালিরাও ততক্ষণে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করে ফেলেছে- হয় মর্যাদা নিয়ে বাঁচব, নয়তো মরব। ইয়াহিয়াও কম সেয়ানা ছিলেন না। তিনি এবং ভুট্টো মুজিবের সঙ্গে আলোচনার নাম করে পূর্ব পাকিস্তানে সমর শক্তি বাড়াতে লাগলেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বর্বর পশ্চিম পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরীহ-নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হল। যেখানে শান্তিপ্রিয় বাঙালিকে হত্যার মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার মতো হীন পন্থা অবলম্বন করা হয়েছিল, সেখানে আমাদের অস্ত্র হাতে তুলে নেয়া ছাড়া আর কী উপায় ছিল? আমরা তাই অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলাম। নয় মাস যুদ্ধ করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছি। এটি আমাদের জন্য অপরিহার্য ছিল।

এতখানি আত্মদানের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের যে সংবিধান প্রণয়ন করেছিলাম তার চারটি মূলনীতি হল- জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। রাষ্ট্র আমাদের কথা দিয়েছিল এ চার মূলনীতির আদলে এ দেশে একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমাজ গড়ে তোলা হবে। রাষ্ট্র কিংবা সরকার এর কতখানি করতে পেরেছে তার একটা হিসাব অন্তত বিজয়ের মাসে নেয়া প্রয়োজন।

যদি জাতীয়তাবাদের কথায় আসেন তবে দেখবেন আমাদের মননে ’৭১-এ যতখানি জাতীয়তাবোধ ছিল, তা অনেকখানি হ্রাস পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ‘আমার’ বলতে কোনো শব্দ ছিল না, ছিল ‘আমাদের’, সমগ্র জাতির। সে জায়গায় এখন ‘আমার’ এবং ‘আমি’ গেড়ে বসেছে। ফলে সামাজিক স্বার্থ বাদ দিয়ে আমরা নৈতিক-অনৈতিক ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলে মত্ত হয়ে উঠেছি। মূলনীতির দ্বিতীয় ‘সমাজতন্ত্র’ কার্যত রাষ্ট্র ও সরকারের চিন্তাধারা থেকে একেবারেই মুছে গেছে, সেখানে সম্বল হয়ে দেখা দিয়েছে পুঁজিবাদ ও শোষণবাদ। তৃতীয়টি ‘গণতন্ত্র’।

এর অবস্থা নতুন করে কিছু বলার নেই। শুধু এটুকু বলব যে, জনগণ আজকাল ‘গণতন্ত্র’ আর ‘স্বৈরতন্ত্রে’র মধ্যে তফাৎ করতে পারছেন না। বাকি রইল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’। ইংরেজি সেক্যুলার শব্দের বাংলা করা হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে এখানে বোঝানো হয়েছে সব ধর্মের মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সমান নাগরিক সুবিধাপ্রাপ্তি। হ্যাঁ, এখনও এ দেশের অধিকাংশ মানুষই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। তবে এর বিপরীতে সাম্প্রদায়িক শক্তির উপস্থিতিকে অস্বীকার করা যাবে না। আমরা সাম্প্রদায়িকতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পেরেছি; কিন্তু নির্মূল করতে পারিনি।

সার্বিক বিবেচনাকে আমলে নিয়ে বলা যেতে পারে, গত প্রায় ৫০ বছর সময়ে আমাদের প্রত্যাশার অনেকখানিই অপূর্ণ থেকে গেছে, বিশেষ করে সংবিধানের মূলনীতির আলোকে। আমরা আগামীতে এই চেতনার ঘাটতি পূরণ করতে চাই, কারণ শহীদদের কাছে আমরা এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়