ময়মনসিংহ, , ১৬ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয়, কমানো সম্ভব

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি নয়, কমানো সম্ভব

কয়েক মাস আগে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির পর আবার গত ২৭ ফেব্রুয়ারি সরকারের নির্দেশে বিইআরসি এক দশকে দশমবারের মতো গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা দিয়েছে। এটি গণশুনানিতে প্রদত্ত তথ্য, যুক্তি এবং প্রাপ্ত ফলাফলের পরিপন্থি। এই দাম বৃদ্ধির পক্ষে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, দেশে গ্যাস সংকটের কারণে তেলনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি আমদানির ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সে জন্য দাম বাড়াতে হয়েছে। এই বক্তব্য পুরোপুরি অসত্য। কারণ প্রথমত, গ্যাস সংকটের জন্য নয় বরং রাষ্ট্রীয় কম দামে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে গ্যাস সরবরাহ না করে ব্যয়বহুল বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীর গ্যাস সরবরাহের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তার সঙ্গে এলএনজি আমদানিসহ ব্যয়বহুল পথ গ্রহণ, রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল ব্যবসায়ীদের অযৌক্তিক মুনাফা দেওয়ার কারণে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।

সরকার তার মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি ২০১৬) অনুযায়ী দেশের গ্যাস অনুসন্ধান স্থগিত করে এলএনজি-কয়লা আমদানির পথ ধরেছে। ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে যাচ্ছে। ব্যয়বহুল কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত রেখেছে। জাতীয় সক্ষমতা বিপর্যস্ত করে সরকার একদিকে সাগরের গ্যাস রপ্তানির বিধান রেখে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করছে; অন্যদিকে গ্যাস সংকটের অজুহাতে সুন্দরবন বিনাশী প্রকল্প, ভয়ংকর ঝুঁকি ও বিপুল ঋণের রূপপুর প্রকল্পের উদ্যোগ নিচ্ছে। তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি কম দামে পরিবেশসম্মত বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প মহাপরিকল্পনা উপস্থিত করা সত্ত্বেও তা আমলে না নিয়ে সরকার তার মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী জ্বালানি ও বিদ্যুৎ  খাতকে ক্রমাগত কিছু দেশি-বিদেশি গোষ্ঠীর স্বার্থ ও ব্যবসার খাতে পরিণত করছে। তাদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়েই বারবার বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম।

বারবার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি অর্থনীতির জন্য বোঝা হচ্ছে। সব পর্যায়ের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াচ্ছে। সর্বশেষ এই দাম বৃদ্ধিতে সব পর্যায়ে আরেক দফা উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। বাড়বে বাসা ভাড়াসহ অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রীর দাম। বাড়বে শিল্প ও কৃষিপণ্যের দাম, সব উৎপাদনী তৎপরতার ব্যয়। কমবে দেশের অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার ক্ষমতা।

পরিণতি যা-ই হোক, তথ্য যা-ই বলুক, যুক্তি যা-ই বলুক; কিছু গোষ্ঠীর স্বার্থে দাম বাড়ানোই যেন সরকারের কাজ। সর্বজনের অর্থের অপচয় করে নাটক করার জন্য বানানো হয়েছে বিইআরসি। সেখানে গণশুনানিতে যুক্তিতথ্য প্রমাণিত হয়েছে- বিদ্যুতের দাম বাড়ানো নয় বরং কমানো উচিত এবং তা সম্ভব। কিন্তু সরকারের আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া- দাম বাড়াতেই হবে! এভাবেই জনসাধারণের পকেট কাটা চলছে।

তাহলে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের দরকার কী? কেন ধুমধাম করে গণশুনানি? কয়েক দিন ধরে গণশুনানিতে যা যা সিদ্ধান্ত ও সুপারিশ, তার বিপরীতে গিয়ে যদি সরকারের পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দাম বাড়ানো হয়, তাহলে আর জনগণের অর্থের অপচয় কেন? কিছু লোক, জনবিরোধী সিদ্ধান্ত জায়েজ করতে চায়।

গ্যাস সংকটের কথা বলা হয়। অথচ জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির বদলে তা সংকোচনেরই ভূমিকা নিয়েছে সরকার। বাপেক্সকে বাদ দিয়ে দ্বিগুণ খরচে বিদেশি কোম্পানিকে কাজ দেওয়া হচ্ছে। বাপেক্সকে বানানো হচ্ছে এখন সাবকন্ট্রাক্টর। বিদেশি কোম্পানিকে আরও গ্যাসক্ষেত্র দেওয়া হচ্ছে। তাদের কাছ থেকে উচ্চ দামে গ্যাস কেনা হবে, আর বাপেক্স কম পয়সায় তাদের সব কাজ করে দেবে। সমুদ্রবক্ষের গ্যাসসম্পদ উজাড় করে তুলে দেওয়ার মতো চুক্তি করা হচ্ছে।

১০ বছরে এসবের বিরুদ্ধে বহু রকম তথ্যপ্রমাণ হাজির করা সত্ত্বেও শুধু সুন্দরবনের জন্য হুমকি রামপাল নয়; উপকূলজুড়ে করা হচ্ছে একের পর এক কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব প্রকল্পে যুক্ত ভারত ও চীন নিজ নিজ দেশে কয়লা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আর তাদের পরিত্যক্ত কয়লা বিদ্যুতের ভাগাড় তৈরি করছে বাংলাদেশের মতো দেশে। বাংলাদেশের বিভিন্ন কয়লা খনি নিয়েও চলছে চক্রান্ত। ফুলবাড়ীতে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিতাড়িত এশিয়া এনার্জি সরকারের প্রশ্রয়ে অবৈধভাবে লন্ডনে শেয়ার ব্যবসা করছে, চীনা কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে ফুলবাড়ী আন্দোলনের সংগঠকদের। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি, পানি ও আবাদি জমির ওপর বিপুলভাবে নির্ভরশীল একটি দেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ঝুঁকি ও বিপদ যে কোনো দেশের চেয়ে অনেক বেশি। এই সত্য অগ্রাহ্য করে রূপপুরে বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প করা হচ্ছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতে কয়লা, এলএনজি ও পারমাণবিক নির্ভরতাসহ ব্যয়বহুল পথ গ্রহণ ও দুর্নীতির বোঝা জনগণের ওপর চাপাতে বারবার বাড়ানো হচ্ছে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম।

গ্যাস, তেল, বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি আমরা মেনে নিতে পারতাম দুই কারণে। এক. যদি চুরি, দুর্নীতি বা জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি ছাড়া যৌক্তিকভাবে উৎপাদন খরচ বাড়ে; দুই. যদি বর্ধিত দাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ জাতীয় সক্ষমতা এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে আরও টেকসই আকারে আমাদের কাছে ফেরত আসে। বর্ধিত দাম দিতে নাগরিক হিসেবে আমরা রাজি হতে পারি, যদি দেখি তা দিয়ে জাতীয়ভাবে সক্ষম একটি ভিত্তি নির্মাণ করা হচ্ছে, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানুষই লাভবান হবে। কিন্তু যদি দেখি এই দুটির একটিও নয়; যদি আমরা দেখি দাম বাড়ানো হচ্ছে জনগণ ও অর্থনীতিকে বিপদগ্রস্ত করে কিছু গোষ্ঠীর পকেট ভরার জন্য; দীর্ঘমেয়াদে এই খাত আরও ক্ষতিগ্রস্ত করতে; তাহলে এই দাম বৃদ্ধি কেন আমরা মানব? এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেব না কেন? আর যেখানে সুলভ, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথ আছে; সেখানে পরিবেশবিধ্বংসী, ঝুঁকিপূর্ণ, ব্যয়বহুল পথে দেশ কেন যাবে?

গত ১০ বছরে কয়েক দফায় বিদ্যুতের দাম বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম প্রতি বছরই বাড়াতে হবে। অন্যদিকে জাতীয় কমিটির প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে না বরং ভবিষ্যতে তা আরও কমানো সম্ভব হবে।

সরকার যখন পশ্চাৎমুখী, পরিবেশবিধ্বংসী, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ পরিকল্পনাকে বাংলাদেশের জন্য সমাধান হিসেবে উপস্থিত করছে; তার বিপরীতে আমরা উপস্থিত করেছি ভবিষ্যৎমুখী, পরিবেশবান্ধব, সুলভ সমাধানের একটি কাঠামো। রামপাল-রূপপুরের মতো আত্মধ্বংসী পথে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। অর্থনৈতিক, সামাজিক, পরিবেশগত বিচারে এর চেয়ে অনেক উৎকৃষ্ট পথ আছে। আমরা সেই রূপরেখাই হাজির করেছি। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বিভিন্ন উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে পরিকল্পনা আমরা প্রকাশ করেছি; অদূর ভবিষ্যতে প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের ফলে এর চেয়েও উন্নততর পথে, আরও সুলভে যে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব হবে তার সব লক্ষণই বিশ্বজুড়ে প্রকাশিত হচ্ছে। এ জন্য প্রয়োজন হবে নীতিগত ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এবং জাতীয় প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ; কিন্তু সরকার হাঁটছে উল্টোপথে।

অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্য সচিব, তেল-গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি