ময়মনসিংহ, , ১১ কার্তিক ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

একদিনে নাপিত্তাছড়া ঝরনা ও চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ

  ভ্রমন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

একদিনে নাপিত্তাছড়া ঝরনা ও চন্দ্রনাথ পাহাড় ভ্রমণ

ওমর ফারুক

চট্টগ্রামের মিরসরাই বোয়ালিয়া ট্রেইলের দুইমাস অতিবাহিত হতে না হতেই ফের ট্রেইলের প্রতি মন টানছিল খুব। হঠাৎ চোখে পড়লো একটি ট্রাভেল গ্রুপ সীতাকুণ্ড ট্যুরের আয়োজন করেছে। একদিনের এ ট্যুরে নাপিত্তাছড়া ঝরনা, গুলিয়াখালি বীচ এবং চন্দ্রনাথ পাহাড় দেখার সুযোগ রয়েছে। দু’বেলা খাবার ও যাতায়াত ভাড়াসহ প্যাকেজ মূল্য ছিলো ৯৯৯ টাকা। অভাবনীয় ওই সুযোগ লুফে নিলো ৯০ জন ভ্রমণপিপাসু।

৯ অক্টোবর রাত সাড়ে ১১টায় পৌঁছে গেলাম সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। গ্রুপের গাইডকে ফোন দিয়ে আমাদের রিজার্ভ বাসে উঠে পড়লাম। খুব সুখময় এক অনুভূতি হচ্ছিল। বাস ছাড়া মাত্রই মাকে ফোন দিয়ে জানালাম। বাস কিছুদূর যাওয়া মাত্রই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো চন্দ্রনাথ পাহাড় এবং নাপিত্তাছড়া ঝরনার অপরূপ দৃশ্য।

এতদিন ফেসবুক, ইউটিউবে দেখেছি, এখন সরাসরি দেখবো। এসব ভাবতে ভাবতে চোখ হঠাৎ বুজে গেল। ছোট্ট একটা ঘুম দিলাম। চোখ খুলে দেখলাম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের ডলি রিসোর্টে চলে এসেছি। বিরতির সময় দিলো ৩৫ মিনিট। ডলি রিসোর্টে ফ্রেশ হয়ে হালকা নাস্তা খেয়ে বাসে উঠলাম। বাস ফের ছুটলো বন্দরনগরী চট্টগ্রামের দিকে।

napittachara

তখন আকাশ ফর্সা হয়নি। বাস থামলো সীতাকুণ্ড বড়দারোগা হাটে। ফজরের নামাজ আদায় করলাম পাশের মসজিদে। বাস থেকে নেমে লেগুনা ভাড়া করে কলেজ রোড দিয়ে চন্দ্রনাথ পাহাড়ের দিকে যাচ্ছি। বিশাল লম্বা গাড়ির সারি। জ্যামে বসে না থেকে হাঁটা শুরু করলাম, যদিও দূরত্ব সামান্য। খুব হাসি আর আনন্দে কাটছিল সময়। মাঝারি আকারের বাঁশ কিনলাম ২০ টাকা দিয়ে। পাহাড় জয় করে এসে চাইলে সেই বাঁশ ফেরত দেওয়া যাবে। এতে ১০ টাকা ফেরত দেয় দোকানিরা।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকটি সেলফি তুলে উপরে ওঠা শুরু করলাম। চন্দ্রনাথ পাহাড় চট্টগ্রাম জেলার সবচেয়ে বড় পাহাড়। এর উচ্চতা ১০২০ ফুট বা ৩১০ মিটার। এ পাহাড়ের চূড়ায় রয়েছে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দুটি মন্দির। অনেকে এখানে উঠে পূজা করেন। কেউ কেউ প্রসাদ নিয়ে আসেন। আমরা কয়েকজন দলবেঁধে আনন্দের সঙ্গে উপরে উঠতেছি। চন্দ্রনাথ পাহাড়ে ওঠার সিঁড়িগুলো বেশ খাড়া। যে কারণে কিছুদূর উঠে আমরা হাঁপিয়ে উঠি।

বিশ্রাম নিয়ে ফের ছুটে যাই। অনেকে খুব ক্লান্ত হয়ে সেখানে তাদের যাত্রা স্থগিত করেন। অনেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে আসেন। মূলত বেশি উচ্চতাবিশিষ্ট পাহাড়ে বাচ্চা এবং বৃদ্ধদের নিয়ে না যাওয়াই ভালো। পাহাড়ের মধ্যভাগে উঠে আমার প্রাণ জুড়িয়ে গেল। সীতাকুণ্ড শহরের কিছু অংশ এবং বঙ্গোপসাগরের কিছু অংশ দেখতে পেলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে ঝটপট কয়েক রাউন্ড সেলফি তুলে নিলাম।

napittachara-4

প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য দেখার কৌতূহল নিয়ে আরও দ্রুত বেগে ছুটতে লাগলাম পাহাড়ের চূড়ার দিকে। মাত্র একটা সিঁড়ি বাকি। আমি খুব ক্লান্ত। পা আর সামনের দিকে নিতে পারছি না। বেশ হাঁপিয়ে উঠলাম। মনের জোরে সামনের দিকে এগিয়ে গেলাম। পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মুগ্ধ হয়ে গেলাম।

পুরো সীতাকুণ্ড শহর আর বঙ্গোপসাগরের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছে। সবাই ভিডিও এবং সেলফি নিতে ব্যস্ত। আমরা পাহাড়ে বেশিক্ষণ সময় দেইনি। কারণ আমাদের গুলিয়াখালি সমুদ্রসৈকতে এবং নাপিত্তাছড়া ঝরনা দেখতে যেতে হবে। পাহাড়ের উপর উঠতে দেড় ঘণ্টা লাগলেও নামতে লেগেছে মাত্র ২০ মিনিট। আমরা লেগুনায় উঠে গিয়ে গুলিয়াখালি সমুদ্রসৈকতের দিকে রওনা হলাম।

napittachara-4

গুলিয়াখালি সৈকতের কথা আলাদা করে বর্ণনা করার মতো কিছু নেই। এর সামনে বেশ কাদামাটি রয়েছে। পুরো পা কাদায় জড়িয়ে কাছে যেতে হয়। এ বীচে লোকসমাগম শুরু হয়েছে ২০১৪ সালের পর থেকে। জানা যায়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) কিছু ছাত্র ঘুরতে এসে ফেসবুকে ছবি আপলোড করেন। এরপরই এ জায়গা সম্পর্কে জানাজানি হয়।

প্রকৃতি ও গঠনগত দিক থেকে এটি অন্যান্য সমুদ্রসৈকত থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর একদিকে দিগন্ত জোড়া জলরাশি, অন্যদিকে কেওড়া বন দেখা যায়। কেওড়া বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল দেখা যায়। এ বন সমুদ্রের অনেকটা গভীর পর্যন্ত চলে গেছে। এর পরিবেশ সোয়াম্প ফরেস্ট ও ম্যানগ্রোভ বনের মত।

সৈকতজুড়ে সবুজ গালিচার বিস্তীর্ণ ঘাস একে অন্যান্য সমুদ্রসৈকত থেকে করেছে অনন্য। এ সবুজের মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে গেছে সরু নালা। নালাগুলো জোয়ারের সময় পানিতে ভরে ওঠে। পাখি, ঢেউ আর বাতাসের মিতালীর অনন্য অবস্থান দেখা যায় এ সমুদ্রসৈকতে। প্রকৃতির অপরূপ এ দৃশ্য দেখা শেষে রওনা হলাম নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে।

napittachara

মাঝে নামাজের বিরতিতে জুমার নামাজ আদায় করে নেই। ট্রেইলের শুরুতে ফের বাঁশ কিনে নিলাম। ট্র্যাকিংয়ের ক্ষেত্রে বাঁশের ব্যবহার অতি প্রয়োজনীয়। মিরসরাই উপজেলার নয়াদুয়ারবাজার থেকে নাপিত্তাছড়া ঝরনার কাছে যেতে ১ ঘণ্টার মতো সময় লাগে। ঝরনার পানিতে শরীর ভিজিয়ে স্বর্গীয় সুখের অনুভূতি পেলাম।

বিকেল ৫টার দিকে মুরগির মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে বাসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিলাম। রাত ৭টায় বাস ছাড়লো। ১১টার মধ্যে আমরা ঢাকায় পৌঁছে গেলাম। দেশে অনেক ট্রাভেল গ্রুপ রয়েছে। ফেসবুকে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আপনিও একদিনের সফর করতে পারেন।

  • সর্বশেষ - ভ্রমণ