ময়মনসিংহ, , ৬ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

ক্রোধ সংবরণে ইসলামি শিক্ষা

  ধর্ম ডেস্ক

  প্রকাশ : 

ক্রোধ সংবরণে ইসলামি শিক্ষা

প্রত্যেকের সঙ্গে অর্থাৎ ধর্ম-বর্ণ-জাতিগোষ্ঠী সবার সঙ্গে উত্তম আচরণের শিক্ষাই আমরা পবিত্র কুরআনুল কারিম ও রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনাদর্শ থেকে পেয়ে থাকি। আমরা যারা শ্রেষ্ঠনবি হজরত মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মত হওয়ার দাবি করি, আমাদের আচার-আচরণ এবং চলা-ফেরাও হওয়া চাই শ্রেষ্ঠ।

আমরা যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ মোতাবেক জীবন পরিচালনা করব তখনই কেবল আমরা নিজেদের সত্যিকারের মুসলমান এবং শ্রেষ্ঠনবির প্রকৃত উম্মত হওয়ার দাবি করতে পারব।

এছাড়া মুখে বলব শ্রেষ্ঠ নবির উম্মত আর নানান পাপে লিপ্ত থাকব; এটা হতে পারে না। আমাকে এমনভাবে চলতে হবে যাতে করে আমার দ্বারা কারো কোনো ক্ষতি না হয় বরং আমার দ্বারা অন্যের উপকার সাধিত হয়।

আমাদের এমনভাবে চলতে হবে; যাতে কেউ এ কথা না বলতে পারে যে, তিনি আমার জন্য কষ্টের কারণ। হাদিসে পাকে প্রিয় নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে কথাই বলেছেন।
হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে হিংসা করবে না, নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করবে না, পরস্পরে বিদ্বেষ রাখবে না, একে অপরের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে না। মূল্য নির্ধারণ হওয়ার পর চড়া দাম দিয়ে অন্যের সওদা কিনবে না।
হে আল্লাহর বান্দারা! পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই। সে তার ভাই-এর ওপর জুলুম করবে না। তাকে নিগৃহীত করবে না এবং তাকে হীন জ্ঞান করবে না।
যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ বুকের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিন বার বলেন-
আত-তাকওয়া হা হুন্না
অর্থাৎ তাকওয়া এখানে।
কোনো ব্যক্তি দূরভিসন্ধি আঁটবার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে তার মুসলমান ভাইদের হীন জ্ঞান (অসম্মান) করে। প্রত্যেক মুসলমানের রক্ত, ধন-সম্পদ আর মান সম্মান (নষ্ট করা) অপর মুসলমানের জন্য হারাম।’ (মুসলিম)

উদ্ধৃত এই হাদিসে বলা হয়েছে ‘ঝগড়া করো না’। অথচ আমরা অহরহ দেখতে পাই সামান্য বিষয়ে কথা কাটকাটি হয়। ঝগড়া-বিবাদ হয়। এমনকি এক পর্যায়ে তা হত্যা পর্যন্ত গড়ায়।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই হাদিসে আরো বলেছেন, ‘শক্রতা পোষণ কর না’। অথচ ছোট ছোট ব্যাপারে আমরা শক্রতা আরম্ভ করে দেই। হিংসা বিদ্বেষ ও বৈরীতায় অন্তর পূর্ণ হয়ে যায়। মনোভাব এমনভাবে তৈরী করে রাখি যে, সুযোগ পেলেই প্রতিশোধ নেব!

যদিও কুরআন-সুন্নাহর দিকনির্দেশনা রয়েছে যে, কারো প্রতি শক্রতা পোষণ করা যাবে না। প্রতিশোধ-পরায়ণ হওয়া যাবে না। হাদিসে এসেছে-

এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে নিবেদন করলো- (আমাকে) এমন একটি সার-কথা বলুন; উপদেশ দান করুন, যা আমি ভুলে না বসি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘ক্রোধ সংবরণ কর’। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারও বলেন, ‘ক্রোধ সংবরণ কর’।

অতএব সব সময় নিজেদের ক্রোধ সংবরণ করে রাখলে অন্তরে জমে থাকা ক্ষোভ ও বিদ্বেষ আপনা-আপনিই চলে যাবে। আর কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে বা কাউকে কষ্ট দেয়ার উদ্দেশ্যে কিছু একটা করা আরেকটি অপরাধমূলক বদ-অভ্যাস।

এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন, ‘জুলুম করো না, কাউকে হীন জ্ঞান কর না, কাউকে অপদস্ত কর না।’ যালেম কখনই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জন করতে পারে না।

আর এটা কি করে হতে পারে! যে,
একদিকে আমরা নিজেদের শ্রেষ্ঠনবির উম্মত হওয়ার দাবি করব আর অপর দিকে জুলুম অত্যাচারে লিপ্ত থাকব? কারো প্রতি রাগ হলেই তাকে আক্রমণ করতে হবে; এটাতো শ্রেষ্ঠনবির আদর্শ নয়। বরং বীরত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব হচ্ছে ক্রোধের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। হাদিসের সুমহান শিক্ষা এমনই।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় সাহাবাগণ ইসলাম গ্রহণের আগে কেমন ছিলেন আর ইসলাম গ্রহণ করার পর তারা নিজেদের অভ্যন্তরে কত অসাধারণ পরিবর্তনই না সাধন করেছিলেন; সে ইতিহাস আজও আমাদের সামনে বিদ্যমান। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে-
হজরত আবু জর গিফারি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, তার একটি চৌবাচ্চা থেকে লোকদের খাবার পানি সরবরাহ করা হতো। একবার কোনো এক পরিবারের কতিপয় লোক এলো। তাদের মধ্য থেকে একজন বলল- কে আছে যে আবু জরের কাছে যাবে আর তার মাথার চুল মুঠিবদ্ধ করে কৈফিয়ত তলব করবে? তখন তাদের মধ্য থেকে একজন বলল, সে এটা করবে।

সেই অনুযায়ী ওই ব্যক্তি চৌবাচ্চার কাছে তার কাছে গেল আর আবু জরকে বিরক্তিকর প্রশ্নবানে জর্জরিত করতে শুরু করল। আবু জর দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে গেলেন এরপর শুয়ে পড়লেন অতপর তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে সম্বোধন করে বলেছেন, ‘দাঁড়ানো অবস্থায় তোমাদের মধ্যে কেউ রাগান্বিত হলে (সে) বসে যাবে, যদি রাগ প্রশমিত হয়ে যায় তো ভাল, (রাগ প্রশমিত) না হলে শুয়ে পড়বে।’ (মুসনাদ আহমাদ)

নিজেদের রাগ নিয়ন্ত্রণে এটি হলো ইসলামের সুমহান শিক্ষা ও উপায়। যে শিক্ষায় আলোকিত মুমিন মুসলমান।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রকৃত ইসলামের শিক্ষা অনুসরণ করে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। হাদিসের ওপর যথাযথ আমল করার তাওফিক দান করুন। নিজেদের সব কঠিন মুহূর্তে রাগ নিয়ন্ত্রণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

  • সর্বশেষ - অতিথি কলাম