ময়মনসিংহ, , ১২ মাঘ ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

খিলগাঁওয়ের সংঘবদ্ধ প্রতারক তুহিন ও তার ২ সহযোগীর স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও

  বিশেষ প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

খিলগাঁওয়ের সংঘবদ্ধ প্রতারক তুহিন ও তার ২ সহযোগীর স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও

খিলগাঁওয়ের সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা মোঃ তুহিন শেখ ওরফে তুহি আহমেদ চৌধুরী ওরফে সাহাল তুহি ও তার ২ সহযোগীর স্বীকারোক্তিমূলক ভিডিও বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সময়ের এই ভিডিওতে তুহিন শেখ প্রতারণার পুরো ঘটনার বর্ণনা দিয়েছে। নিজের দোষ স্বীকার করে সে ক্ষমাও চেয়েছে। নবম শ্রেণীর এক কিশোরীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার হাতিয়ে নেওয়ার মামলায় এখন তারা কাশীমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে। টিডিসি ওয়ার্ল্ড নামের নাম সর্বস্ব ডান্স কোম্পানির আড়ালে নাচ ও মিউজিক ভিডিও’র পরিচয় দিয়ে প্রেমের ফাঁদ পাততো এই চক্র। এদের বিরুদ্ধে ধর্ণাঢ্য ও মধ্যবিত্ত পরিবারের কিশোরীসহ কোমলমতি মেয়েদের বিয়ে এবং প্রেমের ফাঁদে ফেলে স্বর্ণালঙ্কার ও লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এর আগে একাধিক মেয়ের সাথে বিয়ে ও প্রেমের অভিনয় করে ধরাও পড়েছে সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতা ছদ্মবেশী প্রতারক তুহিন। তার প্রধান ২ সহযোগী রতন মিয়া ওরফে রিফাত এবং ইমাম উদ্দিন ওরফে বাবুু।


সূত্র জানায়, দামী পোষাক, শুদ্ধ ভাষায় কথা বলা এবং নিজেদের নামের একাংশের সাথে মিল রেখে আকর্ষণীয় নামে খোলা ফেসবুক আইডিতে এডিট করা সুন্দর সুন্দর ছবি পোস্ট করে কোমলমতি কিশোরী মেয়েদের ফাঁদে ফেলতো সংঘবদ্ধ এই প্রতারক চক্র। পরে তারা বিভিন্ন কৌশলে মেয়েদের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কার, নগদ টাকা এবং দামি জিনিসপত্র হাতিয়ে নিতো। সূত্র মতে, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা একাধিক নাম ব্যবহারকারী মোঃ তুহিন শেখ বহু বিয়ে এবং অনেক মেয়ের সাথে প্রেমের নামে প্রতারণা করেছে। প্রতারণার শিকার মেয়েদের মধ্যে অধিকাংশই কিশোরী এবং নাচের সাথে জড়িত। এদের মধ্যে ইলভিন, সানজিদা, তানিয়া ও সোনিয়া অন্যতম।

জানা যায়, মোঃ তুহিন শেখের বিরুদ্ধে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে থাকা এবং নাচের ক্লাশের জন্য বনশ্রী, মেরাদীয়া ও সিপাইবাগে বাসা ভাড়া নিয়ে টাকা না দিয়েই পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে উত্তর গোড়ানের সিপাইবাগে বাসা ভাড়া নিয়ে বাড়িওয়ালার ছেলের কাছে ধরা পড়ে তুহিন ও তানিয়া। পরে মারধোর করে তাদেরকে ওই বাসা থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। ৩ বছর আগের এ ঘটনা এলাকায় বেশ চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলো। সূত্র মতে, মা-বাবার প্রশ্রয় পেয়েই তুহিন অতিমাত্রায় বখে যায়। মেয়েদের নিয়ে বাসায় আড্ডা দেওয়া থেকে শুরু করে রাত কাটাতে অভ্যস্ত ছিলো এই প্রতারক। এ সুযোগে তুহিনের মা হাসি বেগম নিজেও মেয়েদের কাছ থেকে দামী জিনিসপত্র আদায় করতো।


সূত্র জানায়, সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা মোঃ তুহিন শেখ মুখের সুন্দর অবয়ব, শুদ্ধ ভাষা এবং কণ্ঠকে পুঁজি করে নানান কৌশলে বছরের পর বছর বিভিন্ন বয়সের মেয়েদের সাথে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলো। বাবা মোঃ দুলাল শেখ মালিবাগ চৌধুরীপাড়া আবুল হোটেলের সামনে চা দোকান করে। বাসা উত্তর গোড়ানের ২৯৯-১ সিপাইবাগে। ০১-০৩-২০১৭ তারিখ থেকে শাহজাহান ভূঁইয়ার ৪ তলা বাড়ির দ্বিতীয় তলায় এই পরিবারের বসবাস। ২ ভাই ১ বোনের মধ্যে তুহিন সবার বড়। তানভীর শেখ দ্বিতীয় এবং বোন তুলি শেখ সবার ছোট। গ্রামের বাড়ি বরিশালের উজিরপুর উপজেলার তারাশিরায়। সপ্তম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া জানা এই ধুরন্দর নিজেকে খিলগাঁও মডেল ইউনিভার্সিটি কলেজের ছাত্র পরিচয় দিতো। তার ফেসবুক প্রোফাইলেও এই কলেজের ছাত্র পরিচয় দেওয়া আছে। নির্বিঘেœ অতিমাত্রায় প্রতারণা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তুহিন ২ বছর আগে টিডিসি ওয়ার্ল্ড নামের নাম সর্বস্ব ডান্স কোম্পানি খোলে।

জানা যায়, মোঃ তুহিন শেখ প্রায় ১ বছর আগে ফেসবুকের মাধ্যমে প্রতারণার শিকার কিশোরীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। ২ মাস আগে স্বর্ণালঙ্কার ও টাকা আত্মসাত করার চেষ্টায় লিপ্ত হয়ে নানান প্রলোভনে নাবালিকার সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ায়। কিশোরীর মা গত সেপ্টেম্বর মাসের ৬ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত বিয়ের ৩টি অনুষ্ঠানে ভারী স্বর্ণালঙ্কার পড়েন। ছবি তুলার পর ফেসবুকে পোস্ট করলে তুহিন কিশোরীর সাথে যোগাযোগের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। স্বর্ণালঙ্কার সম্পর্কে কিশোরীর সাথে ফেসবুক মেসেঞ্জার এবং মোবাইল ফোনে একাধিকবার কথা বলে। কিশোরী কোনো কিছু না বুঝে প্রলোভন এবং ফাঁদে পা দেয়। আসামীর ফাঁদে পড়ে ওই কিশোরী বিভিন্ন সময় ফেসবুক মেসেঞ্জারে ভিডিও কলেও স্বর্ণালঙ্কার দেখায়। আসামী তার ০১৬৮৩-৯৩১৮৯১ মোবাইল ফোন থেকে প্রায়ই কিশোরীর বাসার মোবাইল ফোনেও কথা বলতো।


সূত্র জানায়, প্রতারক চক্রের মূলহোতা মোঃ তুহিন শেখ ঢাকার পূর্ব শেওড়াপাড়ার ১৪ বছর বয়সী নবম শ্রেণীর এক স্কুল ছাত্রীকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে তার কাছ থেকে ৭ ভরি ৮ আনা ওজনের স্বর্ণের ৩টি নেকলেস হাতিয়ে নেয়। আনুমানিক মূল্য ৪ লাখ ২৬ হাজার ৭৫০ টাকা। এ ঘটনায় কাফরুল থানায় মামলা (নম্বর: ৩৬, তারিখ: ২৬-১০-২০১৯) দায়ের করা হয়। পরে অফিসার ইনচার্জ মোঃ সেলিমুজ্জামান এবং অফিসার ইনচার্জ (তদন্ত) মোঃ ফারুকুল আলমের নির্দেশে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোঃ সাদ্দাম হোসেন ফয়েজ এবং এএসআই মাহফুজুর রহমান গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করেন। ২৬-১০-২০১৯ তারিখ রাতে খিলগাঁও তালতলা মার্কেট এলাকা থেকে আসামীদের গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ২৭-১০-২০১৯ তারিখ তাদেরকে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে পাঠানো হয়। শুনানি শেষে বিজ্ঞ বিচারক আসামীদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। পরবর্তীতে ০৩-১১-২০১৯, ১১-১১-২০১৯ ও ১২-১১-২০১৯ তারিখ আসামীদের জামিন শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞ বিচারক জামিন নামঞ্জুর করেন। রাষ্ট্র পক্ষে ঢাকা মহানগর পিপি অ্যাডভোকেট মোঃ আব্দুল্লাহ আবু, এপিপি অ্যাডভোকেট মোঃ শহীদ উদ্দিন এবং অ্যাডভোকেট সরোয়ার জাহান শুনানিতে অংশ নেন। জিআরও রনপ কুমার ভক্ত রাষ্ট্র পক্ষে আদালতে নথি উপস্থাপন এবং যুক্তিতর্কে অংশ নেন। সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা তুহিন ও তার ২ সহযোগী বর্তমানে কাশীমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক রয়েছে।


মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণে জানা যায়, আসামী মোঃ তুহিন শেখ পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম দিন ২১-০৯-২০১৯ তারিখ দুপুর ১ টায় পূর্ব শেওড়াপাড়ার শেফ রেস্টুরেন্টের সামনে কিশোরীর কাছ থেকে ৩ ভরি ৮ আনা ওজনের স্বর্ণের ১টি নেকলেস নেয়। দ্বিতীয় দিন ২৭-০৯-২০১৯ তারিখ বিকাল ৪ টায় একই স্থান থেকে ৪ ভরি ওজনের স্বর্ণের আরও ২টি নেকলেস নিয়ে যায়। এ সময় প্রথম দিন নেওয়া বড় নেকলেসের ডিজাইনের মতো করে এমিটেশন দিয়ে বানানো ১টি নকল নেকলেস কিশোরীকে দিয়ে বলে এটি তার মার আলমারীতে গহনার বক্সে রাখতে। বক্সে গহনা নেই বিষয়টি যেন কিশোরীর মা না বুঝেন। আলমারী এলোমেলো এবং বক্স থেকে স্বর্ণের ৩টি নেকলেস না পেয়ে কিশোরীর মা খোঁজাখুঁজি করেন। পরে ফেসবুক মেসেঞ্জার এবং মোবাইল কলের সূত্র ধরে আসামী তুহি এবং তার সহযোগীদের সনাক্ত করা হয়। এক পর্যায়ে কিশোরী পুরো ঘটনার বর্ণনা দেয়। প্রতারণার সাথে অপর ২ আসামী সরাসরি জড়িত।


সূত্র জানায়, নাচের জগতে অভিষিক্ত হওয়ার পর থেকেই মোঃ তুহিন শেখ নানান ধরণের প্রতারণার সাথে জড়িয়ে পড়ে। নির্বিঘেœ অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার জন্য রতন মিয়া ওরফে রিফাত এবং ইমাম উদ্দিন ওরফে বাবুর সাথে ঘনিষ্টতা বাড়ায়। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠা করে সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। এই চক্রের ফেসবুক আইডি এবং তাদের প্রোফাইল দেখলে যে কেউ ভরকে যাবেন। এরা সবাই খিলগাঁও মডেল ইউনিভার্সিটি কলেজের ছাত্র পরিচয় দেয়। অথচ সপ্তম শ্রেণীর বেশি লেখাপড়া জানা নেই কারও। এদের কথাবার্তা এবং চলাফেরায় বিভ্রান্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। অপরিচিতরা তাদেরকে ধর্ণাঢ্য পরিবারের সন্তান মনে করেন। তুহিনের বাবা মোঃ দুলাল শেখ রাস্তার পাশে চা বিক্রি করে। রিফাত ও বাবুর বাবা অল্প আয়ের খেটে খাওয়া মানুুষ। বাবু মাঝে মধ্যে স্বর্ণের কারখানায় কারিগরের কাজ করলেও রিফাত ভবঘুরে। তুহিনই রিফাতের একমাত্র ভরসা। সকল অপকর্মের সাথে সরাসরি জড়িত দাদা নামের এই রিফাত। তার বিরুদ্ধেও মেয়েদের সাথে প্রতারণার বহু অভিযোগ রয়েছে।

জানা যায়, গ্রেফতার হওয়া সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সদস্যরা নিজেদের নাম গোপন রেখে Sahal Tuhi (লিংক: https://www.facebook.com/tuhiahhmed.chowdhury), Rm Rifat Tdc (লিংক: https://www.facebook.com/profile.php?id=100007415984413) এবং Tdc MD Babu (লিংক: https://www.facebook.com/md.nuton.94) ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে প্রতারণা চালিয়ে আসছিলো। তুহিন শেখ ও তার সহযোগীরা নানান প্রলোভন ও প্রেমের ফাঁদে ফেলে বহু মেয়ের সর্বনাশ এবং তাদের কাছ থেকে স্বর্ণালঙ্কারসহ লাখ লাখ টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র হাতিয়ে নেয়। ধুরন্দর প্রতারক মোঃ তুহিন শেখের বিরুদ্ধে ধর্ষণ এবং বহু অনৈতিক কাজের অভিযোগ রয়েছে।

  • সর্বশেষ - জাতীয়