ময়মনসিংহ, , ১৯ শ্রাবণ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

ময়মনসিংহে ডিসি-এসপি অফিসের পাশে বাণিজ্য মেলা : ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

ময়মনসিংহে ডিসি-এসপি অফিসের পাশে বাণিজ্য মেলা : ৩ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা

ময়মনসিংহের ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে কাচারীঘাটে জেলা প্রশাসক এবং পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের পাশে চলছে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্য মেলা। এখান থেকে ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ফাঁদ পেতেছেন ঢাকা থেকে আসা আয়োজক সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা। টেকসই মনে করে বাজার মূল্যে নকল ও নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ময়মনসিংহ নগরী এবং জেলার লাখ লাখ মানুষ। কোটি টাকার ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়ার পরিকল্পনা আয়োজক এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালার তোয়াক্কা না করে এবং জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের বাধ্য করা হচ্ছে ১৫ টাকার গেট টিকিট কিনতে। চালানো হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ বিনোদন। কম আয়তনের স্থানে শতাধিক স্টল ও বিনোদন চালিয়ে ঘিনজি পরিবেশ সৃষ্টি করায় প্রায়ই ঘটছে নানা অঘটন। আয়োজক সিন্ডিকেট ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্সের নাম ভাঙ্গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মেলা থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা, জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন এবং চেম্বার অব কমার্সের শর্ত ভঙ্গ করার অভিযোগ করা হয়েছে আয়োজকদের বিরুদ্ধে। বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ময়মনসিংহের সচেতন মহল। অন্যদিকে চেম্বার অব কমার্সকে বিতর্কিত করার অভিযোগ করেছেন বিক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা। মেলায় গিয়ে নকল এবং নিম্নমানের পণ্য কিনে প্রতারিত না হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে ক্রেতা ও দর্শনার্থীদের। অতিরিক্ত দামে নকল এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করে ময়মনসিংহবাসীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়টি বন্ধ করতে উচ্চ আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করার প্রক্রিয়া চলছে।

বৃহস্পতিবার সরেজমিন মেলা ঘুরে দেখা যায়, ছোট-বড় মিলিয়ে ১০৫টি স্টল রয়েছে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই মেলায়। নামে বাণিজ্য মেলা হলেও প্রতিষ্ঠিত কোনো কোম্পানির স্টল নেই। নকল এবং নিম্নমানের পণ্য দিয়ে সাজানো হয়েছে স্টলগুলো। বৈধ ব্যবসার কাগজপত্র নেই অধিকাংশ স্টল মালিকের। পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে মানা হচ্ছে না কোনো নিয়ম। দেওয়া হচ্ছে না রসিদ এবং মালামালের ওয়ারেন্টি বা গ্যারান্টি। প্রতারণায় ভরপুর প্রতিটি স্টল। ক্রেতারা সবচেয়ে বেশী প্রতারিত হচ্ছেন ক্রোকারিজ এবং ১২০, ১৩০ ও ১৫০ টাকা পণ্যের স্টলে। ক্রোকারিজের স্টল থেকে ১টি পণ্য কিনলে একাধিক ফ্রি। বিষয়টি লটারির মতো। ৪টি স্টলের প্রতিটিতেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে নামি-দামী কোম্পানির প্যাটার্ন এবং লোগো ব্যবহার করা নকল ও নিম্নমানের পণ্য। ১২০, ১৩০ এবং ১৫০ টাকার ৪টি স্টলের প্রতিটিতেই নকল ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করতে চিৎকার চেঁচামেচি করে ক্রেতাদের ডাকে সেলসম্যানরা। পণ্যগুলো দেখতে আসল এবং দামী পণ্যের মতোই। বাসায় নিয়ে ২-৩ দিন ব্যবহার করার পরই ক্রেতাদের কাছে নকলের বিষয়টি ধরা পড়ে। অনেকেই আবার ক্রোকারিজসহ এসব পণ্য মেলায় ফেরত আনেন। এ নিয়ে প্রায়ই তর্কবিতর্কের ঘটনা ঘটে। এই মেলায় প্রতারণার শুরু আছে শেষ নেই। থ্রি-পিস, তৈরী পোষাক, গৃহস্থলীর জিনিসপত্র, মেয়েদের ব্যাগ, স্যান্ডেল, জুয়েলারী এবং প্রসাধনী সামগ্রীর ৮০ ভাগই নকল এবং নিম্নমানের। ঢাকার ইসলামপুর, সদরঘাটের বিসমিল্লাহ টাওয়ার এবং চকবাজার থেকে এসব পণ্য সংগ্রহ করেছেন স্টল মালিকরা। অতিরিক্ত দামে বিক্রি করা হচ্ছে নিম্নমানের খোলা এবং প্যাকেট করা খাদ্যপণ্য। প্যাকেটের গায়ে বিএসটিআই-এর নকল বিডিএস নম্বর দেওয়া থাকলেও মেয়াদোত্তীর্ণের কোনো তারিখ নেই। পরিস্থিতি মগের মুল্লুকের মতো। দেখার যেন কেউ নেই। প্রতারিতরা প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

জানা যায়, ময়মনসিংহ চেম্বার অব কমার্স শর্ত সাপেক্ষে ঢাকার গ্লোবাল লিংক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানকে মেলা লিজ দেয়। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের নাম ব্যবহার না করে গেট, প্রচারপত্র, মাইকিং এবং বিভিন্ন স্থানে চেম্বার অব কমার্সের নাম ব্যবহার করছে। অথচ স্টল বুকিংয়ের প্রচারপত্রে তাদের প্রতিষ্ঠান এবং নিজেদের নাম বড় করে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ঘটনায় জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে। চেম্বার নেতাদের সম্পর্কে ভুল বুঝছেন নগরবাসী। তারা মনে করছেন চেম্বারের শীর্ষ নেতারা সরাসরি মেলার সাথে জড়িত। অবশ্য চেম্বারের এক নেতার মেলায় যাতায়াত এবং সিন্ডিকেটের সাথে মাখামাখি সম্পর্কের কারণে নগরবাসীর ধারণা বেড়েই চলেছে। এই নেতার কারণে চেম্বারের শীর্ষ নেতারা প্রায়ই নানা প্রশ্নের সম্মুখিন এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েন। সূত্র মতে, গ্লোবাল লিংক ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট নামের প্রতিষ্ঠানের অন্যতম মালিক শহীদুল ইসলাম খান পিন্টু ২০১৬ সালেও এই মেলা করেছিলেন। ওই বছর তার কারণে নগরীতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। মেলার মাঠেও অনাকাঙ্খিত নানা ঘটনা ঘটে। ২ মাস্তান গ্রুপের দ্বন্দ্বের কারণে এক যুবককে ছুরিকাঘাত করে পাশেই ব্রহ্মপুত্র নদে ফেলে দেওয়া হয়েছিলো। মেলায় অবস্থান করা একদল পুলিশের সামনে এ ঘটনা ঘটলেও তারা নিরব থাকেন। খবর পেয়ে কোতোয়ালি মডেল থানার তৎকালীন অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কামরুল ইসলাম নিজে মারাত্মক আহত ওই যুবককে উদ্ধার করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এর কয়েক দিন পর মেলার মাঠে এক মেয়েকে নিয়ে ২ গ্রুপের দ্বন্দ্বের সূত্র ধরে রয়েল মিডিয়া কলেজের মেধাবী ছাত্র মাসুম বিল্লাহকে ডেকে নিয়ে শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজের সামনে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। আশঙ্কাজনকভাবে নগরীতে বেড়ে গিয়েছিলো ছিনতাই এবং অপরাধ কর্মকাণ্ড। সূত্র মতে, এসব কারণেই গত ৩ বছর শহীদুল ইসলাম খান পিন্টুকে মেলা লিজ দেয়নি চেম্বার কর্তৃপক্ষ। এবার কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে এক নেতাকে ব্যবহার করে মেলা লিজ নেন পিন্টু। এবারও মেলার আশেপাশে অসামাজিক এবং অপরাধ কর্মকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।


সূত্র জানায়, কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এই মেলায় স্টল রয়েছে ১০৫টি। ৫৫টি বড় এবং বাকিগুলো ছোট। ৩০ দিনের জন্য বড় আকারের ১০টি বক্স স্টল থেকে ৫ লাখ করে ৫০ লাখ, মাঝারি আকারের ২০টি বক্স স্টল থেকে সাড়ে ৩ লাখ করে ৭০ লাখ, ছোট আকারের ২৫টি বক্স স্টল থেকে ২ লাখ করে ৫০ লাখ এবং রাউন্ডের ৫০টি স্টল থেকে ৯০ হাজার করে ৪৫ লাখ টাকা ভাড়া আদায় করা হয়েছে। বিনোদনের ১০টি ইভেন্ট ও কয়েকটি খাবারের স্টল থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছে ২০ লাখ টাকা। এছাড়া বিনোদন এবং স্টল থেকে নেওয়া হবে ১৫ লাখ টাকা বিদ্যুৎ বিল। প্রতিদিন গড়ে বিক্রি হচ্ছে ৯০ হাজার টাকার গেট টিকিট। ৬ হাজারেরও বেশী ক্রেতা ও দর্শনার্থী প্রতিদিন মেলায় প্রবেশ করেন। টিকিটের দাম ১৫ টাকা। টিকিট থেকে আয় ২৭ লাখ টাকা। হিসাব অনুযায়ী ৩০ দিনে স্টল, গেট ও বিনোদন থেকে আয়োজকদের আয় ২ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ৭ দিন সময় বাড়লে অতিরিক্ত ৬৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৩ টাকাসহ মোট আয় হবে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৩ টাকা। ১৫ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মেলা ১৫ মার্চ রাতে শেষ হওয়ার কথা। ৭ দিন সময় বাড়ানোর পাঁয়তারা চালাচ্ছে আয়োজকরা। ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচের পর বাকি ১ কোটি ২৭ লাখ অথবা সময় বাড়লে ১ কোটি ৯১ লাখ ৬৩ হাজার ৩৩৩ টাকা হাতিয়ে নিবে আয়োজক সিন্ডিকেট। সূত্র মতে, ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচের মধ্যে অনুমতি ও লিজ নেওয়ার জন্য ৪০ লাখ, অন্যান্য খরচ ৬০ লাখ, ডেকোরেটর ২৫ লাখ, ইলেকট্রিক ডেকোরেটর ও বিদ্যুৎ বিল ১৫ লাখ এবং মাঠ তৈরীর খরচ ১০ লাখ টাকা।

জানা যায়, মেলার স্টল এবং বিনোদনে প্রতিদিন গড় বিক্রি ৬০ লাখ টাকা। ৩০ দিনে বিক্রি ১৮ কোটি টাকা। স্টল ও বিনোদন মালিকদের লাভ কমপক্ষে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। ভাড়া, ডেকোরেশন, স্টাফদের বেতন এবং অন্যান্য খরচ সাড়ে ৩ কোটি টাকা বাদ দিয়ে লাভ ২ কোটি টাকা। সূত্র মতে, ৩০ দিনে নকল এবং নিম্নমানের পণ্য বিক্রি ও বিনোদন থেকে শতাধিক ব্যবসায়ীর আয় ২ কোটি টাকা। আয়োজক সিন্ডিকেটের আয় ১ কোটি ২৭ লাখ টাকা। এভাবেই ১ মাসে ময়মনসিংহ থেকে ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে আয়োজক সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা। অপরদিকে বিনোদনের ৩টি ইভেন্ট মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। অনুমতি এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছাড়াই এসব বিনোদন চালানোর অভিযোগ করা হয়েছে। ১০টি ইভেন্ট উপভোগ করার জন্য আলাদা আলাদা টিকিটের দাম নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ১০০ টাকা করে। গেট টিকিটের উপর ঘোষণা করা হয়েছে র‌্যাফেল ড্র। প্রাইভেটকারসহ ৩১টি বাহারি পুরস্কার দেওয়ার কথা রয়েছে বিজয়ীদের। অন্যদিকে আয়োজক সিন্ডিকেট এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা কোটি টাকার ভ্যাট এবং আয়কর ফাঁকি দেওয়ার যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেখানে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন সেখানে মুজিব শতবর্ষের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কোটি টাকার ভ্যাট এবং আয়কর ফাঁকি দেওয়ার বিষয়টি নগরবাসীকে ভাবিয়ে তুলেছে। নকল ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রি করে প্রতারণা এবং ভ্যাট ও আয়কর ফাঁকি দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন ময়মনসিংহবাসী। বিষয়টির প্রতিকার না পেলে মঙ্গলবার উচ্চ আদালতে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাগরিক। চেম্বার অব কমার্স এবং আওয়ামী লীগ নেতাদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নগরবাসী।

বাণিজ্য মেলার নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সাংবাদিক মাহমুদুল হাসান রতন শুক্রবার দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে বলেন, আয়োজকরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা এবং প্রশাসনের শর্ত ভঙ্গ করে মেলা চালিয়ে যাচ্ছেন। শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক স্বদেশ জানান, বাণিজ্য মেলার নামে নকল ও নিম্নমানের পণ্য বিক্রির বিষয়ে ব্যবস্থা না নিলে জনগণ প্রশাসনের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলবে। সামাজিক ব্যক্তিত্ব আব্দুল কাদের চৌধুরী মুন্না বলেন, প্রশাসন আন্তরিক হলে অপরাধীরা কোনো অবস্থাতেই ছাড় পাবেন না। উন্নয়ন, গণমাধ্যম ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব স্বাধীন চৌধুরী জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ চাইলেই ময়মনসিংহবাসীকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে পারেন। একই সাথে সরকারের কোটি টাকার ভ্যাট এবং আয়করও আদায় করা সম্ভব।

  • সর্বশেষ - জাতীয়