ময়মনসিংহ, , ৭ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

৩ বছর পেরোলেও তৃতীয় এলওসির কোনো অর্থছাড় করেনি ভারত

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

৩ বছর পেরোলেও তৃতীয় এলওসির কোনো অর্থছাড় করেনি ভারত

তিন বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সই হওয়া তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) এক টাকাও ছাড় করেনি ভারত। বাস্তব কাজ শুরু হয়নি চুক্তির আওতায় থাকা একটি প্রকল্পেরও। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।


খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ, রেল, অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়ন সংক্রান্ত বেশকিছু প্রকল্পের আওতায় সাড়ে চারশ কোটি মার্কিন ডলার বাংলাদেশকে ভারত ঋণ দেবে বলে ২০১৭ সালের ৪ অক্টোবর ওই চুক্তি করে। বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এবং ভারতের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির উপস্থিতিতে এ ঋণ চুক্তি সই হয়। বাংলাদেশের পক্ষে ইআরডি এবং ভারতের পক্ষে দেশটির এক্সিম ব্যাংক চুক্তিতে সই করে।


ইআরডির সর্বশেষ তথ্যমতে, তৃতীয় এলওসির আওতায় ভারত সরকার ১৬টি প্রকল্পের জন্য ৪৫২ কোটি ডলার ঋণ দেবে। তার মধ্যে চুক্তির পর ৯টি প্রকল্পের বিপরীতে ২৫৪ কোটি ডলার অনুমোদন করেছে ভারত সরকার। বাকি সাত প্রকল্পের জন্য আনুমানিক ১৯৮ কোটি ডলার দেবে তারা।


ভারতীয় ঋণের এই ১৬ প্রকল্পের মধ্যে ইতোমধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় পাঁচটি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। বাকি ১১ প্রকল্প একনেকে না ওঠায় এখনো সেগুলো দৃশ্যমান নয়। পাঁচ প্রকল্প একনেকে অনুমোদন পেলেও সেগুলোর এখনো বাস্তব কাজ শুরু হয়নি। ফলে সেসব প্রকল্পে অর্থছাড় করেনি ভারত।


তিন বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো কেন ভারত কোনো অর্থছাড় করল না জানতে চাইলে নাম না প্রকাশ করার শর্তে ইআরডির একাধিক কর্মকর্তা  জানান, বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো বিশ্বের বিভিন্ন দেশ-প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করার পর বাংলাদেশের সঙ্গে ঋণচুক্তি সই করে। কিন্তু ভারত তা করে না। ভারত প্রথমে ঠিক করে কোন কোন প্রকল্পে তারা ঋণ দেবে। সেই প্রকল্পগুলোর বিষয়ে ঋণচুক্তি সই করার পর তারা কাজ শুরু করে। চুক্তির পর তারা ডিপিপি প্রস্তুতসহ আনুষঙ্গিক কাজ করে। স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থার তুলনায় চুক্তি সইয়ের পর দু-তিন বছর বেশি সময় লাগে। এটা লাগা স্বাভাবিক। তৃতীয় এলওসি প্রকল্পের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।


তারা আরও জানান, তৃতীয় এলওসির মধ্যে পাঁচটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু এখনো একটা প্রকল্পও অপারেশনে যায়নি, তাই ছাড় হয়নি।


বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে ইআরডি সচিব ফাতিমা ইয়াসমিনের মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও তার সাড়া মেলেনি।


এ বিষয়ে ইআরডির এশিয়া, জেইসি এবং এফঅ্যান্ডএফ উইংয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী সচিব জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পের অধীনে যদি কেনাকাটা করা হয়, তাহলে টাকা ছাড় হবে। প্রকল্প এখন প্রকিউরমেন্ট করছে। আমি বিশ্বাস করি, এই অর্থবছর ভালোই টাকা ছাড় হবে।’


তিনি বলেন, ‘ভারতীয় যে ঋণ, তা বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো নয়। প্রকল্প একনেকে অনুমোদিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাংক ও এডিবির সঙ্গে চুক্তি সই হয়। ভারতের ক্ষেত্রে আগে চুক্তি সই হয়, তারপর ডিপিপি করার প্রস্তুতি শুরু হয়। যদি বিশ্বব্যাংকের মতো হতো, তাহলে যেদিন চুক্তি সই হতো তার ছয় মাসের মধ্যে প্রকিউরমেন্ট করে ফেলা যেত। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির প্রকল্প সই হলে তার চেয়ে তিন-চার বছর বেশি সময় ভারতের প্রকল্পকে শুরুতেই দিতে হবে। কারণ প্রকল্পগুলো প্রস্তুত থাকে না। শুধু নাম থাকে যে, এই এই প্রকল্প হতে পারে। এটা হচ্ছে পলিসিগত পার্থক্য।’


জহিরুল ইসলাম আরও বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে চুক্তি হয়েছিল যে তারা সাড়ে চারশ কোটি ডলার আমাদের দেবে। ওই সময় আমাদের প্রকল্প প্রস্তুত ছিল না, ডিপিপি প্রস্তুত ছিল না। এখন আমরা ডিপিপি প্রস্তুত করছি।’


তৃতীয় এলওসির মধ্যে একনেকে অনুমোদিত প্রকল্প পাঁচটি হলো- ‘কনস্ট্রাকশন অব নিউ ডুয়েলগেজ রেললাইন ফ্রম বগুড়া টু সিরাজগঞ্জ’ প্রকল্প, যেখানে ভারত ঋণ দেবে ৩৭ কোটি ৯২ লাখ ডলার; ‘ফোর লেনিং অব রামগড় টু বারইয়ারহাট রোড (৩৫ কিলোমিটার)’ প্রকল্পে আট কোটি ডলার; ‘ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ফর পাওয়ার ইভাকুয়েশন ফ্যাসিলিটিস অব রূপপুর নিউক্লিয়ার প্ল্যান্ট’ প্রকল্পে ১০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার; ‘মডার্নাইজেশন অব সিটি স্ট্রিট লাইট সিস্টেম অ্যাট ডিফারেন্ট এরিয়া আন্ডার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পে আড়াই কোটি ডলার এবং ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ প্রকল্পে ভারত ঋণ দেবে ৫৩ কোটি ডলার।


তৃতীয় এলওসির বাকি ১১টির মধ্যে ‘ডেভেলপমেন্ট অব রেল অ্যান্ড রোড বেজড আইসিডি অ্যাট ঈশ্বরদী’ প্রকল্পে সাড়ে তিন কোটি ডলার; ফোর লেনিং অব বেনাপোল-যশোর-নড়াইল-ভাতিয়াপাড়া-ভাঙ্গা রোড (১৩৫ কিলোমিটার)’ প্রকল্পে ১০ কোটি ডলার; ‘ফোর লেনিং অব কুমিল্লা (ময়নামতি)-ব্রাহ্মণবাড়িয়া-সরাইল রোড’ প্রকল্পে সাড়ে ৩৪ কোটি ডলার; ‘ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইন দ্য নিউ অ্যালাইনমেন্ট অব দ্য এনই-বাংলাদেশ-এনইআর [কাতিহার-পার্বতীপুর-বোরনগর (৭৬৫ কেভি ইন্টার-কানেকশন)]’ প্রকল্পে সাড়ে ৩৯ কোটি ডলার; ‘মোল্লাহাট ১০০ মেগাওয়াট সোলা পিভি পাওয়ার প্ল্যান্ট’ প্রকল্পে ১৫ কোটি ডলার; ‘সাপ্লাই অব মেশিনারি ফর সলিড ওয়াস্ট ম্যানেজমেন্ট ইন ঢাকা সাউথ সিটি করপোরেশন’ প্রকল্পে আড়াই কোটি ডলার; ‘পায়রা পোর্ট মাল্টিপারপাস টার্মিনাল’ প্রকল্পে সাড়ে ৫২ কোটি ডলার; ‘বে কনটেইনার টার্মিনাল (চট্টগ্রাম)’ প্রকল্পে চার কোটি ডলার; ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব দ্য স্পেশাল ইকোনমিক জোন (ইন্ডিয়া এসইজেড) অ্যাট মিরসরাই’ প্রকল্পে সাড়ে ১১ কোটি ডলার; ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব সোলার বেজড বেস স্টেশনস ইন হার্ড-টু-রিচ এরিয়াস ফর স্ট্রেন্থেনিং টেলিটক নেটওয়ার্ক কাভারেজ’ প্রকল্পে তিন কোটি ডলার এবং ‘আপগ্রেডেশন অব সৈয়দপুর এয়ারপোর্ট’ প্রকল্পে সাড়ে ৩৭ কোটি ডলার ঋণ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ভারত।

  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর