ময়মনসিংহ, , ৭ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

টাকায় মেলে জাল দলিল

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

টাকায় মেলে জাল দলিল

নামজারি, ডিসিআর ও খাজনার রশিদ, ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্র কোনো কিছুই হাতে নেই। এরপরও প্রতারকের নামে তৈরি হবে দলিল। ওই দলিল সরকারিভাবে রেজিস্ট্রিও হবে দাবিকৃত টাকা দিলে। বছরের পর বছর ধরে এভাবেই দুর্নীতি চলছে বগুড়ার শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে।


এখানেই শেষ নয়, কেউ জমি নিবন্ধন করতে এলে সরকার নির্ধারিত ফির পরিবর্তে ‘সমিতি’ নির্ধারিত টাকা হিসাব করে তুলে দেয়া হয় দলিল লেখকদের হাতে। বলা হয়, এটি না দিলে জমি নিবন্ধন হবে না। বাধ্য হয়ে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে সরকার নির্ধারিত ফির চাইতে কয়েকগুণ বেশি টাকা গুনতে হয়।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সংঘবদ্ধ একটি সিন্ডিকেট চক্রের কব্জায় রয়েছে শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস। প্রকাশ্যে ঘুষ, অনিয়ম-দুর্নীতি এখানকার স্বাভাবিক চিত্র। সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে নানা অজুহাতে পদে পদে টাকা নেয়া হয়। টাকা ছাড়া কোনো কাজই হয় না এখানে।


ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের আশীর্বাদে দলিল লেখক, অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট ‘সমিতি’র নামে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা উৎকোচ আদায় করা হচ্ছে। দীর্ঘদিন থেকে চলা এই সিন্ডিকেটের ব্যাপারে কেউ প্রতিবাদ করার সাহসও পান না।


সম্প্রতি একটি জাল দলিল নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়ার পর দলিল লেখকদের নানা অপকর্মের চিত্র সামনে আসে। সেইসঙ্গে মুখ খুলতেও শুরু করেন ভুক্তভোগীরা। শেরপুর শহরের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আপেল মাহমুদ আশকারীর একটি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাব-রেজিস্ট্রার সেখানে তৈরি করা জাল দলিল বাতিল করেন। তবে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেননি।



ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি এই অফিসটিতে জমি নিবন্ধন করতে গেলে সরকার নির্ধারিত ফির পরিবর্তে দলিল লেখকদের হাতে ‘সমিতি’ নির্ধারিত টাকা তুলে দিতে হয়। এর বাইরে জমি নিবন্ধন হবে না বলে জানিয়ে দেয়া হয়। বাধ্য হয়ে কয়েকগুণ বেশি ফি দিয়ে জমির দলিল করেন তারা।


নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দলিল লেখকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এক লাখ টাকা মূল্যের জমি নিবন্ধন করতে সাব-কবলার জন্য ৬৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়। অর্থাৎ চালানের মাধ্যমে এই টাকা ব্যাংকে জমা দেয়া হয়। এরসঙ্গে দলিল লেখকের সম্মানীসহ আরও দেড় হাজার টাকা হলেই যথেষ্ট হয়। অথচ সেখানে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এই টাকার মধ্যে সমিতির নামে নেয়া হয় ৩৫০০-৫০০০ টাকা। সাব রেজিস্ট্রার অফিসের জন্য নেয়া হয় ১০০০-২০০০ টাকা। এভাবে জমির মূল্য বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ঘুষের টাকার পরিমাণও বাড়তে থাকে।


চাহিদামতো টাকা না দিলে দলিল নিবন্ধন করা হয় না। সমিতির এই প্রকাশ্য চাঁদাবাজির ব্যাপারটি সবাই অবগত। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য চলে সবার সামনেই।


জমি নিবন্ধন করতে বিশালপুর এলাকা থেকে আসা হারাণ চন্দ্র, নাইশিমুল গ্রামের সিরাজ উদ্দীন, মির্জাপুরের জহুরুল ইসলাম অভিযোগ করে বলেন, ‘সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ে অভিযোগে শেষ নেই। কী হয় না এখানে! টাকা হলে সবই সম্ভব। নিয়মনীতির কোনো বালাই নেই। সমিতির নামে টাকা, অফিসের নামে টাকা, মসজিদের নামে টাকা, রশিদের নামে টাকা, বকশিসের নামে টাকা। শুধু টাকা আর টাকা। অথচ সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দুর্নীতিমুক্ত এমন ঘোষণা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিক চিত্র ঠিক উল্টো।’



সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শেরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক ও সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের বাইরেও অনেকে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আবার অনেকেই জটলা করে বসে আছেন।


তবে অফিস প্রাঙ্গণে ঘুরতে থাকা বেশিরভাগ লোকই দালাল চক্রের সদস্য বলে জানা গেছে। এরা কম টাকায় দলিল নিবন্ধন করে দেয়ার কথা বলে পছন্দের দলিল লেখকদের কাছে মক্কেল ধরে এনে দেন। বিনিময়ে কমিশন পান।


সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ক্ষমতাসীন দলসহ প্রভাবশালী একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতার নাম ব্যবহার করে সাব-রেজিস্ট্রি প্রাঙ্গণে দলিল লেখক সমিতির একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়েছে। সিন্ডিকেটের নেপথ্যে যাদের নাম শোনা যায় তার মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা আসিফ ইকবাল, বিএনপি নেতা জানে আলম খোকা, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বিয়া, পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি মকবুল হোসেন, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক গোলাম হোসেন, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরে আলম সানি, ছাত্রলীগের সাবেক উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবু বকর সিদ্দিক, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান মজনুর তৃতীয় স্ত্রী শিল্পী বেগমের মেয়ের জামাই নাসিম।


মূলত এদের সমর্থনেই দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস খন্দকার ও সাধারণ সম্পাদক জামাল উদ্দিন একটি সিন্ডিকেট তৈরি করে জমি রেজিস্ট্রি করতে আসা সাধারণ মানুষদের জিম্মি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই চক্রের কাছে সাব-রেজিস্ট্রারও অসহায়।



সরকারি এই অফিসের প্রধান ব্যক্তি সাব-রেজিস্ট্রার। নিয়ম অনুযায়ী জমি নিবন্ধনের সর্বসময় ক্ষমতা তারই। কিন্তু তিনি চক্রের চাপে সরাসরি কোনো জমি নিবন্ধন করেন না। সমিতি নির্ধারিত ফি ও কর্মকর্তার বিশেষ চিহৃ থাকলেই সেই দলিল নিবন্ধন করেন। এতেই শেষ নয়; অফিসের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলিল লেখকদের একটি অংশ জাল-জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত। তারাই ভুয়া নামজারি, ডিসিআর ও খাজনার রশিদ, আরএস রেকর্ডের জাল কাগজ তৈরি করে জমি নিবন্ধন করছেন।


এমনকি এসব জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেও সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেয়া হয়। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভুয়া কাগজপত্র তৈরির মাধ্যমে জমি নিবন্ধনের এই রমরমা বাণিজ্য চলছে বলেও জানান সংশ্লিষ্টরা।


শেরপুর পৌরশহরের বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ২৭ শতক জমির মালিকানা দাবি করেন ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়ি উপজেলার গোলাম কিবরিয়ার স্ত্রী অজুফা খাতুন। নানা ও চাচার সম্পত্তির ওয়ারিশ হিসেবে একটি দানপত্র দলিল সৃষ্টি করতে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে চুক্তি করেন। পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে এই দলিল নিবন্ধন করার দায়িত্ব নেন তারা। সে অনুযায়ী সর্বশেষ বিগত ২১ ডিসেম্বর দলিলটি নিবন্ধনের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে দেয়া হয়। তবে সমস্ত কাগজপত্রেই জাল-জালিয়াতির আশ্রয় নেয়ার বিষয়টি ধরতে পেরে দলিলটি বাতিল করা হয়।


ভুক্তভোগী আপেল মাহমুদ আশকারী বলেন, জালিয়াত চক্রটি থেমে নেই। তার মালিকানাধীন কোটি টাকা মূল্যের জমির জাল দলিল তৈরির জন্য মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে চক্রটি।


তিনি জমি দলিল রেজিস্ট্রি সম্পাদন আইন-১৮৮২ সালের ৫৩সি ধারা উল্লেখ করে বলেন, যে কোনোভাবে প্রাপ্ত জমির নামজারি খতিয়ান না থাকলে সে জমি বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না মর্মে নির্দেশনা রয়েছে। অথচ কোনো নামজারি, ডিসিআর ও খাজনার রশিদ, ভূমি অফিসের রেকর্ডপত্রই থাকার পরেও জালিয়াত চক্র মোটা টাকার বিনিময়ে অন্যকে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে দিচ্ছে। এ ধরনের একাধিক ঘটনা রয়েছে।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব আম্বীয়া বলেন, ‘তিনি কিংবা তার দলের কোনো নেতা এই কাজের সহযোগিতা করেন না। তারা কেউই সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যান না। এসব অভিযোগ মিথ্যা।’


তবে উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি জানে আলম খোকা বলেন, ‘ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একটি সর্বসম্মত কমিটি করে দেয়া হয়েছিল। সেখানে দলিল কার্যক্রম কিভাবে চলবে তার একটি গাইডলাইন করে দেয়া হয়েছিল। তবে বেশিরভাগ সময়ই এসব গাইডলাইন মানা হয় না।’


দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফেরদৌস খন্দকার অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য না করে পুরো বিষয়টি চাপিয়ে যাবার চেষ্টা করেন।


শেরপুর রেজিস্ট্রি অফিসের সাব-রেজিস্ট্রার নুর-এ আলম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি এখানে নতুন যোগদান করেছেন। তাই অনেক কিছুই এখনো অজানা। তবে কোনো ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে জমি নিবন্ধন করা হবে না। একই সঙ্গে শেরপুরে রেজিস্ট্রি অফিসে কোনো সিন্ডিকেট নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ