ময়মনসিংহ, , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ অনলাইন সংস্করণ

নিজের জন্য কখনোই খেলেনি

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

নিজের জন্য কখনোই খেলেনি
মাশরাফির মা হামিদা মুর্তজা

বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে ছেলে মাশরাফি বিন মুর্তজার শেষ ম্যাচ দেখতে গতকাল সকালেই নড়াইল থেকে সিলেটে উড়ে গেছেন গোলাম মুর্তজা স্বপন। ছোটো ভাই মোরসালিন মুর্তজা ও নড়াইল থেকে মাশরাফির বন্ধুরাও হাজির হয়েছিলেন সিলেটের গ্যালারিতে। নড়াইল শহরের মহিষাখোলার ডুপ্লেক্স বাড়িতে বসে টিভি স্ক্রিনে চোখ রাখছিলেন হামিদা মুর্তজা। মাশরাফির স্ত্রী, ছেলে-মেয়েও ঢাকার বাসায় ছিল। তারাও সিলেটমুখী হয়নি।

গতকাল বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ থাকার সময়টাতে মুঠোফোনে পাওয়া গেল হামিদা মুর্তজাকে। ফোনের ওপ্রান্তে কণ্ঠটা একটুও ভারী মনে হয়নি। কোনো ধরনের আড়ষ্টতাও ধরা পড়েনি। বরং প্রকৃতির নিয়মের মতোই অধিনায়ক হিসেবে ছেলের বিদায়কে বরণ করলেন তিনি।

গত ৫ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে মাশরাফি বলেছিলেন, ঘুম থেকে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এবং দুপুরে জানিয়ে দিয়েছেন। এমনকি আগের দিনও পরিবারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেননি। গতকাল হামিদা মুর্তজার কথায়ও যার সত্যতা পাওয়া গেল।

মাশরাফির মা বলছিলেন, ‘সে ঘুম থেকে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, সে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেবে। প্রত্যেক দিনই আমাকে বলে যায় যে, আম্মা আমি মাঠে যাচ্ছি। আমার জন্য দোয়া করো। কালকেও (৫ মার্চ) সে একই নিয়মে বলছে যে আম্মা আমি অধিনায়কত্ব থেকে অবসর নেব। আমি মাঠে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনে আজকে আমি বলে দেব। তুমি দোয়া করো। এটুকুই আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। তাছাড়া আর কোনো কথা হয়নি। এবং আমাকে, ওর আব্বাকে, ওর মামাকে, ওর বন্ধু-বান্ধব সবাইকেই বলছে যখন এই সিদ্ধান্ত ও নিছে যে, অধিনায়কত্ব ছেড়ে দেবে। সবাইকে বলছে।’

তৃতীয় দফায় টানা ছয় বছর বাংলাদেশের অধিনায়কের দায়িত্বে ছিলেন মাশরাফি। গত এক বছর ধরে ধেয়ে আসা আলোচনার ঝড় থামিয়ে নেতৃত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ছেলের ক্যারিয়ারের শেষের শুরু দেখে হামিদা মুর্তজার ভেতরটা ঠিকই কেঁপেছে। যা প্রকাশেও রাগঢাক করেননি। গতকাল বলেছেন, ‘বুঝেন তো দীর্ঘ ছয়টা বছর অধিনায়কত্ব করছে। এখন অবসর নিল। একটু খারাপ তো লাগেই। এটা তো বুঝেনই। এটা তো বলার অপেক্ষা রাখে না। সবারই বোঝা উচিত। এখন খারাপ লাগলে তো সবকিছু চলবে না। এটাকে তো মেনে নিতেই হবে।’

তবে নিজের ভেতরকে আড়াল করে মায়ের গভীর মমতার চাদরে ঠাঁই দিচ্ছেন ছেলের সিদ্ধান্তকে। মাশরাফির নেতৃত্ব ছাড়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে হামিদা মুর্তজা বলেছেন, ‘কেন স্বাগত জানাব না? নতুন অধিনায়ক আসুক। ২০২৩ সালে বিশ্বকাপ, নতুন অধিনায়কের হাত ধরে খেলবে বাংলাদেশ। ওরটা তো ছাড়তেই হবে, আজকে হোক, কালকে হোক ছাড়তেই হবে। আগেই ছেড়ে দিল। সম্মানের সঙ্গে ছাড়াটাই সবচেয়ে উত্তম। নিজের সম্মান নিয়ে সরে দাঁড়ানোটাই সবথেকে উত্তম। সেটাই করছে।’

মাশরাফির নেতৃত্বের পরশ পাথর বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে। ২০১৪ সালে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশকে টেনে তুলেছেন তিনি। দিন বদলের নেতা বলা হয় তাকে। দেশের সর্বকালের সেরা অধিনায়কের তকমাও তার নামের পাশে শোভা পাচ্ছে। লাল-সবুজ জার্সিতে ছেলের অর্জন মায়ের মনকে গর্বের আনন্দে ভরিয়ে তোলে। হামিদা মুর্তজা বলছিলেন, ‘আসলে এটা তো আপনারাও জানেন, ও ক্রিকেটকে কি দিছে, না দিছে। নিজের জন্য কখনোই খেলেনি। সবসময় দেশের জন্য খেলছে। আর ক্রিকেটকে কতদূর এগিয়ে এনেছে, এটা তো সারা বাংলাদেশের মানুষই জানে। যখন মানুষের মুখে ওর কথা শুনি, তখন অবশ্যই গর্ব হয়। মা হিসেবে মাথাটা উঁচু হয়ে যায়।’

অধিনায়ক হিসেবে শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন মাশরাফি। তবে বোলার হিসেবে এখনও ২২ গজের চ্যালেঞ্জ নিতে মুখিয়ে আছেন। মমতাময়ী মায়ের মন বলে, ছেলে আরো খেলুক। যতদিন তার সময় ও শরীর বিদ্রোহ না করছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ক্যারিয়ারে যতিচিহ্ন এঁকে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা মাশরাফির জন্যই তুলে রাখতে বললেন হামিদা মুর্তজা।

  • সর্বশেষ - সারাদেশ