ময়মনসিংহ, , ২৫ চৈত্র ১৪২৬ অনলাইন সংস্করণ

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও যমজ ভাইদের কথা

  অনলাইন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার তত্ত্ব ও যমজ ভাইদের কথা

আইনস্টাইনকে নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। ওগুলো আসলে সত্য, নাকি সবই শুধু কৌতুক, তা বলা মুশকিল। এ রকম একটা গল্প শুনুন। আইনস্টাইন তখন তাঁর আপেক্ষিকতার তত্ত্বের গাণিতিক সমীকরণ নিয়ে চিন্তা ভাবনায় ব্যস্ত। এই সময় তিনি শুধু ফর্মুলার কথাই ভাবতেন। তাই একটু অন্যমনস্ক থাকতেন। সন্ধ্যায় হেঁটে বাসায় ফিরেছেন। তিনি সযত্নে হাতের লাঠিটি বিছানায় পরিপাটি করে শুইয়ে রেখে নিজে ঘরের কোণে, যেখানে লাঠিটি রাখা হয়, সেখানে গিয়ে দাঁড়ালেন। নিজেকে লাঠি আর লাঠিকে আইনস্টাইন বানিয়ে একেবারে তালগোল পাকিয়ে ফেললেন। কারণ, মাথায় তো কেবল E = mc 2 ফর্মুলাটাই ঘুরছে!

আইনস্টাইন তখন কাগজ–কলম নিয়ে বসেছেন। আপেক্ষিকতার সাধারণ সূত্র লিখছেন। গভীর চিন্তামগ্ন। এমন সময় তাঁর গৃহকর্মী এসে জিজ্ঞেস করলেন, ডিম কিনেছি ১৫টা। প্রতি হালি চার টাকা হলে, চার হালির একটা কম, ১৫টি ডিমের দাম কত দেব? আইনস্টাইন বললেন, দাঁড়াও, হিসাব করে বলছি। এরপর তিনি খাতা–কলম নিয়ে হিসাব করতে শুরু করলেন। যদি ৪টার দাম x হয় আর ১৫টির দাম y, তাহলে y = ...? ঘণ্টাখানেক পর তিনি গৃহকর্মীকে বললেন, খুব জটিল হিসাব, বীজগণিত ব্যবহার করে দেখলাম, ১৫টি ডিমের দাম সাড়ে চৌদ্দ থেকে সাড়ে পনেরো টাকার মাঝামাঝি। তার মানে, 14.5< y >15.5 টাকা। গৃহকর্মী তো অবাক। বললেন, ওই দাম তো আমি তখনই বের করে ডিমওয়ালাকে দিয়ে দিয়েছি! হিসাব তো খুব সহজ। ৪টার দাম চার টাকা, একটার দাম ১ টাকা, তাই ১৫টার দাম ১৫ টাকা! আইনস্টাইন বললেন, ও, ঠিক তাই তো! এর জন্য জটিল হিসাবের দরকারই ছিল না।

আরেকবার দুই তরুণ-তরুণী আইনস্টাইনের কাছে আপেক্ষিকতার তত্ত্ব বুঝতে গেলেন। তিনি বললেন, তেমন জটিল কিছু নয়। মনে করো, প্রেমিকার জন্য তুমি পার্কে অপেক্ষা করছ। আসছে না। তখন প্রতিটি মিনিট মনে হবে যেন ১ ঘণ্টা। আর প্রেমিকা আসার পর তোমরা গল্প জুড়ে দিলে। তখন প্রতিটি ঘণ্টা মনে হচ্ছে মাত্র ১ মিনিট!

অবশ্য আপেক্ষিকতার সূত্র কিন্তু তুলনামূলক কোনো ব্যাপার নয়। সেটা অনেক জটিল বিষয়।

আলোর গতি সব সময় একই থাকে

অনেক সময় ধাঁধা লাগে। মনে হয় আপেক্ষিকতার সূত্র তো আমাদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে খাপ খায় না। যেমন এই সূত্র অনুযায়ী আলোর গতির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে। কোনো বস্তু বা কণা এই গতির চেয়ে বেশি গতিতে কখনো চলতে পারে না। কিন্তু কেন না, সেটাই প্রশ্ন। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা কিন্তু ভিন্ন। ধরা যাক, আমি একটি বাসে যাচ্ছি। এর গতি ঘণ্টায় ৪০ মাইল। চলন্ত অবস্থায় আমি বাসের গতির দিকেই বাইরে একটি ঢিল ঘণ্টায় ১০ মাইল বেগে ছুড়ে মারলাম। আমার বন্ধু বাইরে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দেখছে ঢিলটি ঘণ্টায় (৪০ + ১০) = ৫০ মাইল বেগে যাচ্ছে। আমি যদি ঘণ্টায় ২০ মাইল বেগে ঢিলটি ছুড়তাম, তাহলে বন্ধু দেখত, ঢিলটি (৪০ + ২০) = ৬০ মাইল বেগে যাচ্ছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি আমি চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে একঝলক আলোকরশ্মি ছুড়ে দিই, তাহলে সেই গতি একই থাকবে, বাসের গতি যোগ হবে না। আলো ঘণ্টায় ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল বেগেই চলবে।

কেন এই ব্যতিক্রম
মূল ব্যাপার হলো, আমার বন্ধু যদি আলোর গতি বেড়ে যেতে দেখে, আর, অর্থাৎ দুই অবস্থানের পর্যবেক্ষকদের জন্য আলোর গতি যদি অভিন্ন না হয়, তাহলে ম্যাক্সওয়েলের সূত্র দুই পর্যবেক্ষকের জন্য অভিন্ন থাকবে না। অথচ আপেক্ষিকতার সূত্র ম্যাক্সওয়েলের সূত্রের ভিত্তিতেই গ্রথিত। পর্যবেক্ষণকারীর অবস্থানের ভিন্নতার কারণে প্রকৃতির এই সূত্র ভিন্ন হওয়া সম্ভব নয়। তাহলে তো আপেক্ষিকতার সূত্র ভুল প্রমাণিত হতো। অথচ বিজ্ঞানীরা এর সত্যতা বাস্তব পরীক্ষায় প্রমাণ করেছেন। সুতরাং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতায় বিজ্ঞানীরা এই ব্যতিক্রম গ্রহণ করে নিয়েছেন।

আলোর চেয়ে বেশি গতি কেন অসম্ভব

আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী আলোর চেয়ে বেশি গতি অসম্ভব। কিন্তু আসলে এটা অন্যভাবে বুঝতে হবে। ঘটনা হলো, কোনো বস্তুর গতি আলোর গতির যত কাছাকাছি যাবে, ততই মনে হবে সেটা যেন ভারী হয়ে যাচ্ছে। যদি সেই বস্তু আলোর গতির একদম কাছাকাছি চলে যায়, তাহলে সেটা অসীম ভরসম্পন্ন বস্তুর মতোই ভারী হয়ে যাবে। তখন এর চেয়ে আরও বেশি গতি অর্জন করতে হলে অসীম পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হবে, যা অসম্ভব। তাই তাত্ত্বিকভাবেই বলা যায়, কোনো বস্তুর পক্ষে আলোর গতির সমান বা তার চেয়ে বেশি গতি অর্জন সম্ভব নয়।

কোনো কোনো বিজ্ঞানী মনে করেন, আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিসম্পন্ন বস্তুকণা থাকতে পারে। তবে এর কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। যদি সে রকম কোনো বস্তুকণার অস্তিত্ব থাকে, তাহলে আমরা মহাশূন্যের যেকোনো প্রান্তে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপন করতে পারব।

যমজ ভাইদের কাহিনি অবাস্তব নয়

আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র অনুযায়ী খুব জোরে চলন্ত অবস্থায় ঘড়ির সময় ধীরে চলে। এখন ধরা যাক লিটন ও রিটন যমজ ভাই পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। লিটন রকেটে মহাকাশ ভ্রমণে গেল। রকেটে সে খুব বেশি গতিতে ঘুরে বেড়াল। রিটন থেকে গেল ঢাকায়। ১০-১৫ বছর পর লিটন ফিরে এলে দেখবে, তার যমজ ভাইয়ের বয়স অনেক বেড়ে গেছে, সেই তুলনায় তার বয়স প্রায় আগের মতোই রয়ে গেছে। এটা কোনো রহস্য নয়। বাস্তবেই এটা হয়।

কেন এ রকম হয়, তা বোঝার জন্য আমরা একটা উদাহরণ নিতে পারি। সময়ের পার্থক্য বোঝার জন্য একটি অ্যাটমিক ক্লক দরকার। ট্রেনের একটি কক্ষের মেঝেতে অ্যাটমিক ক্লকের পাশে একটি ফ্ল্যাশ লাইট ও ট্রেনের ছাদে একটি আয়না এমনভাবে রাখি, যেন ফ্ল্যাশ লাইট জ্বললে তার আলো আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে পাশের অ্যাটমিক ক্লকে ফিরে আসে। আলোকরশ্মি এসে পৌঁছানোমাত্র ঘড়িটি ক্লিক করে একক সময় নির্দেশ করে। এখন ট্রেনটি দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় একবার ফ্ল্যাশ লাইট জ্বলে উঠল। আমি বাইরে থেকে দেখব, আলো সঙ্গে সঙ্গে সরল পথে সোজা উঠে ওপরের ছাদে স্থাপিত আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে ফিরে এল এবং অ্যাটমিক ক্লক একবার টিক শব্দে একক সময় নির্দেশ করল। এবার ট্রেনটি দ্রুতগতিতে চলা অবস্থায় আগের মতো আবার ফ্ল্যাশ লাইট জ্বালানো হলো। এই অবস্থায় আমি বাইরে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখব, আলোকরশ্মি সরল পথে ওপরে উঠছে না। ট্রেনের গতির দিকে কোনাকুনি বাঁকা পথে উঠে আবার বাঁকা পথে ফিরে এসে অ্যাটমিক ক্লকে পৌঁছাল। ফলে এবার আলোকরশ্মি অ্যাটমিক ক্লকে পৌঁছাতে একটু বেশি সময় নেবে এবং অ্যাটমিক ক্লক ক্লিক করবে একটু দেরিতে। অর্থাৎ চলন্ত অবস্থায় সময় ধীরে চলে।

সময় যে চলন্ত অবস্থায় আসলেই ধীরে চলে, সেটা পরীক্ষায় প্রমাণিত হয়েছে। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে এক দল বিজ্ঞানী দুটি অ্যাটমিক ক্লক নিয়ে পরীক্ষা চালান। একটি ঘড়ি রাখা হয় অ্যারোপ্লেনে ও আরেকটি এয়ারপোর্টে। পরে দুটি ঘড়ির সময় মিলিয়ে দেখা যায়, অ্যারোপ্লেনে রাখা ঘড়ির সময় ধীরে চলেছে।

এখন অবশ্য আরও বাস্তব প্রমাণ পাওয়া যায়। কৃত্রিম উপগ্রহের ঘড়ি পৃথিবীর ঘড়ির চেয়ে ধীরগতিতে চলে। তাই হিসাব ঠিক রাখার জন্য সংশোধন করে নিতে হয়।