ময়মনসিংহ, , ৩ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

সাজেকের পথে পথে রোমাঞ্চকর তিন দিন

  ভ্রমন ডেস্ক

  প্রকাশ : 

সাজেকের পথে পথে রোমাঞ্চকর তিন দিন

নাসরীন আক্তার

অবশেষে মার্চের ৪ তারিখ সেই দিনটি এলো। লক্ষ্য সাজেক ভ্রমণ। রাত ১১:৪০ এ সেন্টমার্টিন পরিবহনে কলাবাগান থেকে খাগড়াছড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। সামনের সারিতেই আমাদের পছন্দের সিট। লম্বা চুলের দীর্ঘদেহী বেশ হ্যান্ডসাম এক ড্রাইভার আমাদের নিয়ে চললেন। দারুণ উচ্চারণে কথা বলেন। ভাবগম্ভীর। কথাবার্তায় শিক্ষিত বলে মনে হলো। গাড়ি ছাড়ার ঘণ্টাখানেক পরেই প্রায় সব যাত্রীর শুরু হলো ঘুমপর্ব। আমি জেগে। রাতের রাস্তা দেখতে ভালো লাগে। ভোর প্রায় ৪:৩০ মিনিটের দিকে আমরা রামগড় পৌঁছলাম। হঠাৎই মনে হলো সবাই জেগে উঠেছে। কারণ কিছুক্ষণ পরপরই গাড়ি একবার ডানে একবার বামে মোড় নিচ্ছে। মনে হচ্ছিল প্রতি মিনিটে মিনিটে গাড়ি তার দিক পরিবর্তন করে চলছে। বোঝা গেল সমতল হলেও আমরা বেশ আঁকাবাঁকা পথে প্রবেশ করেছি। এ সময় ড্রাইভার সাহেবের গাড়ি চালানোর কারিশমা দেখলাম। অপজিট সাইড থেকে যেহেতু খুব কম গাড়ি আসছিল, তাই ভয়টা কম অনূভুত হলো। এরই মধ্যে যথারীতি মেয়ে তার বমি পর্ব সম্পন্ন করলো। ওর জন্য পর্যাপ্ত পলিথিন আর পানির ব্যবস্থা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার ফলস্বরূপ সব যথাসময়ে প্রস্তুত রাখি। মেয়ে বমির ধকল কাটিয়ে শান্ত হলো। পুব আকাশে আলো ফুটতেই খাগড়াছড়ি পৌঁছলাম। ‘অরণ্য বিলাস’ নামের এক হোটেলে উঠলাম।

মাহেন্দ্রতে (চান্দের গাড়ির মতো দেখতে) করে আমাদের সাজেক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হোটেলের ম্যানেজার সাহেব বললেন, ‘আপনারা যেহেতু মাত্র ৩ জন, তো আপনারা সিএনজি করেই সাজেক যেতে পারেন।’ সিএনজি বললেও ওটা ছিল অকটেন চালিত। ঢাকার সিএনজি চালিত থ্রি হুইলারের ছোট যান। ভয় হচ্ছিলো এই ভেবে, এমন হালকা গাড়ি রাঙ্গামাটির পাহাড়িপথ পাড়ি দিতে পারবে তো! অবশেষে সিএনজিই ভাড়া করা হলো। চুক্তি তিন দিনের জন্য। খাগড়াছড়ির জন্য একদিন আর সাজেকে বেড়ানোর জন্য দুই দিনের রফাদফা। হোটেলে নাস্তা সেরে প্রথমে গেলাম মায়াবিনী লেক দেখতে। জায়গাটির নাম ‘ভাইবোন ছড়া’। নামটি বেশ আগ্রহ-উদ্দীপক। এমন নাম রাখার কারণ জানতে ইচ্ছে হলো। স্থানীয় মানুষকে জিজ্ঞেস করে কিছুই জানা গেল না। কেউ বলতে পারলেন না। তবে এই ‘ভাইবোন ছড়া’র রাজত্ব বেশ বড় এলাকাজুড়ে। ছোট ছোট সাইজের ভিন্ন প্রজাতির আম বাগান চোখে পড়লো। গাছে মুকুল ধরতে শুরু করেছে মাত্র। বাতাসে এর সুগন্ধি মিশে মনকে মাতোয়ারা করার চক্রান্ত করছে। জলকে আমার ভয়। তাই ঠাঁই দাঁড়িয়ে ‘জলে না নেমে মাছ ধরা’র মতো করেই মুহূর্তটিকে অনুভব করা শুরু করলাম। সরু আকৃতির বোটে করে বাপ-বেটি বৈঠা চালিয়ে পুরো লেকটা ঘু্রে এলো। এই অবকাশে দেখলাম ছেলেপেলের এক দল এসেছে পিকনিক করতে। ওরা গানের তালে নাচছে। আমি সানগ্লাসের আড়ালে তাদের নাচ বেশ উপভোগ করতে লাগলাম। একসময় মাথা ঝাঁকিয়ে তুরি বাজিয়ে তাদের সাথে যোগ দিলাম। আমার এ অবস্থা দেখে ওদের নাচের গতি আরও বেড়ে গেলো।

jagonews24

দুপুরে গেলাম পানছড়ি উপজেলায় এক চাকমা বাড়িতে। হৃদয় চাকমা নামক এক ব্যক্তি আমাদের পূর্বপরিচিত। ছোট্ট এক পাহাড়। তার উপর বাড়ি। বাড়িতে অনেক ঘর। দেখে বুঝতে পারলাম এটি যৌথ পরিবার। বাচ্চাদের জন্য পথে মিষ্টি কেনা হয়েছিল। হৃদয় চাকমার পরিবারের সব সদস্য ভীষণ রকমের অমায়িক আর হাসিখুশি। আমাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল। আমরা যাওয়ামাত্র অপেক্ষাকৃত ছোট বয়সের সব শিশু-নারী-পুরুষ পা ছুঁয়ে সালাম করলো। আমরা অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। পরক্ষণে বুঝলাম, এটি বড়দের প্রতি ওদের শ্রদ্ধা প্রকাশের প্রথাসিদ্ধ রীতি। আমরা চারপাশ ঘুরে ঘুরে দেখলাম। নিরিবিলি আর গাছগাছালিতে ঘেরা ছিমছাম পরিবেশ। সারি সারি মাটির ঘর। শুনেছি মাটির ঘরে না-কি তেমন গরম লাগে না। সত্যি তাই।

ভরদুপুরে তেমন গরম লাগলো না। যদিও টেবিল ফ্যানের ব্যবস্থা ছিলো। বাড়ির পাশেই নানা রঙের অনেকগুলো জবাফুলের গাছ চোখে পড়লো। কিছুক্ষণ পর আমরা খেতে বসলাম। টেবিলে দেয়া হলো ছয়-সাত পদের খাবার। এর অধিকাংশ তাদের নিজস্ব খাবার। মাটির নিচের একধরনের আলু দিয়ে লইট্টা শুঁটকি, ডাটা দিয়ে চিংড়ি, খাসির গোশত, মুরগি, ডিমের তরকারি, চিচিঙ্গা দিয়ে ডাল চরচরি, বাঁশে রাঁধা বিন্নি চালের ভাত। সবশেষে পেঁপে, পায়েস, দুধ, রং চা আসতে লাগলো। এতো এতো আয়োজনে লজ্জায় পড়তে হলো আমাদের। চাকমা পরিবারটি স্বচ্ছল নয় কিন্তু পরিশ্রমী। দেখলাম এদের মেয়েদের চোখেমুখে অক্লান্ত পরিশ্রমের ছাপ। ওদের আয়ের তেমন কোনো উৎস নেই। চামড়া কুচকানো, কপালে গভীর বলিরেখা কিন্তু মুখে সরল একটি হাসি। তবে পড়াশোনার ব্যাপারে সচেতন। আমাদের পেয়ে পরিবারের সবাই খুব আনন্দিত। কেউ স্যান্ডেল এগিয়ে দিচ্ছে, হাত ধোয়ার পানি দিচ্ছে। আতিথেয়তার চূড়ান্ত প্রকাশ দেখলাম ওদের আন্তরিকতায়। খাওয়া শেষে সবাই আমাদের সাথে ছবি তুললো। গৃহকর্তা বাড়িতে রাত্রিযাপনের নিমন্ত্রণ জানালেন। কিন্তু আমাদের সময়গুলো তো হিসেব করা। তাই তাদের নিমন্ত্রণ ইচ্ছে থাকলেও গ্রহণ করা গেলো না। বিদায় জানাতে প্রায় পরিবারের সবাই আমাদের সাথে অনেকদূর এগিয়ে এলো। বিদায়ের মুহূর্তে জড়িয়ে ধরলো। কী এক মমতায় বেঁধে ফেললো অল্প সময়ের মধ্যেই। চাকমা পরিবারটির কথা আমার অনেকদিন মনে থাকবে।

jagonews24

সে রাতে হোটেলে ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিলাম নিজেকে দেখবো বলে। নিজের মধ্যে একটা ডিফারেন্ট আর ইয়ং লুক আনার জন্য ভ্রমণের দুই দিন আগে পার্লারে গিয়ে হেয়ার রিবন্ডিং করেছিলাম। খাগড়াছড়িতে মায়াবিনী লেক আর পানছড়িতে যাওয়ার সময় সে চুল যেন হাওয়ার সাথে মিতালি করে তার শাহরিক লাবণ্য হারিয়েছে। এ নিয়ে আমার কোনো খেদ নেই। রিবন্ডিং করা চুল এখানে এসে যেন পেল খোলা হাওয়ায় ওড়ার বাধাহীন স্বাধীনতা।

পরের দিন শনিবার। পাহাড়ের চূড়ায় মেঘের দেশে যাওয়ার দিন। সকাল ৮:৩০ এ নাস্তা শেষে খাগড়াছড়ি থেকে সিএনজি আমাদের সাজেক নিয়ে চললো। প্রথমে নিয়ে গেলো দীঘিনালায়। সেখানে যেতে ঘণ্টাখানেকের উপর লাগলো। ওখানে গিয়ে দেখি সব ভ্রমণপিয়াসী লোকের ভিড়। কেউ গেলো চান্দের গাড়িতে করে, কেউ মাহেন্দ্রতে করে, কেউ নিয়েছে প্রাইভেটকার। মোটর বাইকও ছিলো। আমাদের মতো কেউ কেউ সিএনজি ভাড়া করলো। সব যানই সারিবদ্ধভাবে সাজানো। এখানে প্রায় ঘণ্টাখানেক অপেক্ষা করতে হলো। এর মধ্যে অনেকেই বাঁশ চা খেলো। সুন্দর করে কাটা ছোট সাইজের বাঁশের মধ্যে রং চায়ের পরিবেশনা। এটাই বাঁশ চা। আমরাও বাঁশ চায়ের স্বাদ নিলাম। মেয়ে খেলো যথারীতি চকবার। এরপর সামনে-পেছনে আর্মি গার্ডের তত্ত্বাবধানে সব গাড়ি সাজেকের উদ্দেশ্যে রওনা হলো। যাচ্ছি আর যাচ্ছি। রাঙ্গামাটির রূপলাবণ্য চোখে ধারন করে চলেছি। এত্তো সুন্দর! এত্তো সুন্দর! পাহাড়ি উঁচু-নিচু আর আঁকাবাঁকা পথ আপন মনে যে যার মতো চলে গিয়েছে। সিএনজি এগোতে থাকে। হঠাৎ পেছনে ফিরে দেখি খাড়া পথ বেয়ে আমরা বেশ উপরে উঠে গেছি। আমরা আবারো চলছি। প্রকৃতির পাহাড়ি রূপে নিজেকে হারিয়ে ফেললাম অল্প সময়ের মধ্যে। পেছনে তাকিয়ে মনে হলো গভীর খাদ থেকে আমরা উঁচু কোনো টিলায় আছি। উঁচু-নিচু, আঁকাবাঁকা এমনই পথে চলছি। চারপাশ ঘন সবুজ আর সবুজ। গায়ে ঠান্ডা বাতাসের ছোঁয়া। ঘুমঘুম একটা আমেজ। কিন্তু না, ঘুম আসা চলবে না। আমি এক মিনিটের জন্যও রাঙ্গামাটিকে মিস করতে চাই না। যেতে যেতে দারুণ একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম- পথে পথে রাস্তার দুপাশে উপজাতি ছেলেমেয়েরা হাসিমুখে হাত নেড়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। গায়ে ময়লা জামা। কারো কারো গায়ে জামাও নেই। খালি পা। তাতে কি? ওদের চোখেমুখে আনন্দের এতটুকু কমতি নেই। বুঝলাম জীবনের অনুভূতিগুলো এখানে আমাদের শহরের সুখকাতর মানুষগুলোর মতো নয়।

jagonews24

তখন দুপুর। ১২:১৫ মিনিটে আমরা সাজেক পৌঁছলাম। সিএনজি ড্রাইভার খুব চৌকস। সবকিছু তার চেনা। আগেই বুকিং করে রাখা এক রিসোর্টে উঠলাম। রিসোর্টটি বাঁশ আর কাঠের সমন্বয়ে তৈরি। দেখতে বেশ নান্দনিক। দোতালায় একটি রুম। রুমের পেছনের কাঠের বারান্দাটি বেশ মনোরম। সেখান থেকে যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। কোলাহলহীন দারুণ শান্ত পরিবেশ। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বারান্দায় বসে থেকেছি। আকাশে ছিল অজস্র তারা। নিচে অন্ধকার পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে বেশ দূরে দূরে লাল বাতি মিটমিট করে জ্বলছে। সে আলোয় কিছু ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। এতো উঁচু পাহাড়েও উপজাতিরা এমন বিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করে! ভাবতেই ভয় লাগছিল। হঠাৎ যদি পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, তবে ওরা তখন কী করে? রাতে ঠান্ডা ভাব ছিল। ফ্যান ছাড়তে হয়নি। বারান্দায় বসে ঢাকায় রেখে আসা প্রিয়জনদের মনে পড়লো।

দুপুরে ‘সাজেক হোটেল পেদা টিং টিং’ নামক রেস্টুরেন্টে খেলাম। নামটা যতোই অদ্ভুত হোক না কেন এর বাইরের লুকটা বেশ। সাজেকের রেস্টুরেন্টগুলোর প্রধান আকর্ষণ হলো বাঁশ চিকেন আর বাঁশ বিরিয়ানি। এগুলো আবার তিন থেকে চার ঘণ্টা আগে অর্ডার দিতে হয়। ওদের কথাবার্তার স্টাইলে মনে হলো এই দুটি আইটেম অসাধারণ মানের। আমরা ক্ষুধার্ত। অর্ডার দিয়ে এতো সময় অপেক্ষা করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়। ম্যানেজার সাহেব ব্যাপারটা বুঝতে পেরে অন্যের অর্ডার করা বাঁশ চিকেন আমাদের খেতে দিলেন। বললেন, পরে ওনাদের তৈরি করে দেবেন। আমরা খুশি মনে খেতে বসলাম। বাঁশ চিকেনের সাথে ছিল সবজি, আলুভর্তা আর ডাল। বাঁশ চিকেনের টুকরাগুলো এমনভাবে কাটা ছিল যে, কোন টুকরাটি মুরগির কোন অংশের তা বোঝা মুশকিল। এর স্বাদ ভিন্ন ছিল ঠিকই; তবে দ্বিতীয়বার অন্য কোনো রেস্টুরেন্টে এর টেস্ট নেওয়ার উৎসাহ হারিয়ে ফেললাম। এবেলায় আলুভর্তা আর ডাল আমাদের বাঁচালো।

এদিন বিকেলে স্টোন গার্ডেন আর হেলিপ্যাডে ঘুরতে গেলাম। স্টোন গার্ডেনে স্টোনের পাহাড় দেখলাম। দোলনায় দুললাম। এরপর গেলাম হেলিপ্যাড দেখতে। আমাদের এক জাঁদরেল রাষ্ট্রপতি না-কি এখানেই হেলিকপ্টারে করে নামতেন। আর আমাদের স্টোনগার্ডেন থেকে হেঁটেই হেলিপ্যাডে আসতে হয়েছে। সাজেকে আর্মিদের তিন-চারটি রিসোর্ট আছে যা ইট পাথরের। বাকি প্রায় সব রিসোর্টই বাঁশ আর কাঠ দিয়ে তৈরি। ছনের রিসোর্টও চোখে পড়লো। রাস্তার দুইপাশে সুন্দর সুন্দর নামের অনেক রিসোর্ট। নাম শুনলেই মনে হবে মেঘের রাজ্যে প্রবেশ করলাম বুঝি। মেঘকাব্য, মেঘপুঞ্জি, মেঘগুচ্ছ, মেঘাদ্রি নানা নামের রিসোর্ট। তবে সাজেকে আমরা সেই মেঘের দেখা পেলাম না। ভোরের কুয়াশায় গা ভিজলো না। মেঘের সাথে মিতালি হলো না। বর্ষার শুরুতেই না-কি সাজেকে গেলে মেঘ ছোঁয়া যায়। তবে যা দেখেছি তা-ই ঢের সুন্দর। চোখজুড়ানো। মন মাতানো। মজার বিষয় হলো সাজেকে এতো যে হাঁটলাম, কিন্তু ক্লান্ত হলাম না। ঘাম হলো না। খুব ক্ষুধা বোধও হলো না। সাজেকের সৌন্দর্য শুধু মন ভরালো না, পেটও ভরালো।

jagonews24

সাজেকে দ্বিতীয় দিন সকাল ১০টায় গেলাম কংলাক পাহাড়ে। পাহাড়ের পাদদেশে ছোট একটি ছেলে দশ টাকায় পাহাড়ে ওঠার জন্য একটি করে লাঠি ভাড়া দিচ্ছিল। বাপ-মেয়ে তাই নিয়ে উল্লাসে পাহাড় অভিযান শুরু করলো। আমি আমার স্থূল দেহ বল্লভের কারণে ভয় পেলেও আমার চেয়ে স্থূল দেহের একজনকে পাহাড়ে ওঠার দৃশ্য দেখে সাহস পেলাম। মাইন্ড চেঞ্জ করলাম। আমিও লাঠি নিয়ে পাহাড়ের চূড়া জয়ে নেমে পড়লাম। অল্প সময়ের মধ্যেই চূড়ায় উঠতে সমর্থ হলাম। কংলাক পাহাড়টির বেশিরভাগ অংশই পাথুরে। ফলে উঠতে অসুবিধা হলো না। পা স্লিপ কাটলো না। চূড়ায় ওঠার পর নিজেকে বেশ এনার্জেটিক আর সাহসী মেয়ে (!) মনে হচ্ছিল। উপরে প্রায় দুই ঘণ্টা হাঁটাহাঁটি করলাম। চা-কফির কয়েকটা দোকান ছিল। বাঁশ চা আবারো খেলাম। ডাবও খেলাম। এরই মধ্যে এক ভদ্র নারীকে ফোনে বলতে শুনলাম, ‘আমরা এখন কংকাল পাহাড়ে। এখানে গ্রামীণের কোনো নেটওয়ার্ক নাই।’ পাহাড়ের এই চূড়ায় উঠে দেখলাম- চারিদিকে যতদূর চোখ যায় পাহাড় আর পাহাড়। বাংলাদেশে কোথাও সমতল ভূমি আছে বলে মনে হলো না। আপন মনে গেয়ে উঠলাম...
‘রাঙ্গামাটির রঙে চোখ জুড়ালো
সাম্পান গানের মাঝে মন ভরালো’
পাহাড় জয় শেষে রিসোর্টে ফিরলাম। ক্লান্ত হলাম না একটুও। আমি শ্বাসকষ্টের রোগী। শ্বাসকষ্টও হলো না। বিকেলে ঘুরলাম লুসাই পল্লিতে। অনেক হাঁটলাম। রাস্তার পাশে সিটারে বসে থাকলাম বেশ রাত পর্যন্ত। মনে হলো এতো এতো রিসোর্টের তো দরকার নেই। অধিক সংখ্যক রিসোর্ট সাজেকের সৌন্দর্য হরণ করবে না তো? এ ব্যাপারে সরকারের একটি সুন্দর নীতিমালা থাকা দরকার বৈকি।

পরের দিন সকাল ১০টায় সাজেককে বিদায় জানালাম। আবারো রাঙ্গামাটির রূপ দেখতে দেখতে খাগড়াছড়ি ফিরলাম। প্রথমে গেলাম হর্টিকালচার পার্কে ঘুরতে। ২৪ একর জমির উপর এই পার্ক। এখানে দারুণ সুন্দর একটি ঝুলন্ত ব্রিজ আছে। দেখলাম নানা রকমের পাখি। গাছ আর গাছ। হাজারো গাছ। আছে লেক। হালকা উঁচু পাহাড়। এখানে তিন-চার ঘণ্টা অনায়াসে পার করিয়ে দেয়া যায় এমন। নিরিবিলি ও বেশ পরিকল্পিত। আমরা ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে গেলাম আলুটিলা গুহায়। ওখানে গিয়ে আর এনার্জি পাচ্ছিলাম না আমি আর আমার মেয়ে। অনেক সিঁড়ি ভেঙে গুহার মুখে পৌঁছলাম। প্রবেশমুখটি বেশ অন্ধকার আর কর্দমাক্ত। আমি গুহায় ঢুকবো না বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। একটু পরেই দেখি মেয়ে কাঁদো কাঁদো মুখে বেরিয়ে আসছে। সে হোঁচট খেয়ে গুহায় পড়ে গিয়েছিল। খানিক চোটও লেগেছে। তাই সে আর গুহায় যাবে না। মা ও মেয়ে ফিরে এলাম। আমার অতি উৎসাহী সাথী গুহা অতিক্রম করলো। সে কোনো কিছু না দেখে ফিরবে না।

বিকেল ৩:৩০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে খাগড়াছড়ি ত্যাগ করলাম। আবার সেই যান্ত্রিক জীবনে প্রবেশের আয়োজন। ঢাকায় এসে মনে হলো- অন্য কোথাও এমন প্রাণসঞ্জিবনী জায়গায় ভ্রমণের আগ পর্যন্ত খাগড়াছড়ি আর সাজেকের রূপ আস্বাদন আর ভালোবাসা প্রাপ্তির কথা মনে রেখে এই কংক্রিটের জঙ্গলেও বেশ কিছু কাল কাটিয়ে দেওয়া যাবে।

  • সর্বশেষ - ভ্রমণ