ময়মনসিংহ, , ৩ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

অযত্ন-অবহেলায় বিবর্ণ ভাস্কর্য

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

অযত্ন-অবহেলায় বিবর্ণ ভাস্কর্য
বোঝার উপায় নেই এটি সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নির্মিত একটি ভাস্কর্য

ঢাকার সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য বিভিন্ন মোড় বা পয়েন্টে নির্মিত ভাস্কর্য ও স্থাপনাগুলো অযত্ন-অবহেলায় পড়ে আছে। কোনোটির গায়ে জমেছে ধুলো, আবার কোনোটায় ধরেছে ফাটল। মলমূত্র আর আগাছায় স্থাপনাগুলো পরিণত হয়েছে ভাগাড়ে।

সচেতন নাগরিকরা বলছেন, বিশেষ কিছু দিবস এলেই ভাস্কর্যগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হয়। বাকি সময় এগুলোর খোঁজ রাখে না কেউ। নিয়মিত দেখভাল না করায় শ্রীহীন এই স্থাপনাগুলোতে বাসা বেঁধেছে ছিন্নমূল মানুষ।

সিটি করপোরেশন বলছে, ভাস্কর্য দেখভালের জন্য তারা দায়িত্বপ্রাপ্ত নয়। আর দেখভালের ব্যবস্থা না করে যত্রতত্র ভাস্কর্য নির্মাণকে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অভাব বলছেন নগর পরিকল্পনাবিদরা।

ধুলো জমে একাকার রাজসিক, জননী ও গর্বিত বর্ণমালা
প্রায় এক যুগ আগে ঢাকা নগরীর ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে নির্মাণ করা হয় ‘রাজসিক’। এর কিছু দূরে পরীবাগ মোড়ে হাতের বামে ‘জননী’ ও ‘গর্বিত বর্ণমালা’ ভাস্কর্য। এগুলো নির্মাণ করেছিলেন প্রয়াত ভাস্কর মৃণাল হক।

পুরো সড়ক জুড়ে মেট্রোরেলের কাজ চলায় ধুলোয় ছেয়ে গেছে ভাস্কর্যগুলো। শেষ কবে এগুলো মোছা হয়েছিল, এলাকার কেউ বলতে পারেনি।

রাজসিক ভাস্কর্যটির কাছে গেলে দেখা যায়, দুটি ঘোড়ার ও কোচোয়ানের গায়ে ধুলোর স্তূপ বসেছে। ধুলোর কারণে গাড়িতে বসে থাকা নবাব সলিমুল্লাহকে চেনা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এছাড়া ভাস্কর্যটির পেছনে থাকা পানির ফোয়ারাটিও দীর্ঘদিন ধরে বিকল।

ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে থাকা ট্রাফিক পুলিশ বক্সের সদস্য আরিফ জাগো নিউজকে বলেন, ‘ভাস্কর্য কেউ পরিষ্কার করে না। আমরা মাঝে মধ্যে ভাস্কর্যটায় পানি দেই, ধুলা মুছে দেই। সিটি করপোরেশনের কেউ পরিষ্কার করতে আসে না।’

jagonews24

রোকেয়া সরণির মুখে ভাস্কর্য ‘উড়োজাহাজ’পড়ে আছে অযত্ন-অবহেলায়

ভাস্কর্য সংলগ্ন পানির ফোয়ারা বন্ধ থাকার বিষয়টি তিনি জানেন না উল্লেখ করে আরিফ বলেন, ‘আমাদের ডিউটি চেঞ্জ হয়। কবে থেকে ফোয়ারা বন্ধ জানি না।’

একই অবস্থা পরীবাগ মোড়ের জননী ও গর্বিত বর্ণমালা ভাস্কর্যের। পাদদেশসহ মূল ভাস্কর্যে ধুলোর ভারী প্রলেপ পড়েছে। ফাটল ধরেছে কয়েকটি বর্ণমালায়।

এই ভাস্কর্যের বিপরীতে ফুটপাতে বসা চা দোকানদার জানান, এটা এমনই থাকে। রোদে শুকায়, বৃষ্টিতে ভেজে। পরিষ্কার করতে কেউ আসে না।

যেমন আছে ‘মুক্তি চাই স্বাধীনতা চাই’
বিজয় সরণি মোড়ে ভাস্কর্য ‘মুক্তি চাই স্বাধীনতা চাই’-এর অবস্থান। মুক্তিকামী মানুষের মিছিলকে মোজাইকের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে এই ভাস্কর্যে।

বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে রাজধানীকে সাজানোর অংশ হিসেবে এটিও এখন চকচকে করছে। তবে সেখানকার আশপাশের কয়েকজন জানান, কদিন আগেও এই ভাস্কর্য থেকে ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ ছড়াতো, তবে এখন যে সাজসজ্জা করা হয়েছে, তা যেন বছরভরেই নজরদারিতে থাকে।

বিজয় সরণিতে আছে আরও একটি স্থাপনা। চন্দ্রিমা উদ্যানের বিপরীতে বিজয় সরণি পেরিয়ে ডানে মোড় নিয়ে সামনে এগোলে রোকেয়া সরণির মুখে ঊর্ধ্বমুখী উড়োজাহাজের ভাস্কর্য। সেখানেও বাসা বেঁধেছে ময়লা-আবর্জনা। উড়োজাহাজটির ডানাসহ বেশ কিছু অংশে ফাটল ধরেছে।

jagonews24

গাছপালায় ঢেকে গেছে ভাস্কর্য ‘ইলিশ ফোয়ারা’

দুর্গন্ধে টেকা দায় ‘ইলিশ ফোয়ারা’য়
এদিকে ফার্মগেটের আনন্দ সিনেমা হলের বিপরীতে নির্মিত ভাস্কর্য ‘ইলিশ ফোয়ারা’র অবস্থা আরও করুণ। গাছপালায় পুরো ঢেকে গেছে ভাস্কর্যটি। আবর্জনা আর জঞ্জালে দেখা যায় না এটি। স্থানীয়রা বলছেন, ভাস্কর্যটি হয়ে গেছে হকার, ছিন্নমূলদের মলমূত্র ত্যাগের স্থান।

জুতা বিক্রেতা জামশেদ জানান, ভাস্কর্যটির দেয়াল ভাঙা থাকায় ভেতরে প্রবেশ করে মলমূত্র ত্যাগ করে পথচারীসহ হকাররা। রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি এটিকে।

সম্প্রতি দেখা যায়, ফোয়ারার পাদদেশে ময়লা জমে একাকার হয়ে গেছে। গাছ গাছালির জঞ্জাল আর মলমূত্রের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে এটি।

খামারবাড়ি মোড়ে নির্মাণাধীন নাম না জানা আরেক স্থাপনা চোখে পড়ে। সেটাও আগাছা, জঞ্জালে পরিপূর্ণ। রক্ষণাবেক্ষণ না থাকায় নির্মাণাধীন কংক্রিটটির চারপাশে ঘিরে রয়েছে আগাছা। এখানেও মলমূত্র ত্যাগ করছে ছিন্নমূল লোকজন।

এছাড়া ময়লা-আবর্জনায় ছেয়ে গেছে এলিফ্যান্ট রোডের প্রবেশমুখের দুটি হাতি, কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা, বেইলি রোডের কোতয়ালীসহ রাজধানীর একাধিক ভাস্কর্য।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান জাগো নিউজকে বলেন, ‘উন্নত শহরে যেভাবে আরবান ডিজাইন নিয়ে কাজ করা হয়, আমাদের এখানে সেটা হয় না। বিচ্ছিন্নভাবে নগরীতে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। আমাদের নগরের ফুটপাতের ওপর যে পুলিশ বক্স তৈরি করা হলো, এই পুলিশ বক্স তো ফুটপাতের ওপর এভাবে হওয়ার কথা নয়। সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুসারে এটা কোথায় হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু যে যার মত বিচ্ছিন্নভাবে করছে।’

jagonews24

সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য নির্মিত ভাস্কর্য ঘিরে বাসা বেঁধেছে ছিন্নমূল মানুষ

তিনি বলেন, ‘ভাস্কর্যগুলো নগরের কোন এলাকায় হবে, সেটার ডিজাইন কেমন হবে। আশেপাশের এলাকার আবহাওয়া, পরিবেশের সঙ্গে সমন্বয় করা কিংবা পরে সেটা কারা দেখাশোনা করবে, দেখাশোনা করার টাকাটা কিভাবে আসবে, অথরিটি কারা। এসব পরিকল্পনা নিয়ে ভাস্কর্য বসানো উচিৎ।’

উন্নত দেশে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যবসায়ীরা এসব ভাস্কর্যের দেখাশোনা করেন বলে জানান এই নগর পরিকল্পনাবিদ। তিনি বলেন, ‘যারা রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত থাকবেন, তারা দেখভালের সঙ্গে জড়িত থাকবেন কিনা, কিংবা দেখভাল করলে তাদের কী ধরনের প্রণোদনা দেয়া হবে, এ ধরনের পরিকল্পনা উন্নত শহরে থাকে। তবে আমাদের দেশে সেটা হয় না।’

আদিল মুহাম্মদ খান আরও বলেন, ‘কোনো ধরনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ভাস্কর্যগুলো করা হয় না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে এগুলো করে। শহরে কোথায় কী ভাস্কর্য করব সেটার জন্য আলাদা পরিকল্পনা নেয়া উচিত এবং সেটার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের নেয়া উচিৎ।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. বদরুল আমিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘এগুলো দেখাশোনার জন্য আমরা দায়িত্বপ্রাপ্ত নই। এটা বিভিন্ন সংস্থা বা বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তাদের সিএসআরের ভিত্তিতে করে। যারা ভাস্কর্যগুলো বসায় তারাই আসলে দেখাশোনা করে। সিটি করপোরেশন এগুলোর দেখভাল করে না। তবে মাঝেমধ্যে সিটি করপোরেশন পরিষ্কার কিংবা মেরামত করে। সিটি করপোরেশন প্রয়োজনমাফিক করে।’

তিনি বলেন, ‘কোনো যায়গায় একেবারে দৃষ্টিকটূ হলে আমরা পরিষ্কার করানোর ব্যবস্থা করি। তবে এটা নির্দিষ্ট করা আছে। যাদের কাছে ভাস্কর্যগুলো হস্তান্তর করা আছে তারা এটা দেখভাল করে।’

  • সর্বশেষ - সাক্ষাতকার