ময়মনসিংহ, , ৪ বৈশাখ ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও একজন বিজয়ী নারীর কথা

  ফিচার ডেস্ক

  প্রকাশ : 

মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ও একজন বিজয়ী নারীর কথা

আতিউন নাহার

মুক্তিযুদ্ধ একটি চেতনা নাম। বাঙালির অস্তিত্বের নাম। জাতীয়তাবোধের সংগ্রাম ও আত্মঅধিকারের দাবিতে ঘটেছিল মুক্তিযুদ্ধ। সেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করেছিল এদেশের নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব থেকেই নারীর অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়। যুদ্ধে জয় এসেছে অথচ নারীর অবদান নেই, বিশ্ব ইতিহাসে তা বিরল। ব্যতিক্রম ছিল না বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও।


বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন আজ আর কোন বিরল ঘটনা নয়। যুগে যুগে সেইসব বীর নারীদের নিয়ে রচিত হয়েছে নানা বীরত্বগাঁথা। নারী আজ সমাজের কোন অত্যাচারিত অবহেলিত গৃহকোণে বন্দি প্রাণি নয়। মাথা উঁচু করে বীরদর্পে সমগ্র বিশ্বের বুকে নিজের পরিচয় তুলে ধরতে সক্ষম। মুক্তিযুদ্ধের নেপথ্যে শক্তি-সাহস-সেবায় ছিল নারী। মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য ও ঈর্ষণীয়। যা যুদ্ধজয়ের ইতিহাসে গৌরবোজ্জ্বল হয়ে আছে। যুদ্ধের শেষ পর্যন্ত অদম্য সাহস আর উদ্দীপনা বুকে নিয়ে তারা বিজয় অর্জন করে আসেন। সংগ্রামী নারী সমাজ আর সব মুক্তিযোদ্ধার প্রেরণার উৎস হয়ে আছেন ডা. লায়লা পারভীন বানু।


জন্মেছিলেন কুষ্টিয়ার এক সম্ভ্রান্ত প্রগতিশীল মুসলিম পরিবারে। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি হলেন জ্যেষ্ঠ। পিতা শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান এবং মাতা আনোয়ারা রহমান। পিতা-মাতার অনুপ্রেরণায় তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন ১৯৬৭ সালে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি হারিয়েছেন পুলিশ ইন্সপেক্টর পিতাকে। পড়াশোনার মাঝে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি এবং পারিবারিক নানা সংকটের মধ্যদিয়ে অতিবাহিত হয় তার জীবন। শুরু হয় জীবন সংগ্রাম। যে বয়সে একটি মেয়ের স্বপ্ন দেখার কথা; সে সময় তিনি হাতে তুলে নিলেন অস্ত্র। দেশমাতৃকার সেবায় আত্মনিয়োগ করলেন। পারিপার্শ্বিক নানা দুর্যোগ মোকাবিলা করে অসীম সাহস বুকে নিয়ে তিনি যুদ্ধে যাওয়ার জন্য প্রস্তত হলেন।


সারাবাংলায় ২৫ মার্চ সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেলেও রাজশাহী শহর ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। ১৪ এপ্রিল সকালবেলা পাক হানাদার বাহিনী নৃশংসভাবে হত্যা করে লায়লা পারভীন বানুর বাবাকে। সেই নির্মম স্মৃতি বুকে নিয়ে ১৯৭১ সালের জুন মাসের প্রথমদিকে তিনি যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে চলে যান কলকাতার ‘গোবরা ক্যাম্পে’। প্রবাসী মুজিবনগর সরকার কর্তৃক অনুমোদিত মুক্তিযুদ্ধের আরেক মহীয়সী নারী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী পরিচালিত ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্প’। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সংগ্রামী যোদ্ধা নারীদের জন্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর পরিচালনায় গোবরা ক্যাম্প পরিচালিত হয়।


সেই ক্যাম্পে নারীরা অস্ত্র চালনা শিখতেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি উদ্যোগে প্রায় ৩০০ তরুণী ও কিশোরী সংগঠক গোবরা ক্যাম্পে অবস্থান করত। গোবরা ক্যাম্পে দেওয়া হতো তিন ধরনের ট্রেনিং। সিভিল ডিফেন্স, নার্সিং, অস্ত্র চালনা ও গেরিলা আক্রমণ। ক্যাম্পে তখন ভারত সরকার নারীদের সরাসরি অস্ত্র প্রশিক্ষণের অনুমতি না দেওয়ায় শুধু নার্সিং আত্মরক্ষামূলক বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, ফার্স্টএইড প্রশিক্ষণ শুরু হয়। গেরিলা অপারেশনে অংশগ্রহণ, সংবাদ আদান- প্রদান, সাংস্কৃতিক প্রণোদনা, অর্থ-ওষুধ-খাদ্য-বস্ত্র সংগ্রহ, চিকিৎসা ও সেবাকার্য, খাদ্য ও আশ্রয়দান ইত্যাদি সব ধরনের কাজেই মুক্তিযুদ্ধে সাফল্য অর্জনে ভূমিকা রেখেছে নারী।


ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গোবরা ক্যাম্পে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ নিয়েছেন অনেক নারী। জানা যায়, নারী যোদ্ধাদের জন্য আরও তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয়ে। গোবরা ক্যাম্পের বিভিন্ন জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে জড়িত রেখেছেন লায়লা পারভীন। দেশ স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত তিনি গোবরা ক্যাম্পে থেকেই আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করে গেছেন। নিজের পরিবার স্বজনদের থেকে বিছিন্ন হয়ে শুধু দেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করেছেন এই মহীয়সী নারী।


এ প্রসঙ্গে ডা. লায়লা পারভীন বানু বলেন, ‘১৪ এপ্রিল ১৯৭১ পাক বাহিনীর আক্রমণে আমার বাবাসহ আর একজন ঘটনাস্থলেই মারা যান। সন্ধ্যা পর্যন্ত মরদেহ ওখানেই পড়ে থাকে। অফিসের ভেতরে সহকর্মীরা জীবনের ভয়ে কেউ এগিয়ে আসতে সাহস করেনি লাশ দুটি সমাহিত করার জন্য। অফিসের বাগানের মধ্যে বাবাসহ অন্যজনের লাশ দাফনের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি কাতর, আকুলতা ও অনুরোধ নিয়ে। কিন্তু কোন ফল হয়নি। নিদারুণ সত্য হলো- সেদিন কেউ এগিয়ে আসেননি। নিরপরাধ বাবার এই নৃশংস মৃত্যু আমার ভেতরের রাজনীতি সচেতন মনে প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের আগুন জ্বেলে দেয়। প্রতিজ্ঞা করি দেশকে মুক্ত করার। সেই মুহূর্তেই মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ও প্রস্তুতি নেই। আমাদের গ্রামের বাড়ি ধর্মদাহ সীমান্তের খুব কাছে। মাথাভাঙ্গা নদীর পাশে। এই সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন অসংখ্য আহত শরণার্থী যাতায়াত করে। আমার প্রথম কাজ ছিল এসব শরণার্থী শিবিরে যারা অত্যন্ত অসুস্থ; তাদের চিকিৎসা, খাবার ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা। বিচিত্র সব অভিজ্ঞাতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে আমাকে। পাকসেনা দ্বারা ধর্ষণের শিকার নারীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা দিয়ে সুস্থ করে তুলি।’


২ মে পাকসেনারা তাদের গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়। বাড়ি ফিরে দাদার ঝুলন্ত লাশ দেখে কষ্ট ও যন্ত্রণা বুকে চেপে রেখে ছোট ভাইকে সঙ্গে করে করিমপুর চলে যান। নানা সংকট অব্যবস্থা ও অপ্রতুলতার মধ্যে থেকেও বাবা ও দাদাকে হারানোর ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিজের মধ্যে ধারণ করে অটল প্রতিজ্ঞায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে প্রতিশোধের আগুনে দেশকে স্বাধীন করার ব্রত নেন। একটি পতাকার জন্য এদেশের নারী-পুরুষ, আবালবৃদ্ধবনিতা সম্মিলিতভাবে লড়েছিল ১৯৭১ সালে। দেশকে মুক্ত করেছিল। আদায় করেছিল স্বাধীনতা।


স্বাধীন হওয়ার পর পুনরায় তিনি রাজশাহী মেডিকেলে নিজের পড়ালেখা চালিয়ে যান। পড়ালেখা শেষ করে রাজশাহী মেডিকেল কলেজেই লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। এরপর উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। সাভার গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মুক্ত পরিবেশ ও নীতি আদর্শ তাকে মুগ্ধ করে। তিনি গ্রামের মানুষের সেবা করার মানসিকতা নিয়ে গণস্বাস্থ্যে যোগদান করেন। গণস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দেন। ১৯৭৮ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত শীর্ষক সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৮০ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিদেশে চলে যান। সেখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করার পর ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসেন।


দেশে ফিরে তিনি প্রথমে সিকদার মহিলা মেডিকেলে এনাটমি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। দীর্ঘ সংগ্রামী পথ পাড়ি দিয়ে তিনি অবিচল নিষ্ঠাসহ সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাঁর। তিনি বলেন, ‘একসময় পিতৃহত্যার বদলা নিতে যুদ্ধে গিয়েছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে আর এখন স্বাধীন বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও অরাজকতামুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় গড়ার অঙ্গীকার করেছি।’ এ পথে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দিন-রাত। নতুন রূপে পরিচ্ছন্ন পরিবেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাসমৃদ্ধ একটি বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে চান তিনি। নারী-পুরুষের বৈষম্য দূর করে সবাইকে নিয়ে কাজ করার স্বপ্ন দেখেন। এ মহীয়সী নারী বিরূপ প্রতিবেশ, পুরুষ শাসিত মানসিকতা, নারীদের প্রতি অবদমন মনোভাব সবকিছুর বিরুদ্ধে একক সংগ্রাম করে যাচ্ছেন সারাজীবন।


লেখক: সিনিয়র প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়।

  • সর্বশেষ - ফিচার