, ১২ আশ্বিন ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

‘এলিজি মুজিব নামে’ : বঙ্গবন্ধুর চিরায়ত উপস্থিতি

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

‘এলিজি মুজিব নামে’ : বঙ্গবন্ধুর চিরায়ত উপস্থিতি

নিজস্ব ঐকান্তিক অভিজ্ঞতা ও অনুভূতিকে সচেতন কবি শব্দের ব্যঞ্জনায় ভাষিত ও প্রসারিত করে স্বদেশ ও স্বকালে নিজের রচনাকে ভিন্ন ভিন্ন সহৃদয়ের হৃদয়সংবাদী করে তোলেন। এলিজি মুজিব নামে কাব্যগ্রন্থ এদিক থেকে সমুজ্জ্বল- বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে চিন্তায়, কবিসত্তায়, চৈতন্য ও ভাষাভাবনায় প্রতিভাদীপ্তির বিকশিত রূপ অভিনন্দনযোগ্য।

কবি আসাদ মান্নান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কেবল এলিজি লেখেননি তিনি তাঁর পঙক্তিমালা সাজিয়েছেন মানবিক লগ্নতায় ও প্রগতিশীল ভাবাদর্শে। ইতিহাসের দর্পণ এখানে স্বচ্ছ। নাম কবিতার সাতটি অংশের শেষ অংশে যেমন আছে-

মূলত ‘এলিজি মুজিব নামে’ কাব্যগ্রন্থটি ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহ্যের পরম্পরায় করোনা কবলিত পৃথিবীতে চৈতন্যের বোধন ও সত্তার সাধনে ২১টি কবিতা ও একটি অনুভববেদ্য গল্প মানবিক প্রকর্ষে সৃজনশীলতায় ব্যতিক্রমী প্রকাশনা। এখানে নির্ভীক কলমের অনবদ্য আয়োজনে ঋদ্ধ কবি আসাদ মান্নান

‘চুয়ান্ন হাজার বর্গমাইল ব্যাপ্ত এই বক্ষ জুড়ে

যে মানব ঘুমোচ্ছেন তাকে নিয়ে আজ লেখা হচ্ছে

কত গান, এলিজি কবিতা আঁকা হচ্ছে নানা চিত্র

তৈরি হচ্ছে বিচিত্র ভাস্কর্য তাকে লাশ কে বানাবে!

এই লাশে পিতা নেই, শুয়ে আছে বাংলার হৃদয়

যে মরে মরুক ভাই বাঙালির মুজিব মরে না:

সূর্যটাকে ছুটি দিয়ে অই লাশ সূর্য হয়ে ওঠে

এ সূর্যে উদয় আছে; অস্তাচলে আলোকুঞ্জে আমি’(এলিজি মুজিব নামে)

লক্ষণীয় তাঁর কবিতার ভাষাসজ্জা সব ধরনের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ও অনুভূতি ব্যক্ত করতে সক্ষম। ইতিহাসের সময় ও মহামানবের মানবিক সত্তা, চৈতন্য ও ভাষার পারস্পরিক সম্পর্কের নিবিড় সংযোগে উদ্ভাসিত বাঙালি সংস্কৃতি কাব্যকৃতিতে ধরা পড়েছে। বাল্যকাল থেকে কবির সৃষ্টিশীলতায় কী কী সম্ভাবনা অঙ্কুরিত ছিল, সেসব অভিজ্ঞতার নিদর্শনও এ গ্রন্থে আত্মপ্রকাশ করেছে। কবিতার পাশে একটি গল্প কাব্যাদর্শের সঙ্গে অন্বিত।

আসাদ মান্নান কবি কিন্তু তাঁর ভেতর ইতিহাসচিন্তার নির্যাস ঘনীভূত হয়ে উঠেছে। সমাজ-রাষ্ট্র ও পারিপার্শ্বিকতার বাইরে ইতিহাসচেতনা ও জন-অভিজ্ঞতার গহনে ডুব দিয়েছেন তিনি। অতীত কথাবৃত্তে তুলে ধরেছেন অবিস্মরণীয় পঙক্তিমালা। তাঁর কাব্যবোধ ঐতিহাসিক রসের উপাদান হয়ে উঠলেও নিছক ইতিহাস নির্মিতির তথ্যের দিকে ঝুঁকে পড়েননি তিনি বরং কল্পনার অশেষ মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে বাস্তব পৃথিবীতে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশ ও বহির্বিশ্বে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছিল তারও অনুসন্ধিৎসু কিন্তু চিরায়ত ভাষ্য রয়েছে এ কাব্যে। যেমন-

‘কুয়াশার আস্তাবলে জন্ম নেয় কতিপয় ঘোটক সিরাজ,

স্বভাবে নিকৃষ্ট নোংরা সমকামী বাচাল লম্পট-

উন্মত্ত ষাঁড়ের মতো গুঁতা মারে এখানে ওখানে;

অসম্ভব মানবিক একটি ধর্মের মহিমাকে

তছনছ করে দিতে মাঠে নামে পুরনো লেবাসে

জন্মগতভাবে যারা চোখ থাকতে অন্ধ হয়ে থাকে

আপন বিবিকে ফেলে অন্য দিকে মনোযোগী তারা।’(যদি লিখি একটি কবিতা)

আবার বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাল্যকালের অভিজ্ঞতাকে বর্তমানের বোধিতে ধরা, বৃহত্তর পরিসরে জাতির পিতার চিরন্তন ভাবমূর্তিকে প্রকাশ করা সত্যিই অভিনব। কখনো বা আবেগের সাথে যুক্তির বিন্যাসে ও লেখনী নিঃসৃত চিত্রকল্পসজ্জায় উপলব্ধিময় আখ্যানের রূপ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবির চিন্তা পাঠকের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছেন প্রযতেœ। ভাষার নানা নির্দেশ ও ইতিহাস অনুসন্ধিৎসার উপস্থাপনা এবং বাংলা কবিতার ঐতিহ্য সংলগ্নতায় আসাদ মান্নান অনন্য। কেবল বঙ্গবন্ধু নয় নানা বৈচিত্র্যময় কবিতার সংকলনে এ কাব্যগ্রন্থ পূর্ণতা পেয়েছে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে রয়েছে একাধিক কবিতা। আর রয়েছে ধর্ষণসহ সামাজিক সমস্যার নানা প্রসঙ্গ। তবে টুঙ্গিপাড়ার প্রসঙ্গ পাঠককে নাড়া দিয়েছে বেশি-

‘পিতাকে মায়ের স্নেœহে বুকে নিয়ে ঘুমায় যে-গ্রাম

লোকে বলে টুঙ্গিপাড়া; আমি বলি, আমার ঠিকানা;

চৌষট্টি হাজার গ্রাম এই গ্রামে মিলিত হয়েছে-

জন্ম থেকে জন্মান্তরে রক্ত দিয়ে লিখা এই নাম

অনন্তকালের কাছে বাঙালির আকাশ সীমানা।’(যদি লিখি একটি কবিতা)

কবির আধুনিক মননে বাংলা ছন্দের নতুন ভঙ্গি ইঙ্গিতবাহী হয়ে উঠেছে। অনুভূতি, অভিজ্ঞতা আর ইতিহাসের সামগ্রী, ঘটনার পারম্পর্যে ও কার্যকারণ ব্যাখ্যার শৃঙ্খলে রূপগ্রাহ্য তাঁর কাব্যশৈলি। একসময় বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যায় ব্যথিত কবির প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক, একক বেদনাবোধে নিষিক্ত ছন্দোময় স্বগত উচ্চারণে ছিল বাঙময় কিন্তু তা এখন হার্দিক উচ্চারণে অনন্য। তাঁর কাব্যসৃষ্টিতে সাজিয়ে তোলা ছন্দ, ভাষা ও কল্প-সজ্জা, বিশেষ অনুভূতিতে সর্বজনীন সংবেদনে বিস্ময় জাগ্রত করবে যে কোনো পাঠককে। আসাদ মান্নান কবিতায় রোমান্টিক ভাবাবেশে আপ্লুত হননি। নিজের অভিজ্ঞতাকে অনুভূতির রসে কাব্যে জারিত করলেও বিষয়গত দিক থেকে ক্ষণকালকে চিরকালের মহিমায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। মহান পিতা’কে উদ্দেশ্য করে কবি শেষ স্তবকে লিখেছেন-

‘অতঃপর কত গিরি নদী পথ পার হয়ে আলোর নাবিক

পিতা! তুমি ফিরে এলে বীর বেশে গর্বিত যোদ্ধার মতো-

স্বপ্নের জাহাজে চড়ে তীরে এসে দাঁড়িয়েছ মুক্তির হাওয়ায়-

মাঠে মাঠে সোনা ফলে, কৃষকের হাসি জমে ধানের গোলায়:

ফিনিক্স পাখির মতো চিতাভষ্মে জেগে ওঠে তোমার প্রাণের

দুঃখিনী মুজিব বাংলা- শহীদের রক্তজাত এই বাংলাদেশ।’(তোমার স্বপ্নের চেয়ে তুমি যে অধিক প্রিয় )

বঙ্গবন্ধুর না থাকা নিয়ে কবি কাতর, বিক্ষুব্ধ ও হতচকিত। এজন্য এলিজি মুজিব নামে কাব্যে বাঙালির মুজিব মরে না। কারণ তাঁর স্বপ্নের চেয়ে তিনি কবির অধিক প্রিয়। বাঙালির রক্তগঙ্গা বত্রিশনম্বর। শাণিত বাক্য- শকুন পিতার কবরে খোঁজে সন্তানের গলিত হৃদয়। কবি স্বদেশকে দেখেছেন পিতৃঘাতী দেশ হিসেবে। তবে ইতিবাচক প্রত্যাশায় লিখেছেন- নিভে যাবে দানবের হাসি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এসেছেন এভাবেÑ জনতার জনযুদ্ধে বিজয়ের জন ইতিহাস পিতার স্বপ্নে কন্যা আজ মূল বাতিঘর।

‘আলোকিত অন্ধকার’ কথাকাব্য আলোচ্য এলিজি মুজিব নামে গ্রন্থের বতিক্রমী সংযোজন। কবির অনুভূতির অনবদ্য প্রকাশ এই কথাকাব্য একটি প্রতীকী গল্প। ভাষা পুরো কবিতার মতন, স্ট্রাকচারও। এটিকে আধুনিক কবিতা বলে চালিয়ে দেওয়া যায়। এখানে ৩ টি ক্যারেক্টার আছে। একটি ক্যারেক্টার কবি নিজে, একটি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, মাঝে মাঝে তিনি এসেছেন, আরেকটা অদৃশ্য, অশরীরী ক্যারেক্টার- সেটি হচ্ছে সাহস। যে সাহসকে কবি সঙ্গে পেতে চেয়েছেন দুঃসময়ে। এই তিনটি ক্যারেক্টার নিয়ে গল্পটি দাঁড়িয়েছে।

মনে রাখতে হবে কবি একটা দুঃসময়ের মধ্যে ছিলেন। তাঁর ঘরই তাঁর কবর। যে নদীর কথা বলেছেন তা ত্রিশলক্ষ মানুষের রক্ত দিয়ে প্লাবিত। অথচ পদ্মা নদী আমাদের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। যেখানে বাঙালি সেখানেই নদী। বাঙালির জীবন নদী ছাড়া হয় না। যেহেতু তিনি দ্বীপের মানুষ। জন্মসূত্রে নদী এবং সমুদ্রের সঙ্গে তাঁর একটা নিবিড় সম্পর্ক। কাজেই পদ্মাও এখানে সে হিসেবে এসেছে। আমাদের সমস্ত কষ্টকে ধারণ করে আছে এই পদ্মা। আমাদের সমস্ত অর্জনের সঙ্গেও এই পদ্মা জড়িয়ে আছে, সৌন্দর্যের সঙ্গেও। নদী ছাড়া তো বাংলাদেশের সৌন্দর্যের রূপটা ফুটে ওঠে না।

কাজেই দেখা গেল পদ্মার যে জল, কবির কাছে মনে হয় রক্তের মত। ত্রিশলক্ষ মানুষের রক্ত মিশে আছে এই জলের মধ্যে। কারণ জলগুলো লাল হয়ে গেছে। সেখানে একটি কুমিরকে তিনি দেখেছেন। কুমিরটি এখানে একটি অশুভ প্রাণির প্রতীক। এখানে এদেশের স্বাধীনতাকে একটি গাছ হিসেবে তিনি দেখেছেন, একটি বৃক্ষের মতো। যেটাকে তিনি লালন করছেন। স্বাধীনতাকে ওই কুমিরটা একদিন নিয়ে যায়। সেই গাছটিকে আবার দেখা যায় পিতা বঙ্গবন্ধু আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেলেন। এইভাবে এই গল্পের কথাটা লিপিবদ্ধ।

মূলত ‘এলিজি মুজিব নামে’ কাব্যগ্রন্থটি ঐতিহাসিকতা ও ঐতিহ্যের পরম্পরায় করোনা কবলিত পৃথিবীতে চৈতন্যের বোধন ও সত্তার সাধনে ২১টি কবিতা ও একটি অনুভববেদ্য গল্প মানবিক প্রকর্ষে সৃজনশীলতায় ব্যতিক্রমী প্রকাশনা। এখানে নির্ভীক কলমের অনবদ্য আয়োজনে ঋদ্ধ কবি আসাদ মান্নান।

এলিজি মুজিব নামে, আসাদ মান্নান, আগামী প্রকাশনী, ২০২১, প্রচ্ছদ : ধ্রুব এষ, মূল্য : ২০০ টাকা।

  • সর্বশেষ - সাহিত্য