, ১৩ আশ্বিন ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

দেশের ৬৮ কারাগার এখন সংশোধনাগার নিশ্চিত হয়েছে ভালো পরিবেশ ও খাবার

  শাহ মোহাম্মদ রনি

  প্রকাশ : 

দেশের ৬৮ কারাগার এখন সংশোধনাগার নিশ্চিত হয়েছে ভালো পরিবেশ ও খাবার
সংশোধনাগারে পরিণত হয়েছে দেশের ৬৮ কারাগার। বাস্তব রূপ পেয়েছে ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ মূলমন্ত্র। নিশ্চিত করা হয়েছে ভালো পরিবেশ ও উন্নতমানের খাবার। দ্রুত এগিয়ে চলছে কারাগারগুলোকে আধুনিকায়নের কাজ। আধুনিকায়ন শেষ হলে সুফল ভোগ করবেন বন্দি, তাদের স্বজন, কারা কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। কারাগার সম্পর্কে মানুষের ভ্রান্ত ধারণা পাল্টে গেছে। সোমবার দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন্স) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব মহোদয়ের নির্দেশনায় কারাগারগুলোকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে। দক্ষ জনবল তৈরী করার জন্য চালু রয়েছে বিভিন্ন প্রকল্প। বন্দিরা কারাগার থেকে বিভিন্ন ধরণের কাজ শিখে বাড়ি ফিরে সাবলম্বী হচ্ছেন। সূত্র মতে, কারাগারগুলোয় বাড়ানো হয়েছে নানান সুযোগ-সুবিধা। দেওয়া হচ্ছে সুস্বাদু এবং উন্নতমানের খাবার। মহিলা বন্দি ও তাদের সন্তানদের জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। সেবার মান অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। স্বাচ্ছন্দে দিন কাটাচ্ছেন প্রায় ৮০ হাজার বন্দি। ভালো খাবার ও সুযোগ-সুবিধা এবং পর্যাপ্ত বিনোদনের সুযোগ পেয়ে বন্দিরা খুবই খুশি। নিয়ম মেনে নিজেদের মধ্যে মেলামেশা, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ পাচ্ছেন আটক বন্দিরা। সম্প্রতি কয়েকটি কারাগার থেকে মুক্ত বন্দি ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলে এমন তথ্যই পাওয়া গেছে। অন্যদিকে আইজি প্রিজন্স-এর নির্দেশ বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন এ্যাডিশনাল আইজি প্রিজন্স, ৮ রেঞ্জের ডিআইজি প্রিজন্স, ১৩টি কেন্দ্রীয় এবং ৫৫টি জেলা কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার, জেল সুপার, জেলার ও ডেপুটি জেলাররা।

আইজি প্রিজন্স বলেন, কারাগার আধুনিক সভ্যতায় বন্দিদের সংশোধন ও সুপ্রশিক্ষিত করে সভ্য সমাজের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার একটি প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন কারণে মানুষ অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়তেই পারেন। আইন অনুযায়ী শাস্তি প্রদানের পাশাপাশি তাকে সংশোধন করে গড়ে তোলার দায়িত্ব কারা অধিদপ্তরের। তিনি বলেন, ‘রাখিব নিরাপদ, দেখাব আলোর পথ’ মূলমন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে কারাগারসমূহে আসা বিপথগামীদের সঠিক পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে তাদের কৃত কর্মকাণ্ডের ভুল বুঝতে সহায়তা করা, সংশোধন করা ও যুগের সাথে তাল মিলিয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে সমাজে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, কারা বিভাগ একটি সুপ্রাচীন প্রতিষ্ঠান। ১৭৮৮ সালে তৎকালীন শাসকদের দ্বারা একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা কারাগারের তথা কারা বিভাগের যাত্রা শুরু হয়। ১৮১৮ সালে রাজবন্দিদের আটকের জন্য বেঙ্গল বিধি জারি করা হয়। ১৮৩৬ সালে জেলা ও তৎকালীন মহকুমা সদর ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লায় কারাগার নির্মাণ করা হয়। তিনি বলেন, ১৯২৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারকে কেন্দ্রীয় কারাগার হিসেবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর স্বাধীন দেশে বাংলাদেশ জেল বা বি.ডি.জে. এর যাত্রা শুরু হয়। বর্তমানে দেশে ১৩টি কেন্দ্রীয় কারাগার ও ৫৫টি জেলা কারাগার রয়েছে।

জানা যায়, দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দিদের মাঝে বর্তমানে সুস্বাদু এবং উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। যেকোনো সময়ের তুলনায় পরিমাণে বেশি এবং খাবারের মান অনেক ভালো। এর মধ্যে সকালে সপ্তাহে ২ দিন চাল ও বিভিন্ন রকমের ডালের খিঁচুড়ি, ১ দিন রুটির সাথে হালুয়া ও ৪ দিন রুটির সাথে সবজি, দুপুরে ভাত, সবজি ও ডাল এবং বিকালে ভাত ও ডালের সাথে সপ্তাহে ১ দিন গরুর মাংস, ১ দিন ডিম ও ৫ দিন বিভিন্ন রকমের মাছ দেওয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন জাতীয় দিবসে বন্দিদের মাঝে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হয়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে জামিনে ছাড়া পাওয়া হাজতী ঢাকা মহানগরী মগবাজারের শফিকুল ইসলাম, মধ্য বাড্ডার সোহেল রানা, দক্ষিণখানের শফিকুল ইসলাম, নাখালপাড়ার হযরত আলী, কলাবাগানের আনোয়ার হোসেন, মোহাম্মদপুরের আজগর আলীসহ অর্ধশত ব্যক্তি দৈনিক জাগ্রত বাংলা’কে এমন তথ্যই জানিয়েছেন। তারা জানান, নানান সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি আটক বন্দিরা এখন স্বজন ও আইনজীবীদের সাথে মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারেন। কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সাবলম্বী হওয়ার জন্য বন্দিদের বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। মুজিব শতবর্ষসহ বিভিন্ন জাতীয় দিবসে কারা সদর দপ্তর ও বিভিন্ন কারাগারে অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। বন্দিদের জন্য কারাগারগুলোয় বিভিন্ন ধরণের খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। সূত্র মতে, কারাগারগুলোয় বন্দিদের নিরাপদ আটক নিশ্চিত করা, কারাগারের কঠোর নিরপত্তা ও বন্দিদের মাঝে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, বন্দিদের সাথে মানবিক আচরণ করা, বাসস্থান, খাদ্য, চিকিৎসা, স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাত নিশ্চিত করা এবং সুনাগরিক হিসেবে সমাজে পুনর্বাসন করার জন্য প্রয়োজনীয় পরামর্শ এবং প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়ে থাকে।

সূত্র জানায়, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন ১৯৬৫ সালের ১ জানুয়ারি ঐতিহ্যবাহী রাজবাড়ী জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯১ সালের ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্মি মেডিকেল কোর-এ যোগদান করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে দক্ষতা এবং নিষ্ঠার সাথে সেনাবাহিনী সদর দপ্তর, নৌবাহিনী সদর দপ্তর, বিডিআর সদর দপ্তর, সিএমএইচ ঢাকা ও ডিভিশন সদর দপ্তরে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি ফিল্ড ইউনিট কমান্ড এবং ‘আর্মি মেডিকেল কোর ট্রেনিং সেন্টার’ এর প্রধান প্রশিক্ষক ও কমান্ড্যান্টের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ০৭-০৪-২০১৯ তারিখ থেকে কারা অধিদপ্তরে যোগদানের পূর্ব পর্যন্ত ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ০৬-১০-২০২০ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগে কারা মহাপরিদর্শক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ‘এমপিএইচ’ ডিগ্রী এবং ২০১৪ সালে বিইউপি (বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ প্রফেশনালস) থেকে ‘এমফিল’ ডিগ্রী লাভ করেন। এছাড়া তিনি জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে কুয়েতে ওকেপি-৫ এ নিয়োজিত ছিলেন। দাপ্তরিক ও ব্যক্তিগত সফরে চীন, জাপান, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া এবং কোর্সে তুর্কি গমন করেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন ০৮-১০-২০২০ তারিখ থেকে আইজি প্রিজন্স-এর দায়িত্ব পালন করছেন।
  • সর্বশেষ - আলোচিত খবর