, ১২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

শোক আর বেদনা নিয়ে এসেছে আগস্ট মাস!

  নিজস্ব প্রতিবেদক

  প্রকাশ : 

শোক আর বেদনা নিয়ে এসেছে আগস্ট মাস!

রিপন আহসান ঋতু

সমাজে মানুষ অপয়া হয়। অলক্ষণে হয়। ছোটবেলায় শুনতাম সপ্তাহের দু’একটা দিনও অপয়া হয়। তার মধ্যে শনিবার, মঙ্গলবার, বুধবার উল্লেখযোগ্য। শনিবারে সাবধানে থাকতে হয়, নইলে শনি লাগতে পারে। সন্ধ্যার পরে মঙ্গলবার দিন বাইরে থাকা ভালো নয়। মঙ্গলবার নাকি ভূত-প্রেতের বার। এদিন তারা মানুষ, কুকুরসহ নানা প্রাণির বেশ নিয়ে চলাফেরা করে। সফর, ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য বুধবার মন্দ দিন। এদিনে কোনো শুভকাজ শুরু করতে নেই, শুভযাত্রাও করতে নেই। এমনকি এ দিনগুলোয় মানুষকে ছোটবেলায় বিয়ে করা থেকেও দূরে থাকতে দেখেছি। ইত্যাদি ইত্যাদি আরও কত কল্প-কাহিনি। বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেসব কাহিনি আজ কৌতুকের বিরাট খোরাক জোগায়। তবে বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুধাবন করেছি, বৃটিশ শাসনের দিয়ে যাওয়া ইংরেজি বারো মাসের একটি মাস সত্যি অপয়া। অন্তত বাঙালি জাতির জন্য। না হলে এদিন এলেই কেন সব পত্রিকা-টেলিভিশনে শিরোনাম হয়, ‘এলো শোকের মাস আগস্ট’? হিসাব করে দেখলাম, কথা মিথ্যা নয়।

বাঙালি জীবনে আগস্ট অনেক হারানোর বেদনা নিয়ে আসে। অনেক শোক আর বেদনাময় স্মৃতির পসরা সাজিয়ে আসে আগস্ট। শুরুতেই বলা যেতে পারে, ৫ আগস্ট হারিয়েছি সিকান্দার আবু জাফরকে। তিনি একজন বাঙালি কবি, সংগীত রচয়িতা, নাট্যকার ও সাংবাদিক। তিনি ভারত বিভাগোত্তর কালে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা সমকাল সম্পাদনার জন্য বিশেষভাবে খ্যাত। তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতা হলো ‘জনতার সংগ্রাম চলবেই, আমাদের সংগ্রাম চলবেই’। এটি পরে জনপ্রিয় গণসংগীতে রূপান্তরিত হয়। ৬ আগস্ট চিরবিদায় নেন সুরেন্দ্র ব্যানার্জী। সুরেন্দ্র ব্যানার্জী ব্রিটিশ ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রথম যুগের একজন বিশিষ্ট নেতা। তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল কনফারেন্সের প্রতিষ্ঠাতা। পরে দলটিকে নিয়ে তিনি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন। তাঁকে রাষ্ট্রগুরু সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। ৭ আগস্ট! এদিন বাংলা ও বাঙালির বিস্ময়পুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রয়াণ দিবস। যে কবি তার সাহিত্যের আলোয় আলোকিত করে গেছেন হাজার বছরের বাঙালির মন ও মননশীলতা; সেই কবির চলে যাওয়ার দিন এ আগস্টের ৭ তারিখ। বলাবাহুল্য, এপার-ওপার দুই বাংলায়ই চলে রবি ঠাকুরের স্মরণে শোকের মাতম, শ্রদ্ধাঞ্জলির মহড়া।

অকুতোভয় বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসুকে ১১ আগস্ট ভোরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। আবার একই দিনে একদল কাপুরুষের জঘন্য হামলায় মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের আরেক শক্তিমান লেখক হুমায়ুন আজাদ। তিনি থাকলে জাতির কতটা উপকার হতো জানি না, তবে তার না থাকা জুড়ে যে কত শূন্যতার জন্ম হয়েছে, তা সচেতন আর মুক্তমনা বাঙালি মাত্রই উপলব্ধি করছে। ১১ তারিখের ক্ষত শেষ না হতেই সামনে এসে দাঁড়াবে আরেক শোকের দিন ১৩ আগস্ট, এদিনে নতুন সিনেমার জন্য লোকেশন দেখতে গিয়ে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নন্দিত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ। তার সাথে সেদিন প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রখ্যাত চিত্রগ্রাহক মিশুক মনির। দুই দিগন্তের দুই দিকপালের মৃত্যুবার্ষিকী মানেই বাংলাদেশের জন্য বেদনাময় স্মৃতির দিন।

প্রতিবছর আগস্ট মাস এলেই প্রগতিশীল, স্বাধীনতায় বিশ্বাসী প্রতিটি বাঙালির মনে নানা ঘটনা ঘুরপাক খায়। স্বাধীন বাংলাদেশে এ মাসে নেমে আসে বাঙালি জাতির ওপর এক কালো থাবা। বাঙালির ইতিহাসে কলঙ্কিত এক অধ্যায় সূচিত হয়েছে এ আগস্ট মাসে। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাঙালি জাতি সে নিষ্ঠুর হত্যার বিচারের রায় কার্যকরের মাধ্যমে কলঙ্কমুক্ত হলেও ঘাতকদের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণার চেতনাকে নতুন করে জাগিয়ে তোলে এ মাস। আগস্টকে ঘাতকরা তাদের নিষ্ঠুর টার্গেটের মাস হিসেবে বেছে নিয়েছে বারবার আর ১৫ আগস্টের পরিচয় বাঙালিকে নতুন করে দেওয়ার কিছু নেই। এদিনে ক্ষমতালোভী কিছু পাষণ্ড, বর্বর, অসভ্য, জানোয়ার সেনা অফিসারের হাতে স্বপরিবারে নিহত হয়েছিলেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিবছরের এদিন বাংলাদেশের জন্য জাতীয় শোকের দিন। বাংলার ইতিহাসে এমন ভয়াবহ কলঙ্কিত ইতিহাসের দিন আর কখনো আসেনি, বোধ করি আসবেও না। ১৫ আগস্টের ভোররাতে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালিকে হারানোর ক্ষতি আজীবন এ জাতিকে বহন করতে হবে।

১৭ আগস্ট নাগরিক কবি শামসুর রাহমানকে হারিয়েছি। শামসুর রাহমান বিংশ শতকের ত্রিশ দশকের পাঁচ শ্রেষ্ঠ কবির পর আধুনিক বাংলা কবিতার প্রধান পুরুষ হিসাবে প্রসিদ্ধি লাভ করেন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি আদি নিবাস নরসিংদীর পাড়াতলী গ্রামে চলে যান। সেখানে যুদ্ধের ধ্বংসলীলায় আক্রান্ত ও বেদনামথিত ‘স্বাধীনতা তুমি’ এবং ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা’ কবিতা দুটি লেখেন। সাম্প্রদায়িক শক্তি বারবার তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যে খুনীরা ধারালো অস্ত্রসহ তার বাসায় হামলা করেছে। ১৭ আগস্ট তার মৃত্যুবার্ষিকী। নিঃসন্দেহে বরাবরের মত এবারও দিনটি খুঁচিয়ে যাবে প্রিয় মানুষটিকে হারানোর বেদনাকে।

তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট সরকারের আমলে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সারাদেশে সিরিজ বোমা হামলা চালিয়েছিল কিছু ধর্মান্ধ জঙ্গী। এ হামলায় ঝরে গেছে অনেক প্রাণ। তবে তার চেয়েও বড় ক্ষতি হয়েছে আন্ততর্জাতিক অঙ্গনে। বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল জঙ্গিবাদের রাষ্ট্র হিসেবে। ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশের জন্য এর চেয়ে অলক্ষণে, অপয়া আর কোন দিন হতে পারে?

এ মাসের হারানোর ইতিহাস বড়ই অদ্ভুত। তাই এ মাসে আমরা হারিয়েছি আমাদের নাটকের দুই দিকপালকে। ১৮ তারিখে সেলিম আল দীন। তবে দিনটি আরও বেদনাময় হয়ে ওঠে ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট বর্ষণমুখর সন্ধ্যায় নেতাজী সুভাষ বসুকে বহনকারী বিমান তাইপেতে দুর্ঘটনার শিকার হলে। এতে ভারতের বিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী নেতা সুভাষ বসুর জীবনলীলা সাঙ্গ হয়। নেতাজীর মৃত্যুর অল্প কয়েকদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকি শহরে অসংখ্য বোমা নিক্ষেপ করে হাজার হাজার জাপানির মৃত্যু ঘটায়। আগস্ট মাসের এ ঘটনা জাপানিদের কাছে ভয়াবহ স্মৃতির ইতিহাস। ২০ আগস্ট আমরা হারিয়েছিলাম আমাদের অন্যতম বীরশ্রেষ্ঠ মতিউর রহমানকে। ২১ তারিখে আব্দুল্লাহ আল মামুনকে।

এত সব পেরিয়েই আসে ২১ আগস্ট! তৎকালীন ১৮ দলীয় জোট সরকারের আমলে সরকারের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীরা ২০০৪ সালের এদিনে বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশে গ্রেনেড হামলা চালায়। হামলায় তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ লোক আহত হন। মাত্র দেড় মিনিটের মধ্যে বিস্ফোরিত হয় ১১টি শক্তিশালী গ্রেনেড। এতে ঘটনাস্থলেই ১২ জন এবং পরে হাসপাতালে আরও ১২ জন নিহত হন। হাসপাতালে নিহত হওয়া সেই ১২ জনের একজন আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নারী নেত্রী মিসেস আইভি রহমান। যিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী। একজন নির্লোভ, সাহসী, সৎ নেত্রী হিসেবে আইভি রহমানের মৃত্যু দিবস ২৪ আগস্ট আরেকটি শোকের দিন।

অবশ্য তারও আগে এদিন বাঙালির কাছে অপয়া হয়ে আছে ইয়াসমিন হত্যার দিন হিসেবে। ১৯৯৫ সালের এদিনে দিনাজপুরে একদল পুলিশ সদস্যের হাতে তরুণী ইয়াসমিন নিমর্মভাবে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদে-বিক্ষোভে ফেটে পড়ে দিনাজপুরের আমজনতা। প্রতিবাদী মানুষকে লক্ষ্য করে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালিয়ে সাত জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। রক্তে রঞ্জিত হয় রাজপথ। সবশেষে একেবারে মাসটির শেষের দিকে লেগে আছে আরেক শোকের দাগ। ২৮ আগস্ট জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যুবার্ষিকী। এদিনের শোক নিয়ে কিছু বলব না। কেবল হৃদয়ের বেদনা ভাগ করে নিতে চাইব একটি অভিমত দিয়ে, ‘বাঙালি হয়তো আর কোনো দিনই নজরুলের মত মহামানবের দেখা পাবে না।’

এই হলো আগস্ট। চলতি বছরের আগস্ট মহামারি করোনার কবলে পড়েছে। আগস্ট বোধ হয় তার অপয়া স্বভাব থেকে কোনোভাবেই বের হতে পারছে না। তবুও আশা থাকবে, আগস্ট মাস বাঙালির জন্য আর কোনো বেদনার খবর দিবে না আমাদের।

লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।

  • সর্বশেষ - ফিচার