, ২ কার্তিক ১৪২৮ অনলাইন সংস্করণ

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ : আত্মকথায় অমর্ত্য সেন

  সাহিত্য ডেস্ক

  প্রকাশ : 

জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ : আত্মকথায় অমর্ত্য সেন

এক.
১৯৯৮ সাল। লন্ডনে বিবিসির এক ইন্টারভিউতে প্রশ্নকর্তা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি আপনার নিবাস কোথায় বলে মনে করেন?’ ‘পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে আপনার অবস্থান—হার্ভার্ড থেকে ট্রিনিটি। ইংল্যান্ড থেকে আমেরিকা। আবার আপনার পাসপোর্টে ভারতীয় নাগরিকত্ব, যেখানে ভিসায় পুরো পাসপোর্টটি পরিপূর্ণ। কাজেই আমরা আপনার বাড়ি কোথায় বলে ধরে নেবো?’ সে সময় তিনি ছিলেন ট্রিনিটিতে। যে কারণে তিনি উত্তর দিলেন, ‘এখন যেহেতু আমি এখানে তাই ধরে নিন এটাই এখন আমার বাড়ি।’ ‘ট্রিনিটিতে একসময় ছিলাম ছাত্র, গবেষক, রিসার্চ ফেলো, আবার শিক্ষকও। আবার সাথে সাথে এটাও বলতে হবে, ম্যাসাসুটসের হার্ভার্ড স্কয়ারের পুরনো বাড়িটাই আমার ঠিকানা। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আমাকে এটাই বলতে হবে, আমার বাড়ি ভারতবর্ষ বলতেই আমি সবচেয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবো, বিশেষ করে শান্তিনিকেতনের সেই ছোট্ট বাড়িটা; যেখানে আমি বারবার ফিরে যাই।’ অবশ্য এ ধরনের বেশ বুদ্ধিদীপ্ত উত্তরে প্রশ্নকর্তা বেশ খানিকটা অস্বস্তির সাথে বলেন, ‘মনে হচ্ছে বাড়ির ধারণা সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বড্ড অপ্রতুল।’ তবে প্রশ্নকর্তা যা-ই ভাবুন না কেন, বাঙালির ইতিহাসে যে কয়জন মানুষ বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠেছেন, তাদের অন্যতম হচ্ছেন নোবেল বিজয়ী দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন। বাবা আশুতোষ সেনের বাড়ি ছিল মানিকগঞ্জে এবং তিনি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক। দাদু ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন খুবই নামকরা পণ্ডিত, ইতিহাসবিদ এবং বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বল্পকালীন উপাচার্য। ক্ষিতিমোহনের বাড়ি ছিল বিক্রমপুরে। যিনি জীবনের একটা বড় অংশ শান্তিনিকেতনে অধ্যাপনা করেন। ক্ষিতিমোহন ১৯০২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে এমএ করেন। রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে তিনি ১৯০৮ সালে শান্তিনিকেতনের ব্রহ্মাচার্য আশ্রমের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। সে কারণে বলা চলে, পিতৃভূমি এমনকি মাতৃকূলের নিবাস পূর্বতন বাংলায়। অধ্যাপক সেন গর্বভরে সেকথা উচ্চারণ করেছেন বারবার তার লেখায়।

৮ জুলাই পেঙ্গুইন থেকে প্রকাশিত অমর্ত্য সেনের আত্মজীবনী ‘Home in the World : A Memoir’ শুরু হয়েছে এমনই সব প্রশ্নোত্তর দিয়ে। অমর্ত্য সেনের প্রতি আগ্রহ অনেকের মতো আমারও। আগ্রহটা তার অর্থনৈতিক ও গাণিতিক ধারণা নিয়ে নয় বরং সমাজ, নৈতিকতা, বৈষম্য, উন্নয়ন এবং সমাজতাত্ত্বিক চেতনাবোধ সম্পর্কে তার অভূতপূর্ব বিশ্লেষণ নিয়ে। ভারতবর্ষের সামাজিক বিবর্তন নিয়ে তার লেখা ‘Argumentative Indian’ আমার মনোযোগ কাড়ে দেড় দশক আগে। ভারতীয় সমাজব্যবস্থা কীভাবে একটা দ্বান্দ্বিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে, সেটা তিনি দেখিয়েছেন তার এ গ্রন্থে। তা ছাড়া পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে পুবের মিল-অমিল নিয়ে সুবিস্তার আলোচনা আছে এখানে, সাথে আছে রবীন্দ্র ভাবনার দশ-দিগন্ত। ইত্যাদি কারণে সদ্য প্রকাশিত তার আত্মজীবনীর প্রতি আমার কৌতূহল বড্ড মাত্রাতিরিক্ত। অতি অল্প সময়ে বইটা হাতে পেয়ে কৌতূহলের মাত্রা আমার মনে রোমাঞ্চকর পরিস্থিতি তৈরি করে; আমার ধারণা, যে কেউ বইটা হাতে পেলে তারও আমার মতো মানসিক অবস্থা তৈরি হবে।

যারা নীরদ সি চৌধুরীর ‘Autobiography of an Unknown Indian’ পড়েছেন কিংবা জহরলাল নেহেরুর ‘An Autobiography’ পড়েছেন; তারা নিশ্চয়ই জানেন একটা আত্মজীবনী তখনই বিশ্বমাত্রা পায় যখন ব্যক্তিগত কথন ছেড়ে তা ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি কিম্বা সামাজিক অবস্থার স্রোতের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করে। সাথে সাথে সেটা ব্যক্তিক ও নৈর্ব্যক্তিকতার মাঝে অপরিহার্য বন্ধন তৈরি করলে তখন সেটা ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে উপরের দু’জন থেকে অমর্ত্য সেনের পার্থক্য হলো, তারা দু’জনই আত্মজীবনী লিখেছেন অপরিণত বয়সে, নীরদ ৫৪ বছরে, নেহেরু ৪৭ এ। সেদিক থেকে ৮৮ বছর বয়স পেরিয়ে লেখা অধ্যাপক সেনের আত্মজীবনী জীবনের একটা পরিপূর্ণ দালিলিক রোমাঞ্চকর পরিবেশনা। রবীন্দ্রনাথের পর অমর্ত্য সেন ছাড়া সম্ভবত অন্য কোন বাঙালি পশ্চিমা দেশে এতটা বিচিত্রমুখী প্রভাব ফেলতে পারেনি। এক্ষেত্রে অমর্ত্য সেনের বিশেষত্ব হচ্ছে ইউরোপ এবং আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য, বঞ্চনা, বৈষম্য, বণ্টন, সামাজিক সমতা, নৈতিকতা, ভারতবর্ষ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক ডিলেমা, ন্যায়, নীতি, অথবা ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা নিয়ে তিনি ব্যাপক আলোচনা করেছেন। এটা কোন বাঙালির ক্ষেত্রে বিরল ঘটনা।

দীর্ঘ জীবনের কোলঘেঁষে সাপের মতো তার জীবন-ইতিহাস এগিয়েছে। এক্ষেত্রে তিনি উপভোগ করেছেন সমস্ত কাল পার্বিক চড়াই-উৎরাই। ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করা অমর্ত্য সেন জীবন গঠনের মুহূর্তগুলো কাটিয়েছেন ঢাকা ও শান্তিনিকেতনে। কিছুটা সময় বাবার চাকরির সুবাদে বার্মায়। এ কারণে তার জীবন প্রভাতে যে পূর্ব দিগন্তের সূর্য আলো ফেলেছিল তার বিস্তার পশ্চিম প্রান্তকেও বিভাষিত করেছে। কিছুতেই ভুলতে পারেননি ঢাকার ওয়ারি, লক্ষ্মীবাজার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস আর নারায়ণগঞ্জ থেকে মানিকগঞ্জ যাওয়ার নদী পথের অপূর্ব সব অভিজ্ঞতা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার নাম দিয়েছিলেন অমর্ত্য। তিনি ভেবেছিলেন, এ ছেলে সত্যি একদিন এ মর্ত্যলোককে জয় করবে! কথাটা যে খুব একটা মিথ্যা নয়, সেটা যারা অমর্ত্য সেনকে জানার চেষ্টা করেছেন, তারা উপলব্ধি করবেন।

ভারতবর্ষের স্বাধীনতা, ইংরেজ শাসন, জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং অবশ্যই প্রতি পদে পদে রবীন্দ্রনাথের গল্প স্থান পেয়েছে আত্মজীবনীতে। তবে বড় একটা অংশ হচ্ছে একজন বাঙালির বিশ্বসভায় আসন করে নেওয়ার ইতিহাস। রবীন্দ্রনাথ (মৃত্যুকালে অমর্ত্য সেনের বয়স ছিল ৮ বছর) এবং তার দাদু ক্ষিতিমোহন সেন কীভাবে তার জীবন ও চিন্তা গঠনে ভূমিকা রেখেছেন তা তিনি বর্ণনা করেছেন পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা। প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ও বাংলা ভাষার ওপর দখল নিয়েই তিনি ইংরেজি ভাষার ওপর পূর্ণাঙ্গ অধিকার নেন। ‘Home in the World’ জীবনের নানাবিধ পরিণতির একটা সমন্বিত ফলাফল। ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুলের চার দেয়ালের ভেতর শুরু হওয়া জীবন এগিয়েছে প্রেসিডেন্সি কলেজের মধ্য দিয়ে। এখানে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পরীক্ষায় অর্থনীতিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। সালটা ১৯৫১। ১৯৫৫ সালে তিনি ক্যামব্রিজের ট্রিনিটি কলেজ থেকে অর্থনীতিতে প্রথম হন। ১৯৫৫-৫৬ সালে তিনি ক্যামব্রিজ থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পরপরই তিনি দেশে ফিরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন বিভাগ অর্থনীতির প্রধান হিসেবে যোগদান করেন।

১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি যাদবপুরে ওই বিভাগে অধ্যাপনা শেষে ট্রিনিটিতে আবার দর্শন পড়েন। সামাজিক চয়ন তত্ত্ব, নৈতিক দর্শন, গাণিতিক যুক্তিবিজ্ঞান ছাড়াও তার বিশেষ আগ্রহ ছিল অসমতা, বঞ্চনা এবং ন্যায্যতা নিয়ে একটা সামগ্রিক দার্শনিক বোধ তৈরি করা। তিনি সেটা করেছেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে। যার পরিণতি হিসেবে তিনি দার্শনিক অর্থনীতি-বিজ্ঞানের ওপর অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পান। দর্শনের প্রতি তার বিশেষ আগ্রহ জন্মে প্রেসিডেন্সি থেকেই। একসময় তিনি আমেরিকান অর্থনীতিবিদ কেনিথ অ্যারোর ‘Social Choice and Individual values’ পড়ে দারুণ অনুপ্রাণিত হন। ১৯৬০-৬১ সালে ট্রিনিটি থেকে ছুটি নিয়ে ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে অতিথি অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। এখানে তিনি অর্থনীতিবিদ পল স্যামুয়েলসন, রবার্ট সোলো, নরবাট ওয়েনার, ফ্রাঙ্কো মডিগিলানি প্রমুখ অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের সম্পর্কে জানার ব্যাপক সুযোগ পান। এর ভেতর ১৯৬৪-৬৫ তে বার্কলির ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ায়ও অধ্যাপনা করেন। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত বিখ্যাত কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে পড়ান। তা বাদে তিনি দুই দফায় দিল্লি স্কুল অব ইকনমিক্সে অধ্যাপনা করেন যথাক্রমে ১৯৬৩ ও ১৯৭১ সালে। ৭১ সালেই তিনি লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের অধ্যাপক হন। সেখানে ছিলেন ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত। ১৯৭৮ সাল থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত অক্সফোর্ডে অর্থনীতি পড়ান। এর পরপরই তিনি হার্ভার্ড-এ যোগ দেন।

১৯৯৮ সালে তিনি আবার ট্রিনিটিতে ফেরত আসেন। ২০০৪ সালে তিনি আবার ফেরত যান হার্ভার্ড–এ। ইতিহাসের অতি পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয় বিহারের নালান্দাতে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেয় ভারত সরকার। এর আগে ২০০৭ সালে তাকে নতুন রূপে একটা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু করানোর জন্য নালান্দা মেন্টর গ্রুপের চেয়ারম্যান নিযুক্ত করা হয়। পৃথিবীর প্রাচীন ইতালির বোগনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও নালান্দা বিশ্ববিদ্যালয় পুরোনো। একসময় বৌদ্ধ দর্শন পড়তে এখানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেকেই আসতেন। অধ্যাপক সেনের ব্যক্তিগত জীবন খুব বেশি একটা সরলরেখার মতো নয়। প্রথম স্ত্রী সাহিত্যিক নবনিতা দেব সেন একজন ভারতীয় লেখক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তাদের দুই কন্যা অন্তরা ও নন্দনা। অন্তরা একজন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান জার্নালিস্ট আর নন্দনা বলিউড অভিনেত্রী। ১৯৭১ সালে লন্ডনে চলে গেলে সেনের সাথে নবনিতার বিচ্ছেদ ঘটে। দ্বিতীয় স্ত্রী ইভা কলরনি ছিলেন ইতালীয় জিউস অর্থনীতিবিদ। তাদের ছিল দুই সন্তান। মেয়ে ইন্দ্রানি নিউইয়র্ক ভিত্তিক সাংবাদিক আর ছেলে কবির ক্যাম্ব্রিজ, ম্যাচাসুটসের স্যাডি হিল স্কুলের শিক্ষক। ইভা ১৯৮৫ সালে ক্যান্সারে মারা গেলে তৃতীয়বার বন্ধনে আবদ্ধ হন হার্ভার্ড প্রফেসর ইমা রথচাইল্ড-এর সাথে। ইমা হার্ভার্ডে ইতিহাস পড়ান। ম্যাসাসুয়েটস ছাড়াও ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজে তার বাড়ি আছে। অবশ্যই তার বাড়ি শান্তিনিকেতনের ‘প্রতীচী’।

এসব থেকে সহজেই অনুমান করা যায়, অমর্ত্য সেনের বাড়ি কোথায়, এর উত্তর কী হতে পারে? বরং বিবিসির প্রশ্নকর্তার প্রশ্নটা হওয়া উচিত ছিল, আপনার বাড়িটা কোথায় বলে আপনি মনে করেন না? কাজেই যে উত্তর অমর্ত্য সেন প্রশ্নকর্তাকে দিয়েছেন, তার অন্যথা হলে বরং মন্দ হতো।

দুই.
লন্ডনের পত্রিকা ‘The Spectator’র কলামিস্ট ফিলিপ হেইন্সার গত সপ্তাহে Home in the World আলোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘In a captivating autobiography, Sen describes the thrill of growing up in a city teeming with bookshops and fierce intellectual debate।’ বইয়ের কাভার ইমেজে অমর্ত্য সেন ব্যবহার করেছেন তার ১৯৪৮ সালে শান্তিনিকেতনে জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটা ছবি। সাথে আছে বোন সুপর্ণা এবং কাজিন মিরা। তিনি ইচ্ছে করে শেষ বয়সের ছবি দেননি, দেননি অক্সফোর্ড কিংবা ক্যামব্রিজের ছবি। এমনকি হার্ভার্ড কিংবা এমআইটির কোন ছবিও। তিনি ব্যবহার করেছেন শান্তিনিকেতনের অনেক পুরোনো একটা ছবি, যেটা প্রতীকী অর্থে ধরলেও বেমানান হবে না যে তার চাহনি ছিল বিশ্বভূমির দিকে। ওইটুকু জানালার ফাঁক দিয়ে তিনি বেরিয়ে আসতে চেয়েছিলেন বিশ্বালোকে। ঠিক রবিঠাকুর যেমনটি নিজের জীবন সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘সেদিন জীবনের ছোটো গবাক্ষের কাছে/ সে বসে থাকত বাইরের দিকে চেয়ে।/ তার বিশ্ব ছিল/ সেইটুকু ফাঁকের বেষ্টনীর মধ্যে।’ সেই ছোট্ট ছেলেটি রবীন্দ্রনাথ জানালার ক্ষুদ্র বেষ্টনী ভেঙে যেমন বেরিয়ে পড়েছিলেন পূর্ব-পশ্চিম প্রান্ত আলোকিত করে; অমর্ত্য সেন ঠিক তেমনই এ জানালা দিয়েই দেখতে পেয়েছিলেন পশ্চিমের আলো।

কলকাতা থেকে বিলেতে পড়ার আপাত অসম্ভব ব্যাপারটা সম্ভব হয়েছিলো বাবা আশুতোষ সেনের মনোবলের জন্য। অসম্ভব ছিল এই জন্য যে, বিলেতে পড়ার খরচ নির্বাহ করার মতো সামর্থ্য ছিল না তার। তারপরেও অনেক হিসেব করে বাবা দেখলেন লন্ডনে তিন বছর পড়ার খরচ তিনি জোগাড় করে ফেলবেন। সেসময় লন্ডনে বিশেষ কোন স্কলারশিপের প্রচলন ছিল না। ট্রিনিটিতে ভর্তির উদ্দেশে আবেদন করার অল্প কিছু পরেই তারা আরও কিছু ভালো আবেদনের প্রেক্ষিতে তাকে না করে দেয়। ফলে বিলেতে পড়া আপাত অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। কিন্তু কিছু ছাত্র ভর্তি না হওয়ায় সুযোগ আসে। ট্রিনিটির দিনগুলো ছিল বেশ রোমাঞ্চকর। ভারতবর্ষে পড়াশোনার সময় যেসব অর্থনীতিবিদের লেখা পড়ার সুযোগ হয়েছিল; সেসব অর্থনীতিবিদের কাছে সরাসরি জানার অপূর্ব সুযোগ পেয়ে ভীষণ আপ্লুত হন অমর্ত্য সেন। তবে শিক্ষক হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন অর্থনীতিবিদ মরিস ডব কিংবা পিয়েরো শ্রাফাকে। প্রাথমিকভাবে তিনি পেলেন অপেক্ষাকৃত তরুণ কেনিথ বেরিলকে। বেরিলের সাথে খুব সময়ের ভেতরেও তার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে খুব কম সময়ের ভেতরে ট্রিনিটিকে তিনি আপন করে নেন। একসময়ের আইজ্যাক নিউটন, ফ্রান্সিস বেকন কিংবা টমাস ম্যাক্কুলির ট্রিনিটি তার কাছে হয়ে ওঠে অতি আপন। বিশ্বের নামকরা অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিকদের সাথে তার সখ্য গড়ে ওঠার পেছনে ছিল অসম্ভব বিচক্ষণতা। দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা পাল্টে দেন তিনি। শুধু খাদ্যের অভাবেই দুর্ভিক্ষ হয় না, দুর্ভিক্ষ হয় সুসম বণ্টনের অভাবেও। নিজের চোখে শান্তিনিকেতনে তিনি দেখেছেন দুর্ভিক্ষের দৃশ্য।

তিন.
হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড শুধু একজন নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদের আত্মজৈবনিক কথনই নয়, একজন দার্শনিকের পশ্চিম দেশের অধ্যাপনা করার সংগ্রামই নয় অথবা ইউরোপ-আমেরিকার সামাজিক অবস্থা বর্ণনা করার জন্যও নয়–বরং প্রায় শতবর্ষের ভারতবর্ষ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গতি-প্রকৃতির সাথে বিশ্বের বহু দার্শনিক ও অর্থনীতিবিদের চিন্তার এক অনন্য দলিল বইটি। ভারতীয় প্রাচীন সংস্কৃত সাহিত্য ‘মেঘদূত’ কিংবা ‘মৃচ্ছকটিক’ থেকে ন্যায়, নীতি, উপদেশ নিয়েছেন তিনি, উপদেশ নিয়েছেন স্কটিশ দার্শনিক ডেভিড হিউম, কিংবা ক্যামব্রিজের ভিটগেন্সটাইনের অথবা আমেরিকান প্রেগমেটিস্টদের কাছ থেকে। তিনি আলোচনা করেছেন মার্ক্সসীয় অর্থনৈতিক ধারণা, কেইন্সের কিংবা অরোর চিন্তা ইত্যাদি।

অধ্যাপক সেন বর্ণনা দিয়েছেন শিশু বয়সের বার্মার অভিজ্ঞতা, পুরান ঢাকার জীবন, বাংলার নদ-নদীর উপাখ্যান, উপমহাদেশে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক, ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ, ভারত বিভাজন, গান্ধী-রবীন্দ্রনাথ বিতর্ক, শান্তিনিকেতন, বিলেত যাওয়ার রোমাঞ্চকর প্রথম অভিজ্ঞতা; সাথে সাথে পশ্চিমা বিশ্বের দীর্ঘ প্রবাস জীবন, ট্রিনিটিতে ‘মাস্টার’ হওয়ার গল্প ইত্যাদি। তবে স্বীকার করতে হবে, সময় যত এগিয়েছে অমর্ত্য সেন হয়ে উঠেছেন ‘বিশ্বনাগরিক’ ইংরেজিতে যাকে বলে ‘সিটিজেন অব দ্য ওয়ার্ল্ড’। রবীন্দ্রনাথ দ্বারা প্রভাবিত অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ছিলেন একজন উদারনৈতিক, মুক্তমনা, অসাম্প্রদায়িক, বহু সংস্কৃতির ধারক এবং উন্নত বিশ্বচেতনার অনুসারী। কট্টর ভারতীয় জাতীয়তাবাদ, উগ্রবাদ এবং সামাজিক বৈষম্য তাকে পীড়া দেয়। অমর্ত্য সেনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কাজের প্রতি আনন্দ। তিনি হার্ভার্ড গেজেটে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘I have never done work that I was not interested in. That is a very good reason to go on.’ তিনি যেমন আনন্দের সাথে কাজ করেছেন; তেমনই বিশ্বের যেখানেই গেছেন সেটা তার আনন্দভূমি বলে তিনি ভেবেছেন। সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনি বলতে চেয়েছেন, জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।

  • সর্বশেষ - ফিচার